মেঘলা, তাপমাত্রা ৩১.১ °C
 
২৪ সেপ্টেম্বর ২০১৭, ৯ আশ্বিন ১৪২৪, রবিবার, ঢাকা, বাংলাদেশ

সৌমিত্র ও ফেরদৌসী পাশাপাশি দাঁড়ানোয় ম্লান মঞ্চের আলো

প্রকাশিত : ৫ সেপ্টেম্বর ২০১৫
সৌমিত্র ও ফেরদৌসী পাশাপাশি দাঁড়ানোয় ম্লান মঞ্চের আলো
  • গঙ্গা-যমুনা নাট্য ও
  • সাংস্কৃতিক উৎসব
  • গঙ্গা-যমুনা নাট্য ও সাংস্কৃতিক উৎসব

মঞ্চের সব আলো জ্বলছিল। অনেক আগে থেকেই জ্বলছিল। তবে সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায় ও ফেরদৌসী মজুমদার পাশাপাশি দাঁড়ানোর পর যেন ম্লান হয়ে গেল সেই আলো। দুই বাংলার মহান দুই শিল্পী নিজেরাই আলো ছড়ালেন। নতুন আলোয় উদ্ভাসিত হলো গোটা মিলনায়তন। করতালি দিয়ে প্রিয় অভিনয় শিল্পীদের বরণ করে নিলেন ভক্তরা। কথা হলো। কবিতা হলো। নাটক তো বটেই। সব মিলিয়ে অনবদ্য সূচনা। শিল্পকলা একাডেমিতে শুক্রবার সূচনা করা উৎসবের শিরোনাম গঙ্গা-যমুনা নাট্য ও সাংস্কৃতিক উৎসব। হ্যাঁ, গত কয়েক বছর ধরে হচ্ছে। প্রথমে ‘গঙ্গা-যমুনা নাট্য উৎসব’। আর এখন নাটকের সঙ্গে সঙ্গীত আবৃত্তি নৃত্য যোগ হয়েছে। নাম বদলে হয়েছে ‘গঙ্গা-যমুনা নাট্য ও সাংস্কৃতিক উৎসব। উৎসবের নামকরণ থেকেই পরিষ্কার হয়ে যায়, এটি দুই বাংলার নাটক ও সংস্কৃতির উৎসব। চমৎকার মিলনমেলা।

বিকেলে জাতীয় নাট্যশালায় গিয়ে পৌঁছতেই চোখ ছানাবড়া! বিপুল এলাকাজুড়ে উৎসবের আমেজ। দারুণ সাজানো বহিরাঙ্গন। দেখেই কেমন উৎফুল্ল হয়ে ওঠে মন। উদ্বোধনী অনুষ্ঠান শুরুর অনেক আগে থেকেই আসতে শুরু করেছিলেন সংস্কৃতিকর্মী ও সাধারণ দর্শক। সময় যত গড়িয়েছে, ভিড় বেড়েছে। যখন প্রায় উপচে পড়া অবস্থা তখন উৎসব স্থলে এসে পৌঁছেন সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়। প্রবীণ অভিনেতা। তবে দেখে অতটা বোঝা যায় না। ব্লু জিন্স, চেকশার্ট আর স্যান্ডেল পায়ে বেশ সাবলীল হেঁটে চলেন। ভিড় ঠেলে ভেতরে প্রবেশ করেন। ক্যামেরার ঘন ঘন ক্লিক আর সালাম, নমস্কারের মধ্য দিয়েই তাঁকে বরণ করে নেয় ঢাকার দর্শক। ততক্ষণে মূল মঞ্চের একেবারে সামনের সারিতে এসে আসন গ্রহণ করেছেন ফেরদৌসী মজুমদার। তার পর মঞ্চে। দুই অভিনয়শিল্পী ছাড়াও মঞ্চে আমন্ত্রণ জানানো হয় আরও প্রায় সাতজন গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিত্বকে। সকলে এসে চেয়ারে বসতেই বক্তৃতা হতে পারত। না, এর পরিবর্তে উৎসবের গান বেজে উঠল। মঞ্চের সামনের যেটুকুন খালি জায়গা, চমৎকার ব্যবহার করলেন একদল শিল্পী। বর্ণাঢ্য পরিবেশনার মধ্য দিয়ে অতিথিদের স্বাগত জানান তাঁরা। অনিক বসুর পরিচালনায় শিল্পীদের নাচ গোটা মিলনায়তনের পরিবেশকে মুহূর্তেই বদলে দেয়। আনন্দঘন করে তুলে। নাচ শেষ হলে প্রদীপ জ্বালিয়ে উৎসবের আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করেন সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায় ও ফেরদৌসী মজুমদার। বাংলাদেশের আরেক খ্যাতিমান অভিনেতা আসাদুজ্জান নূর যোগ দেন মন্ত্রী হিসেবেই। ছিলেন আরেক সংস্কৃতিপ্রেমী মন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত। ভারতীয় হাইকমিশনার পঙ্কজ শরণ, শিল্পকলা একাডেমির মহাপরিচালক লিয়াকত আলী লাকী, নাট্যজন ঝুনা চৌধুরী, হাসান আরিফ ও উদ্যাপন পর্ষদের আহ্বায়ক গোলাম কুদ্দুছও প্রদীপ প্রজ্বলনে অংশ নেন।

এরপর শুরু হয় আলোচনা পর্ব। বিশেষ শোনবার ছিল সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায় ও ফেরদৌসী মজুমদারের কাছ থেকে। তবে কাজের মানুষ বলেই হয়ত কম বললেন সৌমিত্র। বাংলাদেশে অনেকবার আসার কথা জানিয়ে তিনি বলেন, যতবার এসেছি ততবারই মুগ্ধ হয়েছি। আপনাদের ভালবাসায় আমাকে আপ্লুত করেছে। প্রথমবার যখন এসেছিলাম, কেঁদেছিলাম। আমারই মতো সব মানুষ, ভাষা এক, সংস্কৃতি এক, অথচ আমরা দুই দেশের বাসিন্দা। বাকি কথাগুলো তিনি বলেন কবিতায়। জীবনানন্দ থেকে চমৎকার আবৃত্তি করে যানÑ বাংলার মুখ আমি দেখিয়াছি, তাই আমি পৃথিবীর রূপ/ খুঁজিতে যাই না আর : অন্ধকারে জেগে উঠে ডুমুরের গাছে/ চেয়ে দেখি ছাতার মতন বড়ো পাতাটির নিচে ব’সে আছে...। তুমুল করতালির মধ্য দিয়ে আবৃত্তির এই প্রতিভাকে অভিনন্দিত করেন শ্রোতা।

দীর্ঘকাল ধরে বাংলাদেশের নাট্যাঙ্গন আলোকিত করে রাখা অভিনেত্রী ফেরদৌসী মজুমদারও সামান্য বলে শেষ করেন। তাঁর আলোচনাজুড়ে ছিলেন প্রিয় অভিনেতা সৌমিত্র। চমকপ্রদ তথ্য দিয়ে তিনি বলেন, আমি আর সবার মতোই সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়কে পর্দায় দেখেছি। আজ প্রথম একমঞ্চে। সামনাসামনি আমাদের দেখা হলো। সৌমিত্রের অভিনয়ের প্রশংসা করার পাশাপাশি তাঁর ব্যক্তিত্বের প্রশংসা করেন ফেরদৌসী মজুমদার।

উদ্বোধনী দিনের প্রধান আকর্ষণ ছিল সৌমিত্র অভিনীত নাটক। জাতীয় নাট্যশালার মূল মিলনায়তনে বিশেষ এই প্রদর্শনীর আয়োজন করা হয়। সৌমিত্র বলে কথা! টিকেট শেষ হয়ে গিয়েছিল একদিন আগেই। প্রদর্শনীর দিন তাই খুব কানে এলো টিকেটের জন্য হাহাকার। অনেকেই ফিরে গেলেন। অপেক্ষাকৃত সৌভাগ্যবানরা সুযোগ পেলেন দেখার। এদিন নিজের নাট্যদল সংস্তবের ‘ছাড়িগঙ্গা’ নাটকে অভিনয় করেন সৌমিত্র। বয়স হয়েছে। নড়বড়ে শরীর। তাতে কী? অদ্ভুত সুন্দর অভিনয়শৈলী প্রদর্শন করলেন জাত অভিনেতা। নাটকে একজন বিজ্ঞানীর চরিত্রে রূপদান করেন তিনি। নিজের জীবনের সঙ্গে নানা রকম পরীক্ষা-নীরিক্ষা শেষে অঙ্ক মেলাতে দেখা যায় তাঁকে। ঠিক হলো কতটা? উত্তর খোঁজার চেষ্টা করেন। সব মিলিয়ে ১ ঘণ্টা ১৫ মিনিটের মতো সময়। তবে নিশ্চিত করেই বলা যায়Ñ ভুলবার নয়। একই দিন পরীক্ষণ থিয়েটার হলে মঞ্চস্থ হয় প্রাচ্যনাটের ‘ট্র্যাাজেডি পলাশবাড়ি’ নাটকটি।

উৎসবে প্রতিদিন দুটি করে মোট ১৮টি নাটক মঞ্চস্থ হবে। ভারতের ৩টি নাট্যদলের ৪টি নাটক দেখা যাবে। বাংলাদেশের নাটকগুলোর মধ্যে ঢাকার থাকছে ১২টি। চট্টগ্রাম ও রাজশাহীর দুটি দল নাটক নিয়ে আসবে। নাটকের পাশাপাশি জাতীয় নাট্যশালার সামনের খোলা জায়গায় প্রতিদিন থাকবে সঙ্গীত, আবৃত্তি ও নাটকের পরিবেশনা। ৯ দিনব্যাপী উৎসব ১২ সেপ্টেম্বর শেষ হবে।

প্রকাশিত : ৫ সেপ্টেম্বর ২০১৫

০৫/০৯/২০১৫ তারিখের খবরের জন্য এখানে ক্লিক করুন

শেষের পাতা



শীর্ষ সংবাদ: