১৮ অক্টোবর ২০১৭,   ঢাকা, বাংলাদেশ   শেষ আপডেট ৭ ঘন্টা পূর্বে  
Login   Register        
ADS

কার্বন নিঃসরণ কমাতে আইনী কাঠামো তৈরির ওপর গুরুত্বারোপ


নাজনীন আখতার ॥ জলবায়ু পরিবর্তনজনিত বিরূপ প্রভাব মোকাবেলায় একটি আইনী কাঠামো বা চুক্তির রূপরেখা তৈরির ওপর জোর দিয়ে জার্মানির বনে হয়ে গেল জলবায়ু সম্মেলন। আগামী ডিসেম্বরে অনুষ্ঠিতব্য প্যারিস জলবায়ু সম্মেলন কপ-২১ সামনে রেখে বন সম্মেলনে ২৯ দেশ ক্ষতিকর প্রভাব মোকাবেলায় দাবিদাওয়া ও পরামর্শ সংবলিত নথি উপস্থাপন করেছে। ৩১ আগস্ট থেকে ৫ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ওই সম্মেলনে প্যারিস সম্মেলনের রূপরেখা চূড়ান্ত করার জন্য আরও আলোচনার ওপর জোর দেয়া হয়।

সম্মেলনে ৪৮ স্বল্পোন্নত দেশের (এলডিসি) পক্ষে সভাপতি গিজা গাসপার মার্টিনস গ্রুপের অফিসিয়াল পেজে প্রেস বিজ্ঞপ্তিতে বলেন, নতুন চুক্তির জন্য প্রযুক্তিগত উন্নতির লক্ষ্যে আলোচনা এখনও চূড়ান্ত হয়নি। তা ধীর পর্যায়েই রয়েছে। তিনি বলেন, প্যারিস কপ-২১ সম্মেলনের আগে আর মাত্র ১০ বার আলোচনার জন্য একত্রিত হওয়ার সুযোগ পাওয়া যাবে। এলডিসিভুক্ত দেশগুলো বিশ্বাস করে প্যারিস সম্মেলনের আগে সামনের সময়গুলোতে আলোচনার মাধ্যমে একটি শক্তিশালী ফল ডিসেম্বরে উপস্থাপন করা সম্ভব হবে। এখন এ অল্প সময়ের মধ্যে সফল হওয়ার জন্য দ্বিগুণ সামর্থ্য ও আকাক্সক্ষা নিয়ে কাজ করতে হবে। আলোচনার এ সন্ধিক্ষণে অংশীদারদের সঙ্গে কাজ করতে প্রস্তত এলডিসিভুক্ত দেশগুলো।

প্যারিস সম্মেলনে জলবায়ুজনিত প্রভাবে ক্ষতিগ্রস্ত দেশগুলোর জন্য একটি কার্যকর ব্যবস্থা নেয়ার জন্য বিশ্বব্যাপী আলোচনা অব্যাহত রয়েছে। বলা হচ্ছে, বৈশ্বিক তাপমাত্রা ২ ডিগ্রী সেলসিয়াসের নিচে রাখা না গেলে বিশ্বে পরিবেশ পরিবর্তনের কারণে প্রাকৃতিক বিপর্যয় ঘটবে। বাংলাদেশসহ স্বল্পোন্নত দেশগুলো এর প্রভাবে সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত হবে। জলবায়ু অর্থায়নে বাংলাদেশকে পর্যাপ্ত অর্থ বরাদ্দের পাশাপাশি আসন্ন প্যারিস জলবায়ু কপ-২১ সম্মেলনে বাংলাদেশের পক্ষ থেকে কার্বন হ্রাসের মাত্রা ২ ডিগ্রী সেলসিয়াসে (৩.৬ ডিগ্রী ফারেনহাইট) নামিয়ে আনার পক্ষে জোর দাবি উঠেছে। সেই সঙ্গে বাংলাদেশসহ ঝুঁকিতে থাকা দেশগুলোর নিরাপত্তার জন্য জ্ঞান ও দক্ষতার মাধ্যমে স্বার্থ সংরক্ষণে ক্ষতিগ্রস্ত দেশগুলোর পক্ষে জোরালো ও কার্যকর অবস্থান তুলে ধরারও দাবি উঠেছে।

শুক্রবার নেপালে এ সংক্রান্ত এক বৈঠকের উদ্বোধন করতে গিয়ে পরিবেশ ও বন মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সভাপতি ড. হাছান মাহমুদ একই কথা বলেছেন। জাতিসংঘের টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্য (এসডিজি) এবং প্যারিস জলবায়ু সম্মেলন বিষয়ে দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর সংসদীয় নেতা এবং সুশীল সমাজের অংশগ্রহণে আয়োজিত তিন দিনব্যাপী ওই বৈঠকের উদ্বোধনী ভাষণে হাছান মাহমুদ বলেন, প্যারিসে অনুষ্ঠিতব্য জলবায়ু সম্মেলনে দক্ষিণ এশিয়া তথা স্বল্পোন্নত দেশগুলোর জোরালো কণ্ঠস্বর উপস্থাপনের জন্য দক্ষিণ এশীয় সুশীল সমাজ নেতৃবৃন্দকে রাজনীতিবিদদের সঙ্গে কাজ করতে হবে। স্বল্পোন্নত দেশ হিসেবে বাংলাদেশ জলবায়ু পরিবর্তনে ইতোমধ্যেই ক্ষতিগ্রস্ত।

সংশ্লিষ্টদের মতে, একটি স্থায়ী জলবায়ু চুক্তিতে পৌঁছানোর জন্য প্যারিসে অনুষ্ঠিতব্য ২০১৫ সালের কপ সম্মেলন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। গত বছরের ডিসেম্বরে পেরুর লিমায় জলবায়ু সম্মেলনে দীর্ঘ আলাপ-আলোচনার পর সমঝোতায় পৌঁছানোর চেষ্টা করেন বিশ্ব নেতৃবৃন্দ। সে সময় ১৯৫ দেশের সম্মতিতে ২০২০ সাল থেকে ১০০ বিলিয়ন ডলারের গ্রীন ক্লাইমেট ফান্ড, লস এ্যান্ড ড্যামেজ ফান্ড এবং ২০১৫ সালে কার্বন নিঃসরণ কমাতে প্যারিসে আইনী বাধ্যবাধকতামূলক একটি চুক্তিতে পৌঁছার রূপরেখা চূড়ান্ত করা হয়। গ্রীন ফান্ড গঠনের আগের চার বছর ২০১৫ থেকে ২০১৯ সাল পর্যন্ত চার বছরের জন্য স্বল্পোন্নত দেশগুলো বছরে ৬০ বিলিয়ন ডলার দাবি করেছে। তবে গ্রীন ফান্ডে অর্থায়ন নিয়ে একমত হলেও শিল্পোন্নত দেশগুলো মধ্য মেয়াদে তহবিলে অর্থের পরিমাণ ও কোন দেশ কী পরিমাণ অর্থ দেবে তা সুনির্দিষ্ট করতে এখন পর্যন্ত মতৈক্যে পৌঁছেনি।

বিশ্বে সবচেয়ে বেশি কার্বন নিঃসরণ করে যথাক্রমে চীন, যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপীয় ইউনিয়ন ও ভারত। চীন বিশ্বের মোট নিঃসরিত কার্বনের প্রায় ২৮ শতাংশ, যুক্তরাষ্ট্র ১৪ শতাংশ, ইউরোপীয় ইউনিয়ন ১০ শতাংশ এবং ভারত ৬ দশমিক ৫ শতাংশ নিঃসরণ করে। তবে মাথাপিছু কার্বন নিঃসরণের দিক থেকে এখনও যুক্তরাষ্ট্রই সবচেয়ে এগিয়ে। চীনের তুলনায় দ্বিগুণ এবং ভারতের তুলনায় আটগুণ বেশি। ওসব দেশে কার্বন নিঃসরণ বেড়েই চলেছে। তবে ইউরোপীয় ইউনিয়ন নির্গমণের হার আগের বছরের তুলনায় শতকরা ১ দশমিক ৮ ভাগ কমাতে সক্ষম হয়েছে।

অপরদিকে জলবায়ু পরিবর্তনের বিরূপ প্রভাব মোকাবেলায় একটি আন্তর্জাতিক আদালত গঠন করার ওপর জোর দিয়েছেন আন্তর্জাতিক বিশেষজ্ঞ ও কূটনীতিকরা। তাদের মতে, এ বিষয়ে যে পক্ষ আইন অমান্য করবে তাদের কঠোর শাস্তির আওতায় আনতে হবে। প্যারিসে জলবায়ু পরিবর্তনজনিত প্রভাব সম্মেলন কপ-২১ সামনে রেখে জলবায়ু বিষয়ে আইনী বাধ্যবাধকতা ও সুনির্দিষ্ট পদক্ষেপের বিষয়টি স্পষ্ট হওয়া উচিত বলে মনে করছেন তারা। তাদের মতে, কার্বন নিঃসরণ হ্রাসে অভ্যন্তরীণ আইন কঠোর হওয়া উচিত। পাশাপাশি প্রযুক্তিগত উন্নয়নে পর্যাপ্ত বিনিয়োগ এবং নবায়নযোগ্য এনার্জির ক্ষেত্রে সরকারী ও বেসরকারী খাতে বিনিয়োগ নিশ্চিত করার ওপরও জোর দেয়া প্রয়োজন।

এদিকে জার্মানির বনে শনিবার শেষ হওয়া সম্মেলনে জলবায়ু পরিবর্তনজনিত প্রভাব মোকাবেলায় জাতীয়ভাবে নির্ধারিত অবদান বিষয়ে বিস্তারিত দাবি দাওয়া ও ক্ষতিকর প্রভাব কমাতে পরামর্শ সংবলিত নথি জমা দিয়েছে স্বল্পোন্নত ২৯ দেশ। সম্মেলনে শিল্পোন্নত ও স্বল্পোন্নত ১৯৫ দেশ আমন্ত্রিত ছিল। এ প্রসঙ্গে এলডিসি গ্রুপের সভাপতি গাসপার মার্টিনস বলেন, ইথিওপিয়া, বেনিন, ডিজিবাউটি ও কঙ্গো সবার আগে তাদের নথি উপস্থাপন করেছে। দ্রুত কাজ শেষ করায় তাদের অভিনন্দন। বাকি দেশগুলোও কাজ করছে। তিনি বলেন, উন্নত দেশগুলোকে বিশেষ করে যারা সবচেয়ে বেশি কার্বন নিঃসরণ করছে তাদেরকেও দ্রুত নথি জমা দেয়ার অনুরোধ করা হয়েছে। ওসব দেশের কার্যকর পদক্ষেপের ওপরই নির্ভর করবে বৈশ্বিক তাপমাত্রা যেন ১ দশমিক ৫ ডিগ্রী সেলসিয়াসের উপরে না উঠে এবং ক্ষতিগ্রস্ত দেশগুলো আগামীতে কার্বন নিঃসরণের ক্ষতিকর প্রভাবমুক্ত হয়ে থাকতে পারে।

সর্বাধিক পঠিত:
পাতা থেকে: