মেঘলা, তাপমাত্রা ৩১.১ °C
 
২৩ সেপ্টেম্বর ২০১৭, ৮ আশ্বিন ১৪২৪, শনিবার, ঢাকা, বাংলাদেশ
সর্বশেষ

বদলে যাওয়া প্রেক্ষাপটে ইংরেজী শেখা

প্রকাশিত : ৬ সেপ্টেম্বর ২০১৫
  • অমিত রায় চৌধুরী

ভাষার রাজ্যে এখনও মুকুটহীন সম্রাট ইংরেজী। ভাষার মানচিত্রে যার শক্তিমান বিচরণ আজও অটুট। মোট ভাষাভাষীর সংখ্যা প্রায় দুই বিলিয়ন। শতাধিক দেশ বিভিন্ন মর্যাদায় এ ভাষাকে ব্যবহার করে আসছে। অতি সাধারণ আদিবাসী কৃষক শ্রেণীর মুখের ভাষা ইতিহাসের বাঁকে বাঁকে বিভিন্ন আগ্রাসনের প্রভাবে অভিযোজিত হয়ে গ্রহণ-বর্জনের প্রক্রিয়ায় প্রায় দীর্ঘ ১৪শ’ বছর পথ পরিক্রমণের পর আজ এমন একটি জায়গায় স্থিত হয়েছে। তবে উল্লেখ করতে হবে, ১৪৭৬ সালে উইলিয়াম ক্যাক্সটনের মুদ্রণযন্ত্র আবিষ্কারের মধ্য দিয়ে ভাষার গাঠনিক অস্থিরতা কমে আসে ও ইংরেজী ভাষার আধুনিক যুগের সূচনা ঘটে। কলেবরে, মেধায়, বৈচিত্র্যে, তারল্যে, সারল্যে অপ্রতিদ্বন্দ্বী এই ভাষা বিশ্বের অগ্রসর প-িতদের লালিত অভিজ্ঞতা ও প্রযুক্তিকে বিশ্বব্যাপী সঞ্চারিত করেছে।

ইংরেজী ছাড়া তথ্যপ্রযুক্তির জ্ঞান অর্জন সম্ভব নয়। ই-কমার্স, ই-ব্যাংকিং, ই-গবর্ন্যান্স, ই-লার্নিং কিছুই ইংরেজী ভাষায় দক্ষতা ছাড়া অর্জন করা সম্ভব নয়। নিজের ভাষা, সংস্কৃৃতি, ভৌগোলিক সীমানাÑ সব কিছু অটুট রাখতে চাই দক্ষ জনশক্তির পাশাপাশি মানানসই বেসামরিক আমলাতন্ত্র ও কূটনীতি; যাঁরা নিরূপণ করবেন সমৃদ্ধির রোডম্যাপ, সুশাসনের কাঠামো, বিদেশনীতি, পরিচালনা করবেন আন্তর্জাতিক বাণিজ্য, বিনিময় করবেন অভিজ্ঞতা ও সম্পাদন করবেন আন্তর্জাতিক চুক্তি। একটি সমীক্ষায় দেখা গেছে, ইংরেজী ভাষায় দক্ষতার অভাবে আমরা বিশ্বের বিভিন্ন দেশের সঙ্গে কূটনৈতিক সংলাপের গতিপথ রাষ্ট্রের স্বার্থে পরিচালিত করতে পারিনি। একদিকে সেটি যেমন লজ্জার, অন্যদিকে আশঙ্কারও বটে। সহস্রাব্দ লক্ষ্যমাত্রা অর্জনের পথে আমরা অনেক সূচকে অগ্রগামী থেকে উদীয়মান অর্থনৈতিক শক্তি হিসেবে বিশ্ব সভায় নজর কেড়েছি। আমাদের রূপকল্পকে এখন চরম নিন্দুকও উচ্চাভিলাষী মনে করছেন না। কিন্তু ভাষা শিক্ষার সীমাবদ্ধতা দূরীকরণকে আমরা অগ্রাধিকার বিবেচনায় গুরুত্বারোপ না করলে আধুনিক প্রযুক্তির জগতে আমাদের প্রবেশাধিকার অনিশ্চিত হয়ে পড়বে। দক্ষ মানবসম্পদ বিনির্মাণের পথে একটি প্রধান অন্তরায় হিসেবে এখনই এই সীমাবদ্ধতাকে শনাক্ত করা প্রয়োজন।

ইংরেজী ভাষা বহু প্রাচীন ধ্রুপদী ভাষা তালিকার অন্তর্ভুক্ত নয়। ইউরোপের সাধারণ মানুষের মুখোচ্চারিত এবং শক্তিমান বিভিন্ন জাতিগোষ্ঠীর ভাষাভা-ার থেকে সঙ্কুলিত হয়ে অনেকটা আপন মহিমায় আত্মপ্রকাশ করে শতাব্দীর পর শতাব্দীজুড়ে আধিপত্য বিস্তার করেছে ইংরেজী। যেহেতেু ব্রিটিশ রাজশক্তি বিশ্বব্যাপী তার উপনিবেশ বিস্তার ঘটাতে সক্ষম হয়েছিল, নিঃসন্দেহে বলা যায় ইংরেজী ভাষা অন্যান্য ভাষার চেয়ে একটু বেশি জায়গা পেয়েছিল তার মানচিত্রের পরিবৃত্ত প্রসারিত করতে। কিন্তু এ কথা অস্বীকার করার উপায় নেই যে, কেবল সাহিত্য নয়, ইতিহাস, রাজনীতি, সমাজতত্ত্বÑ জ্ঞানের সকল শাখায় বিশেষজ্ঞের গবেষণায় সমৃদ্ধ হয়েছে এই ভাষা। কেবল ইংরেজ বা ইংরেজী যাদের মাতৃভাষা তাদের অভিজ্ঞতা নয়; বরং রুশ জার্মান, ফরাসী, ভারতীয় এমনকি চৈনিক মনীষীদের অভিজ্ঞতা বিশ্ব জ্ঞানভা-ারে সংযোজিত হওয়ার লক্ষ্যে দ্রুত অনূদিত হয়েছে ইংরেজী ভাষায়। একটি জীবন্ত ভাষার প্রধান বৈশিষ্ট্য হলো তার পরিবর্তনশীলতা। ইংরেজী ভাষায় ব্যবহৃত শব্দের জন্ম, বৃদ্ধি ও মৃত্যু-জীবনের সঙ্গেই তুল্য। এ ভাষার অভিযোজনের ক্ষমতা অকল্পনীয়। বিভিন্ন ভাষা সংস্কৃতি থেকে শব্দ ও শৈলী গ্রহণ করে যুগ পরিবর্তনের ঢেউয়ের তালে অনেক শব্দ এমনকি ভাষার কারুকলা পর্যন্ত সমন্বিত হয়েছে উদারতায়। ফলে এ ভাষার শ্রীবৃদ্ধি যেমন ঘটেছে, সর্বজনগ্রাহ্যতাও বৃদ্ধি পেয়েছে বহুগুণে।

পৃথিবীর যে কোন প্রান্ত থেকে বিশ্বের সর্বাধুনিক জ্ঞানজগতের বাতায়ন উন্মুক্ত হতে পারে সকল শিক্ষার্থী ও গবেষকের কাছে কেবল ইংরেজী ভাষার কল্যাণে। শিক্ষার্থীরা এখন কোন তাত্ত্বিক বা আদর্শিক অথবা মানস কাঠামোগত আনুগত্য থেকে ইংরেজী ভাষা শেখে না। তারা স্রেফ তাদের কর্মসংস্থানের জন্য, আধুনিক প্রযুক্তি, বাণিজ্য কৌশল, আন্তর্জাতিক যোগাযোগ, চিকিৎসা শাস্ত্র, কম্পিউটিং, ইন্টারনেট, শিক্ষা, প্রকাশনা, ব্যবস্থাপনা এমনকি বিনোদন জগতে প্রবেশের মতো জীবনমুখী বাস্তবতার তাড়নায় কার্যকর মাধ্যম হিসেবে ইংরেজীকে গ্রহণ করতে চায়। একটি সাম্প্রতিক জরিপে দেখা গেছে, বিজ্ঞান প্রকাশনার শতকরা ৮০ ভাগ, প্রকৃতি বিজ্ঞানের শতকরা ৯০ ভাগ এবং কলাশাস্ত্রের ৮২ ভাগ নিবন্ধই ইংরেজী ভাষায় রচিত। তাই উন্নত জীবন, কর্মসংস্থান এমনকি বিভিন্ন সংস্কৃতির মধ্যে মেলবন্ধন সৃষ্টি করে বিচ্ছিন্নতাবাদী প্রবণতা রুখে দিয়ে বৈচিত্র্যের মাঝে ঐক্যÑ এমন সূত্র বিস্তারের জায়গা করে দিয়েছে ইংরেজী ভাষা। মাতৃভাষা, দাফতরিক ভাষা, প্রথম, দ্বিতীয় কিংবা বিদেশী ভাষা-যে মর্যাদাতেই হোক, ইংরেজী ভাষা বিশ্বের সর্বাধিক প্রচলিত, স্বীকৃত, গ্রাহ্য, দরকারী ভাষা হিসেবে ওয়ার্ল্ড লিংগুয়া ফ্রাংকা অভিধায় ইতোমধ্যে সর্বমহলে আদৃত হয়ে আসছে।

ইংরেজী ভাষাকে অযথা আভিজাত্য প্রদান না করে সহজভাবে শেখার কৌশল আয়ত্ত করতে হবে। অহেতুক ভীতি দূর করে আনন্দ পাঠের ভঙ্গিতে স্বাভাবিক ছন্দে ইংরেজী ভাষার শিখন, নিরন্তর পরিচর্যা এই ভাষা শিক্ষাকে সাবলীল, সর্বজনীন ও জনপ্রিয় করে তুলবে। তাই বর্তমান বিশ্বপ্রেক্ষিতে উচ্চশিক্ষার্থী, গবেষক, চিকিৎসাসেবা প্রার্থী, পর্যটক, চাকরিপ্রার্থী, নৌ ও বিমান পথে ভ্রমণযাত্রী, ইন্টারনেট কিংবা বিনোদন জগতে স্বচ্ছন্দে প্রবেশেচ্ছুÑ সকলের জন্য প্রয়োজন ইংরেজী ভাষায় চলনসই দক্ষতা। যে কোন ভাষা বিশেষ করে যে ভাষা মাতৃভাষা নয়, তার ওপর দক্ষতা আনার প্রধানতম কৌশল নিরবচ্ছিন্ন চর্চা, বিস্তৃত পঠন, লিখন, শ্রবণ ও প্রমিত বাচনশৈলী করায়ত্ত করা। ব্যাকরণগত কাঠামোর দিকে সতর্ক দৃষ্টি রেখে শব্দসম্ভার বৃদ্ধি করার মাধ্যমে নিয়মিত অনুশীলনের মধ্য দিয়ে যে কোন ভাষায় ব্যুৎপত্তি অর্জনের মতোই ইংরেজী ভাষাকেও সহজে আয়ত্তে আনা যায়। প্রতীয়মান হয় যে, বাংলাদেশ দ্রুত একটি মধ্য আয়ের দেশে পরিণত হতে যাচ্ছে। এ দেশের বিপুল তারুণ্যকে দক্ষ জনশক্তিতে রূপান্তর করতে ভাষা শিক্ষার উৎকর্ষ সাধন মানব সম্পদ উন্নয়ন প্রক্রিয়ায় গুরুত্বপূর্ণ নিয়ামক হিসেবে কাজ করতে পারে।

অনেক শিক্ষার্থী ইংরেজী ভাষায় অকৃতকার্য হয়। এ প্রবণতার ফলে ইংরেজী ভাষাশিক্ষা বিষয়ে একটি নেতিবাচক ধারণা তৈরি করে নিচ্ছে। প্রশ্ন উঠছে, আমরা কি এভাবে প্রতিবছর মেধা, শ্রম ও সময়ের এমন অপচয় মানিয়ে নিতে প্রস্তুত! খতিয়ে দেখতে হবে দুটি দিকÑ প্রথমত, আমাদের ইংরেজী ভাষা শিক্ষার চাহিদা উদ্ভূত অন্তরায়ের তুলনায় বেশি গুরুত্বের দাবিদার কি না! অন্যদিকে, ইংরেজী শিক্ষার পদ্ধতি, শিখন পরিবেশ, শিক্ষকের দক্ষতা, প্রশিক্ষণ মানসম্মত কিনা অথবা প্রতিষ্ঠানে উপযুক্ত তদারকি ব্যবস্থা বিদ্যমান আছে কিনা! ক্রমবর্ধমান কর্মসংস্থানের ক্ষেত্র প্রস্তুত করা ও আধুনিক প্রযুক্তি ভা-ারে অবাধ প্রবেশাধিকার নিশ্চিত করার জন্য যে কোন মূল্যে ইংরেজী ভাষা শিক্ষার প্রয়োজন আছে বলে আমি মনে করি। দ্বিতীয়ত, ইংরেজী শেখানোর কৌশল ও প্রশিক্ষিত শ্রেণী শিক্ষকের পাঠদান অগ্রাধিকার ভিত্তিতে নিশ্চিত করা সময়ের দাবি।

লেখক : অধ্যক্ষ, ফকিরহাট ফজিলাতুন্নেছা মুজিব মহিলা ডিগ্রী মহাবিদ্যালয়, বাগেরহাট

প্রকাশিত : ৬ সেপ্টেম্বর ২০১৫

০৬/০৯/২০১৫ তারিখের খবরের জন্য এখানে ক্লিক করুন


শীর্ষ সংবাদ: