মেঘলা, তাপমাত্রা ৩১.১ °C
 
২৩ সেপ্টেম্বর ২০১৭, ৮ আশ্বিন ১৪২৪, শনিবার, ঢাকা, বাংলাদেশ
সর্বশেষ

ন্যাশনাল হার্ট ফাউন্ডেশন আরও বড় হও!

প্রকাশিত : ৭ সেপ্টেম্বর ২০১৫
  • জাকারিয়া স্বপন

একজন রোগীর কথা বলি। তিনি ব্যাঙ্কক গিয়েছেন, হার্টে স্টেন্ট বসাবেন। হাসপাতালকে বললেন, আমার দুটো আর্টারিতে স্টেন্ট বসানো আছে। বাকি দুটোতেও ব্লক আছে। তাই ওই দুটোতে স্টেন্ট বসাব।

একজন মানুষের হার্টে যদি চারটি আর্টারিতেই ব্লক থাকে তাহলে বুঝতেই পারছেন তার মানসিক অবস্থা। জীবনের বাঁচা-মরা নিয়ে কথা। যত তাড়াতাড়ি সম্ভব বাকি দুটো আর্টারিতে স্টেন্ট লাগানোর জন্য মরিয়া হয়ে গেলেন তিনি।

কেউ যদি স্টেন্ট লাগাতে চায় তাকে তো আর বাধা দেয়া যায় না। তবুও ডাক্তাররা তাদের রুটিন মতো পরীক্ষা করলেন। কোন্ কোন্ আর্টারিতে স্টেন্ট লাগবে সেগুলো তো দেখে নিতে হবে। সব দেখে ডাক্তার রোগীকে বললেন, তুমি বললে তোমার দুটো স্টেন্ট বসানো; কিন্তু আমরা তো কোন স্টেন্ট দেখতে পাচ্ছি না!

রোগী একটু হতবিহ্বল হয়ে জিজ্ঞেস করলেন, এর মানে কী? আমি ঢাকায় দুটো স্টেন্ট লাগিয়েছি। আর তোমরা এখন বলছ স্টেন্ট নাই?

ডাক্তারও মুচকি হাসি দিয়ে বললেন, তোমার তো সবগুলো আর্টারিই ভাল। স্টেন্ট বসাব কেন?

রোগী একটু রেগে গিয়ে বললেন, কিন্তু আমি যে ঢাকায় দুটো স্টেন্ট লাগালাম।

ডাক্তার আবারও বললেন, আমরা তো কোন স্টেন্ট দেখতে পাচ্ছি না!

রোগী মন খারাপ করে বললেন, তোমরা কি এটা লিখিত দিতে পারো?

ডাক্তার জবাব দিলেন, অবশ্যই। তোমার বুকে কোন স্টেন্ট বসানো নেই। এটা লিখে দিতে পারব না কেন!

ডাক্তার যথারীতি লিখে দিলেন। ভদ্রলোক সহসাই রোগী থেকে দিব্যি সুস্থ মানুষ হয়ে উঠলেন। ব্যাঙ্ককে মনের সুখে কেনাকাটা করলেন। যে টাকা হাসপাতালকে দেয়ার কথা সেটা শপিং মলকে দিয়ে দেশে ফিরলেন। তারপর ব্যাঙ্ককের সেই হাসপাতালের চিঠিসহ দেখা করতে গেলেন ধানম-িতে অবস্থিত বিখ্যাত হৃদরোগ হাসপাতালে। সঙ্গে নিয়ে গেলেন তার লাইসেন্স করা পিস্তলটিও। ব্যাঙ্ককের হাসপাতালের চিঠি আর এই হাসপাতালের বিলটি মালিকের টেবিলে রেখে বললেন, এর মানে কী?

মালিক জানেন এর মানে কী। কোন কথা না বাড়িয়ে হাত ধরে ক্ষমা চেয়ে নগদ টাকা ফেরত দিয়ে এই যাত্রা বাঁচলেন!

হার্টে স্টেন্ট না লাগিয়েই তার জন্য বিল করে টাকা নিয়ে নেয়া হয়েছে, যেখানে মানুষটির পুরো হার্টটিই ভাল রয়েছে। শুধু হার্ট নয়, এমন ঘটনা আমাদের চিকিৎসা খাতে হাজারো রয়েছে। এটা শুধু একটি ঘটনা মাত্র।

এমন একটি দেশে নিজের জীবন নিয়ে কেউ থাকতে চাইবে? যার কোন উপায় নেই সে ছাড়া জীবনের এমন নিষ্ঠুর রসিকতা কেউ সহ্য করতে চাইবে না। আমরা এমন একটি নোংরাতম অবস্থার তৈরি করেছি যেখানে কোটি কোটি মানুষ নিত্যদিন এভাবেই বেঁচে আছে। যেদিন হিসাব মিলছে না সেদিনই এই গ্রহের সমস্ত দেনা-পাওনা মিটিয়ে দিয়ে পা বাড়াচ্ছেন পরপারে। আমি প্রতিদিন সকালে আর রাতে দু’বার নিয়ম করে নিয়তির কাছে ভিক্ষা চাই- ‘প্রভু! তুমি আমাকে বাংলাদেশের কোন হাসপাতালে নিও না! আমার মৃত্যু যেন হয় বিদেশের মাটিতে। মৃত্যুর আগে আমি জানতে চাই আমার মৃত্যুটি অবধারিত ছিল। কারও অবহেলা, অজ্ঞতা আর ব্যবসায়িক কারণে আমার মৃত্যু হয়নি।’

প্রিয় পাঠক, আপনারা যদি কখনও আমার জন্য কিছু উইশ করেন তাহলে দয়া করে এই উইশটুকু করবেন, প্লিজ!

দুই.

সপ্তাহ দু’য়েক আগে বাংলাদেশের একটি প্রাইভেট হাসপাতালে যেতে হয়েছিল। আমার জন্য নয়, আমার ব্রাদার-ইন-ল’র জন্য। তার বুকে ব্যথা উঠল। হয়ত কিছুটা বুঝতে পারছিলেন। নিজেই চলে গেলেন সেই হাসপাতালে। একটু পর পরিবারের সবাই গিয়ে হাজির। ডাক্তাররা ব্যস্ত হয়ে গেলেন অপারেশন থিয়েটারে নিয়ে যাওয়ার জন্য। আমরা আরেকটু দেখতে চাইলাম। কোনরকমে একটা রাত পার করে তাকে সরিয়ে নেয়া হলো মিরপুরে অবস্থিত ন্যাশনাল হার্ট ফাউন্ডেশনে।

এই হাসপাতালটির নাম আমি শুনেছি কিন্তু যেহেতু বাংলাদেশের মেডিক্যাল সিস্টেমের ওপর আমার কোন আস্থা নাই তাই কখনও যাওয়া হয়নি। এই প্রথম আমার যাওয়া। ঢাকার মিরপুরে এতো সুন্দর একটি হাসপাতাল আছে, আমার জানা ছিল না। বাংলাদেশের হাসপাতালের মধ্যে আমি বারডেমকে ধরতাম। এখন সেখানে এসে যুক্ত হলো ন্যাশনাল হার্ট ফাউন্ডেশন।

জাতীয় অধ্যাপক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) আবদুল মালিক সাহেব ১৯৭৮ সালে এই প্রতিষ্ঠানটির সূচনা করেন। দীর্ঘ ৩৬ বছরের বেশি সময় ধরে তিলে তিলে গড়ে উঠেছে এই সেবাকেন্দ্রটি। আমি খোঁজ নিয়ে জানতে পারলাম, ডা. আবদুল মালিক সাহেব এই বৃদ্ধ বয়সেও হাসপাতালে আসেন নিয়মিত, এর ব্যবস্থাপনা দেখেন, এই দেশের গরিব মানুষকে সেবা দেয়ার জন্য নিজেকে তৈরি করেন নিত্যদিন। এটি একটি নন-প্রফিট সেবা প্রদানকারী প্রতিষ্ঠান। যদিও এটি সরকারী প্রতিষ্ঠান নয়, তবে সরকার প্রতিবছর এজন্য কিছু থোক বরাদ্দ দিয়ে থাকে। এর বাইরে রোগীদের টাকা দিয়েই চলে এই হাসপাতাল, ডাক্তার, নার্স, কর্মকর্তা/কর্মচারী এবং পুরো প্রতিষ্ঠান। একদল মহান প্রাণ চিকিৎসক যাদের বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানগুলো এখনও কিনতে পারেনি, তাদের কঠিন পরিশ্রমের বিনিময়ে সেবা পাচ্ছে লাখ লাখ মানুষ, যাদের হয়ত যাওয়ার আর কোন জায়গা ছিল না।

এমনি একজন মানুষের সঙ্গে পরিচয় হলো যার নাম অধ্যাপক ডা. ফারুক আহমেদ। তিনি নিজে একজন কার্ডিয়াক সার্জন এবং বিভাগটির প্রধান হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। ব্যক্তিগত জীবনে সংসার করা হয়ে ওঠেনি। এই হাসপাতালই এখন তার সংসার। একটি ছোট উদাহরণ না দিলে কেউ বুঝতে পারবেন না। তার সঙ্গে আমাদের দেখা করার কথা সকাল ১০টায়। গিয়ে দেখি তিনি অফিসে নেই। তখনও আসেননি। তার সহকারীকে জিজ্ঞেস করে জানতে পারলাম, একজন রোগী মারা গেছেন এবং ডা. ফারুক সারারাত কাজ করে সকাল আটটার দিকে বাসায় গিয়েছেন। আমরা মন খারাপ করে বসে আছি। একটু পরেই তিনি এসে হাজির। আমি বললাম, আপনি! আমরা তো ভেবেছি আজকে আর আসবেন না; আপনি তো একটু আগেই বাসায় গিয়েছেন!

মোটা গোঁফের ফাঁক দিয়ে মুচকি হেসে বললেন, নিজের বাসায় যাইনি। পাশেই বোনের বাসা। ওর বাসা থেকে একটু ফ্রেশ হয়ে নাস্তা করে এলাম।

আমি পুনরায় বললাম, আপনি আজকে বিশ্রাম নিন। আমি কালকে আসব।

তিনি হাসতে হাসতে বললেন, আপনি তো মাত্র একজন রোগী। প্রতিদিন আমাদের বেশকিছু ক্রিটিকাল রোগী দেখতে হয়। আজও তাই আছে। এটা নিয়ে মোটেও বিচলিত হবেন না। দেখি আপনাকে সাহায্য করতে পারি কিনা।

আমি বিচলিত হলাম না। তার সঙ্গে আলাপে সখ্য বাড়ল। আমি এক ফাঁকে জিজ্ঞেস করলাম, এই হাসপাতালে এলেন কিভাবে? এই দেশে সবাই তো টাকার পেছনে ছুটছে। এখানে তো টাকা নেই।

আবারও সেই হাসতে হাসতে ডা. ফারুক বললেন, আমি আমার ২৩ বছরের ডাক্তারি চাকরি একদিনের নোটিসে ছেড়ে দিয়েছিলাম। আমি সরকারী হাসপাতালে ছিলাম। আমি কোন রাজনীতি করি না। কিন্তু প্রতিদিন দেখতে থাকলাম, আমার প্রমোশন হয় না, কিন্তু আমার চেয়ে অযোগ্য মানুষের প্রমোশন হয়ে যায়। আমার চেয়ে জুনিয়র ডাক্তারদেরও প্রোমোশন হয়ে গেল। সবাই আমার কাজের প্রশংসা করে কিন্তু আমার কিছু হয় না। একদিন বুঝতে পারলাম, রাজনীতি না করলে আমার ওখানে কিছু হবে না। ওই মুহূর্তেই চাকরি ছেড়ে দেই। তারপর এখানে চলে আসি।

আরও এমন অসংখ্য নিবেদিত ডা. ফারুক আছেন এই হাসপাতালে যাদের হাতের সেবায় মানুষ পেয়ে থাকে দ্বিতীয় জীবন।

তিন.

সবাই নিশ্চয়ই ভাবছেন, ডা. ফারুক আমাদের পরিচিত, তাই তিনি আমাদের সবচেয়ে ভাল সেবাটুকু দিয়েছেন। কিন্তু সাধারণ মানুষের চিকিৎসার অবস্থাটা কী?

সেটা বলার আগে আরেকটি বিষয় বলে নেয়া যেতে পারে। আমার ব্রাদার-ইন-ল’কে দু’দিন অবজারভেশনে রাখার পর সিদ্ধান্ত হলো এনজিওগ্রাম করে দেখা হোক হার্টের কোথাও ব্লক আছে কি না। রোগীকে অপারেশন থিয়েটারে নেয়া হলো। আমাদের বলা হলো, একটা মনিটরে দেখানো হবে সবকিছু। যদি ব্লক পাওয়া যায় তাহলে স্টেন্ট পরানো হবে। আমি এবং পরিবারের অনেকেই বাইরে অপেক্ষা করছি, কখন আমাদের ভেতরে ডাকে। অসংখ্য রোগী। একজনের পর একজনকে ভেতরে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে। দরজার কাছে ভিড় না করে আমরা দূরে দাঁড়িয়ে আছি। আর কারও অনুমতি ছাড়া কোথাও প্রবেশ করার নিয়মে এখনও অভ্যস্ত হয়ে উঠিনি। তাই সুবোধ বালকের মতো দাঁড়িয়ে আছি। আমার নিজেরও অনেক ইচ্ছে মনিটরে একটি হার্ট দেখব, হার্টের ভেতরটা দেখব।

কিন্তু বিধি বাম। আমি অপেক্ষা করতে করতেই জানতে পারলাম, ভাইয়ার সেকেন্ডারি আর্টারিতে একটি ছোট ব্লক পাওয়া গিয়েছিল এবং সেখানে স্টেন্ট বসিয়ে দেয়া হয়েছে। আমি হা হয়ে দাঁড়িয়ে থাকলাম। বলে কী! আমি তো প্রস্তুতি নিচ্ছি ভেতরে যাব বলে, আর এখন বলে কি না কাজ শেষ! মনটাই খারাপ হয়ে গেল। পুরো প্রক্রিয়াটি করতে লাগল মাত্র ১০ মিনিটের মতো। প্রতিদিন ৫০টির বেশি এই প্রক্রিয়া করা হয়। সময় কই কারও জন্য অপেক্ষা করার! প্রতিটি জীবনই মূল্যবান!

১৯৯৯ সালে আমেরিকায় গিয়ে রবিন উইলিয়ামস অভিনীত ‘প্যাচ এডামস’ ছবিটি দেখে চোখে পানি চলে এসেছিল। একজন ডাক্তার কিভাবে মানুষের জীবনকে ছুঁয়ে যেতে পারেন তা দেখে নিজেকে খুব ছোট মনে হয়েছিল। আমি স্বার্থপরের মতো পড়তে গিয়েছি ইঞ্জিনিয়ারিং! (ডাক্তারি পড়ব না বলে কলেজে বায়োলজি সাবজেক্ট বাদ দিয়েছিলাম!) এই পৃথিবীতে আর দ্বিতীয় কোন পেশা নেই যা মানুষকে, মানুষের জীবনকে এভাবে ছুঁয়ে যেতে পারে! ন্যাশনাল হার্ট ফাউন্ডেশনের করিডরে দাঁড়িয়ে আমার ‘প্যাচ এডামস’-এর কথা মনে হলো। কেন জানি না, চোখ ঝাপসা হয়ে এলো। আমি ডা. ফারুককে খুঁজে জিজ্ঞেস করলাম, এমন এক্সপার্ট ডাক্তার সাহেবের নাম কি?

তিনি আবারও সেই হাসি দিয়ে বললেন, ডা. নাজির আহমেদ। ওর কাছে এগুলো ডালভাত!

আমার সঙ্গে ডা. নাজির আহমেদের দেখা হয়নি। কিন্তু তিনি যা শিখেছেন এবং যেভাবে তা প্রয়োগ করছেন আমি দূর থেকে তাকে সালাম করি। স্রষ্টা মঙ্গল করুকÑ আপনার এবং আপনার সকল সহকর্মীর।

চার.

ন্যাশনাল হার্ট ফাউন্ডেশনে শুধু এটুকু সেবা নিয়ে আমি ভাবে গদগদ হয়ে যাইনি। যতদিন ওই হাসপাতালটিতে গিয়েছি আমি রেজিস্ট্রেশন ডেস্ক থেকে শুরু করে লিফটম্যান, সুইপার, নার্স, কেয়ারটেকার, দারোয়ান, ডাক্তার, প্রশাসনÑ যতটা পেরেছি একা একা খেয়াল করেছি। ভিড়ের মাঝে তাদের লক্ষ্য করেছি। কাজের চাপে তাদের দেখেছি। মানুষ গিজগিজ করছে সেবা নেয়ার জন্য, লিফটে ওঠার জন্য, কাউন্টারে টাকা জমা দেয়ার জন্যÑ সবাইকে মনে হয়েছে আন্তরিক। বাংলাদেশের হাসপাতাল এবং সেবা প্রদানকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর ব্যবহার ভাল হয় না। লিফটম্যান মুখ গোমরা করে থাকে, নার্সরা একবারের বেশি দু’বার ডাকলে বিরক্ত হয়, খাবার বহনকারী গাড়ির ছেলেটি বলে, পারলে খান, না পারলে খাইয়েন না। কিন্তু এখানে ঠিক তার উল্টো।

লিফটম্যানকে দেখবেন হাসিমুখে সবাইকে যার যার তলায় নামিয়ে দিতে চাইছে, ভিজিটররা তর্কে জড়িয়ে গেছেন, সেটা সামাল দিচ্ছে, সবাইকে ‘ভাই’ ডেকে জায়গা করে দিতে বলছে, কোন রোগীকে নিতে গেলে সবাইকে সহযোগিতা করতে বলছেÑ কখনও হাসি ছাড়া দেখিনি। নার্সদের দেখেছি বিভিন্ন তলায় সারাক্ষণ দৌড়ের ওপর। কিন্তু কাউকে হাসি ছাড়া দেখিনি। টাকা নেন যে ভদ্রলোক তাকেও একবারও বিরক্ত মনে হয়নি। কিন্তু হাজার হাজার মানুষ গিজগিজ করছে হাসপাতালের সেবা নেয়ার জন্য।

একদিন ডা. ফারুকের অফিসের সামনে দেখি ডাক্তাররা বেশ মজা করছেন, হাসছেন, সেলফি তুলছেন একজন দর্শকের সঙ্গে, রোগীর সঙ্গে। আমি তো অবাক! আমি জিজ্ঞেস করলাম, হাসপাতালে আপনারা হাসতে পারেন?

সুন্দরী একজন ডাক্তার হাসতে হাসতেই বললেন, হাসপাতালের পরিবেশ তো গম্ভীর করে রাখার প্রয়োজন নেই। হাসপাতাল হবে বাড়ির মতো। মানুষ হেসে-খেলে চিকিৎসা নিয়ে যাবে। আমরা সহজ থাকলে রোগীরা অনেক বেশি সহজ থাকেন। তাতে সেবাটা অনেক বেশি কার্যকরী হয়। আমাকে মুখ গোমরা দেখলে আপনি কি সহজে কথা বলতে পারবেন?

আমি তাকে বললাম, জ্বি, আমি সেটা জানি। কিন্তু বাংলাদেশের হাসপাতালগুলোতে দেখি না তো, তাই জিজ্ঞেস করলাম। আপনারা এই পরিবেশ তৈরি করলেন কিভাবে?

সেই সুন্দরী ডাক্তার আমার দিকে চোখ নাচিয়ে আঙ্গুল তুলে ডা. ফারুককে দেখিয়ে বললেন, স্যারের জন্য। তিনি আমাদের শিখিয়েছেন রোগীদের আর কিছু দিতে না পারো একটা হাসি উপহার দিও। আমাদের পুরো পরিবেশ এখন এমন হয়ে গেছে।

বিদেশের অনেক সেবা দেখে, হাসপাতালের ব্যবস্থা দেখে, ডাক্তারদের প্রফেশনাল দায়িত্ববোধ দেখে, নার্সদের সেবা দেখে আমরা মুগ্ধ হই। ন্যাশনাল হার্ট ফাউন্ডেশনের সবকিছু দেখে আমি মুগ্ধ। যেই আমি দেশের চিকিৎসাব্যবস্থা থেকে মুখ সরিয়ে নিয়েছিলাম সেই আমি এখন বলছি, হার্টের কোন সমস্যা হলে আমাকে যেন হার্ট ফাউন্ডেশনে নেয়া হয়।

পাঁচ.

বাংলাদেশে জঙ্গলের মধ্যে হঠাৎ খুব সুন্দর একটি সাজানো বাগান দেখলে মনটা ভাল হয়ে যায়। অনেক সময় বিশ্বাসও করতে কষ্ট হয়। কিন্তু কেউ কেউ যে সফল হয়ে যান তার প্রমাণ দিয়েছেন অধ্যাপক ইব্রাহিম, অধ্যাপক আবদুল মালিক। হয়ত এমন আরও অসংখ্য হৃদয়বান কর্মী আছেন যাদের নাম কেউ জানে না।

কিন্তু আমার মাথায় এখন ঘুরছে কিভাবে এই প্রতিষ্ঠানগুলোকে আরও বড় করা যায়, তাদের আরও বেশি শক্তিশালী করা যায়, যেন তারা আরও অসংখ্য মানুষকে সেবা দিতে পারেন। বাংলাদেশের বড় দুর্ভাগ্য হলো, দেশের কোন নেতা বাংলাদেশের হাসপাতালগুলোতে সেবা নেন না। কারণ, তারা জানেন তাদের দূষিত রাজনীতি ওখানে অযোগ্য ডাক্তারদের প্রমোট করেছে, যাদের হাতে তাদের নিজের জীবন নিরাপদ নয়। এই দেশের রাজনীতিবিদরা কখনই কোন প্রতিষ্ঠানে যোগ্যতার ভিত্তিতে প্রফেশনালদের প্রমোট করেনি। যে যখন ক্ষমতায় ছিল সে তার নিজের চামচাগুলোকে প্রমোট করে গেছে। এবং সেই রাজনীতিবিদরা জানে কার যোগ্যতা কী! নিজের জীবন নিয়ে কে এই ঝুঁকি নেয় বলুন? ফলে সর্দি-কাঁশি হলেই তারা দৌড় দেন সিঙ্গাপুর, ব্যাঙ্কক, লন্ডন, আমেরিকা নয়ত সৌদি আরব। কেউ একদিন দাঁড়িয়ে বলেননি, এই হাসপাতালেই আমার চিকিৎসা হবে; ঠিক কর হাসপাতাল। (তবে রাজনৈতিক কয়েদি হলে ভিন্ন কথা!)

দেশের সবচেয়ে ক্ষমতাবান মানুষের যদি এই দেশের চিকিৎসার ওপর নির্ভরশীলতা না থাকে তাহলে সেই সিস্টেম ঠিক হবে কিভাবে! ঠিক হবে না। কারণ, বাংলাদেশীরা চামচামি খুব পছন্দ করে। তারা শিক্ষাঙ্গন, হাসপাতাল, প্রকৌশল, আইন-আদালত সর্বত্র তাদের চামচাদের দেখতে চায়। একজন দক্ষ প্রফেশনাল কখনই সেই রাস্তায় হাঁটবেন না। যোগ্যতার ভিত্তিতে প্রফেশনালদের দায়িত্ব না দিলে যা হওয়ার তাই হচ্ছে, হবে বাংলাদেশে। তার ভেতর কেউ কেউ এসব ভেঙ্গে তৈরি করছেন নন-প্রফিট সংস্থা। কিন্তু তার সংখ্যা তো আর বেশি নয়। আমি জানি না ডা. আবদুল মালিক কিভাবে তার হাসপাতালের পরিধি আরও বড় করবেন; তবে দূর থেকে চাওয়া থাকল- আপনার দীর্ঘজীবন হোক, ন্যাশনাল হার্ট ফাউন্ডেশনের পরিধি আরও বড় হোক, অনেক বড়!

৪ সেপ্টেম্বর ২০১৫

লেখক : তথ্যপ্রযুক্তি বিশেষজ্ঞ এবং সম্পাদক, প্রিয়.কম

ুং@ঢ়ৎরুড়.পড়স

প্রকাশিত : ৭ সেপ্টেম্বর ২০১৫

০৭/০৯/২০১৫ তারিখের খবরের জন্য এখানে ক্লিক করুন


শীর্ষ সংবাদ: