১৯ অক্টোবর ২০১৭,   ঢাকা, বাংলাদেশ   শেষ আপডেট পূর্বের ঘন্টায়  
Login   Register        
ADS

বিআরটিসির সেবা থেকে বঞ্চিত মহিলা ও স্কুল শিক্ষার্থী


শর্মী চক্রবর্তী ॥ ঢাকঢোল পিটিয়ে বিআরটিসি চালু করেছিল মহিলা বাস সার্ভিস। বিভিন্ন রুটে চালু হয়েছিল স্কুলশিক্ষার্থী বহনে বিআরটিসির বাস সার্ভিস। এখন এর কোনটিই চোখে পড়ে না। যেমন ঢাকঢোল পিটিয়ে এসব সার্ভিসের উদ্বোধন করা হয়েছিল, তেমনি নীরবে আবার বন্ধও হয়ে গেছে। তবে বিআরটিসির খাতায় মাঝে মধ্যে একটি বা দুটি চলে বলে উল্লেখ রয়েছে। স্কুল সার্ভিসের ১৪ বাসের দুটি সচল। নারী বাস সার্ভিসের ১৭ বাসের পাঁচটির অস্তিত্ব আছে সড়কে। এসব সার্ভিস বন্ধ হওয়ার কোন কৈফিয়ত নেই, কোন ঘোষণাও নেই।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, সারাদেশে বিআরটিসির ১৫৪৬টি বাস চলাচল করে। এর মধ্যে রাজধানীতে চলছে ৪৪০টি। যার ১৯৪টিই বিভিন্ন সরকারী, আধা-সরকারী অফিসের সঙ্গে চুক্তিবদ্ধ। এসব বাস অফিস বাস হিসেবেই ব্যবহার হচ্ছে। বাকি ২৪৬টি পাবলিক বাস। এছাড়া আগে যেমন বিআরটিসি বাসের নানা সুবিধা পেত যাত্রীরা এখন আর তা নেই। বিশেষ করে ভাড়ার ক্ষেত্রে সরকারী সার্ভিস হিসেবে প্রাইভেট সার্ভিসগুলোর চেয়ে অনেক কম ভাড়ায় চলাচল করা যেত বিআরটিসির সার্ভিসে। এখন ভাড়ার ক্ষেত্রে প্রাইভেট সার্ভিসকে ছাড়িয়ে গেছে বিআরটিসির সার্ভিস। প্রতি লাইনেই অতিরিক্ত ভাড়া নিচ্ছে তারা। এ নিয়ে যাত্রীদের সঙ্গে প্রায়ই ঘটছে অঘটন। এসব দেখার যেন কেউ নেই। সরেজমিন বিভিন্ন ডিপোতে গিয়ে দেখা গেছে, অচল বাসের সারি। বিআরটিসির জোয়ার সাহারা ডিপোতে দেখা যায় এক শ’র মতো গাড়ি সারি করে রাখা রয়েছে। এর মধ্যে কোনটির চাকা খোলা, কোনটি ভাঙাচোরা। কোনটির দরজা-জানালা নেই। আবার কোনটির ইঞ্জিন খুলে রাখা হয়েছে।

ডিপোতে কর্মরত এক ব্যক্তি বলেন, এই ডিপোতে স্টাফ বাস বেশি থাকে। লাইনের গাড়ি খুবই কম। হেড অফিস থেকে তথ্য দিতে নিষেধ রয়েছে বলেও তিনি জানান। কল্যাণপুর ডিপোতে দেখা যায়, ডাবল ডেকার ও এসি গাড়ির সংখ্যা বেশি। এখানে বেশির ভাগ গাড়ি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ও জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রছাত্রীদের বহনে ব্যবহৃত হয়। বিকল বা আংশিক মেরামত করার মতো গাড়ির সংখ্যা ৪-৫টি। ডিপোর এক কর্মকর্তা বলেন, বাইরের কোন সংস্থা বা সাংবাদিকদের কাউকে তথ্য দেয়া হেড অফিস থেকে নিষেধ রয়েছে। আমরা ডিপো থেকে হেড অফিসে নিয়মিত তথ্য জানাই। হেড অফিস থেকে আপনাদের বিস্তারিত জানাতে পারবেন। তিনি বলেন, বিশ্ববিদ্যালয়, সচিবালয় ও বিভিন্ন অফিসের স্টাফ বাস হিসেবে ৮৬টি গাড়ি ভাড়া দেয়া রয়েছে। এগুলোই অফ টাইমে সিটি সার্ভিস হিসেবে চালানো হয়। এছাড়া শুধু সিটি সার্ভিসের জন্য প্রায় ২০টি গাড়ি রয়েছে। তবে দৈনিক রুটিনে সিটি সার্ভিসের সত্যতা পাওয়া যায়নি। নাম প্রকাশ না করার শর্তে কল্যাণপুর বাস ডিপোর এক কর্মকর্তা দৈনিক রুটিন দেখে জানান, এখানে মোট বাস ১১৩টি। এর মধ্যে স্টাফ সেবায় ৮৬টি, ঢাকা-আরিচা রুটে ৪টি, ঢাকা-কোটালীপাড়া রুটে ২টি, গুলিস্তান-মাওয়া রুটে ২টি বাস চালু রয়েছে। মতিঝিল ডিপোতে দেখা যায়, শুধু ভেতরেই ৭০টির মতো গাড়ি পার্কিং করা। এছাড়া ডিপোর বাইরে কমলাপুর-আরামবাগ রাস্তায় অসংখ্য গাড়ি পার্কিং করা আছে। ডিপোর মধ্যে মেরামত করার জন্য রয়েছে ১০টি, যার অধিকাংশই একেবারে বিকল। এই ডিপোতে দূরপাল্লার গাড়ির সংখ্যা বেশি। মোহাম্মদপুর ও উথুলী (গাবতলী) ডিপোতে গিয়েও প্রায় একই অবস্থা দেখা যায়। এখানে অনেক গাড়ি মেরামতেরও অযোগ্য। পানি উন্নয়ন বোর্ডের স্টাফদের সেবায় ব্যবহৃত একটি গাড়ির সুপারভাইজার বলেন, ‘আগে আবদুল্লাহপুর টু মতিঝিল রুটে গাড়ি চালাতাম। এই রুটে প্রচুর যানজট হওয়ার কারণে দিনে দুই ট্রিপের বেশি চালানো যায় না। এতে যে আয় হতো তা ভাড়া পরিশোধ করে খুব বেশি থাকত না। এখন স্টাফদের আনা-নেয়ার কাজ করায় সকালে ও বিকেলে কাজ। এছাড়া সারাদিনই বসে থাকি। ফিরে আসার সময় অতিরিক্ত ভাড়া মারি। এতে আয় বেশি হয়।’

গাবতলী বাস ডিপোর সাভার টু মতিঝিল রুটে চলাচলকারী একটি ডাবল ডেকার গাড়ির সুপারভাইজার জানান, এই রুটের একটি গাড়ির ভাড়া দিনে ৭ হাজার টাকা।

ঢাকা শহরে গণপরিবহনে নারী যাত্রীদের হয়রানি নিয়ে ‘বাস সার্ভিস ফর ওমেন অনলি ইন ঢাকা সিটি’ শীর্ষক গবেষণাপত্র প্রকাশ করেন জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের নগর ও অঞ্চল পরিকল্পনা বিভাগের অধ্যাপক এম শফিক-উর রহমান। জরিপে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, ৩০ শতাংশ যাত্রীই বাস জরাজীর্ণ বলে অভিযোগ করেন। নিরাপত্তা নিয়েও অভিযোগ রয়েছে নারীদের। মিরপুরের একজন নিয়মিত যাত্রী সুমাইয়া ইসলাম বলেন, কোনদিন নারী বাস সার্ভিস চোখে দেখিনি। তার এ অভিযোগের সত্যতাও পাওয়া যায়।

বিআরটিসি থেকে জানা গেছে, যানজট নিরসনে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নির্দেশে ২০১১ সালের ১৬ জানুয়ারি চালু হয় স্কুলবাস সার্ভিস। ২৬টি স্কুলকে সার্ভিসের আওতায় আনা হয়। প্রাথমিক পর্যায়ে প্রতিদিন সকালে মিরপুর-১০ থেকে আজিমপুর সাতটি ও বিপরীত দিক থেকে আরও সাতটি বাস চালু করা হয়। কথা ছিল শিক্ষার্থীদের জন্য বিশেষ টিকেট চালু ও সার্ভিসের পরিধি বৃদ্ধি করা হবে কিন্তু চার বছরের ব্যবধানে ১৪ বাসের ১২টিই বন্ধ হয়ে গেছে।

বিআরটিসির তথ্যমতে, ঢাকা সিটির সার্ভিসের জন্য মোট ৪৪০টি বাস রয়েছে। এর মধ্যে ১৯৪টি স্টাফ বাস এবং ২৪৬টি পাবলিক বাস। সূত্র জানায়, এই পাবলিক বাসের মধ্যে আবার ১৬টি মহিলা সার্ভিস এবং ১৫টি স্কুলবাস রয়েছে।