২৩ অক্টোবর ২০১৭,   ঢাকা, বাংলাদেশ   শেষ আপডেট ৬ ঘন্টা পূর্বে  
Login   Register        
ADS

কবি চন্দ্রাবতী ও মৈমনসিংহ গীতিকা


‘চাইর কুনা পুষ্করিণীর পাড়ে চম্পা নাগেশ্বর/ডাল ভাইংগা পুষ্প তোল, কে তুমি নাগর?’ ভোরে ফুল তুলতে এসেছিল কিশোরী চন্দ্রাবতী, তার পরিচয় জানতে চায় কিশোর জয়ানন্দ। উঁচু ডালের বড় ফুলটি নাগাল পায় না সে, জয়ানন্দ সেটি পেড়ে দেয়। দুই কিশোর-কিশোরীর মধ্যে ভাব হয়ে যায়। এমনিভাবে দিন কেটে যায়। তারা বড় হতে থাকে। একদিন জয়ানন্দ চন্দ্রাবতীকে বলে নতুন কথা, ‘ফুল তুল ফুল তুল কন্যা, তুমি ফুলের রাণী/ঐ না ফুলের সঙ্গে বান্দা আমার পরাণী।’

বাংলা সাহিত্যের প্রথম মহিলা কবি চন্দ্রাবতী। দীনেশ চন্দ্র সেনের মতে কবি চন্দ্রাবতী ১৫৫০ খ্রিস্টাব্দে জন্মগ্রহণ করেন। ‘মৈমনসিংহ গীতিকা’র ‘জয়-চন্দ্রাবতী’ উপাখ্যানের নায়িকারূপে তিনি অমর হয়ে আছেন।

বৃহত্তর ময়মনসিংহের কিশোরগঞ্জ জেলা শহর হতে পাঁচ মাইল উত্তরে নীলগঞ্জ রেলস্টেশন। স্টেশনের পূর্ব পাশে ফুলেশ্বরী নদী। নদীর পরেই ছায়াঢাকা, পাখিডাকা ছোট্ট সবুজ গ্রাম পাতুয়াইর। কবি চন্দ্রাবতী এই গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পিতা দ্বিজবংশী দাশ মধ্যযুগের বাংলা সাহিত্যের একজন নামকরা কবি ছিলেন। ‘মনসা মঙ্গল’ কাব্য রচয়িতাদের মধ্যে দ্বিজবংশী দাশ ছিলেন অন্যতম। তিনি নিজগৃহে একটি টোল পরিচালনা করতেন। সেই টোলে চন্দ্রাবতী সহপাঠী হিসেবে পেয়েছিলেন জয়ানন্দকে। দু’জনে একসঙ্গে লেখাপড়া করতেন, মন্দিরে পুজোর জন্য ফুল তুলতেন আর দ্বিজবংশী দাশের মুখে কাব্য শুনতেন। ক্রমে দু’জনেই বড় হলেন, একে অপরকে ভালবাসলেন।

চন্দ্রাবতী কৈশোর উত্তীর্ণ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে তার রূপ ও গুণের কথা চারদিকে ছড়িয়ে পড়ে। দেশের বিভিন্ন জায়গা থেকে বিয়ের প্রস্তাব আসে। কিন্তু চন্দ্রার মন বাঁধা রয়েছে সহপাঠী ব্রাহ্মণ যুবক জয়ানন্দের কাছে। বাল্যসাথীকে চিরসাথী হিসেবে পাওয়ার বাসনা একে অপরের নিকট ব্যক্ত করলেন। জয়ানন্দ চন্দ্রাবতীর পিতার নিকট বিয়ের প্রস্তাব পাঠায়। বিয়ের প্রস্তাব পেয়ে দ্বিজবংশী দাশ আনন্দে এ প্রস্তাবে রাজি হলেন। কোষ্ঠী বিচার করে বিবাহের দিনক্ষণ পর্যন্ত ধার্য হলো। চন্দ্রাবতী আনন্দে গেয়ে ওঠে, ‘বাড়ির আগে ফুইটা রইছে মল্লিকা মালতী, জন্মে জন্মে পাই যেন তোমাকেই পতি।’

কিন্তু এর মধ্যে এক দুঃখজনক ঘটনা ঘটে যায়। জয়ানন্দ ছিল দুর্বল চরিত্রের লোক। জলের ঘাটে কাজীর মেয়েকে দেখে তাকে পাওয়ার জন্য ব্যাকুল হয়ে চিঠি লেখে। অবশেষে জয়ানন্দ ধর্মান্তরিত হয়ে সেই মুসলমান মেয়েকে বিয়ে করে। এ খবর শুনে চন্দ্রাবতী শোকে একেবারে ভেঙে পড়ে, ‘না কান্দে না হাসে চন্দ্রাÑ নাহি বলে বাণী/আছিলো সুন্দর কন্যা হইলো পাষাণী।’ কন্যার এই অবস্থা দেখে দ্বিজ বংশী দাশ বিচলিত হয়ে পড়লেন। তিনি আবার মেয়ের বিয়ে ঠিক করতে চান। কিন্তু চন্দ্রাবতী পিতার কাছে আজীবন কুমারী থাকার বাসনা ব্যক্ত করেন এবং একটি শিবমন্দির প্রতিষ্ঠা করে দেয়ার অনুরোধ জানান, যেখানে তিনি শিবের উপাসনায় জীবন কাটাবেন। তার কথামতো দ্বিজবংশী দাশ মেয়ের জন্য ফুলেশ্বরী নদীর তীরে একটি শিবমন্দির প্রতিষ্ঠা করে দিলেন। কবি চন্দ্রাবতী প্রেমাস্পদ জয়ানন্দের বিচ্ছেদজ্বালা ভোলার জন্য ফুলেশ্বরী নদী তীরের সেই মন্দিরে শিবের ‘আরাধনা’য় মগ্ন হন এবং সেই সঙ্গে কাব্যচর্চায় মন দেন। তিনি একে একে রচনা করেনÑ দেওয়ান ভাবনা, দস্যু কেনারাম, মলুয়া ‘পদ্মাপুরাণ’ প্রভৃতি কাব্যগীতি।

এরপর চন্দ্রাবতী হাত দেন রামায়ণ রচনায়। বাবার আদেশে কবিতায় রামায়ণের কাহিনী রচনা করতে জীবন উৎসর্গ করলেন। তিনি যখন রামায়ণ রচনায় মগ্ন, তখন একদিন জয়ানন্দ নিজের ভুল বুঝতে পেরে অনুতপ্ত হয়ে চন্দ্রাবতীর কাছে ক্ষমা চাওয়ার জন্য দর্শনপ্রার্থী হয়। অনেক দিন পর চন্দ্রাবতীর মন্দিরে দেখা দিল জয়ানন্দ। কিন্তু চন্দ্রাবতী তাকে মন্দিরের দরজা থেকে ফিরিয়ে দেন। এমনকি দর্শন পর্যন্ত দেননি জয়ানন্দকে। চন্দ্রাবতীর দর্শনলাভে ব্যর্থ হয়ে অভিমানী জয়ানন্দ মন্দির প্রাঙ্গণ থেকে সন্ধ্যামালতী ফুল কুড়িয়ে ফুলের রসে মন্দিরের কপাটে চিরদিনের মতো বিদায় প্রার্থনা করে এক পত্র লেখে-

‘দ্বার খোল দ্বার খোল চন্দ্রা তোমায় একবার দেইখ্যা যাই/অভাগা জয়ানন্দ ডাকি আমি শেষ বিদায় চাই।’

চন্দ্রাবতী দ্বার খোলে না। দুঃখ, বেদনা আর অনুশোচনায় জয়ানন্দ ফুলেশ্বরী নদীতে ঝাঁপিয়ে পড়ে আত্মহত্যা করে।

এদিকে পুজো শেষে মন্দিরের কপাটের লেখার ওপর চন্দ্রার চোখ পড়ে-

দ্বার খোল চন্দ্রাবতী দেখা দাও আমারে ॥

না ছুঁইব না ধরিব দূরে থ্যাকা খাড়া।

ইহ জন্মের মতন কন্যা দেও মোরে সাড়া ॥

দেব পূজার ফুল তুমি গঙ্গার পানি।

আমি যদি ছুঁই কন্যা হইবা পাতকিনী ॥

নয়ন ভরে দেখ্যা যাই জন্মশোধ দেখা।

শৈশবের নয়ন দেখি নয়ন ভঙ্গি বাঁকা ॥

জয়ানন্দকে শেষ দেখা দেননি চন্দ্রাবতী। একমনে মন্দিরে বসে শিবের ধ্যানে মগ্ন ছিলেন। পুজো শেষে মন্দিরের বাইরে এসে জয়ানন্দের চিঠি দেখতে পায়। তারপর মন্দিরে ব্যবহারের জন্য চন্দ্রাবতী ফুলেশ্বরী নদীর ঘাটে জল আনতে গেলে দেখতে পায় নদীতে ভাসছে জয়ানন্দের মৃতদেহ। এভাবেই শেষ হয় মৈমনসিংহ গীতিকার চন্দ্রাবতী কাব্যটি। বাংলা সাহিত্যের প্রথম মহিলা কবি চন্দ্রাবতীকে নিয়ে কাব্য লিখেছেন নয়ন চাঁদ ঘোষ।

এই ঘটনার কয়েক দিন পর চন্দ্রাবতীও ফুলেশ্বরীর জলে বিসর্জন দিয়ে জয়ানন্দের অনুগামিনী হন। চন্দ্রাবতীর সর্বশেষ ও সর্বশ্রেষ্ঠ রচনা ‘রামায়ণ কথা’ অসমাপ্তই থেকে যায়। ১৯৩২ সালে দীনেশ চন্দ্র সেন চন্দ্রাবতীর রামায়ণ প্রকাশ করেন। পূর্ববঙ্গ গীতিকার চতুর্থ খ-ে এই রামায়ণ স্থান পেয়েছে।

দীর্ঘদিন এ কাব্য ময়মনসিংহের ঘরে ঘরে পঠিত ও গীত হয়েছে। লৌকিক, মানবিক ও অন্যান্য মৌলিক উপাদান সমৃদ্ধ এ কাব্যটি বিশেষ মর্যাদার আসনে অধিষ্ঠিত। মৈমনসিংহ গীতিকার জয়-চন্দ্রাবতী উপাখ্যানের নায়িকারূপে অমর হয়ে আছেন কবি চন্দ্রাবতী।

বাংলা সাহিত্যের এক অমূল্য সম্পদ মৈমনসিংহ গীতিকা। শুধু বাংলা সাহিত্য কেন, বিশ্ব সাহিত্য ভা-ারেরও এক অনন্য সংযোজন এই মৈমনসিংহ গীতিকা।

কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃক ১৯২৩ সালে দীনেশ চন্দ্র সেনের সম্পাদনায় প্রকাশিত হয় মৈমনসিংহ গীতিকা। এতে ময়মনসিংহের পূর্বাঞ্চলে প্রচলিত এবং চন্দ্রকুমার দে কর্তৃক সংগৃহীত দশটি লোকগীতিকা স্থান পায়। প্রকাশের সঙ্গে সঙ্গে গীতিকাগুলো গুণীজনের দৃষ্টি আকর্ষণ করে এবং এগুলো এক অমূল্য আবিষ্কার হিসেবে চিহ্নিত হয় এবং স্বীকৃতি লাভ করে। দীনেশ চন্দ্র সেন এর ইংরেজী অনুবাদ করেন। তাঁর ইংরেজী অনুবাদ চঁৎনধনধহমষধ এববঃরশধ-ঋড়ষশ ইধষষধফং ড়ভ ঊধংঃ ইবহমধষ প্রকাশিত হলে রোঁমারোঁলাসহ অনেক মনীষী এর অকুণ্ঠ প্রশংসা করেন।

এরপর দীনেশ চন্দ্র সেন আরও গীতিকা সংগ্রহের সন্ধানে মনোনিবেশ করেন। এবার চন্দ্রকুমার দে’র সঙ্গে সংগ্রহকাজে যোগ দেন কবি জসীমউদ্দীন ও আশুতোষ চৌধুরী। এভাবে আরও পঁয়তাল্লিশটি রচনা সংগৃহীত হয়। এগুলো দীনেশ চন্দ্রের সম্পাদনায় কলকাতা বিশ্ববিদালয় থেকে ‘পূর্ববঙ্গ গীতিকা’ নামে তিন খ-ে প্রকাশিত হয়।

পরে পূর্ণচন্দ্র ভট্টাচার্য বিদ্যাবিনোদ, রওশন ইজদানী ও ক্ষিতীশ মৌলিকের মতো সাহিত্যপ্রেমী এসব লোকগীতিকার নানান ভাষ্য সংগ্রহ করেন এবং বিভিন্ন সময়ে কলকাতা ও ঢাকা থেকে প্রকাশিত হয়।

এসব গীতিকায় ফুটে উঠেছে বাংলা মৌলিক সাহিত্যের এক অকৃত্রিম নিদর্শন। এতে গ্রাম-বাংলার সাধারণ মানুষের সুখ-দুঃখ, আনন্দ-বেদনার কথা তাদের নিজস্ব জবানীতে প্রতিফলিত হয়েছে।

পূর্ববঙ্গ গীতিকার প্রধান বৈশিষ্ট্য এর ধর্মনিরপেক্ষতা। কোন বিশেষ ধর্মের মতের প্রতিফলন এতে ঘটেনি। শুধু তাই নয়, বরং নর-নারীর যে প্রণয়াবেগ, ধর্মবন্ধন ও সামাজিক শাসন অস্বীকার করে, এসব গীতিকায় সেই প্রণয়াবেগেরই স্তুতি করা হয়েছে। প্রেমই গীতিকাগুলোর প্রধান উপজীব্য এবং সাধারণত সে প্রেম বিয়োগান্ত। বিভিন্ন পরিস্থিতিতে প্রণয়কাহিনী ভিন্ন ভিন্ন রূপ লাভ করেছে সত্য, কিন্তু এর অন্তরালবর্তী আবেগের রয়েছে মৌলিক ঐক্য।

আরও একটি বিষয় লক্ষণীয়, গীতিকাগুলো রয়েছে নারীর এক বিশেষ স্থান ও মর্যাদা। যে প্রেমনিষ্ঠা পুরুষ চরিত্রে সর্বত্র দেখা যায় না, সেই প্রেমনিষ্ঠাই নারী চরিত্রকে করেছে মোহনীয়। বিবাহপূর্ব প্রেম কিংবা বিবাহিতা জীবনের প্রেম জীবনের উভয় ক্ষেত্রেই এই নিষ্ঠার পরিচয় পাওয়া যায়।

চন্দ্রবতী, চম্পাবতী, মলুয়া, মদিনা, সখিনার প্রেম যথার্থ মূল্য পায়নি তাদের প্রেমাস্পদের কাছে, কিন্তু তাতে নিষ্ঠার কোন তরতম্য হয়নি। এই নিষ্ঠা গীতিকার নারী চরিত্রকে দীপ্ত করেছে, স্বাধীন বিকাশ ঘটিয়েছে ব্যক্তিত্বের।

গীতিকাগুলোর কিছু রচয়িতার নাম পাওয়া গেলেও বিস্তারিত কিছুই পাওয়া যায় না। একমাত্র কবি চন্দ্রাবতী সম্পর্কে জনা যায়।

বাংলা সাহিত্যের আদি মহিলা কবি- কবি চন্দ্রবতী। চন্দ্রাবতী অজস্র লোকগীতি রচনা করেন। তাঁর মৃত্যু হয় আজ থেকে প্রায় চার শ’ বছর আগে। কিন্তু তাঁর লেখা পালাগানগুলো আজও গাঁও-গঞ্জের বিভিন্ন আসরে গীত হয়। নৌকার মাঝির কণ্ঠে, ব্রতে, বিয়েতে এবং প্রতিদিনের গার্হস্থ্য জীবনে আজও শোনা যায় চন্দ্রাবতীর গান। ষোড়শ শতাব্দীর সামাজিক ও অর্থনৈতিক অবস্থার স্বরূপ প্রতিফলিত হয়েছে চন্দ্রাবতীর রচনায়। চন্দ্রাবতীর স্মৃতি, রচনা, জীবন ও সাহিত্য আজও গবেষক ও পর্যটকদের আকর্ষণ করে।

তিনি যে মন্দিরটিতে বসে তাঁর অমর সৃষ্টিগুলো রচনা করে গেছেন সেই মন্দিরটি আজও রয়েছে। রয়েছে তাঁর বসতভিটা। এই বাড়ির পাশ দিয়ে বয়ে যাওয়া ফুলেশ্বরী নদীটি দূরে সরে গেছে। কিন্তু আজও অরণ্যে আবৃত ঝোপ-জঙ্গলে ঘেরা স্থানের দিকে অঙ্গুলি তুলে লোকে বলে- এখানেই জয়ানন্দ ও চন্দ্রাবতী প্রাণ বিসর্জন দিয়েছিলেন ফুলেশ্বরীর জলে।

কিশোরগঞ্জ জেলার পাতুয়াইর গ্রামে শ্যামল প্রকৃতির বুকে দাঁড়িয়ে আছে বাংলা সাহিত্যের প্রথম মহিলা কবি চন্দ্রাবতীর মন্দির, বসতভিটা। মলুয়া, দেওয়ান ভাবনা ইত্যকার প্রাচীন পল্লীগাথা ও কাহিনীর রচয়িতা চন্দ্রাবতীর নাম পূর্ববঙ্গ গীতিকা ও মৈমনসিংহ গীতিকারের মাধ্যমে প্রসিদ্ধ হয়ে রয়েছে।

চন্দ্রাবতীর মন্দির, বসতবাড়ির ধ্বংসাবশেষ আর পাশ দিয়ে বয়ে যাওয়া ফুলেশ্বরী নদী ধারণ করে আজও রয়েছে পাতুয়াইর গ্রাম কিশোরগঞ্জ জেলার পাঁচ মাইল দূরে নীলগঞ্জ রেলস্টেশনের সন্নিকটে। দূর-দূরান্ত থেকে আসা কবি, লেখক, গবেষক, সাংবাদিক ও কৌতূহলী মানুষের ভিড়ে মুখরিত হয় বাংলা সাহিত্যের আদি মহিলা কবি চন্দ্রাবতীর মন্দির প্রাঙ্গণ।