২০ অক্টোবর ২০১৭,   ঢাকা, বাংলাদেশ   শেষ আপডেট এই ঘন্টায়  
Login   Register        
ADS

লোকজ ধারাতেই ॥ বহমান জীবন সমাজ


নব্য প্রস্তর যুগে পাথরের ঘর্ষণে আগুন উদ্ভাবন হয়ে বনের প্রাণী ও পাখি পুড়িয়ে খাওয়ার অভ্যাসের সঙ্গেই সভ্যতার ধারা সূচিত হয়। এর মাধ্যমেই রচিত হয় লোকজ। সমান্তরালভাবে এগিয়ে যেতে থাকে সভ্যতার বিকাশ। প্রাগৈতিহাসিক প্রতœ যুগ থেকে নব্য যুগ হয়ে পরবর্তী সময়ে রূপান্তরিত হয়ে দেশে দেশে লোকজ ধারা বহন করে চলেছে। একটি উদাহরণেই তা পরিষ্কার হবে- বনের পশুপাখি আগুনে পুড়িয়ে খাওয়ার রীতি কালের আবর্তে বর্তমানে চায়নিজ রেস্তোরাঁয় চিকেন ফ্রাই ও চিকেন গ্রিলে পৌঁছেছে। আদিম মানুষ গাছের ছাল বাকল পরে লজ্জা নিরারণের পর পালাবদলে তাঁত ও কাপড় আবিষ্কার করে প্রথমে লুঙ্গির যাত্রা শুরু হয়। লোকজ রূপান্তরে লুঙ্গির ধারায় ঢিলেঢালা ট্রাউজার পরা হয়। আমাদের জীবনাচরণ আমরা যা কিছুই করি যা ব্যবহার করি সব কিছুই এসেছে লোকজ থেকে। ইংরেজীতে ফোকলোর। সহজ কথায় আমাদের ‘অরিজিন’ (গোড়া বা শিকড়) লোকজ। লোকজ ধারায় বিবর্তনে আধুনিকতার পথে চলছি হাজার বছর ধরে। আমাদের জীবনে কর্মে সামাজিক আচার আচরণে বিয়ে পারিবারিক অবস্থানে সর্বোপরি বাঙালী জীবন সংস্কৃতি সবকিছুতেই আছে লোকজ। মাটির নিচে আমাদের প্রতœ সম্পদ অনুসন্ধানে মৃৎশিল্পের সঙ্গে আরও যা মিলছে তা পরখ করে স্পষ্ট বোঝা যায় সেই একই ধারাতে প্রতœ যুগের লোকজ রূপান্তরিত হয়ে এগিয়ে চলেছে।

এগিয়ে চলার ধারায় চৈত্র মাসের শেষ দিনের উৎসব আজও মুছে যায়নি। গ্রামের গৃহস্থ ও কিষান বাড়ির আঙিনা পরিষ্কার করে মাটি পানিতে গলিয়ে কাপড়ের টুকরো অথবা কিছু খড় দিয়ে লেপে দেয়া হয়। যে ধারায় ঢুলিরা ঢোল বাজিয়ে গাঁয়ের বধূরা গীত গেয়ে নেচে পুরুষরা বড় নৌকা করে মাঝ নদীতে গিয়ে চাঁদের আলোয় উৎসবে মেতে ওঠে। এই সময়েই মরাগাঙে গ্রামের কিষান ও তরুণরা পলই খালই নিয়ে কাদা পানিতে পলই গেড়ে হাত ঢুকিয়ে মাছ শিকার করে। আবার অগ্রহায়ণে ফসলের মাঠে সারিবদ্ধ হয়ে কণ্ঠে একেক অঞ্চলের নিজস্ব সুর তুলে গান গেয়ে কাঁচি দিয়ে ধান কাটে। যেন লোকজ ছন্দ। ক্লান্ত অবসন্ন শরীরে ঘরে ফিরে উঠানে বসে কিষানির আদরে প্রশান্তি পাওয়া কত মধুর...। মৃদু শীতের কুয়াশায় ভরা চাঁদের আলোয় উঠানে বসে নতুন ধানের স্বপ্নে কিষান-কিষানির আলাপন লোকজের জীবনাচারের ভালবাসাকেই তুলে ধরে।

আমাদের লোকজের সবচেয়ে বড় আয়োজন এবং সম্প্রীতির বন্ধন বাংলা নববর্ষে। একমাত্র বৈশাখের প্রথম দিন দেশের প্রতিটি কোনায় সকল ধর্মের সকল বর্ণের মানুষ মিলিত হয়ে যে উৎসবে আনন্দে মেতে ওঠে তার সবটুকুই লোকজ। মেলার আয়োজনে শিকড়ের তথা প্রাগৈতিহাসিক প্রতœযুগ নব্যযুগের ধারায় পরবর্তীকালের লোকজ সকল অনুষঙ্গই খুঁজে পাওয়া যায়। একেবারে গভীরের রূপটি অপরূপ হয়ে ওঠে। শিশু ও কিশোর বেলা গ্রামের সেই পথঘাট, বটতলার সেই বাঁশির সুর, ঢাকের বাদ্য, মাটির থালায় (সানকি) পান্তা ভাত, জিলাপি লই মুড়ি খাগরাই পুতুল খেলার মাটির হাঁড়িপাতিল, কবিগান পালা গান গীতের সঙ্গে হেলেদুলে নাচ...শিকড় থেকে উঠে আসা কত যে আয়োজন...।

লোকজ উৎসবের কোনটি নাচ কোনটি গান তা খুঁজে পাওয়াই যেন আরেক আনন্দের ছন্দে রূপ নেয়। কথা বলছে নাচছে আবার গাইছে। নাচ গান সংলাপের এই অদ্বৈত রূপকে ইতিহাসের পাতায় কেউ বলেছেন, ‘কথার ত্রয়ী’। লোকজ সংস্কৃতির আদি রূপে যখন যাত্রার প্রচলন হয় তখন বিশেষ সুরে টানা সংলাপনির্ভর যাত্রাকে লোকজন বলত গান। এখনও যাত্রাপালা দেখতে যাওয়ার সময় বলা হয় ‘যাত্রা গান শোনা।’ চর্যাপদে বাঙালীর প্রাচীন সমৃদ্ধ যে ধারণা মেলে সেখানে সকল আবেগ অনুভূতি প্রকাশের যত বাহন তা লোকজ ধারা। যা দেশের একেক অঞ্চলে একেকরকম। চর্যাপদের শীর্ষে রাগ রাগিনীর প্রয়োগে প্রাচীন ধ্রপদী সঙ্গীতের সঙ্গে বাঙালীর নিবিড় পরিচয় ছিল লোকজে। ওই সময়েই বাঙালীর নিজস্ব সুরেরও মিশ্রণ ঘটে। যার প্রভাবে বাঙালীর কীর্তন ঝুমুর বাউল গানে আমাদের লোকায়ত সঙ্গীত ভাবনার প্রতিফলন ঘটে। রবীন্দ্রনাথের গান ও অনেক কবিতায় তাই দেখা যায়। শান্তি নিকেতনে এক বক্তৃতায় কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর বাউলগান এবং কীর্তনকে বাঙালীর নিজস্ব পরিচয়জ্ঞাপক সঙ্গীত বলে উল্লেখ করেন। যা লোকজ। রবীন্দ্রনাথের অনেক গানে বাউলের প্রভাব দেখা যায়। যেমন ‘যদি তোর ডাক শুনে কেউ না আসে তবে একলা চলো রে... গানটি একটি ক্ষ্যাপা বাউলের সুর ‘হরি নাম নিয়ে জগৎ মাতালে তুই একলা নিতাই রে...’।

বাঙালীর এই শিল্পের আখ্যানে নাট্যকলা বা নাটক স্পষ্ট হয়ে ওঠে। এভাবেই হাজার বছরের ধারায় তৈরি হয়ে আছে আমাদের লোকজের নিজস্ব কাব্য নিজস্ব সাহিত্য। যে সাহিত্য রস সুধায় মহিমান্বিত। যার শাখা প্রশাখাতেই রচিত হয়েছে নানা উপাখ্যান। কাব্য, গীত, লোকসঙ্গীত, লোকনাট্য, গীতিনাট্য নৃত্যনাট্য তো আছেই এর সঙ্গে অনু উপাখ্যানও রয়েছে। সবই এক সুতায় গাঁথা মালা। আমাদের জারি, সারি, ভাটিয়ালি, ভাবগান, নৌকা বাইচের গান, মুর্শিদী, আলকাপ (এই আলকাপ থেকেই গম্ভীরার সূচনা), যোগীগান, মনসার গান, লীলা, রামায়নী, পালাগান, গম্ভীরা, পটগানের সঙ্গে আদিম ধারার সঙ্গীত নাচের যে বলয় তৈরি হয়ে আছে তা নানা বর্ণে বাঙালী জীবনের কোন না কোন ধারায় পাখনা মেলে জানান দেয় শিকড়ের গভীরতা কত! ঋতু বৈচিত্র্যের পালাবদলও ঘটে একই ধারায়। প্রকৃতির উপাদানে বর্ষার ফুলের পরিচিতি ঘটেছে কদমকে দিয়েই। শরতের পরিচিতি শিউলি (শেফালী)। পদ্ম ফুলকে নিয়েও আছে লোকজ থিম। আমাদের লোকজ উপাদান নিয়েই গ্রামবাংলা সাজানো। কৃষকের আঙিনায় গৃহস্থালি, ফসলের মাঠে, মাছ ধরায় ব্যবহার্য সকল উপকরণ একই ধারায়। এর ওপরেই রূপান্তর এসেছে। হালের লাঙলের বদলে কলের লাঙ্গল, ঢেঁকির বদলে হাসকিং মেশিন, বলদ দিয়ে খচিয়ে ধান মাড়াইয়ের রূপান্তরে মাড়াই যন্ত্র, চৌর বা ডিঙ্গি সেচের বদলে সেচ পাম্প, নৌকার দাঁড় ও বৈঠার বদলে ইঞ্জিন...। পাশাপাশি গ্রামীণ জীবনের খেলা হাডুডু, কানামাছি বৌছি, ডাঙ্গুলি, ওপেনটি বায়োস্কোপ লাঠি খেলা পাতা খেলা নৌকাবাইচ...কী নেই লোকজের আওতায়। গ্রামের বিয়েশাদির আচার আচরণে আনুষঙ্গিতা, কলাগাছের তোরণ, বরকনের গায়ে হলুদ, গীত গাওয়া, বিয়ের পর দিরাগমন, একেক অঞ্চলে বিয়ের একেক রীতি, কনের প্রথম শ্বশুরবাড়িতে যাওয়ার সময় নানি দাদি অথবা প্রবীণ কারো সঙ্গে যাওয়া কত যে ধারা..! খরার সময় বৃষ্টির জন্য ব্যাঙের বিয়ে দেয়া। হিন্দু ধর্মাবলম্বীরা পুরনো বট পাকুড়ের গাছের বিয়ে দেয় লোকজ ধারাতেই।

বাংলার এমন কোন রূপ নেই যা বয়ে আনে না লোকজ। বাঙালীর সকল আখ্যান উপাখ্যান অনুউপাখ্যান নিজস্ব পরিম-লে নিজস্ব বলয়ে সৃষ্টি হয়ে আছে। যাকে বাঙালীর ভূগোলও বলেছেন কেউ কেউ। তর্কে এর পক্ষে বেশি যুক্তি এসেছে। যেমন নদী পাররত প্রাচীন একটি কথা ‘ভব নই গহন গম্ভীর বেগে বাহি/দু আন্তে চিখিল মাঝে না থাই’ (যার অর্থ- ভব নদী গহন ও গম্ভীর বেগে প্রবাহিত হচ্ছে, দুই ধারে কর্দম মাঝে ঠাঁই পাওয়া যায় না)। যে কথাগুলো প্রমাণ করে বঙ্গীয় উপখূলের নদী হাওড় বাঁওড় বিল কোমল কাদামাটি। মনসা মঙ্গলে বেহুলা লখখিন্দরের পৌরাণিক ধারার সঙ্গে করুণ উপাখ্যান, দিনাজপুরের বিষহরির পালা, বরিশালের বয়ানিগান, রাজশাহীর পুঠিয়ার মনসার গান, মানিকগঞ্জের বেহুলার হাস্তন, ভাসান যাত্রা ইতাদি। চাঁপাইনবাবগঞ্জের গম্ভীরা কোন বিষয়ে নানা নাতির সংলাপের সঙ্গে বিশেষ এক ধরনের সুর লোকজ আলকাপ থেকেই লুপাতীত হয়ে এসেছে। এই আলকাপের কথা লোকজের সকল পাঠকেই তুলে ধরে। বাঙালীর সকল আচার আচরণে জীবনধর্মী যা কিছু প্রতœযুগ নব্য যুগ পেরিয়ে রূপান্তরিত হয়ে চলমান এবং আগামীর পথে এগিয়ে যাওয়া তার সবই লোকজের শিকড়ের ওপর দিয়েই। সকল পরিবেশনা হাজার বছরের লোকজের ত্রয়ী ও ধ্রুপদীর সহস্র আঙ্গিকের বহু শাখা-প্রশাখার ভিন্ন ভিন্ন ধারা। যা দূর অতীতে নিয়ে যায়। যেখানে পৌরাণিক থেকে প্রকৃতি ও বাস্তবতার মিশ্রণে মাটির গভীরতা থেকে উৎসারিত হয়েছে বাঙালী লোকজ সংস্কৃতির শিকড় থেকেই।

Ñসমুদ্র হক, বগুড়া থেকে