২৩ নভেম্বর ২০১৭,   ঢাকা, বাংলাদেশ   শেষ আপডেট এই মাত্র  
Login   Register        
ADS

ভূত বন্ধু


আজ থেকে ত্রিশ বছর আগের কথা। তখন আমি পড়ি পঞ্চম শ্রেণীতে। একদিন সন্ধ্যা রাতে হিম হিম বাতাস বইছে। আমি বাসার ছাদে আধো আলো আঁধারে আপনমনে আমি হাঁটছি। হাঁটছি কীÑ পায়চারি করছি।

এমন সময় বাতাসের একটা ঝাপটা এসে লাগল আমার শরীরে। সেসঙ্গে আশ্চর্য মিষ্টি একটি সুবাস পেলাম। বুকভরে ঘ্রাণ নিয়ে ভাল করে আশপাশে তাকিয়ে দেখলাম। না নেই। কোথাও কেউ নেই। কেউ নেইÑ তাহলে ঘ্রাণটা এলো কোথা থেকে! কে ছড়াল এই সুবাস! আশ্চর্য ব্যাপার!

আমি যখন অবাক হয়ে এসব ভাবছিÑ ঠিক তখন কেউ একজন পেছন থেকে আমার মাথায় একটা টোকা মারল। আমি পেছনে তাকিয়ে দেখিÑ কেউ নেই। কেউ যখন নেই, তাহলে টোকাটা মারল কে?

এমন সময় অদৃশ্য থেকে ভেসে এলো হো-হো-হো। হা-হা-হা। হি-হি-হি। হাসিটা একটানা চলতেই লাগল। ভয়ে থরথর করে আমি কাঁপতে লাগলাম। চোখ দুটো কেমন যেন বের হয়ে আসতে চাইল। দরদর করে আমি ঘামছি। আমার হাত-পা কেমন যেন অসাড় হয়ে আসছে। মনে হচ্ছে এখনই আমি ফিট হয়ে যাব। অচেতন হয়ে লুটিয়ে পড়ব মেঝেতে। সহসা ভুতুড়ে হাসিটা থামল। আমি ভয়ার্তকণ্ঠে জিজ্ঞেস করলাম, কে-কে? কে ওখানে?

সঙ্গে সঙ্গে জবাব এলো, ভয় পাস্নে খোকা। আমি তোকে মারব না। আমি খুবই শান্তশিষ্ট। খুবই নিরীহ।

ওর কথা শুনে আমি যেন হালে পানি পেলাম। জানতে চাইলাম, কে তুমি? তোমার কথা শুনতে পাচ্ছিÑ অথচ আমি তোমাকে দেখতে পাচ্ছি না কেন?

জবাব এলো, দেখতে পাওয়ার তো কথা না। আমার কোন শরীর নেই। শরীর না থাকলে কী দেখা যায়রে বোকা?

আমি বললাম, তা অবশ্য ঠিক। কিন্তু কে তুমি ভাই?

আবার জবাব এলো, আমি জনৈক ভূত। জীবিতকালে আমি তোর দাদার ভাল বন্ধু ছিলাম। একসঙ্গে আমরা থাকতাম। খেলাধুলা করতাম। ইচ্ছেমতো দুষ্টমি করতাম। নানারকম মজা করতাম।

ওর কথা শুনে আমি অবাক হয়ে বললাম, তাই নাকি! তা তোমার নাম কি? আমি তোমাকে কী নামে ডাকব?

জবাব এলো, নাম নিয়ে সমস্যা নেই। আমি যখন তোর দাদুর বন্ধু, তুই আমাকে ‘ভূতদাদু’ বলেই ডাকিস।

আমি বললাম, আচ্ছা ভূতদাদু। তুমি এখন কোথায়? আমি তোমাকে দেখতে পাচ্ছি না কেন?

ভূতদাদু বলল, দেখতে পাবি কীভাবে রে বোকা! বললাম নাÑ আমার শরীর নেই। আমি বাতাসে ভেসে আছি।

আমি বললাম, তাই নাকি? আশ্চর্য তো!

ভূতদাদু বলল, বাতাসে ভেসে থাকা ভারি মজা। তুই ভাসতে চাস্ নাকি? চাইলে বল্।

বললাম, কিন্তু কীভাবে বাতাসে ভাসব? আমার একটা শরীর আছে। শরীরের একটা ভর আছে। যা ইচ্ছে করলেই বাতাসে ভাসিয়ে রাখা যাবে না।

ভূতদাদু বলল, এমন কথা কে বলেছে তোকে, হ্যাঁ? যে ভারি শরীরকে বাতাসে ভাসিয়ে রাখা যাবে না।

বললাম, বলেনি কেউ। তবে বোঝা যায়।

ভূতদাদু বলল, কচু বোঝা যায়। এই যে দেখ্ তোকে আমি কেমন বাতাসে ভাসিয়ে রাখি। বলে সত্যি সত্যি তিনি আমাকে শূন্যে তুলে বাতাসে ভাসিয়ে দিলেন। সে সময় আমি শরীরের কোন ওজনই অনুভব করলাম না। আশ্চর্য নয় কি? শেষে বললাম, আচ্ছা ভূতদাদু! এই যে তুমি আমাকে আশ্চর্য রকমভাবে বাতাসে ভাসিয়ে রেখেছ, এই ক্ষমতা তুমি কোথায় পেলে?

আমার কথা শুনে ভূতদাদু একদফা হেসে নিলেন। হা-হা-হা। হি-হি-হি। হো-হো-হো। তারপর বললেন, বোকা! আমি কী আর তোর মতো মানুষ নাকিরে। বললাম নাÑ আমি হলাম ভূত। ভূতেরা পারে না, এমন কিছু জগতে নেই। ভূতেরা সবকিছু পারে। ওসব তুই এখন বুঝবি না। তোর বোঝার অবশ্য কথাও না।

আমি বললাম, বুঝিয়ে বল না ভূতদাদু। বুঝিয়ে বললে হয়ত বুঝতে পারব।

ভূতদাদু বলল, এই যেÑ এইভাবে। বলে তিনি কীভাবে শূন্যে ভেসে থাকতে হয়, সেই কৌশল আমাকে শিখিয়ে দিলেন। কৌশলটা শিখে পরে আমি অবিকল পাখির মতো কতক্ষণ আকাশে উড়ে বেড়ালাম। শূন্যের ওপর ঘুরে বেড়ালাম। শূন্যে ওড়াউড়িটা আসলেই খুব মজার!

ভূতদাদুর নিকট শূন্যে ভাসার কৌশলটা শিখে আমার মনে হলো বিষয়টা তত জটিল না। শুধুই ইচ্ছাশক্তির ব্যাপার।

ইচ্ছাশক্তি প্রবলতর হলে কারও পক্ষে শূন্যে ভেসে বেড়ানো কোন ব্যাপারই না। যেমন-পক্ষীকুল ডানা মেলে আপনমনে বাতাসে ভেসে বেড়ায়।

ফিরে যাবার আগে ভূতদাদু আমাকে একটি মূল্যবান জিনিস দিয়ে গেল। আর তা হলো একটি দাঁত। বন্দুকের গুলির মতো দেখতে সাদা দাঁতটি আমার হাতে দিয়ে বলল, এটাকে শুধু সামান্য একটা দাঁত মনে করিস না যেন। এটাকে ইচ্ছাশক্তি বাড়ানোর ওষুধ বলতে পারিস। এই দাঁতটি হাতের মুঠোয় নিয়ে তুই মনে মনে যা হতে ইচ্ছা করবি, বাস্তবে তাই হয়ে যাবি।

সে ঘটনার পর ভূতদাদু মানে আমার ভূত বন্ধুর সঙ্গে কোনদিন আর দেখা হয়নি। তাই বলে আমি কিন্তু হাত-পা গুটিয়ে একেবারে বসে নেই। ভূতদাদুর রেখে যাওয়া দাঁতটি নিয়ে আমি এখন ছোট বাচ্চা-কাচ্চাদের স্কুলে গিয়ে নানারকম জাদু দেখাই। কতরকম জাদুই না আমাকে দেখাতে হয়। শূন্যে ভেসে থাকার জাদু। অদৃশ্য হয়ে যাওয়ার জাদুÑইত্যাদি।

জাদু দেখে বাচ্চারা খুব জমা পায়। আনন্দে তারা হাততালি দেয়। হৈচৈ করে ওঠে।