১৯ নভেম্বর ২০১৭,   ঢাকা, বাংলাদেশ   শেষ আপডেট এই মাত্র  
Login   Register        
ADS

শিশু আইলানের ছবি এবং আমাদের মুক্তিযুদ্ধের শরণার্থীদের ছবি


গত তিনটি বছর ধরে সিরিয়ায় ভয়াবহ গৃহযুদ্ধ চলছে। সেখানকার মানুষের দুর্দশা ও দুর্গতির কোন সংজ্ঞা দিয়ে বর্ণনা করা যাবে না। তিন বছর আগে আইলান নামে ছেলে শিশুটি জন্মলাভ করে কুর্দি পরিবারে। সে ও তার বড় ভাই গালিবকে নিয়ে আবদুল্লাহ কুর্দি ও স্ত্রী রেহান যুদ্ধ পরিস্থিতিতেও মোটামুটি জীবন চালাচ্ছিল। কিন্তু আবার, সারাবিশ্ব একটি ছবি দেখে আঁতকে ওঠে। সোশ্যাল মিডিয়ায় টর্নেডো বয়ে যায়। সমুদ্র তীরে বিচে মৃত লাশটি তিন বছর বয়সী শিশু আইলানের। যে নৌকায় করে অন্য আরও কয়েকটি পরিবারের সঙ্গে কুর্দি পরিবার ভূমধ্যসাগর পাড়ি দিচ্ছিল, নৌকাটি ডুবে যায়। কুর্দি পরিবারের দুই শিশু ও শিশুদের মা রেহান তলিয়ে যায়। শুধু আবদুল্লাহ কুর্দি বেঁচে যায়। ছোট্ট শিশু আইলানের লাশটি তীরে এসে ভিড়েছে। মা ও গালিবের লাশও এসেছে। মৃত্যুর পর আইলানের লাশ তুরস্কের পুলিশ কোলে করে উদ্ধার করে। ভাল একটি কফিনের ব্যবস্থা হয়। তার এবং ভাই ও মার দাফন প্রক্রিয়ার হাজার হাজার মানুষ উপস্থিত হয়। উল্লেখ্য, আবদুল্লাহর বোন, টিমা কুর্দি, পেশায় হেয়ার ড্রেসার কানাডার ভ্যাঙ্কুভারে থাকে। চার হাজার ডলার পাঠিয়েছিল নৌকায় ভূমধ্যসাগর পাড়ি দেয়ার খরচ বাবদ। ভদ্রমহিলা তার ভাইদের পরিবারকে কানাডায় আনার চেষ্টাও চালাচ্ছিল। বেঁচে থাকার জন্য এই কুর্দি পরিবার এর আগেও কয়েকবার চেষ্টা করেছে। কিন্তু যখন চেষ্টাটা সফল হতে যাচ্ছিল, তখনই খবরের শিরোনাম হয়ে গেল কুর্দি পরিবার। কি নিয়তি! এই একটি মর্মান্তিক ঘটনাই বলে দিচ্ছে আরও হাজারটা ঘটনা প্রতিনিয়ত ঘটছে সিরিয়া ও পার্শ্ববর্তী দেশগুলোতে। আরও মর্মান্তিক ছবি পত্র-পত্রিকায় এসেছে। সামুদ্রিক মাছের মতো মানুষের লাশ ভেসে আসছে এবং তীরে এসে ঠেকছে।

ঠিক একই ব্যাপার ঘটেছিল ১৯৭১ সালে আমাদের জন্মভূমি, বাংলাদেশে। বর্তমান প্রজন্মের প্রতিটি বাঙালীর জানা উচিতÑ বাঙালীদের লাশও নদীতে ভেসেছে। ডাঙ্গায় এসে ঠেকেছে। শরণার্থীরা পথে পথে যেতে যেতে লাশ হয়ে গিয়েছে। শিশু মরেছে, প্রাপ্তবয়স্করা মরেছে, বৃদ্ধবৃদ্ধারা মরেছে। যারা বেঁচে গিয়ে ভারতে আশ্রয় নিয়েছে, তাদের সে কি মানবেতর জীবন কাটাতে হয়েছে। এক কোটি মানুষ ভারতে শরণার্থী হয়েছিল। তখন সোশ্যাল মিডিয়া ছিল না। সাধারণ লোকের হাতে ক্যামেরা ছিল না। কত না মর্মান্তিক ঘটনা ঘটেছে! সব ছবি তোলা হয়নি। তারপরও প্রফেশনাল ফটোগ্রাফাররা যেসব ছবি তুলেছে, তা থেকেই বোঝা যায় কত বড় একটা জেনোসাইড ঘটেছিল ১৯৭১ সালে বাংলাদেশে মুক্তিযুদ্ধের সময়। বাংলাদেশের সেই সময়কার মানুষরা আর পঞ্চাশ বছর পর থাকবে না। তবে প্রজন্ম কিংবা পরবর্তী প্রজন্মকে আমাদের সেই ইতিহাসকে ধরে রাখতে হবে।

৪৪ বছর আগে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে ত্রিশ লাখ মানুষ মারা গেল। তখন যারা বেঁচে গিয়েছিল, তারা কত দুঃখ-কষ্টের ভেতর দিয়ে জীবনটা ধরে রেখেছে। কিন্তু এই ৪৪ বছরেও বাংলাদেশে রাজনৈতিক মারামারি হানাহানি অনেক হয়েছে। অনেক সুস্থ মৃত্যু ঘটেছে। আর সুস্থ মৃত্যু নয়, স্বাভাবিক মৃত্যু হোক– সেটাই সবার কাম্য হওয়া উচিত।

লেখক : আমেরিকান প্রবাসী অধ্যাপক, মিসিসিপি