মেঘলা, তাপমাত্রা ৩১.১ °C
 
২৪ সেপ্টেম্বর ২০১৭, ৯ আশ্বিন ১৪২৪, রবিবার, ঢাকা, বাংলাদেশ
সর্বশেষ

আইসিটি একটি হচ্ছে অপরটি আপাতত নিষ্ক্রিয় থাকবে

প্রকাশিত : ৬ সেপ্টেম্বর ২০১৫
  • চার বিচারপতি হাইকোর্টে ফিরছেন

বিকাশ দত্ত ॥ একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধের সময় মানবতাবিরোধী অপরাধীদের বিচারে গঠিত আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল পুনর্গঠনের জন্য আজ প্রজ্ঞাপন জারি হচ্ছে। এর ফলে দুটি ট্রাইব্যুনালের স্থলে একটি ট্রাইব্যুনাল কাজ করবে। অন্যটি নিষ্ক্রিয় থাকবে। মামলার সংখ্যা বাড়লে প্রয়োজনে দুটি কেন তিনটি ট্রাইব্যুনাল গঠন করা হবে। বর্তমানে যে মামলা আসছে এতে একটি ট্রাইব্যুনাল হলে তুলনামূলকভাবে সেগুলো দ্রুত নিষ্পত্তি হবে। আইনমন্ত্রী এ্যাডভোকেট আনিসুল হক জনকণ্ঠকে এ কথা বলেছেন। তিনি আরও বলেন, আমি ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটির সঙ্গে কথাই বলেই এটা করেছি। তখন ওরা বলেছে ট্রাইব্যুনালের সংখ্যা কমিয়ে দিন।

এদিকে বিশ্বস্ত সূত্রে জানা গেছে, মামলার সংখ্যা কমে যাওয়ায় ট্রাইব্যুনাল একটি করা হচ্ছে। বর্তমানে ট্রাইব্যুনালে একটি মামলার সাক্ষ্যগ্রহণ চলছে। দুটি মামলার চার্জ হেয়ারিংয়ের জন্য দিন নির্ধারণ রয়েছে। অন্য ৪ থেকে ৫টি মামলার তদন্ত এখনও চলছে। অন্য মামলাগুলোর আসামিদের বিরুদ্ধে গ্রেফতারি পরোয়ারা জারি করা হয়েছে। ইতোমধ্যে ট্রাইব্যুনাল-২ থেকে মামলাগুলো ট্রাইব্যুনাল-১ এ স্থানান্তরিত করা হয়েছে। এছাড়া তদন্ত সংস্থায় ৩২২৯ জনের বিরুদ্ধে অভিযোগ রয়েছে। সেগুলোর গুরুত্ব বিবেচনা করে তদন্ত করা হচ্ছে বলে জানা গেছে। এছাড়া শীর্ষ পর্যায়ের মানবতাবিরোধী অপরাধীদের বিচার প্রায় শেষ হয়েছে। বর্তমানে জেলা ও উপজেলা পর্যায়ের অপরাধীদের নামে মামলা আসতে শুরু করেছে।

দীর্ঘ নয় মাসের মুক্তিযুদ্ধে ত্রিশ লাখ মানুষকে হত্যা, প্রায় সোয়া চার লাখ নারীর ওপর পাশবিক নির্যাতন চালানো হয়েছিল। এক কোটি মানুষ পার্শ্ববর্তী দেশ ভারতে আশ্রয় গ্রহণ করে। হানাদার পাকিস্তানী বাহিনীর সঙ্গে তাদের দোসর রাজাকার আলবদর, আল শামস এ জঘন্য কাজের সহায়তা করে। হানাদার বাহিনী শুধু হত্যা ধর্ষণ করেই ক্ষান্ত হয়নি। তারা দেশের বুদ্ধিজীবীদের বেছে বেছে মেরেছে। অনেক বীরাঙ্গনা আজ অর্ধহারে অনাহারে দিন কাটাচ্ছে। হত্যা, গণহত্যা, ধর্ষণ, লুটপাট, অগ্নিসংযোগ, ধর্মান্তরিত, অপহরণ, আটকের মতো মানবতাবিরোধী অপরাধ সংঘটিত করেছিল। মুক্তিযুদ্ধের দীর্ঘদিন পর ২০১০ সালের ২৫ মার্চ মানবতাবিরোধী অপরাধীদের বিচারের জন্য গঠিত হয় আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল। মামলার সংখ্যা বাড়ায় এবং দ্রুত নিষ্পত্তির জন্য ২০১২ সালের ২২ মার্চ আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-২ গঠন করা হয়। ২০১০ সাল থেকে এ পর্যন্ত দুটি ট্রাইব্যুনালে ২১টি মামলার রায় হয়েছে। তার মধ্যে ২৪ জনকে বিভিন্ন দ- প্রদান করা হয়েছে। এর মধ্যে ১৭ জনকে মৃত্যুদ-, একজনকে যাবজ্জীবন, একজনকে ৯০ বছরের কারাদ- ও ৫ জনকে আমৃত্যু কারাদ- প্রদান করা হয়। আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১, ১০টি এবং আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-২, ১টি রায় প্রদান করেছেন। ট্রাইব্যুনালের দেয়া দ-ের বিরুদ্ধে আপীল বিভাগে ৫টি মামলার চূড়ান্ত নিষ্পত্তি হলেও এখন পর্যন্ত তিনটি মামলার পূর্ণাঙ্গ রায় প্রকাশিত হয়নি।

২০১০ সালের ২৫ মার্চ আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল গঠনের পর থেকে আজ অব্দি এর বিরুদ্ধে নানামুখী প্রোপাগান্ডা চলে আসছে। ১৯৭৩ সালে আইনটি প্রণীত হলেও এটি ছিল নিষ্ক্রিয়, কিন্তু এর মৃত্যু ঘটেনি। বহাল ছিল এই আইন। আইন প্রণয়নের দীর্ঘ ৩৭ বছর পর গঠিত হয় ট্রাইব্যুনাল। ২০১৩ সালের ১৮ ফেব্রুয়ারি রাষ্ট্রপতি জিল্লুর রহমান মানবতাবিরোধী অপরাধে অভিযুক্ত ব্যক্তির পাশাপাশি যে কোন সংগঠনের বিচারের সুযোগ রেখে সংসদে পাস হওয়া আন্তর্জাতিক অপরাধ (ট্রাইব্যুনালস) (সংশোধন) বিল-২০১৩ এ স্বাক্ষর করেন। এর ফলে যুদ্ধাপরাধ ট্রাইব্যুনালের যে কোন রায়ের বিরুদ্ধে সরকার, বাদী এবং বিবাদী সর্বোচ্চ আদালতে আপীল করতে পারবে।

ইতোমধ্যে মুক্তিযুদ্ধের সময় যারা মানবতাবিরোধী অপরাধ করেছিল তাদের যে বিচার হচ্ছে তা সারাবিশ্বে মডেল হিসেবে দেখা দিয়েছে। বিশ্বে অন্যান্য ট্রাইব্যুনালে যে সুযোগ-সুবিধা নেই তা আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে রয়েছে। এখানে আসামি ও সরকার পক্ষকে সমান সুযোগ দেয়া হয়েছে। মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচার প্রক্রিয়ায় সব পক্ষ সমান আইনী সুবিধা ভোগ করছেন। এ কারণে এই ট্রাইব্যুনাল সারাবিশ্বে যেমন সমাদৃত হয়েছে তেমনি অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে। এছাড়াও রয়েছে অভিযুক্ত ব্যক্তির অধিকার ও অধিকারের উৎস, অভিযোগ সম্পর্কে জানার অধিকার, আইনজীবী নিয়োগের অধিকার, দ্রুত বিচার এবং উন্মুক্ত শুনানি, প্রাক বিচারে পর্বে অভিযুক্ত ব্যক্তির অধিকার, জামিনে মুক্তি, ডিসক্লোজার অব ডকুমেন্টস এবং ডিফেন্স প্রস্তুতির জন্য সময়, অভিযুক্ত ব্যক্তির অধিকার সর্বশেষ আপীল।

এ প্রসঙ্গে আইনমন্ত্রী এ্যাডভোকেট আানিসুল হক জনকণ্ঠকে বলেছেন, মানবতাবিরোধী অপরাধ বিশ্বে মডেল হিসেবে দেখা দিয়েছে। আমাদের অনেকেই অনুসরণ করছে। তিনি বলেন, আমরা বিচারকে দ্রুত গতিতে নেয়ার লক্ষেই একটি ট্রাইব্যুনাল করতে যাচ্ছি। এতে করে বিচার কাজ বন্ধ হবে না। যদি ভবিষ্যতে মামলার সংখ্যা বেড়ে যায় তাহলে দুটির জায়গায় তিনটি ট্রাইব্যুনাল করা হবে। একটি ট্রাইব্যুনাল নিয়মিত বিচার কাজ চালালে কোনভাবেই মামলাগুলো পেন্ডিং থাকার কথা নয়।

অন্যদিকে একাত্তরের ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটির ভারপ্রাপ্ত সভাপতি শাহরিয়ার কবির জনকণ্ঠকে বলেছেন, দুটি ট্রাইব্যুনালের স্থলে একটি হলে কোনভাবেই শহীদ পরিবার, বিচার প্রার্থীরা খুশি হবে না। এই বিচার শেষ করতে একশ’র লেগে যাবে। এখনও সংগঠন ও সহযোগী বাহিনীর বিচার হয়নি। আমরা চাই ২০১৯ সালের মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ বিচারগুলো শেষ হোক। সে কারণে দুটি কেন প্রয়োজনে তিনটি ট্রাইব্যুনাল গঠন করতে হবে।

এদিকে আইন মন্ত্রনালয় সূত্রে জানা গেছে, দুটি ট্রাইব্যুনালের মধ্যে একটি নিষ্ক্রিয় করার সিদ্ধান্তের পাশাপাশি বিচারপতির পদেও পরিবর্তন আসতে পারে। ট্রাইব্যুনাল থেকে চার বিচারপতি সুপ্রীমকোর্টে ফিরে যাবেন অন্যদিকে এক বিচারপতি সুপ্রীমকোর্ট থেকে ট্রাইব্যুনালে আসতে পারেন। এ বিষয়ে আজ রবিবার প্রজ্ঞাপন জারি হতে পারে। যে চারজন বিচারপতি ফিরে যেতে পারেন হাইকোর্টে তাদের মধ্যে রয়েছেন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১ এর চেয়ারম্যান বিচারপতি এম ইনায়েতুর রহিম ও সদস্য বিচারপতি জাহাঙ্গীর হোসেন সেলিম এবং ট্রাইব্যুনাল-২ এর চেয়ারম্যান বিচারপতি ওবায়দুল হাসান শাহীন ও সদস্য বিচারপতি মোঃ মুজিবুর রহমান মিয়া।

২০১০ সালের ২৫ মাচ আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল গঠনের পর থেকে আজ অব্দি এর বিরুদ্ধে নানামুখী প্রোপাগান্ডা চলে আসছে। প্রথমে প্রধান তদন্তকারী কর্মকর্তা আব্দুল মতিনের নিয়োগ থেকে ১ অক্টোবর সালাউদ্দিন কাদের (সাকা) চৌধুরীর রায়ের আগের দিন পর্যন্ত নানামুখী প্রোপাগান্ডা চলে। সাকার মামলার রায় আগেভাগে ফাঁস করার অভিযোগ তোলা হয়। ট্রাইব্যুনাল গঠনের পর তদন্তকারী সংস্থার প্রধান হিসেবে আবদুল মতিন নিয়োগ পাবার পরই তার বিরুদ্ধে একের পর এক অভিযোগ আসতে থাকে। ২০১০ সালের ৫ মে আব্দুর মতিন পদত্যাগ করেন।

শুধু তাই নয়, আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১ এর সদস্য অবসরপ্রাপ্ত জেলা জজ একেএম জহিরুল হকের বিরুদ্ধে প্রসিকিউশন পক্ষ অভিযোগ তুলেন। তিনি অনেক সময় আসামি পক্ষকে বেশি সুযোগ-সুবিধা দিতেন। এর পরিপ্রেক্ষিতে সাবেক জেলা জজ একেএম জহিরুল হক ২০১২ সালের ২৯ আগস্ট পদত্যাগ করেন। আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের চেয়ারম্যান বিচারপতি নিজামুল হক নাসিমের সঙ্গে স্কাইপির মাধ্যমে কথোপকথন ফাঁস করে একটি চক্র। এর কারণে বিচারপতি নিজামুল হক নাসিম ২০১২ সালের ১১ ডিসেম্বর স্বেচ্ছায় পদত্যাগ করেন।

এরপর চেয়ারম্যান হিসেবে নিয়োগ দেয়া হয় বিচারপতি এটিএম ফজলে কবীরকে। তিনি অবসরে যাবার পর চেয়ারম্যান হিসেবে বিচারপতি এম ইনায়েতুর রহিম ট্রাইব্যুনাল-১ আসেন। সদস্য হিসেবে নিয়োগ পান বিচারপতি জাহাঙ্গীর হোসেন সেলিম ও বিচারপতি আনোয়ারুল হক। অন্যদিকে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের চেয়ারম্যান হিসেবে নিয়োগ দেয়া হয় বিচারপতি ওবায়দুল হক শাহীনকে। সদস্য করা হয় বিচারপতি মোঃ মুজিবুর রহমান মিয়া ও বিচারপতি মোঃ শাহিনুর ইসলামকে। বতর্মানে ট্রাইব্যুনাল থেকে চার বিচারপতি হাইকোর্টে যাবার পর একজন বিচারপতি ট্রাইব্যুনালে আসবেন। তবে এখন পর্যন্ত একাধিক বিচারপতির নাম শোনা যাচ্ছে। পাশাপাশি ট্রাইব্যুনালের চেয়ারম্যান হিসেবে নিয়োগ পেতে পারেন বিচারপতি আনোয়ারুল হক।

প্রকাশিত : ৬ সেপ্টেম্বর ২০১৫

০৬/০৯/২০১৫ তারিখের খবরের জন্য এখানে ক্লিক করুন

শেষের পাতা



শীর্ষ সংবাদ: