২০ নভেম্বর ২০১৭,   ঢাকা, বাংলাদেশ   শেষ আপডেট ৮ ঘন্টা পূর্বে  
Login   Register        
ADS

অসাম্প্রদায়িক শক্তির ঐক্য প্রয়োজন


বাংলাদেশ এখন একটা ক্রান্তিকাল অতিক্রম করছে। এই ক্রান্তিকালের দুটি রেখা বা জায়গা সমানভাবে এগোচ্ছে। প্রথমত অর্থনৈতিক উন্নয়ন এবং দ্বিতীয়ত বাংলাদেশকে রাজনৈতিকভাবে মুক্তিযুদ্ধের দর্শনের ওপর প্রতিষ্ঠিত করার সংগ্রাম, যেখানে রাজনীতির সব পক্ষ হবে মুক্তিযুদ্ধের দর্শনে বিশ্বাসী। তখন রাজনীতি হবে দেশের ও মানুষের জীবনমানের উন্নয়ন নিয়ে। শুরুতেই অর্থনৈতিক ক্রান্তিকালের স্বরূপ বর্ণনায় দেশ-বিদেশের প্রাজ্ঞ অর্থনীতিবিদ এবং এতদসংশ্লিষ্ট আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর বাংলাদেশ সম্পর্কে কিছু মূল্যায়ন ও পর্যবেক্ষণ তুলে ধরছি। মধ্য আয়ের দেশে উন্নীত হওয়ার প্রাথমিক স্তর নিম্ন মধ্য আয়ের দেশ হিসেবে বিশ্বব্যাংক এ বছর বাংলাদেশকে স্বীকৃতি দিয়েছে। ব্রিকসের (ব্রাজিল, রাশিয়া, ইন্ডিয়া, চীন, দক্ষিণ আফ্রিকা) পাঁচটি দেশের পরবর্তী যে ১১ দেশকে সম্ভাবনাময় উন্নয়নের তালিকায় রাখা হয়েছে, তার মধ্যে অন্যতম বাংলাদেশ (গোল্ডম্যান এ্যান্ড স্যাকস্্)। সামাজিক সূচকের উন্নয়ন সম্পর্কে বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে তুলনামূলক একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে বিশ্বব্যাংক ২০১৪ সালে, যেটি প্রথম আলোতে প্রকাশিত হয় ১১ নবেম্বর, ২০১৪। এই প্রতিবেদনে দেখা যায়, গড় আয়ু, নারী শিক্ষা, শিশু স্বাস্থ্য, জন্মহার ইত্যাদিসহ ৯টি সামাজিক সূচকে ভারত থেকে বাংলাদেশ এগিয়ে আছে। বিশ্বব্যাংকের প্রতিবেদনে উল্লিখিত সামাজিক সূচকসহ অর্থনৈতিক ক্ষেত্রেও যেমন, রফতানি, রেমিটেন্স, বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ এবং প্রবৃদ্ধির হার, সব খাতে পাকিস্তানকে অনেক পেছনে ফেলে বাংলাদেশের বিস্ময়কর উত্থান ঘটেছে (বাংলাদেশ প্রতিদিন, ১৬ ডিসেম্বর-২০১৪)।

ধর্মাশ্রয়ী মৌলবাদী রাষ্ট্রীয় দর্শনের কারণেই পাকিস্তান ক্রমশ অতল গহ্বরের দিকে ধাবিত হচ্ছে বলে অভিমত ব্যক্ত করেছেন অর্থনৈতিক বিশেষজ্ঞরা। বিশ্বব্যাংক ও আইএমএফ কর্তৃক প্রকাশিত গত জুন মাসের প্রতিবেদনে দেখা যায়, অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি সূচকে ২০১৩ সাল থেকে ২০১৪ সালে, এক বছরে বাংলাদেশ ১৪ ধাপ এগিয়েছে, একই সময়ে ভারত এগিয়েছে মাত্র তিন ধাপ। প্রকাশিত রিপোর্ট অনুযায়ী ২০১৩ সালে বিশ্ব অর্থনীতিতে বাংলাদেশের অবস্থান ছিল ৫৮তম, যা ২০১৪ সালে হয়েছে ৪৪তম। ২০০০ সালে বাংলাদেশে দারিদ্র্যসীমার নিচে বাস করত ৪৮.৯ শতাংশ মানুষ, যা ২০১৪ সালে কমে দাঁড়িয়েছে ২৪ শতাংশে। দ্রুত অর্থনৈতিক উন্নয়নের জন্য কতগুলো মেগা উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়ন শুরু করেছে বর্তমান সরকার। এগুলোর মধ্যে আছে পদ্মা সেতু, কর্ণফুলী টানেল, ঢাকা শহরে মেট্রোরেল, উড়াল সড়ক, অনেক ফ্লাইওভার, পারমাণবিক বিদ্যুত কেন্দ্র, বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট উৎক্ষেপণ এবং গভীর সমুদ্রবন্দর। ২০২১ সালের মধ্যে প্রকল্পগুলো শেষ হলে সার্বিক অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিতে এগুলোর সম্মিলিত অবদান হবে বিস্ময়কর। অর্থনৈতিক সমীক্ষা রিপোর্ট অনুসারে শুধুমাত্র পদ্মা সেতু চালু হলে প্রবৃদ্ধির হার বৃদ্ধি পাবে ১.২ শতাংশ। তারপর ভারত, ভুটান, নেপাল ও বাংলাদেশের মধ্যে আন্তঃসড়ক যোগাযোগ এবং ওই তিন দেশ কর্তৃক চট্টগ্রাম ও মংলা বন্দর ব্যবহার শুরু হলে সেখান থেকে একটা বিশাল অর্থনৈতিক সুবিধা পাবে বাংলাদেশ। ২০১৪ সালে বাংলাদেশের মানুষের মধ্যে ব্যাপকভিত্তিক দুটি জরিপ চালায় ওয়াশিংটনভিত্তিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান ‘দি পিউ রিসার্চ সেন্টার।’ প্রথম জরিপে দেখা যায়, বাংলাদেশের ৮১ শতাংশ তরুণ মনে করে আগামী পাঁচ বছরে তাদের জীবনমানের আরও উন্নতি হবে (প্রথম আলো, ১৯ নবেম্বর-২০১৪)।

দ্বিতীয় জরিপে বলা হয়, বাংলাদেশের ৭১ শতাংশ মানুষ দেশের অর্থনৈতিক অবস্থায় সন্তুষ্ট (ডেইলি স্টার ১৬ জানুয়ারি-২০১৫)। বর্তমান যুগের উন্নতির লিডিং বাহন তথ্যপ্রযুক্তি ব্যবহারের এক জরিপে দেখা যায়, ৮৪ ভাগ গ্রামীণ কৃষক মোবাইল ফোনের মাধ্যমে সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে প্রয়োজনীয় কৃষি তথ্যাদি আদান-প্রদান করে থাকেন। সুতরাং চলমান অর্থনৈতিক ক্রান্তিকাল সফলভাবে অতিক্রম করতে পারলে বাংলাদেশ ২০২১ সালে মধ্যম আয়ের দেশ এবং ২০৫০ সালে উন্নত দেশের পর্যায়ে পৌঁছানো কোন অবাস্তব ভাবনা নয়। একটি দেশের অর্থনৈতিক অগ্রগতির পেছনে অনেক ফ্যাক্টর কাজ করে। তবে সব কিছুর উর্ধে থাকে রাষ্ট্রনীতি, যা আবার উৎপত্তি হয় রাজনীতির গহ্বর থেকে। প্রতিবেশী দেশের সঙ্গে সুসম্পর্ক এবং বিশ্ব অঙ্গনে রাষ্ট্রের মর্যাদাপূর্ণ অবস্থান যে কোন দেশের উন্নয়নের অন্যতম অনুষঙ্গ।

ভারত ও মিয়ানমারের সঙ্গে সমুদ্রসীমার নিষ্পত্তি, ভারতের সঙ্গে ছিটমহল সঙ্কটের সমাধান, আঞ্চলিক কানেকটিভিটি স্থাপন, ইন্টারন্যাশনাল পার্লামেন্টারি এ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি হওয়া এবং সর্বোপরি ধর্মান্ধ উগ্রবাদী জঙ্গী সন্ত্রাস দমনে বিশ্বের মডেল হিসেবে গৌরব অর্জন করা, এগুলো সম্ভব হয়েছে। কারণ, ২০০৯ সাল থেকে বাংলাদেশের রাষ্ট্রীয় দৃষ্টিভঙ্গির মূল অবলম্বন ছিল মুক্তিযুদ্ধের দর্শন, অসাম্প্রদায়িক ও প্রগতিশীল চিন্তায় উদ্বুদ্ধ। ধর্মাশ্রয়ী পাকিস্তানপন্থী দৃষ্টিভঙ্গি থাকলে এত বড় অর্জন সম্ভব হতো না, যা বিগত দিনে প্রমাণ হয়েছে। মুক্তিযুদ্ধের দর্শনে রাষ্ট্র পরিচালিত হলে কি হতে পারে, আর এর বিপরীত ধর্মাশ্রয়ী মৌলবাদী দর্শনে থাকলে কি হতে পারে তার একটা তুলনামূলক চিত্র স্পষ্ট হয় যখন বিগত সময়ের সরকারগুলোর পারফরমেন্সের সুনির্দিষ্ট সূচক সংবলিত চার্ট পাশাপাশি রেখে পর্যালোচনা করা হয়।

মুক্তিযুদ্ধে দর্শনকে রাষ্ট্র পরিচালনায় সুপ্রতিষ্ঠিত করার সংগ্রামের এখন ক্রান্তিকাল চলছে। এ বিষয়ে অগ্রগতি কম নয়। বিএনপির এক প্রধান নেতা নজরুল ইসলাম খান সেদিন বললেন, শেখ মুজিবুর রহমান বাংলাদেশের স্থপতি। বিএনপি প্রতিষ্ঠার সাঁইত্রিশ বছরের মাথায় এটাই প্রথম যে, বিএনপির কোন সিনিয়র নেতা বঙ্গবন্ধু সম্পর্কে এ রকম উচ্চারণ করলেন। ভাল কথা, অনুমান করি ফিরতি যাত্রা শুরু হয়েছে। তবে এখনও হাঁটতে হবে যোজন যোজন পথ। আওয়ামী লীগকেও শুদ্ধি অভিযান চালাতে হবে। দল থেকে আগাছা, পরগাছা ঝেড়ে ফেলতে হবে। মুক্তিযুদ্ধের আদর্শ-দর্শনের মূল ভিত্তি হলো ২৩ বছর পাকিস্তানের বিরুদ্ধে সংগ্রামের মধ্য থেকে এবং একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধ হতে উদ্ভূত উপাদান, যার মূল প্রবক্তা ও প্রবর্তনকারী বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। রাষ্ট্র পরিচালনায় সব নীতি, আইন ও পন্থার মূল উৎস রাষ্ট্রের সংবিধান, যেখানে রাষ্ট্রীয় নীতিমালা লিপিবদ্ধ থাকে। বিএনপি এখন জিয়ার আদর্শের রাজনীতি পুনঃপ্রতিষ্ঠিত করার ঘোষণা দিয়েছে জোরেশোরে। জিয়ার আদর্শের স্বরূপ কেমন, অন্বেষণ করলে সেটি পাওয়া যাবে পঞ্চম সংশোধনীর পরে প্রবর্তিত সংবিধানের ভেতরে। যেখানে তিনি বাহাত্তরের সংবিধানের প্রায় ৪০টি জায়গায় সামরিক ঘোষণার দ্বারা সংশোধনী আনেন। এর মধ্য দিয়ে মুক্তিযুদ্ধের আদর্শ বহনকারী সব শব্দ, বাক্য ও অনুচ্ছেদ বাতিল হয়ে যায়। ফলে সেটি পরিণত হয় পাকিস্তানী নীতির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ ধর্মাশ্রয়ী মৌলবাদী সংবিধান। দেশের সর্বোচ্চ আদালত কর্তৃক পঞ্চম সংশোধনী বাতিল এবং জিয়াকে অবৈধ ক্ষমতা দখলকারী হিসেবে আখ্যায়িত করার মধ্য দিয়ে জিয়ার আদর্শের কিন্তু মৃত্যু ঘটেছে। তাহলে কি ধরে নিতে হবে বিএনপি এই মৃত আদর্শকে জীবিত করতে চায় এবং আবার তা ফিরিয়ে আনতে চায়। সেটা কি সম্ভব হবে? বলা যায় না, সব সম্ভবের দেশে যে কোন কিছুই ঘটতে পারে। তাই সঙ্গত কারণেই রাজনৈতিক ক্রান্তিকালের বড় প্রশ্নÑবাংলাদেশ কি আবার পঞ্চম সংশোধনীর মাধ্যমে প্রবর্তিত জিয়ার আদর্শে চলবে, নাকি মুক্তিযুদ্ধের আদর্শে চলবে, যার স্বরূপ পাওয়া যায় বাহাত্তরের সংবিধানে। ২০০১-২০০৬ মেয়াদে জামায়াত-বিএনপি সরকারের রাষ্ট্র পরিচালনায় ভয়ানক ব্যর্থতা, সরকারের সরাসরি পৃষ্ঠপোষকতায় ধর্মান্ধ জঙ্গী সন্ত্রাসী গোষ্ঠীর ভয়ঙ্কর উত্থান ও ধ্বংসযজ্ঞ, প্রতিবেশী ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের রাজ্যগুলোর সশস্ত্র বিচ্ছিন্নতাবাদীদের প্রত্যক্ষ সমর্থন, সহযোগিতা ও অস্ত্র-গোলাবারুদ সরবরাহ, গত পাঁচ-ছয় বছর ধরে রাজনীতিতে হিমালয়সম ভুল, হঠকারিতা ও সহিংসতা, হেফাজত ও যুদ্ধাপরাধীদের সরাসরি সমর্থন এবং ২০১৪ সালের নির্বাচন বর্জন ইত্যাদির কারণে বিএনপি নেতৃত্বাধীন ২০ দলীয় জোট এখন গভীর গর্তে পড়েছে। তবে জামায়াতের ক্যাডার বাহিনী এবং ইসলামী ঐক্য জোট ও হেফাজতের নিয়ন্ত্রণাধীন মাদ্রাসাকেন্দ্রিক একরোখা মগজ ধোলাইকৃত বড় আকারের জনবল থাকার কারণে যে কোন হঠকারী ধ্বংসযজ্ঞ চালানোর সাময়িক ক্ষমতা তাদের আছে। তাছাড়া দেশের প্রায় এক-তৃতীয়াংশ মানুষ এবং সুবিধাভোগী সুশীল সমাজের একটা অংশের সমর্থন তাদের সঙ্গে আছে। এই সমর্থনকে মূলধন করে তারা আবার ক্ষমতায় ফেরার জন্য বিশ্বের কোন বড় একটি শক্তির ওপর নির্ভর করতে চাইছে বলে কখনও কখনও মনে হয়। ক্ষমতার ভাগাভাগি ও পদ-পদবীর বাটোয়ারায় অভিমানী হয়ে চলে যাওয়া বদরুদ্দোজা চৌধুরী ও কর্নেল (অব) অলি আহমদ জিয়ার আদর্শ রক্ষার সর্বশেষ লড়াইয়ে যোগ দেয়ার জন্য সব অপমান-বেইজ্জতি ঝেড়ে ফেলে সদলবলে জামায়াত-বিএনপির পতাকাতলে আবার একত্রিত হচ্ছেন বলে খবরে জানা গেছে। তারা এখন সকলে এক হবেন, এটাই স্বাভাবিক।

কিন্তু এর বিপরীতে ক্রান্তিকালের রাজনৈতিক লড়াইয়ে মুক্তিযুদ্ধের দর্শনে বিশ্বাসী অসাম্প্রদায়িক প্রগতিশীল শক্তির অভ্যন্তরে আন্তঃদলীয় ও অন্তর্দলীয় যে কোন্দল আর রশি টানাটানি দেখছি, তা কোন শুভ লক্ষণ নয়। তবে এ পক্ষের বড় সুবিধা হলো তৃণমূল পর্যায়ের বৃহত্তর জনগণ ছাড়াও তরুণ প্রজন্মের একটা বড় অংশ তাদের সঙ্গে আছে এবং তাদের নেতৃত্বে আছেন বঙ্গবন্ধুর মেয়ে শেখ হাসিনা, যার নেতৃত্বের ক্যারিশমা ও প্রজ্ঞাময়তার গ্রহণযোগ্যতা এখন বিশ্ব অঙ্গনে আলোচিত ও স্বীকৃত। কিন্তু মহাজোটের বড় শরিকের দলীয় কাঠামো নিয়ন্ত্রণহীন এবং ছাত্রলীগ ও যুবলীগের আগাছা-পরগাছাদের অপকর্মে দলীয় প্রধান ও সরকারের বড় বড় অর্জন ম্লান হয়ে যাচ্ছে। মহাজোটের বাইরে থাকা মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের কিছু জনসম্পৃক্তহীন খ্যাতিমান ব্যক্তি শুধুমাত্র শেখ হাসিনার প্রতি ব্যক্তিগত বিদ্বেষ ও আক্রোশের কারণে পেছন থেকে ছুরি মারার ভূমিকায় আছেন। এনারা পক্ষে থাকলে কতদূর উপকার হয়, তা বলা না গেলেও বাইরে বসে ক্ষতি করতে তারা বড় ওস্তাদ। দেশের বিভিন্ন জেলায়-উপজেলায় আগাছা-পরগাছা এবং আদর্শহীন দলীয় লোকদের আচরণে মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের বহু মানুষ হাত গুটিয়ে চুপচাপ বসে থাকে। নিজেরা নিজেদের আঙ্গুল কামড়ানো ছাড়া তাদের আর কোন উপায় থাকে না। সম্প্রতি মহাজোটের বড় শরিক আওয়ামী লীগের কিছু সিনিয়র নেতা ও তাদের সহযোগীরা অন্য শরিক জাসদকে নিয়ে বিতর্কের যে নবউত্থান ঘটিয়েছেন, তাতে অর্জন কি হবে? লক্ষ্যহীন কথাবার্তা ও কাজে অর্জনের চেয়ে বিসর্জন বেশি হয়। যে কোন বিষয়ও ইস্যু উত্থাপনের ও কার্যকরণের একটা উপযুক্ত সময় থাকে। একই সঙ্গে কোথায় থামতে হবে, সীমা কোথায়, তা উপলব্ধিতে ব্যর্থ হলে সেটি ব্যাক ফায়ার করে এবং নিজেদেরই বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হতে হয়। জোট বা মিত্র পক্ষের সঙ্গে সম্পর্ক গড়া ও রক্ষায় এ্যাডলফ হিটলারের বিখ্যাত বই মাইন ক্যাম্প থেকে একটা উদ্ধৃতি দিচ্ছি : ঞযব ধৎঃ ড়ভ ংঃধঃবংসধহংযরঢ় রং ংযড়হি যিবহ ধঃ পবৎঃধরহ ঢ়বৎরড়ফং ঃযবৎব রং য়ঁবংঃরড়হ ড়ভ ৎবধপযরহম ধ পবৎঃধরহ বহফ ধহফ যিবহ ধষষরবং ধৎব ভড়ঁহফ যিড় সঁংঃ ঃধশব ঃযব ংধসব ৎড়ধফ রহ ড়ৎফবৎ ঃড় ফবভবহফ ঃযবরৎ ড়হি রহঃবৎবংঃং. (মাইন ক্যাম্প-পৃ. ৫৩৬)। সম্প্রতি সিলেট শাহজালাল প্রযুক্তি ও বিজ্ঞান বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্রলীগ নামধারীদের দ্বারা এবং উপাচার্যের গোয়ার্তুমির কারণে যে অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটে গেল, সেটি মুক্তিযুদ্ধের আদর্শ রক্ষার লড়াইয়ে এ পক্ষের ওপর ভয়ানক নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে। মুক্তিযুদ্ধের দর্শনের জায়গায় তরুণদের কাছে অধ্যাপক জাফর ইকবাল একজন আইকন ও স্তম্ভ। একথা আমরা সবাই জানি, আলোচিত আদর্শের লড়াইয়ে মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের জন্য তরুণরাই প্রথম কাতারের সৈনিক। আমার এখনও মনে পড়ে টেলিভিশনের খবরে দেখা সেই ছবিটার কথা। গত জরুরী আইনের তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময় ব্যক্তিত্বহীন আজ্ঞাবাহী প্রেসিডেন্ট ইয়াজউদ্দীনের সিলেট বিশ্ববিদ্যালয়ে আগমনের সময় আর কেউ নয়, শুধুমাত্র অধ্যাপক জাফর ইকবাল ও তার স্ত্রী ইয়াসমিন হক দু’জনে একটা প্রতিবাদের ব্যানার হাতে ঠায় দাঁড়িয়ে আছেন। ইগো সমস্যা ও পদের প্রতি লোভ না থাকলে এবং উপাচার্যের সেই বিজ্ঞতা থাকলে সেদিন সকালের ওই ঘটনা অবশ্যই এড়ানো সম্ভব ছিল। ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়, প্রগতিশীল ও মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের মানুষ যখন ঐক্যবদ্ধ থেকেছে, তখন তারা সব সময় জয়ী হয়েছে। বিভাজনে শুধু পরাজয় নয়, ভয়াবহ বিপদ ডেকে এনেছে। তখন কেউই রক্ষা পায়নি। তাই ক্রান্তিলগ্নের এই আদর্শের লড়াইয়ে সব প্রগতিশীল ও অসাম্প্রদায়িক শক্তি এবং মানুষের ঐক্য একান্ত প্রয়োজন।

লেখক : ভূ-রাজনৈতিক ও নিরাপত্তা বিশ্লেষক