২১ অক্টোবর ২০১৭,   ঢাকা, বাংলাদেশ   শেষ আপডেট এই মাত্র  
Login   Register        
ADS

বিরহকাল ও কিছু কথা


‘আমি যখন তোমাকে ছুঁই,

তখন তোমার যে ফুল ফোটে,

আমি তার নাম দিয়েছি ছুঁইফুল।

সবাই কি আর সে ফুল চেনে?

প্রিয়ার জন্য তারা কেনে জুঁইফুল।

আমার প্রিয় ফুল কি জানো?

ছুঁইফুল আর তুইফুল।’

-নিশিকাব্য (কবিতা ১০৭)

তাঁর নাম নির্মলেন্দু গুণ। অপাদমস্তক কবি। কবিতার সহজিয়া পথে তাঁর দীর্ঘ যাত্রা। ষাটের দ্বিতীয় প্রজন্মের শীর্ষ কবি। কতিবায় দীর্ঘদিনের সরব উপস্থিতি তাঁকে এনে দিয়ে অপরিসীম কবিখ্যাতি। শুধু দেশেই নয়- তাঁর কাব্যখ্যাতি ছাড়িয়েছে ভূগোল। বর্তমান বাংলা ভাষায় তিনি অন্যতম জনপ্রিয় কবি। এই কবি তাঁর কবিতায় মনোহরণের পাশাপাশি পাঠককে নিয়ে যান এক অন্যভূবনে যেখানে তাঁর কবিতাভঙ্গি তৈরি করে বিত্রিচ অনুভূতি।

নিজের জীবন দিয়ে তিনি কবিতাকে করেছেন বাঙময়। বিচিত্র জীবনযাপন, বোহেমিয়ান স্বভাব তাঁকে করেছে আর দশজন কবির চেয়ে ভিন্ন। জীবনে স্পষ্টবাদিতার চরম প্রকাশ করেছে তাঁর যাপিত জীবনে। কবিতায়। সঙ্গে। আত্মস্মৃতিতে। ভ্রমণ কাহিনীতে। ঘটমান জীবনে সঙ্গত কারণে মানুষ অনেক কিছু ‘সেলফ এডিট’ করে ডিলিট করের দেয়- এতে শালীনতা থাকে বলে অনেকেই বিশ্বাস করেন। কিন্তু নির্মলেন্দু গুণ এসবের থোড়াই কেয়ার করেন। ড্যাম কেয়ার- তাঁর জীবনের গভীর গোপন বিষয় নিয়ে কে কী ভাবল, না ভাবল তা নিয়ে তাঁর কোন ভাব-ভাবান্তর নেই। অকপটে তা স্বীকার করেছেন- কবিতার মধ্য দিয়ে তা তুলে এনে পাঠকের সামনে উন্মোচন করেছেন। অনায়াসে ও অবলীলায়। বস্তুত এই কপটহীনতা ও স্পষ্টবাদিতার কারণে নির্মলেন্দু গুণ আজ দু’বাংলায় নিজেই একক প্রতিদ্বন্দ্বী। ‘নির্বাচিতা’র মুখবন্ধে কবি তাঁর স্পষ্টবাদিতার কথা নিজেই উচ্চারণ করছেন, ‘আমার যা বলবার, স্পষ্ট করেই আমি তা বলবার চেষ্টা করি, যা কঠিন আমার মন তাতে সহজে সাড়া দেয় না। সহজ করে পাওয়ার মধ্যে একটা আনন্দ আছে। চার পাশের কঠিনের ভিড়ে আমি চাই সহজ করে বলতে। জানি এ স্বভাব নাগরিক কবির নয়, লোককবির। মৈমনসিংহ গীতিকার কবিদের মধ্যে আমার জন্ম।’

বিরহকাল, কামতপ্ত-প্রেম, রাজনীতি, সমাজতন্ত্র, বিল্পব, মুক্তিযুদ্ধ, বঙ্গবন্ধু, বাঙালী জাতীয়তাবোধ, অসাম্প্রদায়িক চেতনা- নানাভাবে প্রতিফলিত হয়েছে তাঁর কবিতায়। কখনও তিনি বিপ্লবী গুণ, কখনও বিরহী গুণ, কখনও রাজনীতিতে আকণ্ঠ নিমজ্জিত গুণ, কখনও অবিনাশী কামুক আবার কখনও বা আত্মমগ্ন গুণ। সব পরিচয়ের ভেতর তিনি সযতনে পুষে রাখেন নিজস্ব কবিসত্তা। ব্যক্তিসত্তা। বাংলাদেশের রাজনীতিকে খুব কাছ থেকে দেখেছেন, পর্যবেক্ষণও করেছেন। সাংবাদিকতা করতে গিয়ে সে দেখা আরও গভীর থেকে গভীরতর হয়েছে। নিজে রাজনীতি করেছেন। ১৯৯১ সালে নিজ এলাকা থেকে স্বতন্ত্র প্রার্থী হয়ে সংসদ নির্বাচন পর্যন্ত করেছেন। এক জীবনে কত অভিজ্ঞতার ভেতর যে তিনি পরিভ্রমণ করেছেন তা সত্যিই ঈর্ষণীয়। এতকিছুর পরও মূলত কবি হৃদয়কে ধারণ করেছেন, প্রেমিক হৃদয়কে ধারণ করেছেন। যেহেতু প্রেমিক হৃদয় সেহেতু সেখানে তো বিরহ থাকবেই। আর বিরহ থাকলে নির্মলেন্দু গুণ স্বভাবদোষে বিরহী হয়ে উঠবেন এতে অবাক হওয়ার কী! ‘দীর্ঘ দিবস দীর্ঘ রজনী’ থেকে কবির বিরহমনের শুরু। ‘তোমার বন্ধন’ কবিতায় তিনি উচ্চারণ করছেন, ‘তুমি চলে যাচ্ছো, তোমার চলে যাওয়া কিছুতেই শেষ হচ্ছে না/ সেই কবে থেকে তুমি যাচ্ছো, তবু শেষ হচ্ছে না।’

সম্ভবত বাংলা কবিতায় বিরহকে বিলাসিতার পর্যায়ে নিয়ে যেতে পেরেছেন নির্মলেন্দু গুণ। তা না হলে ‘উপেক্ষা’ কবিতায় তিনি কী করে বলেন, ‘আমি বিরহ চাই, ভালবেসে কার্পণ্য শিখিনি/ আমি কি ডরাই সখি, ভালবাসা ভিখারী বিরহে?’

প্রয়াত কবি, গবেষক অধ্যাপক খোন্দকার আশরাফ হোসেন গুণের কবিতার দোষগুণ প্রবন্ধে কবির কাব্যগুণ সম্পর্কে বলতে গিয়ে বলেছেন, ‘... নির্মলেন্দু গুণের সহজবোধ্যতার আবেদন, তাঁর প্রেমিকসত্তার বৈচিত্র্যময় রূপায়ন, তাঁর সংস্কারমুক্ত জীবনভাবনার নানা দিক এবং সর্বোপরি রাজনৈতিক-সামাজিক ঘটনা-সংঘটনের প্রতি তাঁর উৎফুল্ল মনোযোগ। এ সবকিছুই করেছে প্রবলভাবে জনপ্রিয়। আর জনপ্রিয়তা মানেই ক্ষণিকতার মুষ্টিযোগ তা হয়ত সত্য নয়। মানুষের অন্তর্গত সত্তার পরিবর্তন হয় না খুব বেশি এবং এমত ধারণা করা যায় যে, শত মন্বন্তর ও বিপ্লবের মধ্যেও মানুষের মৌলিক আবেগগুলো- প্রেম, বিরহ, রিরংসা, ক্রোধ ও করুণা বেঁচে থাকবে। নির্মলেন্দু গুণ সার্থকভাবে ছুঁতে পেরেছেন ওই আবেগগুলো, এই কালে। আশা করা যায়, দীর্ঘ দিবস, দীর্ঘ রজনী পরেও পাঠক একই ভাবে প্রদীপ্ত হবেন গুণের উচ্চারণগুলোর হৃদ্য ছোঁয়ায়।’

বাংলাদেশের অন্যতম জনপ্রিয় কবি নির্মলেন্দু গুণকে নিয়ে একটি বিশেষ সংখ্যা প্রকাশ করেছে সাহিত্যের কাগজ ‘কাশবন’। সংখ্যাটি হাতে নিলেই এর ওজন পরিমাপ করা যায়। প্রচ্ছদে জলরঙে আঁকা মনোমুগ্ধকর কবির পোট্টেট- যেন কবি নিজেই একটা বিশাল কাশবন। শিল্পী মাসুক হেলাল কবিকে যথার্থই হৃদয়পটে ধারণ করেন- প্রচ্ছদের ছবিটি তা-ই বলে। ‘কাশবন’-এর নামলিপির মধ্যেও এক ধরনের ভাবালুতার তৈরি করে। এ তো গেল প্রচ্ছদ। কিন্তু এই সংখ্যার লেখকসূচীর দিকে তাকালেও কাশবনের সমৃদ্ধ লেখা ও এর বিচিত্র ভূবনের সঙ্গে পরিচিত হওয়া যায়। এসব লেখার মধ্যে খুঁজে পাওয়া যায় পূর্ণাঙ্গ গুণকে। কারা কারা লিখেছেন কাশবন-এর নির্মলেন্দু গুণ সংখ্যায়? প্রবন্ধ লিখেছেন খোন্দকার আশরাফ হোসেন, রফিকউল্লাহ খান, নবনীতা দেব সেন, সুশীল সাহা, বিমল গুহ, রেজাউদ্দিন স্টালিন, আহমাদ মাযহার, কামরুল হাসান, মাসুদুল হক, তপন বাগচী, টোকন ঠাকুর, সৈকত হাবিব, মনি হায়দার, পাবলো শাহি, সমুন গুণ, জুননু রাইন, আহ্মেদ লিপু, পিয়াস মজিদ, মৃত্তিকা গুণ। তিনটি সাক্ষাতকার রয়েছে। অমিয় চট্টোপাধ্যায়, আনোয়ার কবির এবং মিন্টু হক সাক্ষাতকারগুলো নিয়েছেন। কবিকে নিবেদিত কবিতায় আছেন মুহম্মদ নূরল হুদা, আসলাম সানী, মানিক মোহাম্মদ রাজ্জাক, জাকির তালুকদার, ফরিদুজ্জামান, সাজ্জাদ কবির, আনোয়ার কামাল। কবির বিখ্যাত কবিতা ‘হুলিয়া’ থেকে নির্মিত চলচ্চিত্র হুলিয়ার চিত্রনাট্য এই সংখ্যাকে বিষেশভাবে ভিন্নমাত্রা দিয়েছে। ‘চিঠিপত্র’ বিভাগে নির্মলেন্দু গুণকে লেখা বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও কবি আবুল হাসানের চিঠিটি বিশেষ তাৎপর্যময়। এছাড়া ‘কাশবন’ নিয়ে মাইনুল শাহিদ ও নাসের হোসেনের লেখাটিও উল্লেখ করার মতো। তবে ‘চিত্রকর্ম’ অধ্যায়ে পাঠক নির্মলেন্দু গুণের আঁকা চাররঙা ছবি দেখতে পাবেন। মোস্তাফিজ কারিগর কবির চিত্রকর্ম নিয়ে একটি ছোট অথচ গভীর ব্যঞ্জনায় ঋদ্ধ লেখা লিখেছেন যা প্রশংসার দাবিদার।

প্রকাশনার এই চরম দুর্ভিক্ষের সময় কাশবন সম্পাদক মিন্টু হক বিজ্ঞাপনের তোয়াক্কা না করে গাঁটের পয়সা বেমালুম ভুলে গিয়ে দেশের শীর্ষ ও জনপ্রিয় কবিকে নিয়ে একটি অসাধারণ, শিল্পিত সংখ্যা বের করে প্রমাণ করেছেন কবির প্রতি সর্বোপরি কবিতার প্রমাণ তার অপার ভালবাসার কথা। প্রেমের কথা। আগামীতে সম্পাদক কাশবনে নতুন কোন বিষয় নিয়ে আরও সমৃদ্ধ হয়ে পাঠকের সামনে হাজির হবেন- এমন প্রত্যাশা করি।