মেঘলা, তাপমাত্রা ৩১.১ °C
 
২২ সেপ্টেম্বর ২০১৭, ৭ আশ্বিন ১৪২৪, শুক্রবার, ঢাকা, বাংলাদেশ
সর্বশেষ

নিদ্রাভঙ্গ বিশ্ববিবেকের

প্রকাশিত : ৭ সেপ্টেম্বর ২০১৫

ছবিটি অত্যন্ত মর্মস্পর্শী। সমুদ্রসৈকতে নিথর নীরব শায়িত এক শিশু, যেন নিদ্রাতুর। অপার জলরাশির পাশে মানববংশের ছোট্ট এক নিঃসঙ্গ প্রতিনিধি। মৌন শিশুর স্থিরচিত্রটি কী সকরুণ বাঙ্ময়! যেন বলছে, হে মানুষ- আমাকে মরে যেতে দিলে! আমাকে এভাবে মেরে ফেললে তোমরা? ছবিটি দর্শনমাত্রই বিশ্ববাসীর নির্লিপ্তি ভেঙ্গে গেছে, অন্তর কেঁদে উঠেছে জাতি-ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে মানবসমাজের।

শিশুর জন্য ধরিত্রীকে বাসযোগ্য করে রেখে যাওয়ার অঙ্গীকারকে উচ্চমূল্য দিয়েছিলেন কবি সুকান্ত। তার উচ্চারণ: এ বিশ্বকে এ শিশুর বাসযোগ্য ক’রে যাব আমি নবজাতকের কাছে এ আমার দৃঢ় অঙ্গীকার। ...কিন্তু আমরা শিশুকে পৃথিবীতে এনে তার প্রাণ রক্ষার সুবন্দোবস্ত করতে সমর্থ হয়েছি কি? অতিসংবেদনশীল কবিসত্তা বলে নয়, মানুষ মাত্রেরই হৃদয়ের প্রগাঢ় আকাক্সক্ষা : আমার সন্তান যেন থাকে দুধে-ভাতে। আমরা চলে যাব, আমাদের সন্তান রয়ে যাবে, কালপরিক্রমায় এসে পড়বে তারও সন্তানÑ এভাবেই মানবের উত্তরাধিকার বহমান থাকবে জগত সংসারে। টিকে থাকবে মনুষ্যপ্রজাতি। সৃষ্টির সেরা জীব বলে আমরা গর্ববোধ করি। অথচ মানবশ্রেণীরই একটি ক্ষুদ্র অংশের নির্মমতায় কঠোরতায় আমাদেরই সন্তান পতিত হচ্ছে মৃত্যুমুখে! বিশ্ববিবেক বিস্মিত হয়ে দেখল, লাল জামা নীল প্যান্ট পরা ছোট্ট শিশু আয়লান কুর্দি সাগরসৈকতে উপুড় হয়ে পড়ে আছে! এ যেন মানবতারই উপুড় হয়ে পড়ে থাকা, সভ্যতারই মুখ থুবড়ে পড়া। গ্রিসে অভিভাসন প্রত্যাশী অভিভাবকের সঙ্গে শিশুটি উঠেছিল নৌকায়। তীরে ফেরা সহজ নয় জানে সিরীয় অভিবাসীরা, তীরবর্তী রাষ্ট্র এমন আগন্তুক গ্রহণেও সম্মত নয়, সেটাও জানা। তবু জীবন বাঁচাতে সমুদ্রে নৌকা ভাসিয়েছিল আয়লানের পরিবার।

মধ্যপ্রাচ্যে ভয়াবহ গৃহযুদ্ধের হাত থেকে বাঁচতে চাইছে মানুষ, অথচ যে যুদ্ধ তারা শুরু করেনি। কিন্তু ঝঞ্ঝাক্ষুব্ধ সমুদ্র, মানুষের তৈরি সীমান্তের অমানবিক বাধাÑ এসব অতিক্রম করে তাদের বহুজনেরই আর বাঁচা সম্ভব হয় না। তবে শিশু আয়লান কঠিন নির্মম পৃথিবীর বুকে মুখ থুবড়ে পড়ে থেকে বড় আঘাত হেনেছে বিশ্ববিবেকের ঘুমন্ত দুর্গে। বাঘা বাঘা বিশ্বনেতার ঘুমের ভেতর দুঃস্বপ্ন হয়ে প্রতিবাদ করে উঠছে ওই সকরুণ ছবিটি। রাতারাতি বদলে যাচ্ছে দৃশ্যপট। বুদাপেস্টের স্টেশন থেকে অভিবাসন প্রত্যাশীদের পশ্চিম ইউরোপে প্রবেশের অনুমতি দেয়া হয়েছে। হাঙ্গেরি বলেছে, জার্মানি ও তারা অভিবাসন প্রত্যাশীদের সীমান্ত অতিক্রম করতে দিতে রাজি হয়েছে। এই বছর জার্মান সরকার বিপুল সংখ্যক অভিবাসী গ্রহণ করবে। ব্রিটেনও কমপক্ষে ১০ হাজার সিরীয় শরণার্থীকে আশ্রয় দেবে বলে ধারণা করা হচ্ছে। শরণার্থীদের আশ্রয় দিতে যুক্তরাজ্য সরকারকে নেতৃত্বের ভূমিকা পালনের আহ্বান জানিয়েছেন টিউলিপ সিদ্দিক এমপি। অপরদিকে ইউরোপের বিভিন্ন সংস্থা ও গোষ্ঠী শরণার্থীদের কল্যাণে নানা কর্মসূচী হাতে নিতে চলেছে। রিয়াল মাদ্রিদ ইতোমধ্যে ১০ লাখ ইউরো অনুদানের ঘোষণা দিয়েছে। অভিবাসী সঙ্কট নিয়ে প্যারিসে বৃহস্পতিবার বৈঠক করেছেন ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট ও জার্মানির চ্যান্সেলর।

এটা পরিষ্কার যে, শিশু আয়লানের মৃত্যুতে ঘুম টুটে গেছে বিশ্ববিবেকের। এখন সময় হলো এই আবেগ ও মানবতাবোধকে আরও জাগ্রত ও সুসংহত করে পৃথিবীকে বাসযোগ্য করে তোলার চেষ্টায় বাস্তব পদক্ষেপ গ্রহণ করা। জঙ্গীবাদকে উপড়ে ফেলার জন্য কঠোর অবস্থান গ্রহণ করা। এ লক্ষ্যে আমেরিকা ও জাতিসংঘকে আন্তরিক হতে হবে সবকিছুর আগে। হিংসা হানাহানি যুদ্ধ অপঘাত কখনোই শুভ কিছু বয়ে আনতে পারেনি। মানবকল্যাণের জন্য তাই দূর হোক সংঘাত ও যুদ্ধ, বেজে উঠুক শান্তির মোহন সুর। আর কোন শিশুর অপমৃত্যু যেন দেখতে না হয় পৃথিবীকে।

হে পৃথিবীপুত্র আয়লান, আমাদের ক্ষমা করো।

প্রকাশিত : ৭ সেপ্টেম্বর ২০১৫

০৭/০৯/২০১৫ তারিখের খবরের জন্য এখানে ক্লিক করুন


শীর্ষ সংবাদ: