মেঘলা, তাপমাত্রা ৩১.১ °C
 
২৬ সেপ্টেম্বর ২০১৭, ১১ আশ্বিন ১৪২৪, মঙ্গলবার, ঢাকা, বাংলাদেশ
সর্বশেষ

তরণী যেন দুলে না ওঠে হে কর্ণধার

প্রকাশিত : ৬ সেপ্টেম্বর ২০১৫
  • সিডনির মেলব্যাগ ॥ অজয় দাশগুপ্ত

রাজনীতিতে হঠাৎ কথার ঝড় বয়ে যাচ্ছে। পুরনো বিতর্ক তুলে আনার কারণ বুঝতে না পারলেও এটা বুঝি, প্রধানমন্ত্রীর হাত শক্তিশালী হোক এটা অনেকে চান না। কেন চান না সে আলোচনায় না গিয়েও বলব, আমরা আমাদের দেশ ও জাতির স্বার্থে শেখ হাসিনার পূর্ণ মেয়াদের সরকার ও সাফল্য কামনা করি। অকারণ উস্কানি আর হঠকারি মন্তব্য বা বক্তব্যে জাতির কোন লাভ নেই। অতীতের দায় মেটাবে ইতিহাস। তাকে উপজীব্য করে তুলে এনে উন্নয়ন ও প্রগতির প্রতিবন্ধক করাটা ভাল ঠেকছে না। রাজনীতির এই ঘোলা জলে মাছ শিকার করবে বিএনপি। যেমন, গয়েশ্বর বাবুরা এখন মুখ খুলতে শুরু“করে দিয়েছেন। সত্য মিথ্যার চেয়েও ভয়ঙ্কর মানুষের অন্ধ বিশ্বাস। সে কারণে কখন কোন্টা বলা বা করা উচিত তার একটা হিসাব থাকা দরকার।

লেনিনের দেশ সোভিয়েতের শৈশবে ডক্টর জিভাগো নামের গ্রন্থটি পাঠ করা আইনী ছিল না। সাম্যবাদ ও সমাজতন্ত্রের পীঠভূমিতে এই গ্রন্থ সাময়িক নিষিদ্ধ করার কারণ হিসেবে লেনিন বলেছিলেন, রাশিয়া এখনও পরিপূর্ণতা লাভ করেনি। নব্য দেশের নবীন নাগরিকদের দৈহিক বয়স নয়, মানসিক বয়স বিবেচনা করে এই সিদ্বান্ত নেয়া হয়েছিল। তারা কি হজম করতে পারবে কি পারবে না সেটা বোঝার মতো প্রাজ্ঞ ছিলেন তখনকার নেতারা। সেদেশে রবীন্দ্রনাথের ‘রাশিয়ার চিঠি’ও পড়তে হতো কর্তিত সংস্করণে। মানুষের প্রতি বিশ্বাস হারানো পাপের লেখক দার্শনিক কবি রবীন্দ্রনাথকেও ছাড় দেয়া হয়নি। ভাল কি মন্দ সে বিবেচনার আগে বলতে হবে, সত্তর বছর টিকে যাওয়া আর আমেরিকার ফাঁদে পড়া দুনিয়ার তালগোলে পথ হারানো রাশিয়া ছিল পরাশক্তি। সে শক্তি এসেছিল যোগ্য নেতৃত্বে, সে আস্থা এসেছিল এ জাতীয় ভাল-মন্দের মিশ্রণে।

ভারতের প্রথম প্রধানমন্ত্রী নেহরুও তার দেশে খোলা অর্থনীতি বা মার্কিনী আধিপত্য মেনে নেননি। গোড়ার দিকে মিশ্র তো নয়ই, ভারত ছিল প্রায় সমাজতান্ত্রিক অর্থনীতির অনুসারী। এর কারণ বলতে গিয়ে নেহরু একবার বলেছিলেনÑ সন্তান যেমন লায়েক হওয়ার আগে, বুদ্ধি বিকশিত হওয়ার পূর্বে একা রাস্তা পেরুতে পারে না, কোন জাতিও তার অভিজ্ঞতা আর মেধায় পূর্ণ হওয়ার আগে খোলা পথে হাঁটতে পারে না। যদি তা হয় তা হলে তার কপালের দুর্ভোগ ঠেকানো কঠিন। কথাটা কতটা সত্য আর বাস্তবোচিত তা এখন ভারত আর পাকিস্তানের দিকে তাকালেই চোখে পড়বে। পাকিস্তান শুরু থেকে আমেরিকার টাকায় ধনী ও পুঁজিবাদী দেশগুলোর দান-খয়রাত নিতে নিতে এমন অবস্থা তার, নিজের পা আছে কি নেই সেটাও আর বুঝতে পারে না। সত্তর এমনকি আশির দশকেও ভারতের দুরবস্থা দেখেছি। আমরা যখন দেশ-বিদেশের পুরনো-নতুন জিনসে আধুনিক আর বিলাসবহুল, ভারতীয়রা তখনও জিনসের নাম শোনেনি। আমাদের পোশাক, খাবার বা জীবনধারার কাছে তারা ছিল নিতান্ত সাদামাটা আর আটপৌঢ়ে। সে ভারত আজ কোথায়?

না, আমি কোন দেশ বা তাদের অতীত নিয়ে গালগল্প লিখতে বসিনি। এমনিতেই পিতৃদত্ত নাম ও মাতার পরিচয়ের কারণে পিঠে ভারতীয় দালালের সিল আছে। ক্রিকেটযুদ্ধে একটি সাধারণ লেখা লেখার পর আমাকে ভারতে চলে যাওয়ার জন্য উপদেশ আর আদেশ জানিয়েছেন হাজার হাজার পাঠক। দোষ এই, আমি কড়া ভাষায় হালকা জলো দেশপ্রেম বা সে নামে কাউকে গালমন্দ করিনি। লোক দেখানো দেশাত্মবোধের আবরণে আমি যদি উল্টাপাল্টা কথা লিখতাম ধন্য ধন্য পড়ে যেত। যেহেতু আমি আমাদের দেশের উজ্জ্বল ক্রিকেট ভবিতব্য নিয়ে আশাবাদী, যেহেতু মেলবোর্ন মাঠে উপস্থিত ছিলাম, সে ষড়যন্ত্রের আম্পায়ারিং দেখেছিলাম, সে কারণে সে লেখায় কিছু পরামর্শ আর নিজেদের আসন পোক্ত করার জন্য অকারণ বিবাদে না যাওয়ার কথা বলেছিলাম। মানেনি। বরং প্রতিবাদের ভাষায় হতাশ হওয়ার বিকল্প ছিল না। সামান্য ক্রিকেট নিয়ে যখন জাতি কিছু মানতে পারে না, তখন ধর্ম বা সংবেদনশীল বিষয়ে তাকে আগ্রাসী হতে দেয়ার কি আসলেই কোন কারণ আছে?

কিছুদিন থেকে দেখছি ধর্ম বিষয়ে বাড়াবাড়ি ধরনের মন্তব্য করার প্রবণতা পেয়ে বসেছে। আমি যদি কখনও আমার ফেসবুক এ্যাকাউন্ট বন্ধ করে দেই তা হবে এই কারণে। না, এমন না যে, আমাকে ঘিরে বাদানুবাদ বা তর্ক চলে। আমি তেমন বিখ্যাত কেউ নই। আমার লেখালেখিতে বা পোস্ট দেয়া ছবিতে সর্বোচ্চ যতগুলো লাইক পড়ে তা যে কোন নারীর জন্য হাস্যকর। তারা ‘আজ আমি কিছু করছি না’ লিখলেও কয়েক শ’ কমেন্ট পড়ে। আর যারা সেলিব্রেটি তাদের পোস্টে লাইক বা কমেন্টের সংখ্যা দেখলে জুকারবার্গও ভিরমি খাবেন। আমার তেমন কিছু নেই। কিন্তু যে কারণে আমি বন্ধ করব সেটা হলো আন-এডিটেড মিডিয়ার বাড়াবাড়ি। যার যা ইচ্ছা লিখতে পারা, যার যা খুশি বলার অধিকার, গণতন্ত্র বা মানবিক ব্যাপার হতে পারে, তবে তা শিল্প বা সর্বজনমান্য কিছু নয়। আরেকটা বাজে দিক হচ্ছে মানুষকে উস্কে দেয়ার প্রবণতা।

যারা বাংলাদেশ বা বাংলাদেশের রাজনীতি, ধর্ম, সংস্কৃতি ও মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে লেখেন, বলেন বা কাজকর্ম করেন তাদের টার্গেটগ্রুপ কারা? তারা কি জানেন না বাংলাদেশ কোন্ ধরনের দেশ? তাদের অজানা নয় এদেশে কত ধরনের ষড়যন্ত্র আর নোংরামি চলে। রাজনীতি, ধর্ম নিয়ে কিভাবে খেলে তাও জানেন তারা। তারপরও ধর্ম আর দল নিয়ে উত্তেজক কথাবার্তা চলছেই। এ যেন প্রতিশোধ বা প্রতিহিংসার প্রতিযোগিতা। এদিকে বেশ কয়েকটা লাশও পড়েছে দেশে। তবু কেউ থামেনি। যারা হৈ হৈ করে বলবেন মুক্তবুদ্ধি কি ডরাবে নাকি? না মুখ, কলম বন্ধ করে বসে থাকবে? তাদের বলি, বন্ধ করতে বলছে না কেউ। বন্ধ করার দরকারও নেই। কিন্তু জাতি ও দেশকে প্রস্তুত করার কাজটা কি আপনারা করেছেন, না অন্য কেউ করছে? যে রাজনীতি একদিন দেশে প্রগতির জন্য কাজ করত, অসাম্প্রদায়িকতা আর আধুনিকতার জন্য লড়াই করত, তার মাথায় টুপি হাতে দস্তানা আর পায়ে বেড়ি। সে জায়গায় কোন দল বা শক্তি আর আগের মতো দৃঢ় নেই। সবাই সমঝোতা আর আপোসের ভাগিদার। সেটা জেনেও যখন প্রবীণ মানুষেরা ফাঁদে পা দেন বা আমাদের সবাইকে বিপদে ফেলেন তখন বুঝি জাতি তো বটেই, আমরা কেউই আসলে প্রস্তুত না। আর একটা কথা, ইসলামের দোষত্রুটি আর নিন্দা-সমালোচনাই কি আধুনিকতা? বিশ্বব্যাপী বিপাকে পড়া এর বিরুদ্ধে এখন বলা মানে নিজের পায়ে নিজে কুড়াল মারা। কারণ এটা সমালোচনা বা আলোচনার সময় না। ইসলামে বিশ্বাসী সত্যিকার ধার্মিক বন্ধুদের সংহত হওয়ার সময়। বাঙালী মুসলমানের চোখ-কান খোলা আর মেধা শাণানোর পরিবর্তে তাকে এভাবে আক্রমণ করলে কি হতে পারে তা জানার পরও আমাদের অগ্রজ ও প্রবীণরা কেন তা মানেন না? এটা কি এক ধরনের রোগ না প্ররোচনা?

সাধারণ মানুষের মনে আঘাত দেয়া ধর্ম বিষয়ে কথা বলার ভেতর চটকদারি আছে; কিন্তু শান্তি নেই। দুনিয়ার সব ধর্মে ভালমন্দ, সাদাকালো আছে, থাকবে। আমি অগ্রজ ও প্রবীণদের অনুরোধ করি, দেশ, জাতি ও তারুণ্যকে তৈরি করুন। সেটা জরুরী। না হলে আপনার-আমার লেখা তো দূরের কথা, নাম মনে রাখার লোকও থাকবে না। আমাদের বিশ্বাস-অবিশ্বাস লোক দেখানো প্রগতির চাইতে এটা জরুরী। যদি সবাই শোনেন দেশের মঙ্গল হতে বাধ্য।

এখন যোগ হয়েছে হঠকারি বাতচিত আর নিজেদের কলহ। এগুলো বন্ধ করে দেশ শাসন ও উন্নয়নে মনোযোগী হতে পারার বিকল্প নেই। খন্দকার মোশতাক, জাসদ-বাসদ বা বিএনপি-জামায়াত কেউই সময়ের কাছে ছাড় পায়নি। এমনকি আওয়ামী লীগও না। ফলে আমরা চাই তর্কহীন কাজের কথা। যেসব কথা ও কাজে ঝামেলা বাড়বে বা আমাদের জাতির ভবিষ্যত বিঘিœত হবে তার চেয়ে জরুরী সামনে এগুনো। সেটা কি এবারও বিঘিœত হবে? বিশেষ করে এত উন্নয়ন ও অগ্রগতির পর?

প্রকাশিত : ৬ সেপ্টেম্বর ২০১৫

০৬/০৯/২০১৫ তারিখের খবরের জন্য এখানে ক্লিক করুন


শীর্ষ সংবাদ: