২৫ নভেম্বর ২০১৭,   ঢাকা, বাংলাদেশ   শেষ আপডেট এই মাত্র  
Login   Register        
ADS

ধোলাইখালের কান্না


ইতিহাসের রং বদল

ধোলাইখালে পালতোলা বাহারি নৌকা ভেসে বেড়াচ্ছে। ঘোড়া হাঁকিয়ে পাড় ঘেঁষে রক্ষীরা ছুটে চলছে। এমন দৃশ্য চারশ’ বছর আগে নিত্যই ছিল ধোলাইখালে। এখন তা কেবল কল্পনাই করা যেতে পারে। কিংবা পাওয়া যেতে পারে ইতিহাসের পাতায়। ঢাকার প্রথম সুবেদার ইসলাম খান নগর রক্ষা পরিখা ও জলপথ হিসেবে খালটি খনন করিয়েছিলেন। এরপর সময় অনেক গড়িয়েছে। এখন সেখানে লোহালক্কড় আর পুরনো গাড়ির যন্ত্রাংশের হাজারো দোকান। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর ব্রিটিশ সৈন্যদের ব্যবহৃত গাড়ির ইঞ্জিনের সহজলভ্যতার সূত্র ধরে চট্টগ্রামে পুরনো গাড়ির ইঞ্জিন ও পার্টসের ব্যবসায় গড়ে ওঠে। গাড়ির সংখ্যা বৃদ্ধি ও পুরনো পার্টসের ওপর মানুষের চাহিদা বৃদ্ধির কারণে চট্টগ্রামের দেখাদেখি ঢাকার ধোলাইখালে ১৯৬৮ সালে গাড়ির যন্ত্রাংশের মার্কেট প্রতিষ্ঠিত হয়। আশির দশকে পুরনো ইঞ্জিন আমদানির অনুমতি দেয়ার পর থেকে এ মার্কেটটি হয়ে ওঠে রমরমা। প্রাইভেটকারের সংখ্যা বৃদ্ধি পাওয়ায় বর্তমানে গাড়ির যন্ত্রাংশ সংক্রান্ত দোকানপাট ধোলাইখালের গ-ি ছাড়িয়ে গোয়ালঘাট, পাঁচ ভাই ঘাট লেন, লালমোহন স্ট্রিট, ধোলাইখাল পুকুরপাড়, উত্তর ও দক্ষিণ মৈশুন্দি, নবাবপুর রোড, টিপু সুলতান রোড, বনগ্রাম, ওয়ারীতে বিস্তার লাভ করেছে। শুধু টং মার্কেটেই আছে সাড়ে তিনশ’র মতো দোকান। আর পুরো ধোলাইখালে হাজার পাঁচেক, এমন পরিসংখ্যানই জানিয়েছেন ধোলাইখাল ঢং মার্কেট এ্যাসোসিয়েশনের সাধারণ সম্পাদক সাইদুল বারী। দোকান ছাড়া অনেকে ফুটপাথে এমনকি মাঝ আইল্যান্ডেও খুচরা পার্টসের পসরা সাজিয়ে ব্যবসা করছেন।

সবার আগে ভাবতে হয়

বাংলাদেশের অধিকাংশ গাড়িই রিকন্ডিশন। এসব গাড়ির অধিকাংশ যন্ত্রপাতি অনেক সময়ই নতুন পাওয়া যায় না। আর পেলেও দাম অনেক বেশি। অথচ ধোলাইখালে সাশ্রয়ী দামে গাড়ির পুরনো যন্ত্রাংশ পাওয়া যায়। এবং তা দিয়ে কাজ চলে যায় দিব্যি। আর তাই গাড়ির কোন পার্টসের দরকার হলে গাড়ির মালিক, ড্রাইভার ও মিস্ত্রিরা প্রথমেই ধোলাইখালের কথা চিন্তা করে বলে জানিয়েছেন সাইদুল বারী। দোকানি সেলিমের সঙ্গে আলাপ করে জানা যায়, এখানে শুধু গাড়ির যন্ত্রাংশই বিক্রি করা হয় না, গাড়ি মেরামতও করা হয়। কোন যন্ত্রাংশ কেনার পর সেটা গাড়িতে ফিট করে দেয়ার জন্য এক দু’জন মিস্ত্রি প্রতিটি দোকানেই আছে। ফলে কাস্টমাররা সময় বাঁচাতেও ধোলাইখালকে বেছে নেন। সবচেয়ে মজার বিষয়টি জানালেন দোকানদার রফিক। তিনি জানিয়েছেন, কোন পার্টস যদি কোন দোকানে না পাওয়া যায়, তবে হতাশ হওয়ার কোন কারণ নেই। এখানে ছোট বড় অনেক ওয়ার্কশপ আছে, যেখানে লেদ মেশিনের সাহায্যে অবিকল পার্টস তৈরি করে দেয়া হয়। নিনিয়াম, ব্রেক ড্রাম, প্যাড ড্রাম, ব্রেক সিলিন্ডার, বাম্পার ব্রাকেট, পিস্টন ইত্যাদি এখানকার ওয়ার্কশপগুলোতে তৈরি হচ্ছে। তাই একে মিনি মোটর ইন্ডাস্ট্রিয়াল জোন বলে অভিহিত করা যায়। নতুন পার্টস কিনতে যদি পাঁচ হাজার টাকা লাগে, তবে সে পার্টস এখান থেকে দুই হাজার টাকাতেই পাওয়া যায়। ফলে একদিকে সস্তা দাম, আরেকদিকে এখানকার ওয়ার্কশপগুলো চাহিবামাত্র অবিকল পার্টস তৈরি করে দিতে পারে বলে গাড়ির যন্ত্রপাতি লাগলে সবাই ধোলাইখালের কথাই সবার আগে ভাবে।

কারা কোথা থেকে কেমন করে

মেইন রাস্তা থেকে একটু ভেতরে ছোট দোকান আল মদীনা মটরস। দোকানের মালিক আলম যে ঢাকাইয়া কুট্টি তা তার কথাতেই বোঝা গেল। বেশ আগ্রহভরেই তিনি জানালেন ধোলাইখালের ব্যবসা-বাণিজ্যর নানা খুঁটিনাটি। যে কোন গাড়ির ইঞ্জিন, সাসপেনশন, বডি, নাট, বল্টু, চেসিস, বিয়ারিং, টায়ার, স্প্রিংসহ ছোট-বড় সব যন্ত্রাংশই পাওয়া যায় দোকানগুলোতে। টয়োটা, নিশান, হোন্ডা, মিৎসুবিশি, সুজুকি, মারুতির যন্ত্রাংশ বেশি পাওয়া গেলেও, অন্যসব মডেলের গাড়ির পার্টসও কম-বেশি পাওয়া যায়। বাস ও ট্রাকের মধ্যে বেডফোর্ড, ইসুজু, নিশান, হিনো, ভলভো, টাটা, অশোক লেল্যান্ড, টারসেল, আইয়ার, ক্যান্টার ইত্যাদি গাড়ির যন্ত্রাংশ এই মার্কেটে বেশি পাওয়া যায়। এসব যন্ত্রপাতি এখানকার দোকানিরা সংগ্রহ করে পুরনো ও ব্যবহার-অনুপযোগী যানবাহন থেকে। বিভিন্ন সরকারী ও বেসরকারী প্রতিষ্ঠানের নিলামে অংশগ্রহণ করে যন্ত্রপাতি ও যন্ত্রাংশ তারা কেনে। আবার অনেকে চট্টগ্রাম থেকেও পার্টস কিনে এনে বিক্রি করে। অবশ্য কিছু কিছু দোকানি পুরনো যন্ত্র ও যন্ত্রাংশ জাপান, দুবাই, চীন, সিঙ্গাপুর, থাইল্যান্ড ইংল্যান্ড, মালয়শিয়া এবং ভারত থেকে কিনে আনে। এগুলোর ক্রেতা কারা এমন প্রশ্নের উত্তরে আলমের কাছ থেকে জানা যায়, ড্রাইভার আর মিস্ত্রিরাই তাদের প্রধান ক্রেতা। এদের কাছে তারা সাধারণত খুচরা পার্টস বিক্রি করে। তবে মফস্বল থেকে যারা পার্টস কিনতে আসে, তারা সাধারণত পাইকারি হারে পার্টস কিনে নেয়। পার্টসের ব্যবসায় কয়েকগুণ বেশি লাভ করা যায়। কোন পার্টস কেনা ও অন্যান্য খরচ বাবদ যদি একশ’ টাকা পড়ে, তবে তা কমপক্ষে সাতশ’ থেকে একহাজার টাকা বিক্রি করা যায়, এমনটাই জানিয়েছেন আলম। এ কারণে কিছু শিক্ষিত ছেলে চাকরি-বাকরির চেষ্টা না করে এখানেই দোকান দিয়েছে। আলম তার পাশের দোকানের মালিক মোসাদ্দেকের দিকে ইঙ্গিত করে জানালেন, ছেলেটি এমএ পাস। লেখাপড়া শেষ করে এখানে ব্যবসা করছে। যদিও এখানকার বেশিরভাগ দোকানিই কম লেখাপড়া জানা।

আগের মতো ভাল নেই কেউই

কেউ ভাল নেই। যতজন ব্যবসায়ীর সঙ্গে কথা বললাম, সবার এক কথা, ভাই বড় কষ্টে আছি। বেচা কেনা একদমই নেই। সংসার চালানোই দায় হয়ে পড়েছে। আলম ঢাকাইয়া কুট্টিদের ভাষায় জানালেন, বাপজান এই ব্যবসা করছে। এহন আমি করতাছি। ভাই লেহাপড়া করি নাইক্কা। অন্য কোন কামও করবার পারি না। এডা যে ছাইড়া দিমু হেইডাও পারতাছি না। সংসার লইয়্যা হিমশিম খাইতাছি। আলমের মতো এমন কথা প্রতিটি ব্যবসায়ীর। রমরমা এ ব্যবসায় হঠাৎ কেন পড়তি অবস্থা তা তাদের কথাতেই খোলাসা হয়ে যায়। অতি উচ্চহারে আমদানি শুল্ক, ডলারের মূল্যবৃদ্ধি, পোর্ট, শিপিংয়ের রেন্ট বৃদ্ধি, এলসি খুলতে ব্যাংকের সুদ, কাস্টমস কর্মকর্তাদের হয়রানিসহ বিভিন্ন সমস্যার কারণে পুরান পার্টস আমদানি কারকরা লোকসানের মুখোমুখি। আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ কারণ হলো- বাংলামোটর, রাজারবাগ, বিজয়নগর, পল্লবী, উত্তরায় পুরনো মটর পার্টসের মার্কেট গড়ে উঠেছে। এগুলোতেও সস্তায় পার্টস কিনতে পারছে ক্রেতারা। ফলে এসব এলাকার মানুষজন কয়েক ঘণ্টার জ্যাম ঠেলে ধোলাইখাল যেতে আগ্রহী নন। বিক্রির পরিমাণ অসম্ভব রকম কমে গেছে। কোন কোন দোকানদার দিনে একটাও ক্রেতা পান না। ফলে দোকানভাড়ার টাকা যোগানই অনেকের জন্য কঠিন হয়ে পড়েছে।

ঘুচে গেছে বদনাম

ঢাকা শহরের কোথাও কোন গাড়ি চুরি হয়েছে মানে তা ঘণ্টাখানেকের মধ্যেই ধোলাইখালে খুঁজে পাওয়া যাবে, এমন কথা বহুল প্রচলিত। তবে দিন বদলে গেছে। এখন আর এখানে চোরাই গাড়ি আসে না। বদনাম ঘোচানোর জন্য এখানকার ব্যবসায়ী সমিতিগুলো অত্যন্ত কঠোর নিয়ম ও নিয়ন্ত্রণ আরোপ করেছে। কেউ বা কোন চক্র চোরাই গাড়ি কাটার চেষ্টা করলে তাকে মার্কেট থেকে বের করে দেয়া হয়। একদিকে সমিতিগুলোর কঠোর নিয়ন্ত্রণারোপ আর অন্যদিকে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কঠোর নজরদারি-এই দু কারণে এখানে চোরাই গাড়ি ঢুকতে পারে না বলে জানিয়েছেন সাইদুল বারী। ফলে ধোলাইখালের বহুল প্রচলিত বদনাম ঘুচে গেছে।

অবিশ্বাস্য দক্ষতা, অবিশ্বাস্য মজুরি

তেল চিটচিটে কালিঝুলি মাখা টিশার্ট পরা নয় দশ বছরের ছেলেটির নাম শামীম। তিন বছর ধরে সে ঢং মার্কেটে শ্রমিক হিসেবে কাজ করছে। তার সঙ্গে কথা বলে বুঝলাম, সে শুধু গাড়ির সব খটমট নামগুলো জানেই না, ইতোমধ্যে সে ঝানু মিস্ত্রি হয়ে উঠেছে। শামীম জানিয়েছে, তার মজরি দৈনিক একশ’ টাকা। সে অনেকের চেয়ে বেশি মজুরি পায়। তারই বন্ধু রহমত দিনে মাত্র বিশ টাকা মজুরি পায়। অবাক করার মতোই কথা। বাংলামোটর থেকে মগবাজারে যাওয়ার একবার রিকশাভাড়া যেখানে বিশ টাকা, সেখানে এখানকার একজন শ্রমিকের সারাদিনের মজুর বিশ টাকা! তবে কোন কোন শ্রমিকের মজুরি একহাজার টাকাও আছে। সেটা নির্ভর করে মূলত দক্ষতার ওপর। ধোলাইখালের শ্রমিকরা পুরনো গাড়িকে নতুন আদল দেয়া, গাড়ির ভেতরের ও বাইরের সাজসজ্জা, অচল গাড়ি সচল করা, মেরামতসহ যে কোন কাজে খুবই দক্ষ। বেশিরভাগ শ্রমিক নিরক্ষর হলেও কাজ করতে করতে তারা এক একজন দক্ষ মিস্ত্রি হয়ে উঠেছেন। লেদ মেশিন ওয়ার্কশপের শিশু শ্রমিকরা যেভাবে অতি সহজে যে কোন স্যাম্পল দেখে অবিকল তা তৈরি করে দিতে পারে, তা অবিশ্বাস্যই লাগে। অথচ এদের মানবেতর জীবনযাপন করতে হয় রাসাবাজার আর কলতা বাজারের খুপড়ি ঘরে।

অর্থনীতির অংশÑ যন্ত্রাংশ

ধোলাইখাল দেশের অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখছে। এখানে মোটরপার্টস ও হাল্কা প্রকৌশল শিল্পে এখন প্রায় চার হাজারের মতো যন্ত্র ও যন্ত্রাংশ তৈরি হচ্ছে। এগুলো দেশের অভ্যন্তরীণ চাহিদা মেটাচ্ছে। আবার ১৩৭টি আইটেম বিশ্বের সতেরটি দেশে রফতানি হচ্ছে। ধোলাইখালের মোটরপার্টস ও হাল্কা শিল্পের বার্ষিক টার্নওভার ৪৫ হাজার কোটি টাকার অধিক। সরকারকে এ খাতের ব্যবসায়ীরা বাৎসরিক দেড়শ’ কোটি টাকার অধিক রাজস্ব দিচ্ছেন। এ ছাড়া এখানকার ওয়ার্কশপ, লেদ ইন্ডাস্ট্রি এবং পুরনো যন্ত্রাংশ কেনাবেচা ও পুরনো গাড়ি কাটার কাজে নিয়োজিত প্রায় পাঁচ লক্ষাধিক শ্রমিক। এত বিপুলসংখ্যক লোকের কর্মসংস্থানের মাধ্যেমে ধোলাইখাল আমাদের অর্থনীতিতে গুরুত্বর্পূণ অবদান রেখে চলছে।

আশ্বাস ও প্রত্যাশার দূরত্ব

ধোলাইখালের ব্যবসায়ীরা এর হারানো ঐতিহ্য ফিরে পেতে চায়। ফিরিয়ে আনতে চায় রমরমা অবস্থা। এজন্য সরকারের কাছে তাদের বেশকিছু দাবি দাওয়া আছে। সাইদুল বারী এখানে আধুনিক মার্কেট গড়ে তোলার জন্য সরকারের কাছে আহ্বান জানিয়েছেন। ধোলাইখালের যন্ত্রাংশের মার্কেট গড়ে উঠেছে মূলত ঢাকা সিটি কর্পোরেশনের জায়গায়। দোকানগুলো ছোট হওয়ায় মালামাল রাখতে হচ্ছে ফুটপাথ, এমনকি রাস্তার ওপর। অনেক আগ থেকেই আধুনিক মার্কেট করার দাবি জানিয়ে আসলেও এখনও কোন উদ্যোগ নেয়া হয়নি। নবনির্বাচিত মেয়রের কাছে ব্যবসায়ীরা তাই আধুনিক মার্কেট তৈরির উদ্যোগ গ্রহণের প্রত্যাশা করছেন। বছর চারেক আগে সাবেক শিল্পমন্ত্রী দিলীপ বড়ুয়া ধোলাইখাল এলাকাকে লাইট ইঞ্জিনিয়ারিং শিল্পপার্ক হিসেবে গড়ে তোলার ঘোষণা দিয়েছিলেন। তবে তা ঘোষণা হিসেবেই রয়ে গেছে। ব্যবসায়ীরা সেই ঘোষণার বাস্তবায়ন দেখতে চান। তাছাড়া, আমদানি শুল্ক হ্রাস, সহজ ব্যাংক লোনের প্রত্যাশাও ব্যক্ত করেছেন তারা। ব্যবসায়ীদের দাবি দাওয়ার দিকে সরকার যদি মনোযোগী হয়, তবে ব্যবসায়ী ও শ্রমিকরা যেমন উপকৃত হবেন, তেমনি সরকারেরও রাজস্ব বৃদ্ধি পাবে, অর্থনীতি হবে আরও সমৃদ্ধ।