২১ নভেম্বর ২০১৭,   ঢাকা, বাংলাদেশ   শেষ আপডেট এই মাত্র  
Login   Register        
ADS

জট খুলল হাঙ্গেরির উদ্বাস্তু-সঙ্কটে অন্ধকার যুগের ছায়া ইউরোপে


জট খুলল হাঙ্গেরির উদ্বাস্তু-সঙ্কটে অন্ধকার যুগের ছায়া ইউরোপে

চার দিনের লাগাতার ক্ষোভ-বিক্ষোভের পর অবশেষে খুলল দরজা বুদাপেস্টের। তবে অন্ধকার কাটছে না ইউরোপের। হাজার হাজার শরণার্থীর কাতর আর্তি এবং বিভিন্ন দেশে কার্যকর নিরাপত্তা বিধিতে সিঁদুরে মেঘ দেখছে ইউরোপ। পশ্চিম এশিয়া এবং আফ্রিকায় জঙ্গিদের হাতে গণহত্যা এবং তার জেরে এই বিপুল সংখ্যক মানুষের ঘর ছাড়ার ঘটনায় আদতে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ পরবর্তী অন্ধকার যুগের ভূত দেখতে শুরু করেছে ইউরোপ!

শুক্রবার গভীর রাতে হাঙ্গেরির বুদাপেস্টে আটকে থাকা শরণার্থীদের জায়গা দেওয়ার কথা ঘোষণা করেছে অস্ট্রিয়া। আর তার পর থেকেই বুদাপেস্টে শুরু হয়েছে শরণার্থীদের বাসে করে অস্ট্রিয়ার সীমান্তে পৌঁছে দেওয়ার প্রক্রিয়া। বুদাপেস্টে সাময়িক ভাবে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের এই চেষ্টা শুরু হলেও ইউরোপের অন্যান্য দেশে শরণার্থী-সঙ্কট এখনও কাটেনি।

ইউরোপীয় ইউনিয়নের নিয়মমাফিক বুদাপেস্টেই গত কালও জার্মানি যাওয়ার ট্রেনে তোলার নাম করে শরণার্থীদের নিয়ে যাওয়া হয়েছে আশ্রয় শিবিরে। সীমান্তে নজরদারি বাড়ানো হয়েছে বিভিন্ন দেশে, শরণার্থীদের ধরে ধরে তাঁদের গায়ে পার্মানেন্ট মার্কার দিয়ে নম্বর লিখে দেওয়া হয়েছে স্লোভাকিয়ায়। সব মিলিয়ে ঘরছাড়াদের ভিড় এবং তাদের হটাতে এই পুলিশি তৎপরতা দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের ইহুদি-নিধন এবং তার পরের অন্ধকার সময় মনে করিয়ে দিচ্ছে ইউরোপকে। হাঙ্গেরির প্রধান ধর্মযাজক রবার্ট ফ্রোলিকের কথায়, ‘‘শরণার্থীদের হাতে নম্বর লিখে দিচ্ছে পুলিশ। দেখে শিউরে উঠছি। সশস্ত্র পুলিশ দিয়ে ওঁদের ট্রেনে তুলে আশ্রয় শিবিরে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে। সেখানে বন্ধ করে রাখা হচ্ছে। এ যেন হলোকাস্টের প্রতিধ্বনি!’’ দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পরবর্তী সময়ের শরণার্থী সমস্যার সঙ্গে ইউরোপ ও পশ্চিম এশিয়ার বর্তমান পরিস্থিতির তুলনা আগেই টেনেছে রাষ্ট্রপুঞ্জ। জানানো হয়েছে, চল্লিশের দশকের পরে এমন উদ্বাস্তু-সমস্যা বিশ্বে আর হয়নি।

ইউরোপের একটি মানবাধিকার পর্যবেক্ষণ সংস্থা অবশ্য বলছে, এই পরিস্থিতিতে আতঙ্কের ইতিহাস মনে পড়া অস্বাভাবিক নয়। ওই সংস্থার এগ্‌জিকিউটিভ ডিরেক্টর কেনিথ রথের কথায়, ‘‘চোখের সামনে এই পরিস্থিতি দেখলে খারাপ সময়ের কথা মনে পড়াটাই স্বাভাবিক। যারা এক বার সঙ্কট দেখেছেন, পরের বার কঠিন সময় এলে আগের কথা তো আমাদের মনে পড়েই।’’ তাঁর কথায়, ‘‘এটা সত্যিই বিস্ময়কর, শরণার্থীদের ট্রেনে চাপিয়ে আশ্রয় শিবিরে বা অন্য দেশে নিয়ে যাওয়ার দৃশ্য চল্লিশের দশকের কথা মনে করিয়ে দিচ্ছে আমাদের সকলকেই।’’ রাষ্ট্রপুঞ্জের তথ্য বলছে, তিন লক্ষেরও বেশি মানুষ ইতিমধ্যেই সমুদ্র পেরিয়ে ইউরোপে আশ্রয়ের খোঁজে পৌঁছেছেন। কিছু মানুষ এসেছেন লিবিয়া থেকে ইতালিতে। আর কিছু মানুষ তুরস্ক হয়ে গ্রিসে পৌঁছেছেন। নৌকাডুবি এবং সার্বিয়া আর ম্যাসেডোনিয়ার কঠিন রাস্তা পেরোতে গিয়ে মৃত্যু হয়েছে আড়াই হাজারেরও বেশি শরণার্থীর।

আজ অবশ্য বুদাপেস্টের পরিস্থিতি কিছুটা নিয়ন্ত্রণে এসেছে। অস্ট্রিয়ার চ্যান্সেলর ওয়ার্নার ফেম্যান তাঁর ফেসবুক পেজে লিখেছেন, ‘‘বর্তমান পরিস্থিতির কথা মাথায় রেখে হাঙ্গেরিতে আটকে থাকা শরণার্থীদের জায়গা দিতে রাজি হয়েছে অস্ট্রিয়া এবং জার্মানি।’’ হাঙ্গেরির পুলিশ রাতেই শরণার্থী শিবিরে এসে সে কথা ঘোষণা করে। লাগামছাড়া উচ্ছ্বাসে ফেটে পড়েন সেখানে আটক শরণার্থীরা। রাত একটার মধ্যে ‘ট্রানজিট সার্ভিস’ লেখা ৪০টি বাস এসে পৌঁছয় ওই শিবিরে। পাশাপাশি বুদাপেস্টের কেলেটি স্টেশনের সামনে অপেক্ষারত শরণার্থীদেরও সেখানে নিয়ে আসা হয়। শুরু হয় হেলিকপ্টারে নজরদারিও।

প্রথমটায় গোটা বিষয়টা বিশ্বাস করতে অসুবিধা হচ্ছিল শরণার্থীদের। যে পুলিশ এত দিন স্টেশন থেকে হিঁচড়ে বের করে এনেছে তাঁদের, আজ তারাই কেন বাসে করে সীমান্তে পৌঁছে দিতে চাইছে? তাই বাসে উঠতে প্রথমে অস্বীকার করেন অনেকে। পুলিশকে জানান, সীমান্তের নামে পুলিশ কোথায় নিয়ে যাচ্ছে তা নিয়ে সন্দিহান তাঁরা। তবে পরে বাসে উঠতে রাজি হন তাঁরা। পুলিশ জানিয়েছে, রাত দু’টোর মধ্যেই বুদাপেস্ট থেকে ৪০টি বাস সীমান্তের দিকে রওনা হয়। ভোর পাঁচটার মধ্যে ছ’টি বাসে করে সেখানে পৌঁছে যান শ’চারেক শরণার্থী। অস্ট্রিয়া পৌঁছে রীতিমতো উৎসবে মাতেন বাসযাত্রীরা। হাততালি দিয়ে, গান গেয়ে ধন্যবাদ জানাতে থাকেন অস্ট্রিয়ার প্রশাসনকে। বাসের পাশাপাশি ট্রেনে করেও আজ সকালে হাঙ্গেরি থেকে অস্ট্রিয়া পৌঁছেছেন কয়েক হাজার শরণার্থী।

আজ সকালে নিজের ফেসবুক পেজে ওয়ার্নার ফেম্যান জানিয়েছেন, হাঙ্গেরির প্রধানমন্ত্রী ভিক্টর ওরবান এবং জার্মানির চ্যান্সেলর আঙ্গেলা মের্কেলের সঙ্গে তাঁর কথা হয়েছে। বুদাপেস্টে আটকে থাকা শরণার্থীদের না সরালে গোটা ট্রেন চলাচল ব্যবস্থাই আটকে পড়ত। সে জন্যই যৌথ ভাবে এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে বলেও মন্তব্য করেছেন তিনি।

অস্ট্রিয়ার প্রশাসন জানিয়েছে, আজ সকালের মধ্যেই হাজার তিনেক শরণার্থীর সঙ্গে কথা বলে তাঁদের প্রয়োজনীয় কাগজপত্র তৈরির প্রক্রিয়া শুরু হয়ে গিয়েছে। পাশাপাশি, প্রশাসনের তরফে জানানো হয়েছে, যাঁরা অস্ট্রিয়ায় থাকতে চান না, তাঁদের জার্মানি পৌঁছে দেওয়ার ব্যবস্থাও করবে প্রশাসনই।

প্রাথমিক ভাবে জট কেটেছে হাঙ্গেরিতে। তবে ইউরোপের শরণার্থী সঙ্কটের সমস্যার সিকিভাগও যে এখনও সমাধান করা হয়নি তা স্বীকার করে নিচ্ছেন আন্তর্জাতিক সম্পর্ক এবং মানবাধিকার বিশেষজ্ঞরা। জানাচ্ছেন, শুধু অস্ট্রিয়া এবং জার্মানি নয়, এই উদ্যোগে হাত মেলাতে হবে গোটা বিশ্বকে। এক বিশেষজ্ঞের কথায়, ‘‘এত মানুষকে জায়গা দিতে হলে হাত বাড়াতে হবে সকলকে। না হলে আয়লানদের বাঁচানো যাবে না!’’

শরণার্থী সঙ্কট প্রসঙ্গে এ বার মার্কিন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামাকে চিঠি দিলেন ১৪ জন সেনেটর। তাঁরা ওই চিঠিতে জানিয়েছেন, শরণার্থী সমস্যা দিনের পর দিন প্রকট হয়ে উঠছে। ফলে অন্তত ৬৫ হাজার শরণার্থীকে আমেরিকায় আশ্রয় দিলে সমস্যার খানিকটা সমাধান হতে পারে। তবে তাঁদের এই ভূমিকার সমালোচনা করেছেন অনেকেই। তাঁদের মতে, সীমান্ত এলাকা দিয়ে শরণার্থীরা দেশে ঢুকলে তাদের সঙ্গে জঙ্গিরাও দেশে ঢুকতে পড়তে পারে। এমন সম্ভাবনাও উড়িয়ে দেওয়া যায় না।

সূত্র: আনন্দবাজার