২২ নভেম্বর ২০১৭,   ঢাকা, বাংলাদেশ   শেষ আপডেট এই মাত্র  
Login   Register        
ADS

তিস্তাপারের এক ঝাঁক নারীর অভাব জয়ের কাহিনী


তিস্তাপারের এক ঝাঁক নারীর অভাব জয়ের কাহিনী

তাহমিন হক ববি

একটা সময় ছিল গোলা ভরা ধান, পুকুর ভরা মাছ গোয়াল ভরা গরু। বাপ দাদার সেই রেখে যাওয়া সম্পত্তিগুলো ওরা তিস্তা নদীর করাল গ্রাসে চিরদিনের জন্য হারিয়ে ফেলেছিল। যা তাদের পরিণত করেছিল পথহারা পথিকে। ঘাত প্রতিঘাতে মাথা গোঁজার ঠাঁই পেতে কোন রকমে তিস্তার ডান তীর বাঁধের ওপর ঝুঁপড়ি ঘর তৈরি করে বসবাস করতে বাধ্য হয়েছিল। সে সময় তাদের সংসারে ঠিকমতো দুই বেলা খাবার জুটত না। উপার্জনের পথ ছিল রুদ্ধ। ফলে ঘরে ঘরে দেখা দিয়েছিল খাদ্য সঙ্কট। স্বামীর সংসারের অভাব অনটন তাদের কুরে কুরে খেত। রাতের ঘুম ছিল না দুই চোখে। নুন আনতে পান্তা ফুরিয়ে যেত যেখানে, সেখানে ছেলে-মেয়েদের ভবিষ্যত কি হতে পারে। চোখে-মুখে চারদিকে তারা দেখত শুধু ঘোর অন্ধকার আর অন্ধকার। দুটো ভাতের জন্য তিস্তা নদীতে মাছ ধরার চেষ্টা, কাশফুল সংগ্রহ করে হাটবাজারে বিক্রি। কামলা খেটেও জুটত না চাহিদা মতো অর্থ। চাতক পাখির মতো তাকিয়ে থাকতে হতো রিলিফের দিকে। বাস্তবতার এই দৃশ্যপট যে জীবন সংগ্রাম করে পাল্টিয়ে দিতে পারে তা দেখিয়ে দিচ্ছে নীলফামারীর ডিমলা উপজেলার তিস্তাপারের হতদরিদ্র এক ঝাঁক নারী। সেই সব নারী আজ স্বাবলম্বী হয়ে উঠেছে। সংসারে সচ্ছলতা ফিরে এসে দিনদিন এসব নারীরা তাদের জীবনযাত্রার মান পরিবর্তনে ব্যাপক উন্নতি ঘটিয়েছে। বিশেষ করে তারা নারীর অর্থনৈতিক ক্ষমতায়ন, জলবায়ু অভিযোজন, নেতৃত্ব এবং শিখনের মাধ্যমে ঘাত-সহনশীল কমিউনিটি গড়ে তুলতে সক্ষম হয়েছে। এসব নারী এখন চরের জমিতে আবাদ করছে ভুট্টা, মরিচ, পেঁয়াজ, শাকসবজি, মিষ্টি কুমড়া, চাল কুমড়া, বাদাম এবং দুগ্ধ উৎপাদনে গাভীর খামার, ছাগলের খামার পর্যন্ত করে ফেলেছে। ক্ষুদ্র ব্যবসা, সাথী ফসল উৎপাদন, মিষ্টি ব্যবসা, ধান-চালের ব্যবসা, টেইলারিং, মিনি গার্মেন্টস, ধান ভানা মেশিন, কার্টন তৈরি, হাতপাখা তৈরি, চিড়া-মুড়ি ব্যবসা ইত্যাদি কাজ করছে। ফলে তিস্তা বিধৌত এলাকায় অভাবকে জয় করার এক সুবাতাস বইছে। খোঁজ নিয়ে জানা গেল বর্তমান সরকারের সহযোগিতায় পল্লীশ্রী রি-কল প্রকল্পের মাধ্যমে তিস্তাপারের তারা পূর্ব ছাতনাই-খগাখড়িবাড়ি ও টেপাখড়িবাড়ির ৩টি ইউনিয়নে অসহায় নারীদের নিয়ে গঠিত ৩৪টি উৎপাদনকারী জনসংগঠন রয়েছে। প্রতিটি দলের পৃথক পৃথক নাম রয়েছে। যেমন, শান্তির নীড়-আশারআলো-তিতাস-তিস্তা-শাপলা-যমুনা-গোলাপ-জুই-মুক্তি-জবা-সুখেরঠিকানা-কুসুমকলি-দোয়েল ও শক্তিসহ বিভিন্ন নামে। ৩৪টি সংগঠনে ৪ হাজার ৪৩২টি পরিবারের ১৭ হাজার ৬৬০ জন সদস্য স্বাবলম্বী হয়ে গড়ে উঠেছে। কষ্ট করলে যে কেষ্ট মেলে তারা দেখিয়ে দিচ্ছে। এখন আর তাদের তিস্তার বাঁধে ঝুঁপড়ি ঘর নেই। বসতের জন্য ভিটা কিনে করেছে পাকা টিনের ঘর। সন্তানরা স্কুল যাচ্ছে। এসবের পাশাপাশি বর্তমান সরকারের রূপকল্পের ডিজিটাল বাংলাদেশ থেকেও তিস্তাপারের নারীরা এবার যুক্ত হলো স্মার্টফোনের অনলাইনের সঙ্গে। এখানে উল্লেখ্য যে স্মার্টফোনে বিশেষ সেবা সম্মিলিত কিছু প্রোগ্রাম চালু রাখা হয়েছে এই ফোনে। যেখান থেকে তারা সমস্যা সমাধানের পরামর্শ গ্রহণসহ সমস্যা সমাধানের উদ্যোগ গ্রহণ করতে সহজেই সিদ্ধান্ত নিতে পারবে। সংশ্লিষ্টরা জানান, ৩৪টি জনসংগঠনের মধ্যে প্রথম পর্যায় ১৫টি উৎপাদনকারী সংগঠনকে বর্তমান সরকারের সহযোগিতায় দাতা সংস্থা অক্সফ্যামের অর্থয়ানে বেসরকারী সংস্থা পল্লীশ্রী রি-কল প্রকল্পের উদ্যেগে স্মার্টফোন বিতরণ করা হয়েছে। বাকি ১৯টি সংগঠনকে আগামী মাসের মধ্যে স্মার্টফোন দেয়া হবে। সোমবার (৩১ আগস্ট) দুপুরে নীলফামারীর ডিমলা উপজেলা শহরে অবস্থিত পল্লীশ্রী কার্যালয়ে এই স্মার্টফোন বিতরণে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন নীলফামারী-১ (ডোমার-ডিমলা) আসনের সংসদ সদস্য আফতাবউদ্দিন সরকার। পল্লীশ্রী রি-কল প্রকল্পের প্রকল্প সমন্বয়কারী পুরান চন্দ্র বর্মণের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত স্মার্টফোন বিতরণ অনুষ্ঠানে অন্যান্যের মধ্যে উপস্থিত ছিলেন উপজেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা এসএম শফিকুল ইসলাম, কৃষি কর্মকর্তা হুমায়ুন কবির, খগাখড়িবাড়ি ইউপি চেয়ারম্যান রবিউল ইসলাম লিথন, টেপাখড়িবাড়ি ইউপি চেয়ারম্যান রবিউল ইসলাম শাহিন, ডিমলা উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক লুৎফর রহমান প্রমুখ। সংশ্লিষ্ট সূত্রমতে, ওইসব স্মার্টফোনে বিশেষ সেবা সম্মিলিত কিছু কর্মসূচী চালু রাখা হয়েছে। যেখান থেকে তারা সমস্যা সমাধানের পরামর্শ গ্রহণসহ সমস্যা সমাধানের উদ্যোগ গ্রহণ করতে পারবেন নিজেরাই। এ সময় কথা হয় সংগঠনের এক নারী সদস্য লিলি বেগমের সঙ্গে। লিলি বললেন কর্মের ফসল আজ ডিজিটালের যুগের স্মার্টফোনে তাদের কাজের পরিধিকে সম্প্রসারিত করল। ডিমলা উপজেলার তিস্তাপারের টেপাখড়িবাড়ি ইউনিয়নের উত্তর খড়িবাড়ি গ্রামে লিলি বেগমের (৩৫) বসবাস। তার স্বামী আব্দুল সাক্তার এক সময় রাইছমিলে শ্রমিকের কাজ করতেন। কিন্তু কি এক রোগে স্বামী আজ অসুস্থ হয়ে শয্যাশায়ী। ফলে সংসারের হাল ধরতে হয় তাকে। ৫ বছর আগে লিলি বেগম গ্রামের ১৫৭টি পরিবার মিলে পল্লীশ্রীর মাধ্যমে গঠন করে শক্তি জনসংগঠন। এরপর বর্তমান সরকারের সহযোগিতায় পল্লী শ্রীর রি-কল প্রকল্পের লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য অনুযায়ী বিভিন্ন বিষয়ে প্রশিক্ষণ নিয়ে ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করতে থাকে। আয়বর্ধনমূলক কর্মকা- মাথায় রেখে লিলির পালনকৃত হাঁস-মুরগি দুই হাজার টাকায় বিক্রি এবং ৫ হাজার টাকা ঋণ গ্রহণে মোট ৭ হাজার টাকা দিয়ে তার বসতবাড়ির তিস্তার বাঁধের রাস্তার ধারে মুদির দোকানের ব্যবসা শুরু করে। তার ব্যবসা সম্প্রসারণে পল্লী শ্রী, রি-কল প্রকল্পের মাধ্যমে তাকে ৬ হাজার টাকা আর্থিক সহযোগিতা করা হয়। লিলি জানায় এখন সে মুদির দোকানের মালামাল বাড়িয়ে প্রায় ৩০ হাজার টাকা লাভ করে ব্যবসার পরিধি বৃদ্ধি করেছে। বর্তমানে তার আয়ের ১৪ হাজার টাকায় জমি বন্ধক নিয়ে ফসল আবাদ করছে।

