মেঘলা, তাপমাত্রা ৩১.১ °C
 
২৫ সেপ্টেম্বর ২০১৭, ১০ আশ্বিন ১৪২৪, সোমবার, ঢাকা, বাংলাদেশ
সর্বশেষ

চোরাচালান রোধে এবার বিশেষ ডগ স্কোয়াড

প্রকাশিত : ৬ সেপ্টেম্বর ২০১৫
চোরাচালান রোধে এবার  বিশেষ ডগ স্কোয়াড
  • শুল্ক গোয়েন্দার ডিজির নেতৃত্বে ৬ সদস্যের কমিটি
  • জার্মানি থেকে আনা হচ্ছে বিশ্বখ্যাত শেফার্ড ও লেবরাডর
  • প্রতিটি বন্দরে চলবে তল্লাশি

আজাদ সুলায়মান ॥ শাহজালাল বিমানবন্দরসহ দেশের সব বন্দরে চোরাচালান রোধে এবার বিশেষ ডগ স্কোয়াড গঠনের উদ্যোগ নিয়েছে শুল্ক গোয়েন্দা। ইতোমধ্যে কোথায় কী আঙ্গিকে ডগ স্কোয়াড কাজে লাগানো হবে সেটাও নির্ধারণ করা হয়েছে। খুব দ্রুততম সময়ে ডগ স্কোয়াড চালুর লক্ষ্যে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিতে তৎপর ছয় সদস্যের কমিটি। এর আগ পর্যন্ত প্রয়োজনে র‌্যাব-পরিচালিত ডগ স্কোয়াড ব্যবহারেরও সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে। এ লক্ষ্যে র‌্যাব ও শুল্ক গোয়েন্দার মধ্যে একটি সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরের খসড়া তৈরি করা হয়েছে।

চোরাচালান দমনে অর্থমন্ত্রীর নির্দেশে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের নেয়া বেশকিছু পদক্ষেপের অন্যতম হচ্ছে এই ডগ স্কোয়াড। ডগ স্কোয়াড নিয়ে কাজ করার জন্য শুল্ক গোয়েন্দার মহাপরিচালক ডক্টর মইনুল খানকে প্রধান করে ৬ সদস্যের একটি উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন কমিটি গঠন করা হয়েছে। কমিটি ইতোমধ্যে এ প্রকল্পের জন্য একটি ধারণাপত্র তৈরিসহ অন্যান্য ক্ষেত্রে যথেষ্ট এগিয়েছে বলে জানা যায়।

এ সম্পর্কে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড চেয়ারম্যান মোঃ নজিবুর রহমান জনকণ্ঠকে বলেন, দেশের প্রতিটি বিমানবন্দর, স্থলবন্দর ও সমুদ্রবন্দরে ডগ স্কোয়াড সক্রিয় রাখা হলে চোরাচালান আশানুরূপ রোধ করা সম্ভব হবে।

শুল্ক গোয়েন্দার মহাপরিচালক ডক্টর মইনুল খান জানিয়েছেন, শুধু শাহজালাল কেন যে কোন বন্দরে চোরাচালানের মালামাল শনাক্ত করার জন্য এই ডগ স্কোয়াড ব্যবহার করা হবে। কারণ কুকুরের রয়েছে মানুষের চেয়ে ৪০ হাজার গুণ বেশি ঘ্রাণশক্তি। ওগুলোকে সেভাবে প্রশিক্ষণ দেয়ার পর কাজে লাগানো হবে। এতে বিমানবন্দরের কার্গো হাউসসহ বিভিন্ন স্থানে লুকিয়ে রাখা চোরাই মাল অনায়াসে শনাক্ত করা সম্ভব হবে। প্রকৃত অর্থে মানুষ চোরাচালানের মালামাল শনাক্তকরণে বিভিন্ন প্রলোভনে প্রকৃত তথ্য গোপন করতে কিংবা চেপে যেতে পারে। কুকুর কিন্তু সেটা করবে না। তাকে ঘুষ দিয়ে কিনতে পারবেন না। তাকে যে কাজে লাগাবেন সেটাই ঠিক মতো করে দেবে।

বর্তমানে চোরাচালান মাল শনাক্ত করা হয় ম্যানুয়াল পদ্ধতিতে সন্দেহজনক স্থানে তল্লাশি করে। এটা যেমন সময়সাপেক্ষ, তেমনি এতে অনেক নিরীহ লোকের মালামালের জন্য একটা ওটকো ঝামেলা। ডগ স্কোয়াড দিয়ে সারা বিমানবন্দরের যে কোন সন্দেহজনক স্থানে মুহূর্তেই তল্লাশি চালানো সম্ভব।

জানা যায়, শাহজালাল বিমানবন্দর দিয়ে বর্তমানে সোনা, ওষুধ মাদকদ্রব্য ও অন্যান্য নিষিদ্ধ পণ্য চোরাচালান হয়ে আসছে। এখন প্রশ্ন হচ্ছেÑ কুকুর সোনার চালান শনাক্তে কতটা সক্ষম হবে।

জবাবে ডক্টর মইনুল খান বলেন, ‘বর্তমানে সাধারণত অস্ত্র গোলাবারুদ বোমা ও বিস্ফোরক দ্রব্য শনাক্তকরণের কাজে ডগ স্কোয়াড বা কুকুর লাগানো হয়। এর বাইরেও কুকুর দিয়ে অনেক কাজ করা সম্ভব। এ দেশে হয়ত এখনও সোনা শনাক্তকরণে কুকুর ব্যবহার করা হয়নি। সেজন্য যে এটা করা যাবে না, তেমনটি ভাবা ঠিক নয়। কুকুর যদি তার ঘ্রাণশক্তি দিয়ে বোমা ও গোলাবারুদ শনাক্ত করতে পারেÑ তাহলে সোনা, মুদ্রা ও মাদকদ্রব্য কেন শনাক্ত করতে পারবে না। সেজন্যই কুকুরকে সেভাবেই প্রশিক্ষণের উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। এ জন্য বিদেশ থেকে ইন্সট্রাক্টর আনা হচ্ছে। সোনার ঘ্রাণ দিয়ে যদি কুকুরকে প্রশিক্ষণ দেয়া হয় তাহলে সেই কুকুর যেখানেই সোনা থাকুক তা ঠিক শনাক্ত করতে পারবে। এমনকি মাটির নিচেও যদি কোন পদার্থ থাকে সেটাও এ ডগ স্কোয়াড শনাক্ত করতে পারবে।

সূত্র জানায়, জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের সার্বিক আওতায় এ বিষয়ে উদ্যোগ নেয়া হলেও মূলত এ স্কোয়াড নিয়ে কাজ করবে শুল্ক গোয়েন্দা। চোরাচালানের মালামাল দ্রুত শনাক্তকরণে এ ডগ স্কোয়াড যথেষ্ট বুদ্ধিমত্তার পরিচয় দেয় বলে বিশ্বব্যাপী স্বীকৃত। বর্তমানে বিশ্বব্যাপী বিস্ফোরক, অস্ত্র ও গোলাবারুদের দ্রুত অনুসন্ধান ও শনাক্তকরণের কাজে ডগ স্কোয়াড ব্যবহার করা হচ্ছে। বাংলাদেশেও র‌্যাপিড এ্যাকশন ব্যাটালিয়ন (র‌্যাব) ও পুলিশের নিজস্ব ডগস্কোয়াড রয়েছে। এখন পর্যন্ত আইনশৃঙ্খলা রক্ষা, সন্ত্রাস প্রতিরোধ ও জননিরাপত্তার কাজে ডগ স্কোয়াড ব্যবহার করা হয়। এ সব কাজে ডগ স্কোয়াড যথেষ্ট নির্ভরশীল ও আস্থার প্রতীক বলে মনে করছেন নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞরা।

এ বাস্তবতার আলোকেই শুল্ক গোয়েন্দা ডগ স্কোয়াড নিয়ে কাজ শুরু করে দিয়েছে। ইতোমধ্যে ডগ স্কোয়াড নিয়ে একটি ধারণাপত্র তৈরি করা হয়েছে। এতে উল্লেখ করা হয়, চোরচালান রোধে ডগ স্কোয়াড অন্য যে কোন কৌশলের চেয়ে বেশি কার্যকর ভূমিকা রাখতে সক্ষম হবে। এটা চালু করতে খুব বেশি সময় ও অর্থ লাগবে না। বছরখানেকের মধ্যেই সর্বোচ্চ কোটি দুয়েক টাকায়ই এটা করা সম্ভব।

এ সম্পর্কে ডক্টর মইনুল খান জানান, আপাতত ঢাকায় ডগস্কোয়াড চালুর বিষয়টি মাথায় রেখে কাজ চলছে। ডগ স্কোয়াডের জন্য খোলামেলা জায়গা দরকার। কুকুরকে নিরাপদে সুস্থ পরিবেশে রাখা, তাদের লালনপালন ও প্রশিক্ষণের জন্য যে উপযোগী জায়গা দরকার-সেটা রাজধানী বা আশপাশের কোথাও খোঁজা হচ্ছে। যদি না পাওয়া যায় তাহলে চট্টগ্রামে সাগরিকা রোডে কাস্টমসের নিজস্ব একাডেমিতেই স্থায়ীভাবে সেটা চালু করা হবে।

সূত্র জানায়, শক্তিশালী ডগ স্কোয়াডের জন্য কুকুর আনা হচ্ছে জার্মানি থেকে। প্রথমে জার্মানির বিশ্বখ্যাত শেফার্ড ও লেবরাডর রিট্রাইভারস প্রজাতির ৬টি কুকুর আমদানি করা হবে। ওদের ঢাকাতেই প্রশিক্ষণ দেয়া হবে। নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞের মতে, এসব কুকুরের শিকার খ্যাতি রয়েছে দুনিয়াজুড়ে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিরক্ষাসহ বিশ্বখ্যাত বিমানবন্দরগুলোতেও রয়েছে এ সব প্রজাতির কুকুর নিয়ে গড়া ডগ স্কোয়াড। বর্তমান বিশ্বের উন্নত দেশগুলোর গোটা নিরাপত্তা ব্যবস্থা ও পদ্ধতি অনেকাংশেই নির্ভরশীল এই ডগ স্কোয়াডের ওপরই। এমন বাস্তবতার নিরিখেই জাতীয় রাজস্ব বোর্ড চোরাচালান রোধেও ডগ স্কোয়াড গঠনের উদ্যোগ নিয়েছে বলে জানিয়েছেন একটি গোয়েন্দা সংস্থা।

কী ধরনের প্রশিক্ষণ দেয়া হবেÑ জানতে চাইলে ডক্টর মইনুল খান জনকণ্ঠকে বলেন, এমনিতে ডগ স্কোয়াড দিয়ে বোমা গোলাবারুদ ও বিষাক্ত রাসায়নিক দ্রব্য শনাক্তকরণের কাজে ব্যবহার করা হয়। এর বাইরেও চোরাচালানের যে কোন মালামাল অনুসন্ধানে কুকুরকে কাজে লাগানোর যথেষ্ট সুযোগ রয়েছে। যেমন- হযরত শাহজালাল বিমানবন্দর দিয়ে যে হারে সোনা ধরা পড়ছে সব তথ্যই মানুষের দেয়া। কিন্তু বিশাল কাস্টমস হাউসের কোথায় কী লুকানো, কোথায় হেরোইন লুকানো, কোথায় মুদ্রা লুকানোÑ সেটা কিন্তু সোর্স ছাড়া অন্য কোন উপায়ে জানা বা শনাক্ত করা কঠিন। শুধু সন্দেহের ওপর ভিত্তি করে সারা বিমানবন্দরে তল্লাশি বা অনুসন্ধান চালানোও সম্ভব নয়। কিন্তু যদি প্রশিক্ষিত ডগ স্কোয়াড থাকত তাহলে মুুহূর্তে বিমানবন্দরের সন্দেহজনক প্রতিটি পয়েন্টে সার্চ করা সম্ভব হতো।

জানা যায়, গত সপ্তাহে র‌্যাব থেকে ধার নিয়ে ডগ স্কোয়াড দিয়ে তল্লাশি চালানো হয় হযরত শাহজালাল বিমানবন্দরের কার্গো হাউসে। এতে তেমন কিছু না পেলেও একটি কুকুরের অনুসন্ধানে কিছু পুরনো কেমিক্যাাল ধরা পড়ে।

মইনুল খান বলেন, এমন সূক্ষ্ম পদার্থও কুকুরের ঘ্রাণ শক্তিতে ধরা পড়ে। ডগ স্কোয়াড চোরাচালান টাস্কফোর্সকে সত্যিকার অর্থেই কাক্সিক্ষত বস্তু শনাক্তকরণে সহায়তা করতে পারবে এমন বাস্তবতা থেকেই এ উদ্যোগ নেয়া হয়েছে।

জানা যায়, জার্মানির শেফার্ড ও লেবরাডর প্রজাতির কুকুর খুবই ধূর্ত, সাহসী ও বুদ্ধিমান। এদের যা প্রশিক্ষণ দেয়া হয় সেটাই তারা অনুসরণ করতে সক্ষম। এ জন্য বর্তমানের আলোচিত সোনা চোরাচালানের কাজেও এ কুকুরকে ব্যবহার করার মোক্ষম সুযোগ রয়েছে। এ জন্য কুকুরকে সোনার ঘ্রাণ দিয়ে প্রশিক্ষণ দিতে হবে। মুদ্রার জন্য মুদ্রার ঘ্রাণ দিয়েই প্রশিক্ষণ দিতে হবে। এমনকি হেরোইন, ইয়াবা, কোকেন, চরস, মারিজুয়ানার মতো আলোচিত মাদকদ্রব্য শনাক্তকরণেও কুকুর পারঙ্গম। বিশেষ করে জার্মানির এই প্রজাতির কুকুর যে কোন শিকারে বেশ দক্ষ। দুনিয়াব্যাপী তাদের রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তার কাজে ব্যবহার করা হয়ে থাকে। এসব কুকুর মাটির গভীরে লুকিয়ে থাকা কোন বস্তুকেও শনাক্ত করতে পারে।

ডক্টর মইনুল খান বলেন, যত দুর্গম স্থানেই এসব পদার্থ লুকিয়ে রাখা হোক কুকুর মুহূর্তেই তা শনাক্ত করে ফেলতে পারে।

তিনি গত জুনে চট্টগ্রাম বন্দরে ধরা পড়া তেলের ড্রামে কোকেন চোরাচালানের ঘটনা টেনে বলেন, যদি ডগ স্কোয়াড থাকত তাহলে এমন সন্দেহজনক আরও অনেক কন্টেনারে তল্লাশি চালানো যেত। এমনকি সেটা নিয়মিত করা হতো। শুধু সোর্সের ওপর নির্ভর করে ওই একটি কন্টেনারে দীর্ঘ তল্লাশি চালিয়েও এটা নিশ্চিত হওয়া যায়নি ততক্ষণ না পর্যন্ত যতক্ষণ না সেটা ল্যাবরেটরিতে নিয়ে গিয়ে পরীক্ষা করা হয়েছে। যদি প্রশিক্ষিত ডগ স্কোয়াড থাকত তাহলে মুহূর্তেই সেটা শনাক্ত করা সম্ভব হতো। এ নিয়ে এত ঝামেলা ও বেগ পোহাতে হতো না। এ সম্পর্কে র‌্যাব সূত্র জানায়, আপাতত শুল্ক গোয়েন্দার সঙ্গে একটা সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরের প্রস্তুতি নেয়া হয়েছে। চোরাচালান শনাক্তকরণে কাস্টমস যেখানেই ডগ স্কোয়াডের সাহায্য চাইবে, সেখানেই সহযোগিতা দেয়া হবে। এমনকি সেটা রাজধানীর বাইরে চট্টগ্রাম মংলাসহ অন্যান্য বন্দরে হলেও প্রয়োজনে ডগ স্কোয়াড পাঠাতে হবে।

উল্লেখ্য, সম্প্রতি হযরত শাহজালাল আন্তজার্তিক বিমানবন্দর দিয়ে ব্যাপক হারে সোনা চোরাচালান অবিশ্বাস্য পরিমাণে বেড়ে গেছে। এতে সরকারের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ও রাজস্ব বোর্ড বিব্রতকর অবস্থায় পড়ে। রাজস্ব বোর্ড এসব চোরাচালান দমনে ডগ স্কোয়াডসহ একাধিক পদক্ষেপ গ্রহণ করে। এরপর শুরু হয় শুল্ক গোয়েন্দার সাঁড়াশি অভিযান। এতে বড় বড় চালান ধরা পড়তে থাকে। এসব অভিযানে চোরাচালানের ভিত কেঁপে ওঠে। ঢাকায় অবস্থা বেগতিক দেখে চোরাচালানিরা রুট পরিবর্তন করে চট্টগ্রামের হযরত শাহ আমানত বিমানবন্দরে আশ্রয় নেয়। এরপর সেখানেও চলে অভিযান। এতে চোরাচালানিরা দিশেহারা হয়ে পড়ে।

এ সম্পর্কে ডক্টর মইনুল খান বলেন, হয় চোরাচালানিরা পালিয়েছে না হয় তাদের ভিত গুঁড়িয়ে দেয়া হয়েছে। তারপরও এটা শতভাগ নির্মূল বা দমন হয়ে গেছে, সেটা বলা যাবে না। হয়ত চোরচালানিরা রুট পরিবর্তন করে অন্য দিক দিয়ে কাজ সারছে। ডগ স্কোয়াড চালু হলে সেটাও চিহ্নিত করতে সহজ হবে বলে আমার দৃঢ়বিশ্বাস।

প্রকাশিত : ৬ সেপ্টেম্বর ২০১৫

০৬/০৯/২০১৫ তারিখের খবরের জন্য এখানে ক্লিক করুন

প্রথম পাতা



শীর্ষ সংবাদ: