১৯ নভেম্বর ২০১৭,   ঢাকা, বাংলাদেশ   শেষ আপডেট এই মাত্র  
Login   Register        
ADS

চাঁপাইয়ে চলছে আম গাছ কাটার মহোৎসব


ডি.এম. তালেবুন নবী, চাঁপাইনবাবগঞ্জ ॥ হঠাৎ করেই বেড়ে গেছে জাতীয় বৃক্ষ নিধন বা কেটে ফেলা। চাঁপাইনবাবগঞ্জের সর্বত্র চলছে জাতীয় বৃক্ষ আম গাছ কাটার মহোৎসব। ২০১০ সালের নবেম্বরে রাষ্ট্রীয়ভাবে আম গাছকে জাতীয় বৃক্ষরূপে ঘোষণা করা হলেও তা রক্ষণাবেক্ষণ বা কেটে ফেলার ব্যাপারে কোন ধরনের সুনির্দিষ্ট নীতিমালা ঘোষণাতে আসেনি। আর এই সুযোগকে কাজে লাগিয়ে অধিক পরিমাণে জাতীয় বৃক্ষের এলাকা চাঁপাইনবাবগঞ্জে শুরু হয়েছে আম গাছ কাটা। বিশেষ করে গত মৌসুমে (অক্টোবর-২০১৪ থেকে এপ্রিল ২০১৫ পর্যন্ত) চাঁপাইনবাবগঞ্জে মারাত্মকভাবে কয়লা সঙ্কটের কারণে জেলার ৬৫টি বৈধ ইটভাঁটিতে ব্যবহার হয়েছে আম গাছের কাঠ। যার পরিমাণ প্রায় ১ কোটি ২০ লাখ মেট্রিক টন। যার মূল্য প্রায় দুই হাজার ৬শ’ কোটি টাকা। এর মধ্যে শুধু চাঁপাইনবাবগঞ্জ সদরের ৪২ ইটভাঁটিতে ৪০ লাখ টন আমের খড়ি পোড়ানো হয়েছে। যার মূল্য প্রায় ৯শ’ কোটি টাকা বলে জানা গেছে। এই স্টাইলে আমের গাছ নিধনের মাধ্যমে তা ইটভাঁটিতে ব্যবহারের রেকর্ড পরিমাণ নজির ইতোপূর্বে কোনদিন ঘটেনি বলে নির্ভরযোগ্য সূত্র নিশ্চিত করেছে।

এসব ইটভাঁটিতে আমের কাঠ যোগান দেয়া হয়েছে ব্যাপকহারে বৃক্ষ নিধনের মাধ্যমে। অপর একটি সূত্র নিশ্চিত করেছে সাত মাসে প্রায় ২১টি আম বাগান নিশ্চিহ্ন করা হয়েছে। পাশাপাশি বিভিন্ন বাড়ির আঙ্গিনা ও চত্বরে যে সব আম গাছ ছিল তাও চড়া মূল্য পাওয়ার কারণে কেটে ফেলা হয়েছে। সব মিলিয়ে লক্ষাধিক আম গাছ কেটে ফেলা হয়েছে শুধু ইটভাঁটির কাঠ যোগান বা লাকড়ি যোগান দিতে। এসব গাছের মধ্যে বড় আম গাছের সংখ্যা সব চেয়ে বেশি। এ ছাড়াও অধিকাংশ আম গাছ বুনিয়াদি গুটি জাতের।

এই অঞ্চলে গুটি জাতের আমের তক্তা খুবই দামী ও চাহিদা বেশি। যারা আম গাছ কেটে লাকড়ি সরবরাহ করেছে তাদের অধিকাংশ গোড়ার ভিটা ও মোটা ডাল মিলে ফাড়াই করছে তক্তার জন্য। এসব মোটা ভিটার জন্য আলাদা চড়া মূল্য পাচ্ছে গাছের মালিকরা। ডালপালা বিক্রি করছে ইটভাঁটিতে। কয়েক বছর ধরে আম বিক্রিতে আশানুরূপ লাভ না আসায় এবং বিক্রি ঝুঁকিতে আক্রান্ত ও নানা ধরনের কেমিক্যাল ব্যবহার নিয়ে তোলপাড় থাকায় বাগান মালিকরা আকাক্সিক্ষত মূল্য না পেয়ে হতাশ হয়েছে।

আর আম ব্যবসায়ীরা হারিয়েছে পুঁজি। তাই হতাশ হওয়া বাগান মালিকদের অনেকে আমের চাষ ও আবাদ ছেড়ে ঝুঁকেছে হাউজিং ব্যবসার দিকে। বাগানের আম গাছ কেটে সেখানে প্লট তৈরি করে চড়ামূল্যে বিক্রি করা শুরু করেছে। শহীদ ক্যাপ্টেন জাহাঙ্গীর মহিউদ্দীন বীরশ্রেষ্ঠ সেতু হয়ে সোনামসজিদ বন্দরমুখী সড়কের দুই ধারের বিশাল বিশাল বাগানের আম গাছ কেটে প্লট তৈরি করা হচ্ছে। বিশেষ করে বারঘরিয়া, মহারাজপুর, রানীহাটি, ছত্রাজিতপুরসহ শিবগঞ্জ এলাকার ১৪ ইউনিয়নের প্রতিটিতে বাগানের আম গাছ কেটে বাড়ি করার প্লট তৈরি করা হয়েছে। এসব আম গাছের লাকড়ির প্রধান খরিদ্দার ইটভাঁটির মালিকরা। সাধারণত মুকুল আসা থেকে শুরু করে আম শেষ না হওয়া পর্যন্ত আম গাছ কাটা হয় না। এবার সেসব না মেনে গাছ কাটা হয়েছে দেদার ।

এখনও গাছ কাটা অব্যাহত রয়েছে। এই হারে আম গাছ নিধন অব্যাহত থাকলে কয়েক বছরের মধ্যে ঘোষিত জাতীয় বৃক্ষ আম গাছ শূন্য হয়ে পড়বে চাঁপাইনবাবগঞ্জের পুরো অঞ্চল। তাই অবিলম্বে সরকারী প্রজ্ঞাপন জারি করে জাতীয় বৃক্ষ আম গাছ যত্রতত্র কেটে ফেলার সংস্কৃতি বন্ধ করার আবেদন জানিয়েছেন পরিবেশবিদরা। কারণ এইভাবে বাগান নির্মূলের মহোৎসব চলতে থাকলে তা প্রাকৃতিক পরিবেশের ভারসাম্য নষ্ট হবে। একই সঙ্গে যে সব ইটভাঁটি মালিকরা আম কাঠ ব্যবহারের মাধ্যমে কালো ধোঁয়ার সৃষ্টি করছে তার ফলে ভাঁটিসংলগ্ন বিস্তীর্ণ এলাকার আম বাগান অক্ষত থাকবে না।

সুস্বাদু আমের ওপর তার প্রতিক্রিয়া পড়ে ফলন কমাসহ নষ্ট হয়ে যাওয়া এবং সেই ফল বিস্বাদে পরিণত হবে। তাই অবিলম্বে ইটভাঁটিতে আম কাঠ ব্যবহার বন্ধ ও জাতীয় বৃক্ষ আম গাছ কাটার ওপর বিধি-নিষেধ জারি করা একান্ত প্রয়োজন হয়ে পড়েছে।