২১ নভেম্বর ২০১৭,   ঢাকা, বাংলাদেশ   শেষ আপডেট ৭ ঘন্টা পূর্বে  
Login   Register        
ADS

কালের ধ্বনির অনবদ্য প্রয়াস


মুক্তবুদ্ধির চর্চা বা বড় কথা বলতে পারার সক্ষমতার কারণে ‘ছোটকাগজ’ শিরোনামটি তার সত্তার স্ববিরোধী। বস্তুত লেখকের নিরঙ্কুশ স্বাধীনতা সংরক্ষণের জন্য কোন বিষয় বা ব্যক্তি সম্পর্কে এখানে স্বতঃস্ফূর্ত আলোচনা-সমালোচনার সুযোগ সৃষ্টি হয়; ফলে নিজের খেয়ে বনের মহিষ তাড়ানোর অভিযোগ থাকলেও সৃজনশীলতার নিরিখে ছোটকাগজ ও তার সম্পাদকের গুরুত্ব অপরিসীম। সমকালীন ছোটকাগজের গতি-প্রকৃতি লক্ষ করলে দেখলে পাই, বিষয়ভিত্তিক সংখ্যার প্রতি সম্পাদকরা অধিকতর আগ্রহী হয়ে উঠছে। হতে পারে এটা সময়ের দাবি! তবে মহিষ তাড়ানোর মানদ-ে রাখালের (সম্পাদক) লক্ষ্য, দক্ষতা, পরিকল্পনা, প্রয়োজনীয়তা ও সার্থকতা নিরূপণ করা জরুরী বলে মনে করি।

সাহিত্যের ছোটকাগজ ‘কালের ধ্বনি’র চলতি সংখ্যাটি পূর্বের সংখ্যাগুলো হতে ভিন্নতর। বিষয়ের সঙ্গে আঙ্গিকেও আমূল পরিবর্তন এসেছে, প্রথাগত ধারা থেকে বিষয়ভিত্তিক হয়ে উঠেছে। প্রশ্ন আসতে পারে, বিষয় হিসেবে সাহিত্যিক ও রাজনীতিবিদ আবুল মনসুর আহমদকে (১৮৯৮-১৯৭৯) কেন নির্বাচন করলেন; সামান্য অদক্ষতায় পাঠক-সমালোচকের অসির তলে প্রাণহরণ নিশ্চিত জেনেও কাজ করা কি ঝুঁকিপূর্ণ নয়! দুঃসাহসিকও বটে! অথচ সম্পাদক ইমরান মাহফুজ নির্ভিকচিত্তে ওই ঝুঁকি কাঁধে তুলে নিয়েছেন! একুশ মাসের দীর্ঘ শ্রমে সম্পাদনা করেছেন ৫৮১ পৃষ্ঠার বৃহৎ কর্মযজ্ঞ। আবুল মনসুর আহমদকে নিয়ে এই প্রথম নয়, ১৯৯৮ সালে রফিকুল ইসলাম সম্পাদনা করেছেন, আবুল মনসুর আহমদের রচনাবলী; নুরুল আমিন সম্পাদনা (১৯৮৮) করেছেন, আবুল মনসুর আহমদের আয়না; ১৯৮৫ সালে রাজিব হুমায়ূন সম্পাদনা করেছেন, আবুল মনসুর আহমদের ব্যঙ্গ রচনা; জাতীয় গ্রন্থকেন্দ্রের ক্রোড়পত্রসহ আরও অনেকেই এই মহান ব্যক্তির ওপর কাজ করেছেন। তবে কালের ধ্বনি’র আয়োজন অন্য সবার চাইতে আলাদা। ‘দুর্লভ কথক আবুল মনসুর আহমদ’ শিরোনামে অখ- আবুল মনসুর আহমদকে উপস্থাপন করা হয়েছে। সাহিত্য ও রাজনীতির পাশাপাশি তার ব্যক্তিগত, পারিবারিক ও সামাজিক জীবনের ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র অংশ আলোচিত হয়েছে।

আলোচনা ও পাঠকের সুবিধার্থে সমগ্র আয়োজন পর্বে-পর্বে বিভক্ত হয়েছে। সাহিত্য মূল্যায়ন, ব্যঙ্গ শিল্পের মূল্যায়ন, রাজনৈতিক বিশ্লেষণ, সংবাদপত্র ও সাংবাদিকতা, জীবন দর্শন, বুদ্ধিবৃত্তিক চর্চা : ভাষা, বুদ্ধিবৃত্তিক চর্চা : ধর্ম-দর্শন, আইনজীবী, নাট্যাঙ্গন, স্মৃতিকথা ও মূল্যায়ন : পরিবার, স্মৃতিচারণ : অন্যান্য, পরিশিষ্ট : ১ ও পরিশিষ্ট : ২ সম্পাদকের দূরদৃষ্টির পরিচায়ক। সমৃদ্ধ লেখক তালিকা সংখ্যাটির উল্লেখযোগ্য দিক। বিচারপতি আবদুর রহমান চৌধুরী, সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী, মোহাম্মদ মনিরুজ্জামান, আল মাহমুদ, আখতার-উল-আলম, রফিকুল ইসলাম, আবুল কালাম মনজুর মোর্শেদ, যতীন সরকার, আনিসুজ্জামান, শেখ আবদুল জলিল, আবদুল গাফফার চৌধুরী, সৈয়দ আবুল মকসুদ, শাহ খায়রুল বাশার, আনোয়ারা বেগম, ড. নুরুল আমিন, ড. আবদুর রহিম, শহীদ ইকবাল, ড. মিজানুর রহমান, আহমেদ মওলা, অজয় রায়, এস এম আলী, বিলু কবীর, বিচারপতি এ কে এম নুরুল ইসলাম, মাহবুব আনাম, কে জি মোস্তফাসহ বাংলা সাহিত্যের অসংখ্য প্রথিতযশা লেখকের লেখা কাগজটির শ্রীবৃদ্ধি করেছে। বলার অপেক্ষা রাখে না, তাদের বস্তুনিষ্ঠ আলোচনা পাঠকের বোধের দুয়ারে নিরন্তর কড়া নাড়বে। কোন বিশেষ একটি সংখ্যায় এত অসংখ্য গুণীজনের সমাবেশ ঘটানো সত্যি সত্যি দুরূহ!

রাজার নীতি হিসেবে খ্যাত রাজনীতি এখন ভিন্নপথে; শুরু হয়েছে পচন প্রক্রিয়া। দলে দলে হানাহানি, ক্ষমতার লিপ্সা, মূল্যবোধের চূড়ান্ত অবক্ষয়, দলীয় আদর্শের অপমৃত্যু, পেশিশক্তির অপব্যবহারের ফলে দিকভ্রান্ত জাতি। অথচ অতীতে এমনটা ছিল না! রাজনীতির ওপর লেখকদের প্রত্যক্ষ প্রভাব ও অংশগ্রহণ ছিল। উইস্টন চার্চিল, পাবলো নেরুদা, চে গুয়েভারা, খুশবন্ত সিংসহ অসংখ্য সাহিত্যিক বিশ্ব রাজনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখেছেন। মূলত সৃজনশীল মানুষ তথা কবি-সাহিত্যিকরা রাজনীতি থেকে মুখ ফিরিয়ে নেয়ার (কারও কারও দলদাসে পরিণত হওয়া) ফলে আমাদের রাজনীতি আজ ভিন্নধারায়! বঙ্গবন্ধুর ৭ মার্চের ঐতিহাসিক ভাষণ কালজয়ী সাহিত্য হিসেবে বিবেচিত। একজন আবুল মনসুর আহমদের কোন পরিচয়কে আমরা বড় করে দেখব- রাজনীতিবিদ নাকি সাহিত্যিক! রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ ক্ষমতা স্পর্শ করার পরেও তাঁর সাহিত্যিক পরিচয় উপেক্ষা করার নয়। সম্পাদক ইমরান মাহফুজ লিখেন : তাঁর রচিত সাহিত্য পড়ে ও বিশ্লেষণে দেখা যায়- দেশপ্রেম বুকে নিয়ে সারা জীবন সব রকম প্রহসনমূলক রাজনীতি ও দুর্নীতির বিরুদ্ধে ছিলেন। তাঁর দেখা সমাজের প্রতিটি অসঙ্গতি নিয়েই কলম ধরেছেন। সময়ের বুকে পা রেখে কুয়াশা ভেদ করে দেখেছেন আলো। সর্বত্র বিচরণে দিনে দিনে তার কলম হয়ে উঠেছে দুর্ধর্ষ।

অনেকে মনে করেন এমন বহুদর্শী মানুষকে নিয়ে একটি বিশেষ সংখ্যা প্রকাশ করার উদ্যোগ নিঃসন্দেহে সাহসী পদক্ষেপ। ইমরান মাহফুজদের এখানেই অনন্যতা। দক্ষ কর্মকুশলতার পরিচয় আমরা গ্রন্থটির প্রতিটি পরতে পরতে প্রতিটি পাতায় পাতায় প্রত্যক্ষ করি। যেসব গুণীজন আবুল মনসুর আহমদকে নিয়ে লিখেছেন- স্মৃতিচারণ করেছেন-মূল্যায়ন করেছেন, তাদের কাছ থেকে লেখা সংগ্রহ থেকে শুরু করে গ্রন্থনা ও প্রকাশনা একটি বিশাল কর্মযজ্ঞ ছিল। এই কর্মযজ্ঞকে সফলভাবে সম্পাদন করে পাঠক ও আবুল মনসুর অনুরাগী/ভক্তদের হাতে পৌঁছে দেয়ার নিরলস প্রয়াস সম্পাদক ইমরান মাহফুজ ও তার কর্মসঙ্গীরা সুচারুরূপে পালন করে আমাদেরকে ইতিহাসের একটি দায়বদ্ধতার হাত থেকে নিষ্কৃতি দিয়েছেন বলেই আমার বিশ্বাস।

আবুল মনসুর আহমদকে নিয়ে কালের ধ্বনির বিশেষ সংখ্যাটি ইমরান মাহফুজদের নিকট আমাদের প্রত্যাশা অনেকগুণ বাড়িয়ে দিয়েছে। একটি মানসম্মত-সুন্দর ও সৌষ্ঠব অবয়ব এবং কলেবরে স্মারক সংখ্যাটি এখানেই থেমে থাকবে বলে আমরা মনে করি না। আমরা প্রত্যাশা করি বাংলাদেশ ও বাঙালীর আরও আরও প্রথিতযশা যেসব বরেণ্য ব্যক্তিবর্গ আছেন, তাদের নিয়েও কালের ধ্বনি এ ধরনের প্রয়াস অনবরতই নিতে থাকবে।