২২ নভেম্বর ২০১৭,   ঢাকা, বাংলাদেশ   শেষ আপডেট এই মাত্র  
Login   Register        
ADS

মানবপাচার মালয়েশিয়া দায় এড়াতে পারে কি?


‘মানুষ মানুষকে পণ্য করে, মানুষ মানুষকে জীবিকা করে’ অমর শিল্পী ভূপেন হাজারিকার এই গান আজ বাস্তবে রূপ দেয়ার জন্য একশ্রেণীর প্রভাবশালী মানুষ পাচারের সঙ্গে জড়িয়ে পড়েছে। যে পুরুষের সারাদিন শ্রম দিয়ে দুই শ’ টাকা আয় হয় না, অথবা যে সংসারে মানুষের তিনবেলা তিনমুঠো ভাত জোটে না, কিংবা যে নারী পরিবার ও সমাজে নিদারুণভাবে নিগৃহীত, তাদের যদি বলা হয় এমন এক স্বপ্নের দেশ আছে যেখানে খাদ্যের কোন অভাব নেই এবং দিনে এক শ’ রিঙ্গিত অর্থাৎ বাংলাদেশী টাকায় প্রায় দুই হাজার পাঁচ শ’ টাকা রোজগার করা যায় তাহলে সে মানুষের লুঙ্গি পরার সময় কোথায়?

স্বপ্নময় স্বর্ণখনি সন্ধানের অলীক গল্প ফেঁদে সোনালী ভবিষ্যতের মিথ রচনা করে দলে দলে ঝাঁকে ঝাঁকে নিরীহ, নিরপরাধ স্বপ্নবিলাসী বাঙালীকে কখনও সাগরের মতো নৃশংস পথে, কখনও আকাশপথে, কখনও স্থলপথে পাচার করা হচ্ছে। বিনিময়ে হাতিয়ে নেয়া হচ্ছে লাখ লাখ কোটি কোটি টাকা। কারও বাস্তুভিটা বিক্রির টাকা, কারও হালের বলদ ও একমাত্র কৃষি জমি বিক্রির টাকা। এই টাকা সমাজের রাঘববোয়ালদের নিরাপদ আশ্রয়ে যাবে। এ টাকা দিয়ে তাদের সন্তানরা কেউ ইংরেজী মাধ্যমে পড়বেন, কেউ আবার হিন্দি মাধ্যমে পড়বেন, তারা আর কেউ বাঙালী থাকবেন না। বাঙালী থাকবেন শুধু শোষিত, নিপীড়িত ভুখা-নাঙ্গা খেটে খাওয়া মানুষগুলো। এইতো বাস্তবতা, এইতো নিয়তি!

পাসপোর্ট ও ভিসাবিহীন সমুদ্রপথে পাচার করা হাজার হাজার মানুষ ছাড়াও নানাভাবে মানুষকে ভুল প্রক্রিয়ায় বিদেশ পাঠিয়ে বিপথগামী করা হচ্ছে। এক্ষেত্রে ট্যুরিস্ট ও স্টুডেন্ট ভিসাকে তুরুপের তাস বানানো হচ্ছে। কোনরকম সেভেন-এইট পাস করে ক্ষেতে-খামারে কাজ করতেন এমন অসংখ্য অবুঝ বাঙালীকে এইচএসসি পাসের ভুয়া কাগজপত্র তৈরি করে মালয়েশিয়ার বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের শিক্ষককে কন্টাক করে স্টুডেন্ট ভিসায় মালয়েশিয়াতে পাচার করা হচ্ছে। স্টুডেন্ট ভিসায় গিয়ে ওয়ার্ক পারমিট ছাড়া কাজ করা সম্পূর্ণ অবৈধ। এমন অবৈধ ও প্রতারণার শিকার অসংখ্য বাংলাদেশী মালয়েশিয়ার কাজাং, মেরু, ক্লাং, কাপ্পার, নিলয়, পাহাং, ইপো, বানতিং, জোহর বারু, পেনাং, মালাক্কা, রাওয়াং, আলোস্তা, সাবা সারোয়াকে গিজগিজ করে।

মালয়েশিয়ায় একশ্রেণীর ব্যবসা প্রতিষ্ঠান আছে যারা হাজার হাজার রিঙ্গিতের বিনিময়ে ট্যুরিস্ট ভিসার জন্য আমন্ত্রণপত্রের ব্যবসা (ওহারঃধঃরড়হ খবঃঃবৎ নঁংরহবংং) করে। এভাবে ট্যুরিস্ট ভিসায় অবৈধ প্রক্রিয়ায় মানবপাচার করা হয়। ট্যুরিস্ট ভিসার শর্ত হলো এক মাস পর অবশ্যই পার্শ্ববর্তী কোন দেশে গিয়ে ফিরে এসে এক মাসের ভিসা নিয়ে মালয়েশিয়ায় প্রবেশ করতে হয়। কিন্তু এই শ্রেণীর ভিসায় যারা যান তাদের অধিকাংশই পরদিন থেকে শ্রমিক হিসেবে কাজে নেমে পড়েন এবং এক মাস পর থেকে সম্পূর্ণ অবৈধ হিসেবে বসবাস করতে থাকেন। পাচারের শিকার এই মানুষগুলোকে কোনক্রমেই জানতে দেয়া হয় না যে, তাদের ট্যুরিস্ট ভিসায় নিয়ে যাওয়া হচ্ছে।

‘মালয়েশিয়ার পুলিশ বাকিতে ঘুষ খায়’Ñ এমন একটি ধ্রুব সত্য কথা প্রচলিত আছে। ওই দেশে ‘স্পিড মানি হালাল’ এ কারণে সবকিছুকে তারা স্পিড মানি বানিয়ে নেয়। তবে জাতে মাতাল হলেও তালে ঠিক; এ ঘটনা তারা শুধু বাঙালীদের সঙ্গেই ঘটিয়ে থাকে। এভাবে মানবপাচারের ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় প্রতিবন্ধকতা হলো বিমানবন্দর ও ইমিগ্রেশন পুলিশ। মোটা অঙ্কের টাকার মাধ্যমে আন্তর্জাতিক দালালচক্র উভয় দেশের সবকিছু কন্টাক করে প্রতারণার ফাঁদে ফেলে লাখ লাখ মানুষ পাচার করে।

মালয়েশিয়ার বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের, ফার্মের বিজনেস ম্যাগনেটদের কাছেও অবৈধ বাঙালীর দারুণ কদর। কারণ মালয়েশিয়া বা বৈধ বিদেশীকে শ্রমিক হিসেবে পেতে গেলে পারিশ্রমিক অনেক বেশি। যেমন, একজন মালয়কে শ্রমিক হিসেবে নিতে গেলে দিনে আড়াই শ’ থেকে তিন শ’ রিঙ্গিত দিতে হয় এবং বৈধ প্রবাসী শ্রমিককেও কমপক্ষে এক শ’ থেকে দেড় শ’ রিঙ্গিত দিতে হয়। পক্ষান্তরে অবৈধ অসহায় বাঙালী শ্রমিককে চল্লিশ থেকে পঞ্চাশ রিঙ্গিতে খরিদ করা যায়। এরা সব কোটি কোটি রিঙ্গিতের মালিক। অথচ সীমাহীন দরিদ্র অসহায় বাঙালী শ্রমিকের প্রতি এ কোন্ নির্মমতা? রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের দুই বিঘা জমির দুটি চরণ না লিখে পারছি নাÑ ‘এ জগতে হায় সেই বেশি চায় আছে যার ভূরি ভূরি, রাজার হস্ত করে সমস্ত কাঙ্গালের ধন চুরি।’ বিশ্ব কবি এখন বেঁচে থাকলে হয়ত চিরশোষিত বাঙালীকে নিয়ে শেষের চরণ পাল্টে লিখতেনÑ ‘সারাবিশ্ব করে সমস্ত বাঙালীর ধন চুরি।’

মালয়েশিয়ার পুলিশের অন্যতম ইনকাম সোর্স প্রবাসী বাংলাদেশী। বাঙালী যেহেতু অবৈধ, তাই পথে-ঘাটে, হাটে-মাঠে, নদী-তটে যত্রতত্র ধরে দুই শ’-তিন শ’ রিঙ্গিত ছিনতাই করে। কথা বললেই বেদম প্রহার এবং জেলখানায় পাঠানোর হুমকি অহরহ দিয়ে থাকে। মালয়েশিয়ায় বিভিন্ন কোম্পানি-ইন্ডাস্ট্রিতে অসংখ্য বাঙালী কর্মরত রয়েছেন। সবচেয়ে বেশি বাঙালী; কিন্তু সবচেয়ে কম পারিশ্রমিক তাদের। ভারত, নেপাল, পাকিস্তানীদের অবস্থা এমন নয়।

আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থার (ওখঙ) নীতিমালার প্রতি তাদের ন্যূনতম শ্রদ্ধা নেই। আবার নারীদের ব্যাপারে সিডও (ঈঊউঅড : ঈড়হাবহঃরড়হ ড়হ ঃযব বষরসরহধঃরড়হ ড়ভ ধষষ ংড়ৎঃং ড়ভ ফরংপৎরসরহধঃরড়হ ধমধরহংঃ ড়িসবহ) সনদের প্রতিও তারা ভ্রƒক্ষেপ করে না। অবশ্য ভারত, পাকিস্তানসহ অন্যান্য দেশের হাইকমিশনের মতো বাংলাদেশী হাইকমিশনও যদি নিয়মিত বাংলাদেশী প্রবাসীদের খোঁজখবর নিত, তাহলে বাঙালীরা বৈষম্য থেকে নিষ্কৃতি পেতেন।

মালয়েশিয়ার অর্থনীতির ভিত মজবুত করেছে বাংলাদেশী প্রবাসী শ্রমিক। বাঙালীর বিন্দু বিন্দু ঘামে গড়ে উঠেছে তাদের মুক্তাখচিত অসংখ্য সৌধকিরীটিনী শহর। অথচ এই বাঙালী তাদের গগনচুম্বী অট্টালিকায় যখন সিরিশ ঘষে, তখন অবৈধ হয় না; কিন্তু যখন রাত্রে ঘুমানোর সময় তখন চলে পুলিশী রেড। অসম সাহসী বাঙালী ভিনদেশী হওয়ায় ভয়ে কাতর হয়ে রাত কাটায় পাম বাগানে। যেখানে বিষধর সাপ আর বিকটাকার মশা তাদের নিশিসঙ্গী। হায়রে পৃথিবী! হায়রে জীবন! দিনের বেলায় যারা বৈধ তারা রাতের আঁধারে ঘুমানোর সময় অবৈধ। তবে কি মালয়েশিয়ার প্রশাসন এ ব্যাপারে অবগত নয়? তাই তাদের স্বল্প ব্যয়ে অধিক কর্মদক্ষ বাঙালী শ্রমিক পাওয়ার জন্য এমন নির্মম দ্বৈতনীতি। আমাদের দেশের নৃশংস মানবপাচারকারী আর তথাকথিত সভ্য দেশের ওই সব অসভ্য শাসকের সঙ্গে কিই বা তফাত আছে?

প্রত্যক্ষভাবে মানবপাচারের সকরুণ এ দৃশ্য দেখে আমার প্রাণিত মন খুব পীড়িত। এসব হায়েনার হাত থেকে মানবজাতিকে বাঁচানোর জন্য চাই সঠিক পরিকল্পনা ও কঠোর পদক্ষেপ। আইনের যথাযথ প্রয়োগ ও মানবপাচারকারীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করে গণমাধ্যমে প্রচার করা এবং পাচারের শিকার মানুষ যেহেতু জোরজবরদস্তিমূলক শ্রম, যৌন ব্যবসা, অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ কেটে বিক্রির মতো নির্মম কাজে নিয়োজিত হয়, সেহেতু এর বিরুদ্ধে সামাজিক আন্দোলন গড়ে তোলা ছাড়াও সচেতনতা বৃদ্ধি, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমগুলোতে ব্যাপক প্রচার, বিশেষ বিশেষ দিবসে স্কুল-কলেজে মানবপাচারের ভয়াবহতা নিয়ে চিত্রাঙ্কন প্রতিযোগিতা, সরকারী-বেসরকারী অংশীদারিত্বমূলক অনুষ্ঠান আয়োজন প্রভৃতির মাধ্যমে মানুষকে সর্বতোভাবে সচেতন করে মানবপাচার রোধে কার্যকরী পদক্ষেপ গ্রহণ সময়ের দাবি।

গান দিয়ে শুরু করেছিলাম, এবার গান দিয়েই শেষ করিÑ ‘কোথায় নবী-রাসূলেরা কোথায় শান্তির বুদ্ধ/এসো আবার এই ধরাতে করো শান্তি যুদ্ধ/মানুষ মারে মানুষকে আজ নির্বিচারে/তলিয়ে গেছে ভুবন আজ পাপাচারে/কোটি শিশু মরিছে আজ অনাহারে/দেখে এসব কষ্টে যে হয় আমার বাকরুদ্ধ/নিয়নবাতির কতো আলো এই শহরে/কোটি টাকার গাড়ি আছে তার বহরে/আছে গরিব গ্রামে আজ কষ্ট নহরে/তাদের দিকে দৃষ্টি দিয়ে হই চলো আজ শুদ্ধ।’

লেখক : গীতিকার, গবেষক

যধভনমব০২@ুধযড়ড়.পড়স