তিস্তাপারের সুখের ঠিকানা জনসংগঠনের নারী সদস্য খগাখড়িবাড়ি ইউনিয়নের কিসামত চর গ্রামের মর্জিনা বেগম (৩০)। ১৪ বছর বয়সে তার বিয়ে হয়েছিল ওই গ্রামের দিনমজুর আব্দুল্লাহর সঙ্গে। বর্তমানে দুই মেয়ে ও এক ছেলে সন্তান তার। তিস্তা ভাঙ্গনে বাড়ির ভিটা আর আবাদী এক বিঘা জমি বিলিন হয়েছে তার স্বামী। চোখে মুখে অন্ধকার যখন দেখছিল ঠিক ৫ বছর আগের একটি দিনে মর্জিনা পল্লীশ্রী রি-কল প্রকল্প সমাজের পিছিয়ে পড়া দরিদ্র জনগোষ্ঠীর আর্থ-সামাজিক উন্নয়ন ও জলবায়ু পরিবর্তনের সঙ্গে খাপ খাইয়ে সহনশীল পরিবার তথা কমিউনিটি গড়ে তোলার জন্য কাজ শুরু করে। পল্লীশ্রী রি-কল প্রকল্প ৯৬টি পরিবার নিয়ে একটি স্থানীয় জনসংগঠন তৈরি করে যা এখন সুখের ঠিকানা জনসংগঠন নামে পরিচিতি লাভ করে। সেই সংগঠনে সদস্য মর্জিনা। এখানে সে প্রশিক্ষণের মাধ্যমে সে পল্লীশ্রীর আর্থিক সহায়তায় মর্জিনা বিভিন্ন ফসলের বীজ উৎপাদন করে তা বাজারজাতের মাধ্যমে আজ সুখের ঠিকানা খুঁজে পেয়েছে। মর্জিনা বলেন, আজ আমরা যে স্মার্টফোন পেলাম তা দিয়ে ডিজিটাল যুগ প্রবেশ করলাম। আর এর মাধ্যমে কৃষি ফসলের উৎপাদন বৃদ্ধি ও মান উন্নয়ন, সরকারী ও বেসরকারী প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যোগসূত্র স্থাপন করতে পারব। এছাড়া বিভিন্ন আঞ্চলিক ও জাতীয় বাজারের তথ্য, পণ্যের বাজার মূল্য এবং পণ্য বিক্রয়ের একটি নেটওয়ার্ক গড়ে তুলতে পারব। সুখের ঠিকানা জনসংগঠনের সভা প্রধান আন্জুয়ারা বলেন, আগে আমরা বাজারে যেতে পারতাম না কৃষি ফসল উৎপাদনের পরামর্শ সহজলভ্য ছিল না, কিন্তু আজ মর্জিনার সহায়তায় আমরা বিভিন্ন জায়গায় যেতে পারছি এবং বিভিন্ন ধরনের কৃষি পরামর্শ ও তথ্য পাচ্ছি, এবং পণ্য ন্যায্যমূল্যে ক্রয়-বিক্রয় করার ক্ষেত্রে সেবা গ্রহণ করতে পারছি। তিনি বলেন, বর্তমানের সরকারের সহযোগিতায় পল্লীশ্রী বি-কল প্রকল্পের মাধ্যমে নতুন জাতের ভাল ফসলের বীজ নির্বাচন, কৃষি যন্ত্রাংশ ব্যবহার সমকালীন সাথী ফসল চাষাবাদ, কীটনাশকের ব্যবহার, কম্পোস্ট তৈরি ও ব্যবহার পাবলিক ও প্রাইভেট সেক্টর সেবাদানকারী, লিড কৃষক এবং ইনপুট রিটেইলারগণ সঙ্গে কৃষকদের আন্তঃসম্পর্ক উন্নয়ন ঘটিয়েছি। পল্লীশ্রী রি-কল প্রকল্পের প্রকল্প সমন্বয়কারী পুরান চন্দ্র বর্ম্মন বলেন, বর্তমান সরকারের সহযোগিতায় গত ৫ বছরে তিস্তাপারের অসহায় পরিবারের কষ্টের জীবন ধারণের চিত্র সম্পূর্ণ পাল্টে দেয়া হয়েছে। অভাব নামের দৈত্যটি তিস্তাপারের একঝাঁক নারীরা জোট বেধে বিতারিত করেছে বিভিন্ন প্রকল্পের মাধ্যমে। এবার তারা প্রবেশ করল ডিজিটাল যুগের স্মার্টফোনে।

সম্পর্কিত:
পাতা থেকে: