মেঘলা, তাপমাত্রা ৩১.১ °C
 
২২ সেপ্টেম্বর ২০১৭, ৭ আশ্বিন ১৪২৪, শুক্রবার, ঢাকা, বাংলাদেশ
সর্বশেষ

প্রতিবাদের ভাষা গম্ভীরা আলকাপ

প্রকাশিত : ৫ সেপ্টেম্বর ২০১৫

পশ্চিমবঙ্গের মালদহের আদি আঞ্চলিক লোকজ গম্ভীরা এখন চাঁপাইনবাবগঞ্জের লোকসংস্কৃতি হিসেবে জাতীয় পর্যায়ে স্থান পেয়েছে। চাঁপাইয়ের অপর লোকজ আলকাপ এই অঞ্চলের একেবারে নিজস্ব সংস্কৃতি, যা এখন বিলুপ্তির পথে। সব মিলিয়ে গম্ভীরা আর আলকাপ চাঁপাইনবাবগঞ্জের একান্ত নাড়ি থেকে সৃষ্ট সংস্কৃতি বললেও ভুল হয় না। তাই প্রথমেই গম্ভীরার আদি রূপ ও রূপরেখা নিয়ে আলোচনা করা যেতে পারে। চাঁপাইনবাবগঞ্জ দেশ বিভাগের পূর্বে পশ্চিম বাংলার মালদহ জেলার অন্তর্ভুক্ত ছিল। সুকুমার রায়ের মতে, শিব ধর্মের প্রতি বিশেষ অনুরাগের কারণে গম্ভীরা সেন রাজাদের সময়ে তা লাইম লাইটে আসে। শিবের স্তুতি গানের মধ্য দিয়ে প্রকাশ করতে গিয়ে গম্ভীরার সৃষ্টি হয়। আবার গবেষকদের ভিন্নতায় উঠে এসেছে হর্ষবর্ধন, শশাঙ্ক, সেন ও পালবংশের সকলেই শিব পূজাতে ডুবে ছিল। এমনকি গুপ্তযুগে রাজ্য বিশেষে ব্রহ্মা পূজার পাশাপাশি শিব ও বিষ্ণু পূজা ছিল প্রধান। তারা মন্দিরে পূজা শেষে গম্ভীরা গানের আয়োজন করত। লৌকিক ধর্মের চেহারাকে গম্ভীরাতে রূপান্তরিত করে কৃষক সমাজ সেসব দিনে আনন্দ উৎসবে মেতে উঠেছে। তখন গম্ভীরা গানে শিবকে উপলক্ষ করে বর্ষবিবরণী বা বর্ষপর্যালোচনা উঠে এসেছে। চাওয়াপাওয়া বা বঞ্চিত হবার বিষয়গুলো গানের স্টাইলে সুর করে পরিবেশনের মধ্য দিয়েই গম্ভীরার রূপান্তর শুরু। গম্ভীরা গায়কগন শিব স্তুতির এক পর্যায়ে ভোলাকে ভোলানাথ বা ভোলাকে নানারূপে আবির্ভূত করেছিলেন। এসবের মধ্য দিয়েই চলে আসে প্রতীকী নানা আর তার হাত ধরে নাতি। নানার সঙ্গে নাতির ঠাট্টা তামাশার রেওয়াজটা সহস্র বছরের আগের আদিরূপ। ঠাট্টা তামাশার পরতে পরতে বা ধারাবাহিকতায় বিগত বছরের সব সামাজিক প্রাকৃতিক দুঃখ দুর্যোগ, এমনকি শাসকদের জুলুম অত্যাচার বঞ্চনার কথাও পেশ করা হতো প্রতিকার কল্পে। প্রাচীনকালে আরও একটি রেওয়াজ ছিল ঢেঁকি চুমানো। সেখানে তৈরি করা হতো গম্ভীরাঙ্গন। একজন নারদ সেজে ঢেঁকিটি রেখে দিত গম্ভীরাঙ্গনে। চৈত্রসংক্রান্তিতে চড়ক উৎসব শেষে গম্ভীরা পার্বণের ইতি টানা হতো। ভারতে পশ্চিমবঙ্গের গ্রামীণ সমাজে পুরান পদ্ধতিতে গম্ভীরার এই পার্বণটি টিকে থাকলেও সময়ের বিবর্তনে বর্তমান বাংলাদেশে অর্থাৎ চাঁপাইনবাবগঞ্জ অঞ্চলে এ ধরনের উৎসবের খবর আর মেলে না। বিবর্তনটা ভিন্নমাত্রার বললে ভুল হয় না। আর এতে যোগ হয়েছে চল্লিশের দশকে দেশভাগের কারণে। শিব ঠাকুর বিদায় নিয়ে এসেছে বা সরব হয়েছে নানা-নাতি সম্পর্ক। দর্শক শ্রোতাদের কাছে নানা-নাতির আবেদন গ্রহণযোগ্যতা পেয়েছে। যদিও শুরুটা আদি আবেগ নিয়ে দেশ বিভাগ পূর্ব সময়ে আঘাত হেনেছিল ব্রিটিশকে। কারণ ব্রিটিশ শাসনের শেষ দিকে তাদের অত্যাচার অনাচারে অতিষ্ঠ ছিল মানুষ। ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলন তীব্র থেকে তীব্রতর হয়েছিল তার ফলশ্রুতিতে। সুফি মাস্টার চাঁপাইনবাবগঞ্জের শিবগঞ্জ অঞ্চলের সন্তান ছিলেন। আব্দুর রহমান, ভজু, ফজলুল হক, ধরনী ধর, সতীজ কবিরাজ, গোপীনাথসহ একাধিক গীতিকার ব্রিটিশ উপনিবেশ উচ্ছেদ বা ঘায়েল করতে গম্ভীরাকে পুরোপুরি ব্যবহার করেন। এরই ধারাবাহিকতায় সোলেমান মোক্তার মুসলিম লীগের নেতা হয়েও গম্ভীরা গানের রচয়িতা সেজে বিশেষ ভূমিকা পালন করেন। বিশেষ করে ত্রিশ দশকের পর থেকেই গম্ভীরা রাজনৈতিক ঘটনার প্রতিক্রিয়া হিসেবে রচিত হয়েছে।

আলকাপ : জেলার অপর সাংস্কৃতিকাঙ্গন হচ্ছে আলকাপ। বিলুপ্ত প্রায় আলকাপ। গম্ভীরার চর্চা নিজস্ব আদলে করা হলেও আলকাপের চর্চা একেবারে নেই। বর্তমান প্রজন্মের কাছে আলকাপ গান কি? জিজ্ঞেস করলে জবাব মেলে না। অথচ সমৃদ্ধ এই লোকসঙ্গীতের মধ্যে নাচ, গান, বন্দনা ছড়া, নাটকীয়তা সবই ছিল। বিলুপ্তির কারণে তাৎক্ষণিক কোন আলকাপের দল পাওয়া যায় না।

আলকাপের প্রতিশব্দ হচ্ছে মস্করা, ঢং বা কৌতুক। মজার ব্যাপার আলকাপে কোন নারী অংশগ্রহণ করে না। তবে নারী চরিত্র রয়েছে। পুরুষদের মধ্য থেকে সুন্দর ও মিষ্টি চেহারার অল্পবয়সী ছেলেরা মেয়ের পোষাক পরে নারী চরিত্রে অভিনয় করে থাকে।

Ñডি.এম তালেবুন নবী

চাঁপাইনবাবগঞ্জ থেকে

প্রকাশিত : ৫ সেপ্টেম্বর ২০১৫

০৫/০৯/২০১৫ তারিখের খবরের জন্য এখানে ক্লিক করুন


শীর্ষ সংবাদ: