মেঘলা, তাপমাত্রা ৩১.১ °C
 
২৫ সেপ্টেম্বর ২০১৭, ১০ আশ্বিন ১৪২৪, সোমবার, ঢাকা, বাংলাদেশ
সর্বশেষ

ধানে ইউরিয়া প্রয়োগে নতুন পদ্ধতি, সাফল্য পাচ্ছেন কৃষক

প্রকাশিত : ৬ সেপ্টেম্বর ২০১৫
ধানে ইউরিয়া প্রয়োগে নতুন পদ্ধতি, সাফল্য পাচ্ছেন কৃষক
  • স্প্রে করা হচ্ছে পাতায়

কাওসার রহমান/সমুদ্র হক ॥ স্প্রের মাধ্যমে ইউরিয়া সার ধান গাছের পাতায় ছিটিয়ে আশাতীত সাফল্য পাচ্ছে কৃষক। এর ফলে শুধু কৃষকের খরচেই সাশ্রয় হচ্ছে না, ১০ শতাংশ পর্যন্ত ফলন বৃদ্ধি পাচ্ছে। কৃষক ধান আবাদ করে বেশি লাভের মুখ দেখছে। মাঠ পর্যায়ে ট্রায়ালে ইউরিয়া সার জমিতে না ছিটিয়ে স্প্রের মাধ্যমে পাতায় প্রয়োগের কারণে কৃষকের ৩৫ শতাংশ পর্যন্ত ইউরিয়া সার সাশ্রয় হচ্ছে।

পাতায় স্প্রে করে ধান গাছের খাদ্যপুষ্টি প্রয়োগের বিষয়টি নিয়ে গত ৫ বছর ধরে গবেষণা করেছেন বাংলাদেশ কৃষি উন্নয়ন কর্পোরেশনের (বিএডিসি) রাজশাহী বিভাগীয় যুগ্মপরিচালক কৃষিবিদ আরিফ হোসেন খান। শেষ পর্যন্ত ধান চাষের এমন লাগসই ও লাভজনক প্রযুক্তি সফলভাবে উদ্ভাবনের পর তিনি দাবি করেছেন দেশ ও আন্তর্জাতিক পরিম-লে এই প্রযুক্তি এটাই প্রথম। এর আগে ধানের জমিতে গাছের পাতায় সার হিসাবে ইউরিয়া স্প্রে করা হয়নি। শুধু মাটিতে ছিটানো হয়েছে। তার মতে সঠিক পৃষ্ঠপোষকতা পেলে এই প্রযুক্তি বাংলাদেশসহ বিশ্বের ধান উৎপাদনকারী সকল দেশে মডেল হয়ে থাকবে।

উদ্ভাবক এই প্রযুক্তির নাম দিয়েছেন ‘ধান চাষের সাশ্রয়ী ইউরিয়া স্প্রে প্রযুক্তি’। ইতোমধ্যে এই প্রযুক্তিটি খাদ্যশস্য উদ্বৃত্ত অঞ্চল হিসেবে পরিচিতি পাওয়া উত্তরাঞ্চলের বগুড়া, নওগাঁ, নীলফামারী, দিনাজপুর এবং অন্যান্য এলাকার মধ্যে ঠাকুরগাঁও, পাবনা, রাজশাহী, টাঙ্গাইল শেরপুর নাটোর জেলার বিভিন্ন গ্রামের চাষী প্রয়োগ করে সাফল্য পাচ্ছেন। বিএডিসির সরকারী খামারে পরীক্ষায়ও এসেছে সফলতা।

গত বোরো মৌসুমে ১৪ জেলার কয়েকশ’ চাষীর সম্পৃক্ততায় ৩ হাজার ২১৭ বিঘা জমিতে এই প্রযুক্তি প্রয়োগ করা হয়। বগুড়া সদর উপজেলার চাষী জাহাঙ্গীর আলম এ প্রযুক্তি প্রয়োগের অভিজ্ঞতা তুলে ধরে জনিয়েছেন, তিনি ১৮ বিঘা জমিতে স্প্রে করে ধানের উৎপাদন বেশি পেয়েছেন এবং ইউরিয়া সাশ্রয় হওয়ায় ধানের উৎপাদন খরচও কম হয়েছে। প্রায় একই কথা বললেন বগুড়ার শাজাহানপুর উপজেলার হযরত আলী। তিনি ১৫ বিঘা জমি আবাদ করেছেন এই প্রযুক্তি প্রয়োগে। উৎপাদন খরচ কম হওয়ায় পণ্য বিক্রিতেও লাভ বেশি পেয়েছেন তিনি।

এ প্রসঙ্গে প্রযুক্তির উদ্ভাবক আরিফ হোসেন খান বলেন, ‘এই প্রযুক্তিতে ইউরিয়া সারের ব্যবহার ৩৫ শতাংশ কমে গেলেও, প্রকৃতপক্ষে ধান চাষে নাইট্রোজেনের ব্যবহার কমে না। কারণ পাতার মাধ্যমে যখন ইউরিয়া প্রদান করা হয়, তখন তার কার্যকারিতা অনেকগুণ বেশি বেড়ে যায়। এটি-ই ইউরিয়া স্প্রে প্রযুক্তির মাধ্যমে ধান চাষের মূল কৌশল। এরমধ্যে সম্পূর্ণ আধুনিক বিজ্ঞান রয়েছে।’

এই প্রযুক্তি ব্যবহারে অধিকাংশ স্থানে দেখা যায়, ধানের ফলন বৃদ্ধি পেয়ে থাকে এবং ১০ শতাংশ পর্যন্ত ফলন বৃদ্ধি পায়। ধানের চিটার পরিমাণ কমে যায়, পোকার আক্রমণ কম হয় এবং ধান বা বীজের রং ভাল হয়। আবার উৎপাদিত ধানের গুণগতমান ভাল হওয়ার কারণে কৃষক বাজারে বেশি দামে ধান বিক্রি করতে পারে।

এছাড়া জাতীয়ভাবে সাশ্রয়ের কারণে দেশে ইউরিয়া সার আমদানি কমে যাবে। এতে বৈদেশিক মুদ্রার সাশ্রয়ের পাশাপাশি সরকারের ভর্তুকির পরিমাণও হ্রাস পাবে। ফসল উৎপাদনে বালাইনাশকের পরিমাণ কমে গিয়ে পরিবেশ উন্নত হবে।

দেশে মোট ধান আবাদ হয় এক কোটি ১৮ লাখ হেক্টর জমিতে। প্রতি বিঘায় গড়ে ৬.৬৬ কেজি হিসেবে প্রতি হেক্টরে ৫০ কেজি ইউরিয়া সাশ্রয় হবে। এতে দেশে মোট ইউরিয়া সাশ্রয় হবে ৫ লাখ ৯০ হাজার টন। যার মূল্য বাবদ বছরে সরকারের প্রায় এক হাজার ৯৫০ কোটি টাকা সাশ্রয় হবে। অন্যদিকে, প্রতি বিঘায় গড়ে ২৫ কেজি হিসেবে প্রতি হেক্টরে ১৫০ কেজি ধান বেশি উৎপাদিত হয়। ফলে সারাদেশে এই প্রযুক্তিটি ব্যবহার করা গেলে বছরে প্রায় ১৮ লাখ টন বেশি ধান উৎপাদিত হবে। এই অতিরিক্ত ধানের বাজার মূল্য প্রায় তিন হাজার দুইশ’ কোটি টাকা।

কৃষিবিদ আরিফ হোসেন খানের প্রযুক্তিটি মূলত বিশ্ব খাদ্য ও কৃষি সংস্থার (ফাও) ‘সেভ এ্যান্ড গ্রোথ’ ধারণাকে অনুসরণ করে। এই প্রযুক্তির বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা হলো- একটি গাছের শুষ্ক পদার্থ তৈরিতে ১৬টি অত্যাবশ্যকীয় খাদ্যোপাদানের মধ্যে ৯৬ ভাগ তৈরি হয় কার্বন, হাইড্রোজেন এবং অক্সিজেন দ্বারা। যা গাছ সম্পূর্ণ প্রকৃতি থেকে পেয়ে থাকে। অবশিষ্ট ৪ ভাগের মধ্যে ২.৭ ভাগ তৈরি হয় অত্যাবশ্যকীয় প্রাইমারী খনিজ খাদ্য উপাদান নাইট্রোজেন, ফসফরাস এবং পটাশের মাধ্যমে। ০.৫০ ভাগ তৈরি হয় অত্যাবশ্যকীয় সেকেন্ডারি খনিজ খাদ্য উপাদান ক্যালসিয়াম, ম্যাগনেশিয়াম এবং সালফার দ্বারা। অবশিষ্ট ০.৮০ ভাগ তৈরি হয় বাকি ৭টি মাইক্রো নিউট্রিয়েন্টের মাধ্যমে। ফলে যদি সুনিয়ন্ত্রিতভাবে ইউরিয়া সারকে ধান চাষের সময় মাটিতে এবং পাতার মাধ্যমে ব্যবহার করে গাছের পুষ্টি (নাইট্রোজেন) চাহিদা নিশ্চিত করা যায়, তাহলে অল্প পরিমাণ সারের ব্যবহারের মাধ্যমেই কাক্সিক্ষত ফলন পাওয়া যায়।

আরিফ হোসেন খানের প্রযুক্তি প্রয়োগের কৌশলও হচ্ছে- বীজতলা থেকে চারা তোলার আগের দিন বিকালে প্রতি লিটার পানিতে ২০ গ্রাম ইউরিয়া ২০ গ্রাম পটাশ, ৩ গ্রাম থিওভিট বা কমুলাস, ১ গ্রাম লিবরেল/ চিলেটেড জিঙ্ক ও শূন্য দশমিক ৫ গ্রাম লিবরেল বোরোন মিশিয়ে স্প্রে করতে হবে। প্রতি শতক বীজতলা ভিজাতে দরকার প্রায় দেড় লিটার দ্রবণ। এই দ্রবণ প্রয়োগে চারায় রোপণজনিত আঘাত লাগে না। মূল জমিতে দ্রুত বেড়ে ওঠে। ১শ’ ৩৫ থেকে ১শ’ ৪৫ দিনের জীবনকাল বিশিষ্ট বিআর-১১ ও ব্রি-৪৯ ধানের ক্ষেত্রে মূল জমি তৈরি শেষে চাষের সময় আর সব সারের সঙ্গে মোট প্রয়োজনীয় ইউরিয়া শতকরা দশ ভাগ প্রয়োগ করতে হবে। ১২ থেকে ১৫ দিন সময়ের মধ্যে মোট প্রয়োজনীয় ইউরিয়ার ৪০ ভাগ উপরি প্রয়োগ করতে হবে। ধান গাছের বয়স ৩০ থেকে ৩৫ দিনের মধ্যে হলে ১৬ লিটার পানিতে ৬শ’ গ্রাম ইউরিয়া ২শ’ গ্রাম পটাশ, ৫০ গ্রাম থিওভিট বা কুমুরাস, ১৬ গ্রাম লিবরেল জিঙ্ক ১০ গ্রাম লিবরেল বোরোন মিশিয়ে দ্রবণ বানিয়ে সকালে ও বিকালে পড়ন্ত রোদের সময় স্প্রে করতে হবে। তীব্র রোদে স্প্রে না করাই ভাল। এরপর গাছের পাতার রং দেখে ১২-১৫ দিন পর পর দু’বার স্প্রে করতে হবে। ১শ’ থেকে ১শ’ ১৫ দিনের মধ্যে যে ধান হয় (যেমন বিনা-৭) তার শেষ চাষে শতকরা ২০ শতাংশ ইউরিয়া, প্রথম টপ ড্রেসিংয়ের সময় ৩০ শতাংশ ইউরিয়া দিতে হবে। স্প্রের ২৪ ঘণ্টার মধ্যে বৃষ্টিপাত না হলে প্রযুক্তি পূর্ণমাত্রায় কার্যকর থাকবে। বৃষ্টিপাত হলে পাতার রং দেখে স্প্রে করতে হবে। বিশ্বে প্রথম মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে পাতার মাধ্যমে গাছে পুষ্টি প্রয়োগ শুরু হয় ১৮৪৪ সালে। এর ১০৬ বছর পর ১৯৫০ সালে গবেষণায় এই সত্যতাকে স্বীকৃতি দিয়ে বলা হয় মাটিতে যে সার ছিটিয়ে প্রয়োগ করা হয় তার ৯০ শতাংশই অপচয় হয়। পাতায় সার প্রয়োগে ৯০ শতাংশ কার্যকর হয়। মাটির চেয়ে পাতা ৮ থেকে ২০ গুণ দ্রুত কাজ করে। বালু প্রধান মাটিতে রসের অভাব থাকলে পাতায় সার প্রয়োগে গাছের পুষ্টি চাহিদা পূরণ হয়।

মাঠ পরীক্ষায় দেখা গেছে, মাটিতে ৪ কেজি ইউরিয়া প্রয়োগে যে ফলন মেলে পাতায় এক কেজি ইউরিয়া স্প্রে করলে তারচেয়ে বেশি ফলন মেলে। পাতায় ইউরিয়া প্রয়োগে সালোকসংশ্লেষণের হার দ্রুত বেড়ে যায়। গাছের শরীরবৃদ্ধির বিষয়গুলো ত্বরান্বিত করে মাটি থেকে পানি ও পুষ্টি উপাদান সহজে গ্রহণ করে স্বাস্থ্যবান গাছ হয়ে বেশি ফলন দেয়। যেসব চাষী এই প্রযুক্তিতে আবাদ করেছে তারা জানায়, ধানের পোকা দমনে আগে যেভাবে কীটনাশক ব্যবহার করা হতো পাতায় সার স্প্রের পর তা আর লাগে না। যে কারণে ধানের রং ঝকঝকে হওয়ায় বাজারে বেচতে সুবিধা হয়। স্প্রে করার জন্য সারকে তরল করার পদ্ধতি ও সূত্র কৃষক পর্যায়ে পৌঁছে দেয়া হচ্ছে।

এ প্রসঙ্গে আরিফ হোসেন খান বলেন, ‘এই প্রযুক্তি প্রয়োগে ৩০ থেকে ৩৫ কেজি ইউরিয়া সাশ্রয় করা সম্ভব। সবচেয়ে বড় কথা : অতিরিক্ত কোন খরচ তো হবেই না উচ্চফলনশীল (উফশী) আবাদে কীটনাশকের স্প্রে অনেক কমে যাবে।’

তিনি বলেন, ‘বিশ্বে রাসায়নিক সার ব্যবহার কমিয়ে দেয়া হয়েছে। এই প্রযুক্তি রাসায়নিক সার ব্যবহার কমিয়ে মাটির উর্বরতা বাড়াবে। স্প্রে ইউরিয়া ব্যবহারে ধানের গর্ভাবস্থায় পুষ্টির ঘাটতি দূর হবে। ফলন বেড়ে যাবে।’ আরিফ হোসেন খানের মতে, এই প্রযুক্তি মাঠ পর্যায়ে ছড়িয়ে দিতে পারলে ধান চাষে ইউরিয়ার কম ব্যবহারে বহুকোটি টাকা সাশ্রয় হবে একই সঙ্গে উৎপাদন বেড়ে গিয়ে বাড়তি খাদ্য বিদেশে রফতানি করা যাবে। এই প্রযুক্তি ব্যবহারে পরিবেশ নির্মল থাকবে। এ বিষয়ে বিএডিসি (বীজ উন্নয়ন) উপ-পরিচালক আখতার হোসেন জানান, চুক্তিবদ্ধ চাষীরা এই প্রযুক্তি ব্যবহার করে উপকৃত হচ্ছেন, এমনটি শুনেছেন তিনি। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতর বগুড়া জোনের অতিরিক্ত পরিচালক আবুল হোসেন জানান, বিষয়টি সম্পর্কে তিনিও অবহিত। পাতার মাধ্যমে খাদ্য প্রদান কৌশল কার্যকর, যা উন্নত বিশ্বে ব্যবহার হচ্ছে। কিন্তু বাংলাদেশে এখনও সেভাবে শুরু হয়নি।

তিনি বলেন, ‘এই প্রযুক্তি ব্যবহারে কৃষকদের অবহিত করতে হবে। মাঠ পর্যায়ে ছড়িয়ে না দেয়া হলে এবং সার্বিকভাবে ব্যবহার না হলে প্রযুক্তিটির সার্থকতা আসবে না। মাঠ পর্যায়ে কিভাবে বাস্তবায়ন করা যায় সেই কৌশলও নেয়া দরকার।’

প্রকাশিত : ৬ সেপ্টেম্বর ২০১৫

০৬/০৯/২০১৫ তারিখের খবরের জন্য এখানে ক্লিক করুন

শেষের পাতা



শীর্ষ সংবাদ: