১৮ নভেম্বর ২০১৭,   ঢাকা, বাংলাদেশ   শেষ আপডেট ৩ ঘন্টা পূর্বে  
Login   Register        
ADS

ময়মনসিং শহরবাসীর দুঃখ জলাবদ্ধতা


বাবুল হোসেন, ময়মনসিংহ ॥ শহরের আউটার স্টেডিয়াম এলাকায় স্ত্রী-সন্তানদের নিয়ে থাকেন পৌর কর্মচারী আকরাম আলী (৪৮)। চলতি বর্ষা মৌসুমের প্রতিটি ভারি বর্ষণে যারপরনাই নাকাল হয়েছেন তিনি। বসতঘরের ভেতরে পানি, বাইরে চারপাশে পানি, রাস্তায় নামলে কোমর সমান পানি। শোবার ঘর থেকে রান্নাঘরÑ সবখানে হাঁটু সমান পানি। ড্রেন উপচানো নোংরা ও ময়লাযুক্ত এই পানি থেকে রেহাই পেতে গেল বছর বসতঘরের চারপাশ উঁচু করে দেয়াল দিয়েছিলেন। এবারের বর্ষায় সেই দেয়াল উপচে পানি ঢুকেছে ভেতরে। স্ত্রী-সন্তানদের নিয়ে রাতভর পানি সেচ দিয়েও কূল-কিনারা করতে পারেননি। শহরে বাস করার পরও এমন পানি দেখে বিস্ময়ে হতবাক স্ত্রী সন্তানেরা। এ রকম নারকীয় দুর্ভোগ নিয়ে গত কয়েক বছর ধরে বাস করছেন আউটার স্টেডিয়ামসহ ময়মনসিংহ পৌর এলাকার ২ নম্বর ওয়ার্ডের অন্তত পাঁচ হাজার পরিবার। বর্ষা মৌসুমে সামান্য থেকে ভারি বৃষ্টিপাতে এই ওয়ার্ডের বাসিন্দারা অবর্ণনীয় দুর্ভোগের শিকার হলেও কোন প্রতিকার পাচ্ছেন না তারা। পৌর এলাকার এই ওয়ার্ডের পানি নিষ্কাশনে কোন ড্রেনেজ ব্যবস্থা না থাকায় আউটার স্টেডিয়াম, ইটাখলা, গোলাপজান রোড, কাশর, জেলখানা এলাকার পানি সরে যেতে পাঁচ-সাত দিন লেগে যায়। এ সময় পানিবন্দী হয়ে থাকতে হচ্ছে বাসিন্দাদের। সমস্যা সমাধানে একাধিকবার পৌর মেয়র প্রতিশ্রুতি দিলেও কার্যকর কোন সমাধান পায়নি এলাকাবাসী-অভিযোগ আউটার স্টেডিয়াম এলাকার বাসিন্দা মুক্তিযোদ্ধা সেলিম সাজ্জাদের।

কেবল পৌর এলাকার এই ২ নম্বর ওয়ার্ড নয়, হাল্কা থেকে মাঝারি বৃষ্টিপাতে শহরের আবাসিক ব্রাহ্মপল্লী, পুরহিতপাড়া, ডেঙ্গু ব্যাপারী রোড, কৃষ্টপুর, বাঘমারা, চরপাড়া কপিক্ষেত, চরপাড়া নয়াপাড়া, নওমহল, কলেজ রোড, হামিদ উদ্দিন রোড, গুলকিবাড়ি, জিলা স্কুল রোড, নতুনবাজার, আমলাপাড়াসহ বাণিজ্যিক এলাকা সিকে ঘোষ রোড, গাঙিনাপাড়, স্টেশন রোড, মালগুদাম, রামবাবু রোড, দুর্গাবাড়ি রোড এর বাসা-বাড়ি ও ব্যবসায়িক দোকানপাট হাঁটু ও কোমর সমান পানিতে তলিয়ে যাচ্ছে। আর টানা বর্ষণে প্লাবিত হয়ে যাচ্ছে পুরো ময়মনসিংহ শহর। ৪০ থেকে ৮০ মিলি মিটার বৃষ্টিপাতে শহরজুড়ে দেখা দিচ্ছে জলাবদ্ধতা। এ সময় ভরাট ড্রেন উপচে নোংরা ও ময়লাযুক্ত পানি ঢুকছে বাসা-বাড়ি এবং দোকানপাটে। শহরের প্রধান সড়ক ও বাণিজ্যিক এলাকার এই নোংরা ও ময়লাযুক্ত পানি ৩-৪ ঘণ্টার মধ্যে সরে গেলেও অনেক আবাসিক এলাকার এই পানি সরে যেতে সময় লাগছে ৫ থেকে ৭ দিন। পৌর কর্তৃপক্ষের সূত্র জানায়, শহরের অনেক অসচেতন মানুষ ময়লা-আবর্জনা ড্রেনে ফেলছে। বহুতল ভবন নির্মাণের সময় পাইলিংয়ের মাটিতেও ভরাট হচ্ছে ড্রেন। ফলে ড্রেনে সহজে পানি নামতে পারছে না। আর ভুক্তভোগীরা জানায়, নিয়মিত পরিষ্কার না করায় ড্রেনগুলো ভরাট হয়ে এই পরিস্থিতির উদ্ভব হচ্ছে। এর বাইরে প্রয়োজনীয় ড্রেনের অভাব তো আছেই। অথচ নিয়মিত ড্রেন পরিষ্কার করার জন্য স্থানীয় কাউন্সিলরদের বিপরীতে চাহিদার শ্রমিক বরাদ্দ দেয়া আছে। অভিযোগ একশ্রেণীর কাউন্সিলর বরাদ্দের শ্রমিক না খাটিয়েও এই খাতের টাকা নয়ছয় করছেন। এসব নানা কারণে প্রাচীন জেলা শহর ময়মনসিংহের জলাবদ্ধতা এখন স্থায়ী রূপ নিয়েছে। ফলে ময়মনসিংহ শহরবাসীর এখন প্রধান দুঃখ এই জলাবদ্ধতা। অথচ ময়মনসিংহ পৌরসভার এই জলাবদ্ধতা সমস্যার সমাধানে একের পর এক প্রকল্প তৈরি ও বাস্তবায়নে ব্যায় করা হয়েছে অর্ধশত কোটি টাকা। অভিযোগ প্রকল্পের টাকা যথাযথভাবে ব্যবহার না করে নয়ছয় করার কারণেই শহরবাসী এই নারকীয় যন্ত্রণা থেকে মুক্তি পাচ্ছে না। প্রভাবশালী একাধিক ঠিকাদারের কাজ সঠিকভাবে বুঝে নেয়ার ক্ষেত্রে পৌরসভার সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ ছিল অসহায় নির্বিকারÑ এমন দাবি করেছেন স্থানীয় সূত্র। এসবের বাইরে যেনতেনভাবে কাজ করেও বিল তুলে নেয়ার অভিযোগ রয়েছে। ফলে যে লক্ষ্যে জলাবদ্ধতা দূরীকরণের ড্রেনেজ প্রকল্প হাতে নেয়া হয়েছিল সেটি কার্যত ভেস্তে গেছে। ময়মনসিংহ পৌরসভার প্রধান নির্বাহী একেএম তারিকুল আলম জানান, বিশ্বব্যাংকের অর্থ সহায়তায় প্রায় এক শ’ কোটি টাকার একটি প্রকল্প হাতে নেয়া হচ্ছে। প্রকল্পটি বাস্তবায়ন হলে শহরবাসীর এই দুঃখ আর থাকবে না বলে দাবি এই কর্মকর্তার। এর আগেও প্রকল্প বাস্তবায়নের সময় এমন জোর দাবি ছিল পৌর কর্তৃপক্ষের।

স্থানীয়রা জানায়, শহরের পানি নিষ্কাশনের বিদ্যমান ব্যবস্থায় স্টেশন রোড থেকে মালগুদাম চরপাড়া হয়ে সেহরা খাল এবং পৌরসভার পেছনে নতুন বাজার-নওমহল ও আকুয়া হয়ে মাকড়জানি খাল রয়েছে। শহরে এসব খাল ময়লা জমে ভরাট ছাড়াও অনেক অংশ বেদখল হয়ে গেছে। শহরের বাইরে ভাটির দিকে পলি জমেও ভরার হয়েছে এসব খাল। দীর্ঘদিন যাবত খালগুলো খনন না করায় শহরের একাংশের পানি নামতে পারছে না। তবে বলাশপুর, পাটগুদাম র‌্যালি মোড়, কালীবাড়ি মন্দির, থানারঘাট, বুড়াপীরের মাজার, সার্কিট হাউস ও পুলিশ লাইনসহ তালতলা থেকে শহরের যেসব ড্রেন ব্রহ্মপুত্রে ফেলা হয়েছে তা দিয়ে দ্রুত পানি নামতে পারায় একাংশে জলাবদ্ধতার সমস্যা কম। ময়মনসিংহ পৌরসভার সাবেক এক নির্বাহী প্রকৌশলী জানান, শহরে প্রকল্পের আওতায় নতুন যে ৬০ কিলোমিটার ড্রেন করা হয়েছে তার ওয়াটার লেভেলের সঙ্গে ভাটির দিকে ওয়াটার লেভেলের সমন্বয় না থাকায় শহরের পানি নামতে পারছে না। ড্রেনের ভাটির চেয়ে ওপরের দিকের ওয়াটার লেভেল নিচু বলেও বৃষ্টির পানি নামতে পারছে না বলে দাবি এই প্রকৌশলীর। এ ছাড়া শহরে যে ড্রেনেজ ব্যবস্থা রয়েছে তার ধারণক্ষমতা ১৫ মিলিমিটার এর চেয়েও কম। ফলে মাঝারি থেকে ভারি বর্ষণে অকার্যকর হয়ে পড়ছে পুরো ড্রেনেজ সিস্টেম। ময়মনসিংহ পৌরসভার নির্বাহী প্রকৌশলী রফিকুল ইসলাম মিঞা জানান, পঁাঁচ লক্ষাধিক জনসংখ্যা অধ্যুষিত প্রায় ২২ বর্গকিলোমিটার আয়তনের প্রথম শ্রেণীর ময়মনসিংহ পৌর এলাকায় কাঁচা-পাকাসহ ১৫০ কিলোমিটার ড্রেন রয়েছে। এর মধ্যে ১০০ কিলোমিটার ড্রেন পাকা। এর মধ্যে বর্তমান মেয়র ক্ষমতা গ্রহণের পর গত ৩ বছরে শহরের মাসকান্দা, বলাশপুর, ট্রাঙ্কপট্টি, পৌরসভার পেছন থেকে বুড়াপীর মাজার ও কাচিঝুলি এলাকায় আরসিসি পাইপ ড্রেন ও ব্রিকস ড্রেনসহ অন্তত ৬০ কিলোমিটার ড্রেন নির্মাণ করা হয়েছে। এসব ড্রেন নির্মাণে ব্যয় হয়েছে ৫০ কোটি টাকার বেশি। এশিয়ান ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক-এডিবি, ওপেক, কেএফডব্লিউ, ইউএনডিপির সিডিএমপি, ইউজিপ দাতা সংস্থাসহ সরকার এই কাজের অর্থ যোগান দেয়।

স্ট্রিপ প্রকল্প, জলবায়ু প্রকল্পসহ নানা নামে এই অর্থ ব্যয় দেখানো হয়েছে। কেন শহরের জলাবদ্ধা দূর হচ্ছে না কিংবা কবে নাগাদ শহরবাসী এই দুর্ভোগ থেকে মুক্তি পাবেÑ এমন প্রশ্নের উত্তরে সদা হাসি-খুশি ময়মনসিংহ পৌর সভার মেয়র ইকরামুল হক টিটুর সহজ সরল জবাব চলমান প্রকল্পের কাজ শেষ হলেই এই সমস্যার সমাধান হবে। স্থায়ীভাবে শহরবাসীর এই দুর্ভোগ লাঘবে খাল খননের ওপর গুরুত্বারোপসহ পৌর মেয়র সকলের সহযোগিতা কামনা করে ময়লা-আবর্জনা ড্রেনে না ফেলতেও অনুরোধ জানান।