১৭ ডিসেম্বর ২০১৭,   ঢাকা, বাংলাদেশ   শেষ আপডেট এই মাত্র  
Login   Register        
ADS

ঢাকার ৩১ বিহারী ক্যাম্প জ্বলন্ত আগ্নেয়গিরি!


গাফফার খান চৌধুরী ॥ সারাদেশে আটকেপড়া পাকিস্তানীদের ৭০ ক্যাম্প এখন বিষফোঁড়া। এর মধ্যে ঢাকার ৩১ বিহারী ক্যাম্প একপ্রকার জীবন্ত আগ্নেয়গিরি। ক্যাম্পের আশপাশে উগ্র মৌলবাদী ও জঙ্গী গোষ্ঠীগুলো ঘাঁটি গাড়ছে। ক্যাম্পবাসীদের মধ্যে সরকারবিরোধী প্রচ- ক্ষোভ উস্কে দিচ্ছে তারা। যেকোন সময় ক্যাম্পবাসীদের ক্ষোভ তপ্ত লাভার মতো বেরিয়ে আসতে পারে। ভাষাগত মিল থাকায় দেশী বিদেশী অনেক অপরাধী দিব্যি আত্মগোপনে রয়েছে এসব ক্যাম্পে। ক্যাম্পবাসীদের পুঁজি করে বিদেশ থেকে কাঁড়ি কাঁড়ি টাকা এনে পকেট ভরছে বেশকিছু এনজিও, সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক সংগঠন। ‘বিহারী’দের জন্য যতসামান্য টাকা খরচ করা হচ্ছে। আর অধিকাংশ খরচ করা হচ্ছে রাষ্ট্রবিরোধী কর্মকা-ে। ক্যাম্পগুলোর আশপাশের এলাকা মাদকের অভয়ারণ্যে পরিণত হচ্ছে। দিন দিন বেড়ে যাচ্ছে অপরাধ। ক্যাম্পবাসীদের বিষয়ে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ না নিলে ভবিষ্যতে বড় ধরনের অপ্রীতিকর ঘটনার জন্ম হতে পারে এখানে। দীর্ঘ অনুসন্ধানে এসব তথ্য উঠে এসেছে।

ক্যাম্প নয়, যেন অপরাধের আখড়া ॥ মোহাম্মদপুর কৃষি মার্কেট ক্যাম্পের বাসিন্দা আয়েশা খাতুন (৮৫) স্মৃতি হাতড়ে বলছিলেন, ১৯৪৭ সালে ভারত-পাকিস্তান আলাদা হয়ে যায়। এরপর হিন্দু মুসলিম বিরাট রায়ট হয়। রায়ট এতটাই ভয়াবহ আকার ধারণ করে যে, বহু মুসলিমকে ইচ্ছায় বা অনিচ্ছায় জীবন বাঁচাতে তৎকালীন পূর্ব-পাকিস্তানে পাড়ি জমাতে হয়। আমি তাদেরই একজন। জীবনের হুমকি থাকায় ১৯৫০ সালে কলকাতার পার্ক টাউন থেকে স্বামী ইয়াসিনসহ পরিবারের ৬ সদস্যসহ ঢাকায় চলে আসি। আমার বয়স তখন ২০ বছর। গর্ভে বড় ছেলে মোহাম্মদ হোসেন। আমরা ৬৫ বছর ধরে বাংলাদেশে অবস্থান করছি। বলতে গেলে কিছুই পাইনি। জীবনের শেষপ্রান্তে এসেও এক কক্ষের একটি কুঠুরিতে গাদাগাদি করে বসবাস করতে হচ্ছে। নোংরা পরিবেশ। বৃষ্টি হলেই অঝোরে জল ঝরে বিছানা ভিজে যায়। এত কষ্ট আর সহ্য হয় না। কিন্তু কী করব! নিরুপায় হয়ে থাকতে হচ্ছে। ৩ ছেলে ও এক মেয়ে পাকিস্তানে চলে গেছে। কালেভদ্রে ছেলেমেয়েদের সঙ্গে মোবাইল ফোনে কথা হয়। এর বেশি নয়। শেষ জীবনে সরকার যদি আমাদের একটু থাকার ব্যবস্থা করত, খুব খুশি হতাম। মরার আগে অন্তত স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলে পরপারে চলে যেতে পারতাম।

আয়েশা খাতুনেরই বড় ছেলে মোহাম্মদ আলী। পেশায় মিষ্টির প্যাকেট প্রস্তুতকারক। বলছিলেন, দুই বোন নিয়ে ক্যাম্পেই কোনমতে জীবন পার করছি। ক্যাম্প নয়, যেন আগ্নেয়গিরি। ক্যাম্পগুলো এখন বিষফোঁড়ার মতো। মাদক, হানাহানি, মারামারি, নানা অসামাজিক কর্মকা- লেগেই আছে। প্রকাশ্যে উঠতি কিশোর-কিশোরীরা মাদক সেবন করছে। পুলিশও হাঙ্গামা এড়াতে সচরাচর ক্যাম্পের ভেতরে ঢোকে না। ছেলেমেয়েদের বাধ্য হয়ে প্রাপ্ত বয়স্ক হওয়ার আগেই বিয়ে দিতে হচ্ছে। এ ছাড়া কোন উপায় নেই। চোখের সামনে বহু ছেলেমেয়েকে নষ্ট হয়ে যেতে দেখেছি। ক্যাম্প জীবনের হতাশা এর অন্যতম কারণ। হু হু করে জনসংখ্যা বাড়ছে। বাড়তি জনসংখ্যার জন্য তৈরি হচ্ছে অতিরিক্ত ঘর। জায়গা নেই। তাই বহুতল ভবন উঠছে। সামান্য ইট বালু সিমেন্ট দিয়েই ৪ থেকে ৫ তলা পর্যন্ত বাড়ি তৈরি করা হচ্ছে। মোহাম্মদপুর ও মিরপুরের ক্যাম্পগুলোতে এমন দৃশ্য হরহামেশাই চোখে পড়ে। যেকোন সময় এসব বাড়ি ধসে অনেক প্রাণহানির ঘটনা ঘটতে পারে। তবে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর তরফ থেকে সারাদেশের বিহারী ক্যাম্পগুলোর ওপর নজরদারি ও অপরাধের বিষয়ে নজরদারি অব্যাহত আছে বলে বলা হচ্ছে। এ ব্যাপারে র‌্যাবের লিগ্যাল এ্যান্ড মিডিয়া উইংয়ের পরিচালক কমান্ডার মুফতি মাহমুদ খান জানান, দেশের যেকোন প্রান্তের অপরাধপ্রবণ এলাকার ওপরই নজরদারি করা হয়। বিহারী ক্যাম্পগুলোও এর বাইরে নয়। ক্যাম্পগুলোতে মাদক ব্যবসাসহ নানা ধরনের অপরাধ নিয়ন্ত্রণে র‌্যাব প্রায়ই অভিযান চালিয়ে থাকে। পাশাপাশি বিশেষ নজরদারি করে।

আশপাশের বাসিন্দাদের অভিযোগ ॥ ক্যাম্পের সামনের রাস্তায়, ফুটপাথে হরদম মাদক বিক্রি হচ্ছে। কেউ কেউ প্রকাশ্যেই সেবনও করছে। বাধা দেয়ার যেন কেউ নেই! অনেকেই নিজ থেকেই চক্ষু লজ্জার ভয়ে সরে যাচ্ছেন। এ পর্যন্তই। এমন দৃশ্য নিত্যদিনের। বলছিলেন, মার্কেট ক্যাম্পের ঠিক সামনে মনন নামের একটি হাসপাতালের কর্মকর্তা রিপা (৩৫)। বছর পাঁচেক হাসপাতালটিতে চাকরি করছেন। বাসা মোহাম্মদপুর লালমাটিয়ায়। রাত বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে ক্যাম্পের আশপাশের রাস্তা আতঙ্কের জনপথে পরিণত হয়। মোড়ে মোড়ে মাদকের আসর। চাকরি নেয়ার পর আজ পর্যন্ত নাইট শিফটে দায়িত্ব পালন করিনি, শুধু অনাকাক্সিক্ষত ঝামেলা এড়াতে। শুধু রিপা নয়, হাসপাতালটির অনেক মহিলা কর্মকর্তা-কর্মচারী ও মোহাম্মদপুর কৃষি মার্কেটসহ আশপাশের বাসিন্দাদের সঙ্গে কথা বলে মিলেছে এমনই বর্ণনা। মোহাম্মদপুরের বিহারী ক্যাম্প ॥ উর্দুভাষী শাহনেওয়াজ আহমদ খান ওরফে শান্নু ও তার ভাই মর্তুজা আহমদ খানের নেতৃত্বে ৪০ সদস্য বিশিষ্ট শান্তি কমিটি নিয়ন্ত্রণ করছে মোহাম্মদপুরের বিহারী ক্যাম্পের অপরাধ জগত। তাদের পিতা আটকেপড়া পাকিস্তানীদের সংগঠন এসপিজিআরসি’র (স্ট্রান্ডেড পাকিস্তানীজ জেনারেল রিপ্যাট্রিয়েশন কমিটি) বর্তমান সভাপতি জব্বার খানের ছেলে। ক্যাম্পের অবৈধ কর্মকা-ের সঙ্গে সরকারের কতিপয় অসাধু কর্মকর্তা কর্মচারী ও স্থানীয় পুলিশ প্রশাসন জড়িত। যদিও এমন অভিযোগ ভিত্তিহীন বলে দাবি করেছেন শান্নু ও মর্তুজার পিতা জব্বার খান।

ক্যাম্প সূত্রে জানা গেছে, শান্তি কমিটির সদস্যরা মাদক, অবৈধ পানি ও বিদ্যুত সংযোগ দেয়া, জালটাকা, বোমা তৈরি, মজুদ ও সরবরাহ এবং দেশী-বিদেশী জঙ্গীদের আশ্রয় দেয়া থেকে শুরু করে নানা অপরাধে জড়িত। ২০১৩ সালের ২০ ডিসেম্বর মোহাম্মদপুরের জেনেভা ক্যাম্পের ৭ নম্বর সেক্টরের একটি বাড়িতে বোমা তৈরির সময় বিস্ফোরণে শাহীন ও নাদিম ওরফে বেজি নাদিম আহত হয়। আহত দুইজন ও আহত নাদিমের ভাই বশিরকে আটক করা হয়। তাদের কাছ থেকে ১শ’টি তাজা বোমা উদ্ধার হয়।

পরদিন ২১ ডিসেম্বর র‌্যাব-২ জেনেভা ক্যাম্পেরই আরেকটি বাড়ি থেকে ৩২টি তাজা বোমা, বোমা তৈরির সময় ব্যবহৃত মুখোশসহ নানা সরঞ্জাম উদ্ধার করে। গ্রেফতারকৃতদের বরাত দিয়ে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ওই সময় জানিয়েছিল, বহুদিন ধরেই জেনেভা ক্যাম্পে বোমা তৈরি হচ্ছিল। তৈরিকৃত অনেক বোমা সরকারবিরোধী নানা কর্মসূচীতে নাশকতা চালাতে ব্যবহৃত হয়েছে। জব্দকৃত বোমাগুলোও সরকারবিরোধী কর্মসূচীতে ব্যবহারের পরিকল্পনা ছিল বিএনপি-জামায়াত নেতৃত্বাধীন ২০ দলীয় জোটের। বোমা ছাড়াও ক্যাম্পগুলোতে ইয়াবা, ফেনসিডিল, হেরোইন, গাঁজা, আফিম, চরস, ডেনড্রাইডের (জুতো তৈরির আঠা) মতো মাদকের নিয়মিত আসর বসে। ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের মিডিয়া বিভাগের উপকমিশনার মুনতাসিরুল ইসলাম বলছেন, ঢাকার বিহারী ক্যাম্পগুলোতে নানা ধরনের অপরাধ সংঘটিত হওয়ার বিষয়ে তাদের কাছে তথ্য আছে। বিশেষ করে ক্যাম্পগুলোতে মাদকের সহজলভ্যতার বিষয়টি একেবারেই প্রকাশ্য। প্রায়ই অভিযান চালিয়ে অপরাধীদের গ্রেফতার করা হচ্ছে। ক্যাম্পগুলোর ওপর তাদের জোরালো নজরদারি রয়েছে।

বিহারী ক্যাম্প সূত্রে জানা গেছে, শুধু ঢাকা নয়, দেশের সব ক্যাম্পেই মাদকের ছড়াছড়ি। এর মধ্যে মিরপুরের ২৫টি ও চট্টগ্রামের ক্যাম্পগুলোতে মাদকের বিস্তার সবচেয়ে বেশি। চট্টগ্রামের ৫টি ক্যাম্পে ইয়াবার বড় বড় চালান খালাস হচ্ছে। খালাসকৃত ইয়াবা দেশের বিভিন্ন জেলায় থাকা বিহারী ক্যাম্পসহ মাদকের আস্তানাগুলোতে চলে যাচ্ছে। ক্যাম্পের আশপাশ ঘিরে গড়ে ওঠেছে মাদকের পাইকারি ও খুচরা বাজার।

এছাড়া বিহারী ক্যাম্পগুলো থেকে আশপাশের বিভিন্ন ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে পানি ও বিদ্যুতের অবৈধ সংযোগ দেয়া হচ্ছে। এর সঙ্গে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা ও ক্যাম্পের নিয়ন্ত্রণকারীরা জড়িত। কারণ বিহারী ক্যাম্পের বিদ্যুত ও পানির কোন বিল সরকারকে পরিশোধ করতে হয় না। এমন সুযোগে কাঁড়ি কাঁড়ি টাকা কামিয়ে নিচ্ছে সংশ্লিষ্টরা। মোহাম্মদপুরের ৬টি ক্যাম্প থেকে যে পরিমাণ পানি ও বিদ্যুতের অবৈধ সংযোগ দেয়া হয়েছে, তাতে সরকারের প্রতিমাসে ১০ কোটি টাকা ক্ষতি হয়।

বিহারীদের মাধ্যমে সুবিধাভোগী গোষ্ঠী ॥ অধিকাংশ বিহারীর অভিযোগ, তাদের জিম্মি করে রেখেছেন বিহারীদের বিভিন্ন সংগঠনের কতিপয় নেতা, এনজিও, বিভিন্ন রাজনৈতিক দল ও ক্যাম্পের নিয়ন্ত্রণকারীরা। তারা পরস্পর যোগসাজশে আটকেপড়া পাকিস্তানীদের কল্যাণের কথা বলে দাতা সংস্থাগুলোর তরফ থেকে মোটা অঙ্কের টাকা আনছেন। যার অধিকাংশই চলে যাচ্ছে এদের পেটে। মেরি স্টোপস, ব্র্যাক, রাড্ডা, বার্নার, ওয়ার্ল্ড ভিশন, সৌরভ, ওবায়েট হেল্পার্সসহ বহু এনজিও বিহারী ক্যাম্পগুলোতে কাজ করে। ক্যাম্পবাসীদের অভিযোগ, নামী-দামী কিছু এনজিও যতসামান্য কাজ করলেও, অধিকাংশ এনজিও কাজ করে না। ঢাকার কয়েকটি ক্যাম্প ঘুরে কয়েকটি এনজিওর তরফ থেকে ক্যাম্পগুলোতে শুধু পাকা বাথরুম তৈরিসহ যতসামান্য কাজ করার চিত্র চোখে পড়েছে।

ক্যাম্পবাসীর অভিযোগ, এনজিওগুলোর মধ্যে ওবায়েট হেল্পার্স তাদের দেখিয়ে সবচেয়ে বেশি টাকা আনে। এনজিওটি মোহাম্মদপুরের শেরশাহশূরী রোডের ৩২/৪ নম্বর পাশাপাশি একটি চারতলা ও তিনতলা বাড়িতে ইংরেজী স্কুল, টিউটোরিয়াল সেন্টার ও কম্পিউটার ট্রেনিং সেন্টার স্থাপন করেছে। এনজিওটি বহু আটকেপড়া পাকিস্তানীদের পাকিস্তান পাঠিয়েছে বলে দেশ-বিদেশের গণমাধ্যমে প্রকাশিত হয়েছে। বিষয়টি মানতে নারাজ ক্যাম্পের বাসিন্দারা। তাদের অভিযোগ, এনজিওটি তাদের কোন সুযোগ সুবিধা দেয়নি। এ ব্যাপারে এনজিওটির মোহাম্মদপুরের কার্যালয়ে গেলে তারা কেউই কথা বলার জন্য যথাযথ ব্যক্তি নয় বলে এড়িয়ে গেছেন। ক্যাম্পের অনেকেই নাম প্রকাশ না করার শর্তে অভিযোগ করেছেন, ক্যাম্পে বহুতল বাড়ি নির্মাণের জন্য ক্যাম্প চেয়ারম্যানের অনুমোদন নিতে হয়। না নিয়ে বাড়ি করলে তাদের ওপর নির্যাতন নেমে আসে। টাকা না দিলে অনুমোদন মিলে না। তারা বাধ্য হয়ে টাকা দিয়ে ক্যাম্পে বহুতল বাড়ি নির্মাণ করে থাকেন। সরেজমিন দেখা গেছে, যেভাবে বহুতল বাড়ি নির্মিত হয়েছে, যেকোন সময় সেসব বাড়ি ধসে পড়ে অসংখ্য প্রাণহানির ঘটনা ঘটা সময়ের ব্যাপার মাত্র।

অনুসন্ধানে জানা গেছে, অনেক এনজিও এবং রাজনৈতিক দলের বিভিন্ন কর্মসূচীতে লোকের যোগান আসে বিহারী ক্যাম্প থেকে। ক্যাম্পগুলোকে ঘিরে আস্তানা গড়ে তুলছে বহু উগ্র মৌলবাদী ও জঙ্গী সংগঠন। মোহাম্মদপুরের জেনেভা ক্যাম্পের অদূরেই তাজমহল রোডের ২০/২০ নম্বর চারতলা বাড়িতে গড়ে তোলা হয়েছে দাওয়া’তে ইসলামী নামের একটি সংগঠনের মহিলা শাখার কার্যালয়। সেখানে বিনামূল্যে পবিত্র কুরআন শরীফ, হাদীসসহ বিভিন্ন বিষয়ে বিশেষ প্রশিক্ষণ দেয়া হচ্ছে। মহিলাদের শারীরিক নানা কসরতও শেখানো হয় বলে স্থানীয়রা জানান। অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক ড. আবুল বারকাতের প্রকাশিত গবেষণাপত্রেও উগ্র মৌলবাদী সংগঠনের মধ্যে এটির নাম রয়েছে। তবে কৌশলে সংগঠনের নামের বানানের ক্ষেত্রে খানিকটা ভিন্নতা আনা হয়েছে। যদিও সংগঠনটির সেক্রেটারি জেনারেল মোহাম্মদ জহিরুল ইসলাম দাবি করেছেন, তারা ধর্মীয় সংগঠন। কোন উগ্র মৌলবাদী সংগঠন নয়। কোন উগ্র বা উগ্র মৌলবাদী বা জঙ্গী সংগঠনের কার্যক্রম সমর্থন বা তাদের সঙ্গে তারা যোগাযোগ রাখেন না। সংগঠনটির একজন সক্রিয় কর্মী নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানিয়েছেন, দাওয়া’তে ইসলামী চট্টগ্রামকেন্দ্রিক একটি সংগঠন। চট্টগ্রামের হাটহাজারী মাদ্রাসার সঙ্গে তাদের যোগাযোগ রয়েছে। তারা টঙ্গীতে বিশ্ব এজতেমায় অংশ নেন না। চট্টগ্রামে তারা আলাদা এজতেমা করেন। সারাদেশে তাদের ২ হাজারের বেশি কওমী মাদ্রাসা রয়েছে। সংগঠনটির প্রায় শতভাগ কার্যক্রমই বিদেশী অর্থায়নে পরিচালিত হচ্ছে।

এসব বিষয়ে এসপিজিআরসির সাধারণ সম্পাদক শওকত আলী বলছেন, তারা বিহারীদের স্বার্থ নিয়ে কাজ করেন। তাদের সঙ্গে কোন রাজনৈতিক দল, এনজিও, উগ্র বা উগ্র মৌলবাদী বা জঙ্গী সংগঠনের যোগাযোগ নেই। তারা কোন উগ্র সংগঠনকে সমর্থন করে না।

বিহারী ক্যাম্প স্থাপনের প্রেক্ষাপট ॥ ১৯৪৭ সালে ভারত-পাকিস্তান আলাদা হয়ে যায়। এরপর হিন্দু মুসলিম দাঙ্গার কারণে ভারতের দিল্লী, কর্ণাটক, কেরল, রাজ্যস্থান, তামিলনাড়ুসহ বিভিন্ন রাজ্যের অনেক মুসলমান মুসলিম দেশ হিসেবে পাকিস্তানে (বাংলাদেশে) বসবাসের আগ্রহ দেখায়। আগ্রহীদের কৌশলে পূর্বপাকিস্তান অর্থাৎ আজকের বাংলাদেশে থাকার ব্যবস্থা করে তখনকার পাকিস্তান সরকার। ১৯৫২ সালের মহান ভাষা আন্দোলনে এবং ১৯৭১ সালে মহান স্বাধীনতা আন্দোলনে উর্দুভাষী বিহারীরা পশ্চিম পাকিস্তানের পক্ষ অবলম্বন করে। যে কারণে স্বাধীনতা লাভের পর থেকেই বাঙালীরা বিহারীদের ভিন্নদৃষ্টিতে দেখে থাকে। অনাকাক্সিক্ষত পরিস্থিতি সৃষ্টির আশঙ্কায় স্বাধীনতার পর পরই আন্তর্জাতিক রেডক্রস বাংলাদেশের ১৩ জেলায় ৭০টি ক্যাম্প স্থাপন করে। ওই সময় রেডক্রস বিহারীদের কাছে, তারা কোন দেশে থাকতে চায় তা জানতে চাওয়া হয়েছিল। বিহারীরা পাকিস্তানে চলে যেতে আগ্রহ দেখায়। এরপর শুরু হয় বিহারীদের পাকিস্তান পাঠানোর প্রক্রিয়া।

এসপিজিআরসির সৃষ্টি ও ক্যাম্পের বর্তমান অবস্থা ॥ বিহারীদের পাকিস্তানে পাঠানোর সার্বিক দিক দেখভালসহ প্রতিনিধিত্ব করতে ১৯৭৮ সালের ২ ডিসেম্বর এসপিজিআরসি নামের সংগঠনটির সৃষ্টি হয়। ১৯৯২ সালে মক্কাভিত্তিক এনজিও রাবেতা আল ইসলাম বিহারীদের জরিপ মোতাবেক ঢাকার ৩১টি ছাড়া বাকি ৩৯টি ক্যাম্পের মধ্যে বগুড়া, গাইবান্ধা, ফরিদপুর, রাজবাড়ী, দিনাজপুর, ময়মনসিংহ, ঠাকুরগাঁও, জামালপুর ও নীলফামারিতে ১টি করে, নারায়ণগঞ্জে ৩টি, যশোরে ৯টি, রংপুরে ২টি, রাজশাহীতে ২টি, চট্টগ্রামে ৫টি, ঈশ্বরদীতে ৪টি ও খুলনায় রয়েছে ৫টি। ওই সময়ের জরিপ অনুযায়ী ক্যাম্পে ৪২ হাজার পরিবার ছিল। ওই সময় জনসংখ্যা ছিল প্রায় ২ লাখ সাড়ে ৩৭ হাজার। বর্তমান জনসংখ্যা প্রায় ৫ লাখ।

অনুসন্ধানে জানা গেছে, যারা আর্থিকভাবে সামর্থ্যবান তারা ক্যাম্প ছেড়ে আশপাশের এলাকায় বাড়ি ভাড়া নিয়ে বসবাস করছেন। তাদের নামে থাকা ঘর ভাড়া দিয়েছেন। অধিকাংশ বিহারীই শাড়ি, গহনা ও হস্তশিল্পের কাজে জড়িত। অনেকেই আবার বাঙালী মেয়ে বিয়ে করে ঘর সংসার করছেন। তাদের সন্তানাদি ভুয়া নাম ঠিকানা ব্যবহার করে স্কুল কলেজে পড়াশোনাও করছে। ভাল চাকরিও করছে। কেউ কেউ বিদেশ পাড়ি জমিয়েছে।

বাংলাদেশী পরিচয়পত্র পাওয়া না পাওয়া নিয়ে সমস্যা ॥ বিগত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলে সুপ্রীমকোর্টের এক রায়ের প্রেক্ষিতে নির্বাচন কমিশন থেকে বাংলাদেশে জন্ম নেয়া ভোটারযোগ্যদের তালিকাভুক্ত করে। ভোটার ও বাংলাদেশের জাতীয় পরিচয়পত্র পেয়েছেন ক্যাম্পের এমন বাসিন্দার সংখ্যা কমপক্ষে দেড় লাখ।

সম্পর্কিত:
পাতা থেকে: