১৮ নভেম্বর ২০১৭,   ঢাকা, বাংলাদেশ   শেষ আপডেট এই মাত্র  
Login   Register        
ADS

বন্যা ॥ খাদ্য সঙ্কট চরমে


জনকণ্ঠ ডেস্ক ॥ নদ-নদীর পানি বৃদ্ধির কারণে সারাদেশে সার্বিক বন্যা পরিস্থিতির আরও অবনতি হয়েছে। কুড়িগ্রামে বন্যার পানিতে ডুবে মারা গেছে এক শিশু। বন্যাদুর্গত এলাকায় খাদ্য ও বিশুদ্ধ পানি সঙ্কটে মানুষের দুর্দশা চরম আকার ধারণ করেছে। স্টাফ রিপোর্টার ও নিজস্ব সংবাদদাতাদের পাঠানো খবর :

কুড়িগ্রামে তিন লাখ

মানুষ বন্যার কবলে

ধরলা ও দুধকুমোর নদীর অববাহিকায় যাত্রাপুর ইউনিয়নের খাসেরচর, প্রথম আলোর চরের গ্রামের দিনমজুর আবদুস সোবাহান, ফজলার রহমান, আবদুস সামাদ, সাইফুল ইসলাম ঘরে হাঁটুপানির মধ্যে পরিবার-পরিজন নিয়ে মাচানের ওপর উপোসে দিন কাটাচ্ছেন। তারা দিনে একবেলা খাবার খাচ্ছেন। এক সপ্তাহের বেশি সময় বেকার বন্যাকবলিত ৪শ’ গ্রামের প্রায় তিন লাখ মানুষ। ধারদেনা অথবা চড়াসুদে টাকা নিয়ে কোনরকমে জীবনটা বাঁচিয়ে রেখেছে তারা। বিশাল এই জনগোষ্ঠীর মধ্যে সামান্য কয়েকজনের ভাগ্যে সরকারী ত্রাণ জুটেছে। বন্যাকবলিত ধরলা, ব্রহ্মপুত্র, দুধকুমোর, তিস্তাসহ ১৬টি নদ-নদীর অববাহিকার ৪০৫টি চর-দ্বীপচরের পানিবন্দী অধিকাংশ মানুষ পুরোপুরি দিনমজুরির ওপর নির্ভরশীল। বন্যার পানিতে পুরো তলিয়ে গেছে সদর উপজেলার যাত্রাপুর, পাঁছগাছী, ঘোগাদহ ও মোগলবাসা ইউনিয়ন। ৭ দিন থেকে কর্মহীন মানুষগুলো পরিবার-পরিজন নিয়ে অধিকাংশ সময় উপোসেই কাটাচ্ছে। তাদের ঘরে মজুদ খাবার শেষ হবার উপক্রম হয়েছে। এ দৃশ্য শুধু জেলার ৯টি উপজেলার ৬৫টি ইউনিয়নের নদ-নদী তীরবর্তী ৪শ’ চর-দ্বীপচর গ্রামের। যাত্রাপুর ইউনিয়নের ৯টি ওয়ার্ডের সবই এখন পানিতে ডুবে আছে। চারদিকে পানি আর পানি। গ্রামীণ কাঁচা-পাকা সড়ক পানিতে তলিয়ে যাওয়ায় যোগাযোগ বিছিন্ন হয়ে পড়েছে। ধরলার প্রবল স্রোত বয়ে যাচ্ছে গ্রামের ওপর দিয়ে। পুরো ইউনিয়নের ৩২ হাজার মানুষ পানিবন্দী। ৬ হাজার পরিবার কর্মহীন হয়ে খাদ্যকষ্টে পড়েছে। এদের অধিকাংশই দৈনিক আয়ের ওপর পুরোপুরি নির্ভরশীল। দুঃসহ এক সঙ্কট পরিস্থিতি মোকাবেলা করছে তারা। একবেলা আধাপেটা খাবার জুটছে তো দু’তিন বেলা উপোস। দারুণ অপুষ্টির শিকার শিশু, কিশোর ও মহিলারা। ধরলাপাড়ের বন্যাকবলিত গ্রামগুলো হচ্ছে গারুহারা, চরযাত্রাপুর, ফারাজীপাড়া, দোয়ালীপাড়া, ঝুনকারচর, ভগবতীপুর, কালীর আলগা, নন্দদুলালের ভিটা, হরিদডোবা, মাঝেরচর, জগমোহনের চর, জয়সরস্বতী। মানুষের দুর্ভোগ কি যে চরম সীমায় পৌঁছে যাচ্ছে তা না দেখলে বোঝা যাবে না। যাদের বাড়ি ধরলার প্রবল স্রোতে ভেঙ্গে যাচ্ছে। যাত্রাপুর ইউনিয়নের ১৬টি বাড়ি তীব্র স্রোতে ভেসে গেছে দুদিনে। এসব পরিবারের সদস্যরা অন্যত্র মানুষের বাড়ির উঠানে আশ্রয় নিয়েছে। যাত্রাপুর, কালির আলগা গ্রামের কৃষক সকমোল (৬০), শাহেদ আলী (৫৫), জানান, দু’সপ্তাহ আগে তারা আমনের চারা জমিতে লাগিয়েছিল। অথচ এসব ধানক্ষেত এখন পানির নিচে। পানি নেমে যাবার পর কিভাবে আবার ধান লাগাবে এ চিন্তায় পড়েছে তারা। যাত্রাপুর ইউনিয়নের সর্বত্র ক্ষুধা আর ক্ষুধা। পানিবন্দী মানুষ খাবার চায়। পরিবহন সমস্যাও প্রকট। অধিকাংশ মানুষের নৌকা নেই। কেউ কেউ কলাগাছের ভেলায় মাল নেয়ার কাজ করছে চড়া ভাড়া দিয়ে। খাসেরচর গ্রামের বিউটি বেগম, বলি বেওয়া, কারিভান জানান, বাঁধের রাস্তা ভেঙ্গে যাওয়ায় তারা এবার বাঁধে আশ্রয় নিতে পারছে না। মানুষের বাড়ির উঠানে অথবা খোলা মাঠে আশ্রয় নেয়ার জন্য বের হয়েছি। বাড়ির কারও ঘরে একবুক, কারওবা হাঁটুপানি। চিলমারীর রাজারভিটা গ্রামের সিরাজুল হকের মেয়ে তৃপ্তি (২) পানিতে ডুবে মারা গেছে।

হুমকিতে নীলফামারী বিজিবি ক্যাম্প

তিস্তা নদীতে ব্যাপক ভাঙ্গন শুরু করেছে। শনিবার রাতে তিস্তার ভাঙ্গনে ডিমলা উপজেলার টেপাখড়িবাড়ি ইউনিয়নের চরখড়িবাড়ী মৌজার কাইয়ুমের বাড়ি সংলগ্ন মাটির বাঁধের ৩ মিটার বিলীন হয়েছে। এতে চরাখড়িবাড়ী ৩ শতাধিক পরিবারে নতুন করে বন্যার পানি প্রবেশ করেছে। এই বাঁধটির ভাঙ্গনের কারণে চরখড়িবাড়ী সীমান্তে বিজিবি ক্যাম্পের ভেতরে পানি প্রবেশ করেছে এবং ক্যাম্পটি তিস্তা নদীর ভাঙ্গনে হুমকির মুখে পড়েছে।

এলাকাবাসীর অভিযোগ গত ৭ দিন ধরে ওই বাঁধটি ঝুঁকির মুখে পড়ে। এজন্য পানি উন্নয়ন বোর্ড জরুরী ভিত্তিতে ৩ লাখ টাকা বরাদ্দ দিয়ে বাঁধটি রক্ষার জন্য ঠিকাদারের মাধ্যমে মাত্র ৫০ হাজার টাকার ব্যয় করে বাঁশের পাইলিং দেয়। কিন্তু নিম্নমানের বাঁশের পাইলিং করায় বাঁটি শনিবার রাতে নদীতে বিধ্বস্ত হয়। এলাকাবাসী অভিযোগ করে বলেন, নামে মাত্র কাজ করে পাউবো কর্মকর্তা ও সংশ্লিষ্ট ঠিকাদার সমুদয় অর্থ আত্মসাধ করায় কারণে জরুরী মেরামত কাজটি শেষ হওয়ার ৭ দিনের মধ্যে তিস্তা নদীতে বিলীন হয়েছে। টেপাখড়িবাড়ি ইউপি চেয়ারম্যান রবিউল ইসলাম শাহিন বলেন, চরখড়িবাড়ীতে মাটির বাঁধটি বিলীন হওয়ার কারণে চরখড়িবাড়ি বিজিপি ক্যাম্পটি হুমকির মুখে পড়েছে।

গাইবান্ধায় বাঁধের

ওপর মানুষ

ভারিবর্ষণ ও উজান থেকে নেমে আসা পানির ঢলে ঘাঘট, ব্রহ্মপুত্র ও করতোয়া নদীর পানি অব্যাহত থাকায় বন্যাকবলিত এলাকার পানিবন্দী মানুষের দুর্ভোগ এখন চরম আকার ধারণ করছে। সদর উপজেলার ঘাগোয়া, গিদারি ইউনিয়নের ব্যাপক এলাকা তলিয়ে যাওয়ায় পানিবন্দী লোকজন বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধে আশ্রয় নিয়ে এখন দুর্ভোগ পোহাচ্ছে। রোববার ব্রহ্মপুত্রের পানি ৯ সেমি বৃদ্ধি পেয়ে এখন বিপদসীমার ৫৭ সেমি এবং ঘাঘট নদীর পানি ৪ সেমি বৃদ্ধি পেয়ে বিপদসীমার ৬০ সেমি ওপর দিয়ে প্রবাহিত হয়। অপরদিকে করতোয়া ও তিস্তার পানি বৃদ্ধি পেলেও বিপদসীমার সামান্য নিচে রয়েছে।

এদিকে বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধগুলোর ক্ষতিগ্রস্ত বিভিন্ন পয়েন্ট দিয়ে পানি ভেতরে ঢুকে পড়ায় গোটা জেলায় এ বন্যায় আরও নতুন নতুন এলাকা প্লাবিত হচ্ছে এবং ইতোপূর্বেকার বন্যাকবলিত এলাকাগুলোতে ব্যাপক জলাবদ্ধতার সৃষ্টি হয়েছে। ফলে দু’সপ্তাহের এ অব্যাহত বন্যায় জনদুর্ভোগের পাশাপাশি ব্যাপক ফসলহানির ব্যাপকতা বাড়ছে। গ্রামের অধিকাংশ সড়ক তলিয়ে যাওয়ায় যোগাযোগ ব্যবস্থা বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে।

নওগাঁয় তিন লাখ

মানুষ পানিবন্দী

বন্যা পরিস্থিতি আরও অবনতি হয়েছে। পানি আরও বৃদ্ধি পাচ্ছে। বাঁধ ভাঙ্গার ফলে গত কয়েক দিনে আত্রাই ও রানীনগর উপজেলার ১০ ইউনিয়নের শতাধিক গ্রাম প্লাবিত হয়েছে। এতে প্রায় ৩ লাখ মানুষ পানিবন্দী রয়েছে। পানির স্রোতে শত শত কাঁচা বাড়ি-ঘর ও গাছপালা ভেঙ্গে গেছে। কয়েক হাজার বিঘা জমির রোপা আমন ধান ও শাকসবজি পানিতে তলিয়ে গেছে। শত শত পুকুরের মাছ ভেসে গেছে।

রবিবার নওগাঁ পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী মোঃ আনোয়ার হোসেন এই প্রতিবেদককে জানান, ভাটিতে বাঁধ ভাঙ্গার কারণে নওগাঁ শহরে ছোট যমুনা নদীর পানি কমে বিপদসীমার ৩৮ সে.মিটার নচি দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। তবে ছোট যমুনা ও আত্রাই নদীর সংযোগস্থল এলাকায় আত্রাই রেলওয়ে পয়েন্টে নদীর পানি বিপদসীমার ১১ সে.মিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। বাঁধের ভাঙ্গন স্থানগুলো দিয়ে প্রবলবেগে স্রোত প্রবাহিত হওয়ায় কোনভাবেই এখন বাঁধ দেয়া সম্ভব হচ্ছে না। ফলে নওগাঁ জেলা শহরের সঙ্গে আত্রাই উপজেলা ও নাটোর জেলার সঙ্গে সড়ক যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন রয়েছে। এদিকে পানির স্রোতে আত্রাইয়ের ফুলবাড়ী গ্রামে প্রায় ৩০টি পাকাবাড়ি-ঘর সম্পূর্ণ বিলীন হয়ে গেছে। ওই গ্রামের রাসেল জানান, ৩ বছর আগে ৮ লাখ টাকা দিয়ে জমি কিনে মাটি কেটে পাকা বাড়ি নির্মাণ করতে প্রায় ১১ লাখ টাকা খরচ হয়েছিল। কিন্তু বাঁধ ভাঙ্গায় আমি এখন নিঃস্ব হয়ে গেলাম। আমি এখনও কোন ত্রাণ সামগ্রী পাইনি। আরও ২০/২৫টি পরিবারের ঘরবাড়ি বিলীন হয়ে যাবার আশঙ্কা করছেন তিনি। শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে পানি ওঠায় আত্রাই উপজেলার ৪০টি এবং রানীনগর উপজেলার ২৫টি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বন্ধ ঘোষণা করেছেন স্থানীয় কর্তৃপক্ষ। জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে আত্রাই উপজেলার বন্যার্ত মানুষের মাঝে জিআর ৪৫ মেঃ টন চাল ও ৬৫ হাজার টাকা এবং রানীনগর উপজেলা ৪০ মেঃটন চাল ও নগদ ৫৩ হাজার টাকা বিতরণ করা হয়েছে। তবে প্রয়োজনের তুলনায় ত্রাণ অপ্রতুল বলে জানিয়েছেন বানভাসী মানুষেরা।

টাঙ্গাইলে ৩৭

স্কুলে পানি

জেলার ভূঞাপুরে যমুনা নদীর পানি বৃদ্ধি পেয়েছে। গত ২৪ ঘণ্টায় যমুনা নদীর পানি ১৩ সেমি বৃদ্ধি পেয়ে বিপদসীমার ৬২ সেমি ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। এতে উপজেলার হাজার হাজার একর জমির ফসল পানিতে তলিয়ে গেছে। এদিকে খাদ্য-শিশু খাদ্য ও বিশুদ্ধ পানির সঙ্কট দেখা দিয়েছে এলাকায়।

জানা গেছে, উপজেলার চারটি ইউনিয়নের হাজার হাজার পরিবার পানিবন্দী হয়ে পড়েছে। যমুনা নদীর পানি বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে এ সকল গ্রামে নতুন করে পানি উঠতে শুরু করেছে। চরম দুর্ভোগে পড়া এ অঞ্চলের মানুষ নিরাপদ স্থানে সরে যেতে শুরু করেছে। ফলে বাড়ি ঘর ছাড়ার কারণে তাদের ভোগান্তি এখন চরমে। এদিকে উপজেলায় ৩৭টি বিদ্যালয়ে পানি ওঠায় বিপাকে পড়েছে শিক্ষার্থীরা। অন্যদিকে উপজেলার চরাঞ্চল ছাড়াও ফলদা ইউনিয়নের মাইজবাড়ি, ঝনঝনিয়া, ঢেপাকান্দি, আগতেরিল্যা, ফলদা, ধুবলিয়া, পাছতেরিল্যা, মমিনপুরসহ বিভিন্ন এলাকায় পানি ডুকে পড়ায় হাজার হাজার একর জমির আউশ, আমন ধান ও সবজি খেত পানিতে তলিয়ে গেছে।

মির আবাদি ফসল নষ্ট হওয়ার আশক্ষায় কৃষকরা দিশেহারা হয়ে পড়েছে।