২০ নভেম্বর ২০১৭,   ঢাকা, বাংলাদেশ   শেষ আপডেট এই মাত্র  
Login   Register        
ADS

ছাত্র সন্ত্রাসী, রাজনীতি ও বিশ্ববিদ্যালয়


সরকারী দলের ছাত্রগুণ্ডা কর্তৃক শিক্ষক পেটানো এটি প্রথম কোন ঘটনা নয়। এই ঐতিহ্য আমরা সৃষ্টি করেছি আইয়ুব-মোনায়েম আমলে। স্বাধীন হওয়ার পর ভেবেছিলাম এ ধরনের কুৎসিত ঘটনা আর ঘটবে না কিন্তু ঘটেছে- গতকালের পর আজ পড়ুন শেষ কিস্তি...

অন্যান্য প্রতিষ্ঠান থেকে বিশ্ববিদ্যালয়ে সুযোগ-সুবিধা সবচেয়ে কম। যারা শিক্ষক হিসেবে নিয়োগ পেয়েছেন গত দু’দশক তাদের সংখ্যাগরিষ্ঠ অংশ নিম্ন-মধ্যবিত্ত/মধ্যবিত্ত পরিবারের; যেখানে দিন এনে দিনে খেতে হয় সেখানে সামান্য সুযোগ-সুবিধার জন্য তরুণ শিক্ষকরা মরিয়া হয়ে ওঠেন। বিশ্ববিদ্যালয় তৈরি হচ্ছে বটে, কিন্তু ভৌত অবকাঠামো প্রায় নেই বিশেষ করে গবেষণার। বিশ্ববিদ্যালয়ে গবেষণা যেহেতু একটি মূল বিষয়, সেহেতু গবেষণায় কোন অর্থ বরাদ্দ না থাকলে কিভাবে চলবে? আমলাতন্ত্রের সঙ্গে দ্বন্দ্বের সূত্রপাত সে কারণে। আমলাতন্ত্রে একজন লে. কর্নেল বা একজন যুগ্মসচিব যে সুবিধা পান, বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন অধ্যাপকও তা পান না। তাছাড়া জনসংখ্যার কারণে বিশ্ববিদ্যালয়গুলো এত চাপের মধ্যে আছে যে, বিশেষ করে পুরনো বিশ্ববিদ্যালয়গুলো, যা বলার নয়।

এর মধ্যে, আশ্চর্য হলেও ঠিক যে, বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে অনুপ্রবেশ করেছে আঞ্চলিকতা; বিশেষ করে চট্টগ্রাম এ দিক থেকে বিশেষ খ্যাতি অর্জন করেছে, শাহজালালও। স্বাধীন হওয়ার এত বছর পরও জাতীয় জীবনে আঞ্চলিকতা একটি প্রধান বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। এই মনোভাব আগে তেমন ছিল না। ভোটের ক্ষেত্রেও এই আঞ্চলিকতা প্রাধান্য পায়, স্বার্থের ক্ষেত্রেও। আমলাতন্ত্রে আমরা যেমন শুনি, শেখ হাসিনার সময় গোপালগঞ্জের মানুষজন বিভিন্ন নিয়োগের ক্ষেত্রে অগ্রাধিকার পায়, খালেদার সময় বগুড়া। এ এক অদ্ভুত বিষয়। এক বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পাস করা ছাত্র অন্য বিশ্ববিদ্যালয়ে সাধারণত নিয়োগ পায় না।

গত কয়েক বছর ধরে দেখা যাচ্ছে, সিলেটের শাহজালাল, সাভারে জাহাঙ্গীরনগর, ঢাকার শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় ও চট্টগ্রামে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়েই ঝামেলা হচ্ছে বেশি। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক আনোয়ার হোসেনকে চলে আসতে হলো তার কারণ সঙ্কীর্ণ আঞ্চলিকতা। অর্থাৎ জাহাঙ্গীরনগরে, জাহাঙ্গীরনগরের শিক্ষক উপাচার্য হবেন। চট্টগ্রামে, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় ও চট্টগ্রামের মানুষ ছাড়া উপাচার্য নিয়োগ করা যায় না।

প্রত্যেকটি বিশ্ববিদ্যালয়ে উপাচার্যরা বিপাকে পড়েন টেন্ডার ও নিয়োগ নিয়ে। সরকারী দলের ছাত্ররা প্রায় ক্ষেত্রে এতে প্রাধান্য বিস্তার করে এবং সেগুলোর জোন ভাগ করা থাকে। এমনকি বিশ্ববিদ্যালয়ের অনেক নিয়োগের ক্ষেত্রেও আজকাল ছাত্ররা হস্তক্ষেপ করার সাহস পায়। এর প্রধান কারণ, ক্ষমতাসীন রাজনীতিবিদরা এর সঙ্গে যুক্ত। যেমন- ধরা যাক, শাহবাগ থেকে নিমতলী যতগুলো প্রতিষ্ঠান আছে তার প্রতিটির টেন্ডার একজন নিয়ন্ত্রণ করে। তার সঙ্গে যুক্ত ক্ষমতাবানদের একজন। ফলে তার বিরুদ্ধে কথা বলার সাহস কেউ পায় না। সামরিক আমল থেকে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে কোন ছাত্র সংসদ নেই। রাজনীতির একমাত্র ধারক ক্ষমতাসীনরা। অন্যরা রাজনীতিতে নামলে ক্ষমতাসীন দল ও পুলিশ তাদের পিটিয়ে লম্বা করে দেয়। ধরা যাক, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কথা। ছাত্রদল বা অন্য কেউ ঝুঁকি না নিয়ে নামতে পারবে? একইভাবে খালেদার আমলে ছাত্রলীগ বা অন্য কেউ নামতে পেরেছিল? ফলে, এই একচ্ছত্র আধিপত্য থাকায় ক্ষমতাসীন দলের মধ্যে অন্তর্দ্বন্দ্ব লেগে যায়, ঘটে সংঘর্ষ। এর জন্য খবরে বেশি আসে সেই তিন বিশ্ববিদ্যালয়েরই কথা।

এ পটভূমিতে, আজকাল ছাত্ররা শিক্ষকদের ওপর চড়াও হতে পারছে। ভিসিকে ক্ষমতাসীন ছাত্রদের ডিকট্যাট অনুযায়ী অনেক সিদ্ধান্ত নিতে হয় বা যোগাযোগ রাখতে হয়। এ মন্তব্য সব উপাচার্য অস্বীকার করবেন। উপাচার্য না থাকলে স্বীকার করবেন। সেখানে, অন্য শিক্ষকদের স্বার্থের হানি ঘটলেই দ্বন্দ্বের সূত্রপাত্র হয়। সরকারী তদবিরে যিনি নিযুক্ত হন তখন স্বাভাবিকভাবেই তিনি ক্ষমতাসীন ছাত্রদের ওপর নির্ভরশীল হন।

বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে সবচেয়ে খারাপ কাজ হচ্ছে, ছাত্রদের নিজেদের অন্তর্দ্বন্দ্বে ব্যবহার করা। অধিকাংশ ক্ষেত্রে এটি হয় না, কিন্তু হয়। হলেই ছাত্র-শিক্ষক দ্বন্দ্ব শুরু হয়।

শাহজালালে মূল বিষয় কী, তা অনেকেরই ঠিক জানা নেই। কিন্তু এটিতো সত্য, ছাত্রলীগই তা ঘটিয়েছে। প্রতিটি বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্রলীগই সব ঘটনা সৃষ্টি করছে। বিএনপি আমলে ছাত্রদল। কেন করছে বা করার সাহস পাচ্ছে তার পটভূমি আগেই উল্লেখ করেছি।

দুই.

শাহজালালে শিক্ষকদের অন্তর্দ্বন্দ্ব বেশকিছু দিনের। কারণ, সেখানে যারা নিয়োগ পাচ্ছেন তারা ‘বহিরাগত’। সেখানে একবার ‘অন্তর্গত’ নিয়োগ দিয়ে দেখা যেতে পারে। কিন্তু থাকুক সে প্রসঙ্গ। আমরা শিক্ষকদের ওপর হামলায় ফিরে যাই।

শিক্ষকদের বাদ-প্রতিবাদ চলছে, চলতেই পারে, তা মেটানোর দায়িত্ব প্রাথমিকভাবে শিক্ষকদের ওপরই বর্তায়। সেখানে, ক্ষমতাসীনদের ছাত্র সংগঠনের কোন এখতিয়ার নেই নাক গলাবার। ছাত্ররা চড়াও হয় কখন? অধিকাংশ ক্ষেত্রে যদি তাদের ইন্ধন বা উৎসাহ দেয়া হয়। শাহজালালে যারা তাদের উৎসাহ দিয়েছিল তাদের বিষয়টিও তদন্তের আওতায় আনা উচিত এবং শাস্তি তাদেরও হওয়া উচিত।

এ ধরনের ঘটনার দায় অন্তিমে ক্ষমতাসীন দলের ওপরই বর্তায় এবং সবশেষে শেখ হাসিনার ওপর। কেন্দ্রীভূত শাসনের কারণে, সবকিছুর দায়িত্বও তাঁর, চাপিয়ে দেয়ার সুযোগও থাকে তাঁর ওপর। এ ধরনের ঘটনা যে হঠাৎ ঘটল তা তো নয়, নিয়মিত ঘটছে। প্রশ্ন জাগতেই পারে এবং সেটি স্বাভাবিক যে, কেন সরকার ছাত্র/যুবলীগকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারছে না? এর কারণ, নেতৃত্ব নিশ্চয় ভাগ-বাটোয়ারায় জড়িয়ে পড়ছে। তা’হলে এই নেতৃত্ব যেন নেতৃত্বসুলভ ব্যবহার করে তা দেখার দায়িত্ব কার?

মনস্তাত্ত্বিকভাবে শাসক দলের ভেতর একটি চিন্তা বোধহয় কাজ করে। রাজনীতির ভিত্তি হয়ে দাঁড়িয়েছে এখন ভায়োলেন্স। এখানে আদর্শের বিষয়টি গৌণ। আদর্শের ভাবটা এখনও রাখতে হয় কিন্তু উদ্দেশ্য হচ্ছে অর্থ/প্রভাবের মালিক হওয়া। এখন আর আদর্শের ঈমানী ভিত্তি নেই যা আগে ছিল। এখন সেøাগানের মূল ভিত্তি চাওয়া-পাওয়া। সেøাগানের ভিত্তি বিশ্বাস নয়। বঙ্গবন্ধুর নামে যে নিয়ত সেøাগান দেয়া হয় এবং যারা দেয় আদৌ তারা জাতির পিতার নামটি শুদ্ধভাবে লিখতে পারবে কিনা সন্দেহ। শেখ হাসিনা কতভাবে তাদের অসমাপ্ত আত্মজীবনী পড়ার উপদেশ দিয়েছেন। দশভাগও বইটির প্রচ্ছদ দেখেছে কিনা সন্দেহ। সে কারণে, শাহজালালে ‘জয় বাংলা’ বলে শিক্ষকদের ওপর তারা ঝাঁপিয়ে পড়েছে। তাদের ধারণা হয়েছে ‘জয় বাংলা’ বলেই বোধহয় শিক্ষকদের ওপর বা প্রতিপক্ষের ওপর চড়াও হতে হয়। যাক যা বলছিলাম, ক্ষমতাসীনদের একটি ভয় থাকে। বিরোধীরা যদি রাস্তায় নামে তা’হলে ঠেকাবে কে? তখন তো এই ছাত্রলীগ/যুবলীগ বা ছাত্রদল/যুবদলই লাগবে। জামায়াত যেটা করেছিল ১৯৭১ সালে, পুরো ছাত্রশিবিরকে আলবদরে রূপান্তরিত করে। সে জন্য যে ওষুুধে রোগ সারবে সে ওষুধ তাদের দেয়া হয় না।

আমার এক সাংবাদিক বন্ধু বলছিলেন, বর্তমান প্রধানমন্ত্রী এক পদ্মা সেতু বানিয়ে যা অর্জন করেন, ছাত্রলীগ তা এক নিমিষেই নস্যাত করে দেয়। কথাটা একদিক দিয়ে ঠিক, ক্ষমতায় যারা থাকেন তারা বুঝতে অক্ষম। জাফর ইকবাল ও ইয়াসমিন হকের অবদান আছে শাহজালাল বিশ্ববিদ্যালয় গড়ে তোলায়, তরুণদের আইডল জাফর ইকবাল, বৃহত্তর সমাজে তার একটি ইতিবাচক ভাবমূর্তি আছে। অধিকাংশ মন্ত্রী, নেতার নাম অধিকাংশ মানুষই জানেন না। তাদের শ্রদ্ধা-ভক্তিও করেন না। সত্যি বলতে কী রাজনীতিবিদদের মধ্যে শেখ হাসিনা ছাড়া অন্য কারও প্রতি মানুষের তেমন শ্রদ্ধা-ভক্তি নেই। এখন জাফর ইকবাল বা তার স্ত্রী যদি লাঞ্ছিত হন তখন সমাজে কিন্তু প্রবল প্রতিক্রিয়া হয়। বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষকদের ফরাসউদ্দিন পে-কমিশনে যত অকিঞ্চিতকর করে দেখানো হোক না কেন, একজন আমলার ওপর হাত তুললে সমাজে প্রতিক্রিয়া হয় না। কারণ দেখা গেছে, আমলারা অপকর্ম করলে তার সহকর্মীরা তাকে রক্ষা করে। সরকারের অবস্থা দেখুন, এতজন সচিব জালিয়াতি করে মুক্তিযুদ্ধ সনদ নিয়েছে, সোনা চুরি করেছে মুক্তিযুদ্ধ সম্মাননারÑ কিছু হয়েছে? কিছু হয়নি। প্রমাণ হয়েছে চোরে চোরে মাসতুতো ভাই। পৃথিবীর কোন দেশে জালিয়াতি করে কেউ পদে থাকতে পারে না। কিন্তু বাংলাদেশে পারে। একজন শিক্ষক সামান্য অপকর্ম করলে সঙ্গে সঙ্গে তাকে শাস্তি দেয়া হয়। আমি জানি, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ে অনুমতি না নিয়ে বিদেশ যাওয়ায় শিক্ষকের পদাবনতি হয়েছে। আমলাদের ক্ষেত্রে সচিব সরকারী পাসপোর্ট না নিয়ে গৃহিণী পাসপোর্ট নিয়ে বিদেশ যাওয়াও ধরা পড়ায় কিছু হয়নি। এসব পার্থক্য এখনও আছে দেখে শিক্ষকদের অবমাননা এখনও সমাজ মেনে নেয় না। জাফর ইকবাল দম্পতিকে লাঞ্ছিত করায় ছাত্রলীগের যা ক্ষতি হয়েছে এবং ছাত্রলীগ নেতারা যেভাবে ডিফেন্ড করেছেন অপরাধীদের, তাদের পক্ষে ছাত্রলীগের ভাবমূর্তি উদ্ধার করা মুশকিল হয়ে পড়বে।

ছাত্রলীগের/যুবলীগের ধারাবাহিক উচ্ছৃঙ্খলতা এখনও নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব হয়নি। প্রতিটি ঘটনার পর সবাই প্রধানমন্ত্রীর দিকে তাকিয়ে থাকে। প্রধানমন্ত্রী তাঁর প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেছেন পরদিন। আগাছা উপড়ে ফেলতে হবে। কিন্তু কে উপড়াবে তা বলেননি। অপরাধীদের সাময়িকভাবে দল থেকে বহিষ্কার করা হয়েছে যা কোন শাস্তিই নয়। এখনও কেউ গ্রেফতার হয়েছে কিনা জানা যায়নি।

তিন.

এই লেখা শেষ করার সময় দেখি অধ্যাপক জাফর ইকবাল একটি বিবৃতি দিয়েছেন। ছাত্রলীগ যে চারজনকে বহিষ্কার করেছে তাকে তিনি ‘এক রকম অন্যায়’ বলে অভিহিত করেছেন। তিনি বলেন, ‘শিক্ষকদের ওপর কে হামলা করেছে? ছাত্রলীগের ছেলেরা? না। এরা তো ছাত্র, আমাদের ছাত্র। এত কম বয়সী ছেলে, এরা কী বোঝে? ওদের আপনি যা-ই বোঝাবেন, তাই বুঝবে। কাজেই আমি যখন দেখলাম যে, তিনজন আর চারজনকে বহিষ্কার করা হয়েছে; এখন আমার লিটারালি ওদের জন্য মায়া লাগছে। আহা বেচারারা!’ তিনি আরও বলেন, ‘এই বাচ্চা ছেলেগুলোকে মিসগাইডেড করে পাঠিয়ে দিয়েছে, এখন তারাই বিপদে পড়েছে। ছাত্রত্ব বাতিল হবে, শাস্তি হবে। ওরা কি দোষ করেছে? কাজেই এখন আমার খুব খারাপ লাগছে। এই ছেলেদের শাস্তি দেয়াটা এক ধরনের অন্যায়। যারা তাদের পাঠিয়েছেন তাদেরকে শাস্তি দিন।’ এসবের জন্য শাবিপ্রবির ভিসিকে দায়ী করে তার অপসারণ দাবি করেন জাফর ইকবাল। [প্রথমআলো, ৩.৯.১৫]

প্রচ- আবেগ নিয়ে তিনি শিক্ষকরা লাঞ্ছিত হওয়ার দিন বলেছিলেন, গলায় দড়ি দিয়ে তার মরতে ইচ্ছে করছে কারণ, তার শিক্ষকতা জীবনে এটি তিনি কল্পনাও করেননি। ইয়াসমিন হকও ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেছিলেন। তারা দু’জন বৃষ্টিতে একা একা বসে প্রতিবাদও করেছেন যা টিভিতে দেখানো হয়েছে। এতে সাধারণ মানুষের মনে তীব্র প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হয়েছিল।

একই আবেগ নিয়ে তিনি পরদিন ওপরের বিবৃতিটি দিয়েছেন। এই পরস্পরবিরোধী বক্তৃতায়ও তীব্র প্রতিক্রিয়া হয়েছে। শুধু তাই নয়, বিভ্রান্তিরও সৃষ্টি হয়েছে। অনেকেই জিজ্ঞেস করেছেন, আগে তা’হলে তিনি কেন ছাত্রদের অভিযুক্ত করে বিবৃতি দিয়েছিলেন? এখন কেন তিনি ভিসি পক্ষকে দোষারোপ করছেন? তার এই বিবৃতি ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় নেতৃত্বকেও বিপাকে ফেলেছে। আমরা কিন্তু মনে করি, ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব ঠিক সিদ্ধান্তই নিয়েছেন। কারণ, মূল প্রশ্ন শিক্ষকদের অন্তর্দ্বন্দ্ব বা বিরোধ নয়, মূল প্রশ্ন একজন শিক্ষকের গায়ে হাত তোলার অধিকার ছাত্রদের আছে কিনা? উত্তর হলো, নেই।

জাফর ইকবালের বক্তব্য যারা তাদের প্ররোচিত করেছে তাদের শাস্তি হওয়া দরকার। এটি অনুমান। অভিযুক্ত ছাত্ররা এ কথা স্বীকার না করলে এটি অনুমানই থাকবে। তার চেয়ে বড় কথা, প্ররোচনা দিলেই প্ররোচিত হতে হবে? ধরা যাক, ভিসি পক্ষ জাফর ইকবালদের ‘শায়েস্তা’ করার জন্য এসব ছাত্রকে প্ররোচনা দিয়েছিলেন। তা’হলেই কি এই গর্হিত কাজ করতে হবে? এই যুক্তি আজ অচল। আমরা আলবদরদের শাস্তি চাই কেন? তারা তো অনায়াসে এ যুক্তি দিতে পারে তাদের নেতারা লুটপাট খুন জখম করতে বলেছিল। এই যুক্তি পরে অধ্যাত্মবাদে পরিণত হতে পারে। যেমন বলেছিলেন বিএনপি নেতা বায়ু সেনা আলতাফ হোসেন, একটি শিশু গুলিতে নিহত হওয়ার পর যে, আল্লাহর মাল আল্লাহ নিয়ে গেছেন। অপকর্ম যে করে, তাকে কোন না কোন শাস্তি পেতেই হবে। না হলে অপকর্ম রোধ করা যায় না। অধ্যাপক ইকবাল এতো আবেগী না হলে হয়ত এ মন্তব্য করতেন না। শুনেছি, যোগাযোগ মাধ্যমেও নাকি এ নিয়ে নানা তীর্যক মন্তব্য করা হচ্ছে। এর কারণ একটিই, সমাজ কখনও অপকর্ম প্রশ্রয় দিতে চায় না।

জাফর ইকবালের মন্তব্য, শিক্ষকদের তীব্র অন্তর্বিরোধকেই তুলে ধরে মাত্র।

জাফর ইকবাল আরও বলেছেন, প্রধানমন্ত্রী যাদের আগাছা বলছেন তার কাছে পাঠিয়ে দিলে তিনি তা ফুলের বাগান করে দেবেন। এই সন্ত মনোভাব জাফর ইকবালের আছে, সেটি প্রশংসনীয় কিন্তু এটি নিতান্ত অবাস্তব। এসব ছেলে তো শাহজালালে দীর্ঘদিন নানা কর্মকা- করছে কিছু করতে পেরেছেন তিনি? জামায়াতী-বিএনপি করা ছাত্ররাও তো তার ছাত্র। এতদিনে একটিকেও কি তিনি মুক্তবুদ্ধির ছাত্রতে পরিণত করতে পেরেছেন? যিশুখ্রিস্ট সন্ত হয়েও অপকর্ম ঠেকাতে পারেননি।

এখন জাফর ইকবাল বা ইয়াসমিন হক যাই বলুন না কেন, ঘটনা তাতে বদলাবে না। তাদের ও শিক্ষকদের লাঞ্ছনা আমরা অবশ্যই প্রতিবাদ ও নিন্দা করি। ঐ ধরনের মনোভাব অপকর্ম প্রশ্রয় দেয়ার নামান্তর মাত্র। বিশ্ববিদ্যালয়ে যারা পড়ছে তাদের শিশুত্ব ও কৈশোরত্ব কেটে গেছে। তারা এখন তরুণ। সুতরাং, দায়দায়িত্ব এখন না নিলে কবে নেবে? আমরা প্রায়ই দেখি, ছাত্ররা এ ধরনের অপকর্ম করলে সংগঠন থেকে তাদের বহিষ্কার করা হয় মাত্র। এটি কোন শাস্তি নয়। তাদের বিরুদ্ধে মামলা হওয়াও উচিত। এতে সমাজের ক্ষোভ কমবে।

প্রধানমন্ত্রী যথাসময়ে উচিত কথা বলেছেন। ছাত্রলীগ-যুবলীগ থেকে এসব আগাছা উপড়ে না ফেললে দল ও সরকার ক্ষতির সম্মুখীন হবে। ছাত্রলীগ বা যুবলীগের এক বা দুই ভাগ এসব অপকর্মের সঙ্গে যুক্ত। বাকি ৯৮ বা ৯৯ ভাগ কেন এদের দায় বহন করবে?

এর আগেও প্রধানমন্ত্রী এসব ক্ষেত্রে ব্যবস্থা নিয়েছেন যা নতুন নতুন ঘটনার ক্ষেত্রে আমরা উল্লেখ করি না। অপকর্মের কথা বার বার বলা হয় কিন্তু এর বিরুদ্ধে যে ব্যবস্থা নেয়া হয় তা বলা হয় না। যেমন জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ে বিশ্বজিৎ হত্যার কথা বার বার বলি, টিভিতে বার বার তা দেখানো হয়েছে কিন্তু অভিযুক্ত আটজনকে যে ফাঁসির দ- দেয়া হয়েছে বলতে ভুলে যাই। এতে মিডিয়া বা আমরা এ কথাই বলতে চাই সরকার কোন ব্যবস্থা নেয় না।

নানা ঘটনায় এ রকম গ্রেফতার ও ক্রসফায়ারে মারা গেছে। এক হিসাবে দেখা গেছে, গত এক বছরে প্রায় শ’খানেক ছাত্রলীগ কর্মীকে বহিষ্কার করা হয়েছে। তবে আবারও বলছি শুধু বহিষ্কার নয়, তাদের বিচারের আওতায় আনতে হবে।

এই সব পরিণতি যদি মিডিয়ায় সমভাবে আসত তা হলে এই উচ্ছৃঙ্খলরা একটি বার্তা পেত।

আমরা মনে করি এ সব ক্ষেত্রে শৈথিল্য ঝেড়ে পালের গোদাদের আজীবনের জন্য সব বিশ্ববিদ্যালয়ে অযোগ্য ঘোষণা করা উচিত। আর তদন্তে যদি প্রমাণিত হয় কোন শিক্ষক এতে জড়িত তাকেও এমন শাস্তি দেয়া উচিত। একটা জায়গায় আমাদের দাঁড়াতে হবে তাৎক্ষণিক লাভ/ক্ষতি বিচার না করে।

সাদা-কালোর অবস্থান ভাল। ধূসর অবস্থান গ্রহণযোগ্য নয়। এই অবস্থান সাধারণত নেন রাজনীতিবিদরা। আমলারা। শিক্ষকদের ধূসর অবস্থান নেয়া সাজে না

সম্পর্কিত: