১৮ ডিসেম্বর ২০১৭,   ঢাকা, বাংলাদেশ   শেষ আপডেট এই মাত্র  
Login   Register        
ADS

কুসুম কুমারীর ছাত্রী


বীরাবতীকে নিয়ে দুশ্চিন্তার শেষ নেই দ্রৌপদীর। মেয়ে তো বটেই-একমাত্র মেয়ে, গঙ্গানারায়ণের লক্ষ্মী কন্যা। যেমন দুধে আলতা গায়ের রঙ তেমন লম্বা পাঁচ ফিট পাঁচ ইঞ্চি। টানা ডাগর চোখ, স্বাস্থ্যবতী। বয়সও কাঁচা। এ বয়সটা ভয়ের। দ্রৌপদীর বুকের ভেতর বাঘের ভয়। ক্লাস টেন-এর ছাত্রী বীরা রায়। রোল নম্বর এক। কুসুম কুমারী উচ্চ মাধ্যমিক বিদ্যালয়।

সন্ধ্যা নামে। মেয়ের স্কুল ফেরার অপেক্ষা করেন দ্রৌপদী। পুকুর থেকে হাঁসগুলো হেলেদুলে ধীরগতিতে ঘরে ফিরছে। কিন্তু মায়ের মন পড়ে আছে বীরাবতীর স্কুলে। বুক ধুকধুক করছিল, বিশ্রী সব কল্পনা আর ভয়ের তাড়া। দ্রৌপদীর অলক্ষে বীরা ততক্ষণে বাড়ির উঠানে।

লজ্জাবতী গাছের সারিতে এসে দাঁড়িয়ে বীরা বলল, ‘মা ভয় পাইয়া গেছিলা!’ কথা বলে খলখল করে হাসে মেয়ে। মেয়ের মুখের দিকে তাকিয়ে জগৎ ভুলে যাওয়ার মতো করে দ্রৌপদী বললেন, ‘স্কুল কি দেরিতে ছুটি হইছে? এত দেরি!’

‘রিক্সাওয়ালাদের আন্দোলন হইতেছিল। স্কুলে দেরি হয় নাই, তারা দুই ঘণ্টা রিক্সা চালান বন্ধ রাখছিল। সন্ত্রাসীদের বিরুদ্ধে দাঁড়াইবার প্রতিবাদ করছে তারা।’ কথাগুলো আশ্চর্য সুন্দর ভঙ্গিতে বলতে বলতে ঘরে ঢোকে বীরা।

একদল যুবক যেদিন দ্রৌপদীকে শাসিয়ে গেল, ‘বাড়িতে ধুতি উড়াইয়া নিশানা টানামু-’ সেদিন থেকেই এ পরিবারের খাওয়া পরা ঘুম নির্বাসিত। দিবালোকেও ভয় ভয় মন থাকে দ্রৌপদীর! ষ-ামার্কা ছেলেগুলোর ভয়ঙ্কর ও কুৎসিত আচরণের অর্থ খুঁজছিলেন তার স্বামী গঙ্গানারায়ণ।

স্ত্রীকে বলেন, ‘একাত্তর নয়, এ হচ্ছে দুই হাজার চার। শেষ রক্ষা হলেই ভাল। মা শ্মশান কালী রক্ষা কর।’ দুই হাত কপালে ছুঁয়ে করজোড়ে প্রণাম করেন। দীর্ঘ নিঃশ্বাস ছাড়েন গঙ্গানারায়ণ।

বীরাদের বাড়িতে ফোন লেগেছে। একই পাড়ার আদিনাথের একমাত্র ছেলে সুভাষ। এ খবরে সে ভীষণ খুশী। বাড়ির সবার সঙ্গে কথা হয় ফোনে। সুভাষ ঢাকা থেকে বীরাদের বাড়িতে ফোনে মায়ের খবর নেয়। খবর দেয়া হয় সুভাষের মাকে। আসেন বীরাদের ঘরে। ছেলের সঙ্গে মায়ের কথা কি সংক্ষেপে শেষ হয়? সুভাষের সহজ সরল মা সুরবালাকে জ্যাঠিমা ডাকে বীরা। সেটা কখনো উচ্চারণে জ্যাঠাইমা হয়ে যায়। সুরবালা মেয়ের আদুরে ডাকে হাসেন। বীরাদের ফোন। কিন্তু বীরাদের বাড়ির কারো কাছে তেমন ফোন টোন আসে না।

প্রতাপ কাকুর জন্য বীরার মায়া অনেক। বাড়িতে ফোন লাগিয়েছিলেন যিনি; তিনিই নিখোঁজ। নিজেই আত্মগোপন করেছেন হয়ত কোথাও। কারণ, তাকে তাড়িয়ে বেড়াচ্ছে পুলিশের লোকজন। সরকারী দলের গুণ্ডাপাণ্ডাদের ভয়ই বেশি। এদের ইঙ্গিতে পুলিশের একমাত্র কাজ হয়েছে প্রতাপ নারায়ণকে তাড়ানো, ধাওয়া করা, ধরে নিয়ে জেলে ঢুকানো। এর হিসেব-নিকেশ করে কূল পায় না বীরা। তাকে নিয়ে এতো চিন্তা সরকারী দলের লোকদের কেন?

টেলিফোন বাজল দু’বার। ঠিক এ দুপুরে কে ফোন করতে পারে? রান্নাঘর থেকে দৌড়ে এলেন দ্রৌপদী। মেয়েকে বললেন, ‘বীরা ফোন ধর।’ অনেকদিন পর টেলিফোন বাজলো। ক্রিং ক্রিং টেলিফোন বাজে কিন্তু রিসিভার উঠালেই শব্দ নেই। কেউ কি তামাশা শুরু করেছে! রিসিভার তুলে কথা বলার সমুদয় আনন্দ মাটি হয়ে গেছে বীরার।

টেলিফোন সেট রাখা হয়েছে একটি কাঠের টুলের উপর। পাশে বসে কথা বলবার জন্য আছে হাতল চেয়ার। বিছানায় বসে কিংবা শুয়েও কথা বলা যায়। দ্রৌপদী বিছানায় বসার আগে সিলিং ফ্যানের স্পিড বাড়িয়ে দেন। বীরা রেগে অধৈর্য হয়ে চলে গেল পড়ার ঘরে। এবার অনেকক্ষণ ধরে টেলিফোন বাজছে। দ্রৌপদী রিসিভার না তুলে তাকিয়ে থাকলেন সেটের দিকে। বীরা এল, ‘কী ব্যাপার মা! টেলিফোন ধরতাছো না কেন?’

দ্রৌপদী ফোন তুলতেই ওপাশ থেকে কথা এলা পুরুষের কণ্ঠে, ‘প্রতাপ নারায়ণের খবরাখবর পাইছেন কিছু?’

দ্রৌপদী বললেন, ‘না’।

একটু থেমে দ্রৌপদী জানতে চাইলেন, ‘আপনি কে কথা বলতেছেন?’

‘আমারে চিনতাইন না, তাইনে চিনে, প্রতাপ ভাল কইরা চিনে।’ কথাগুলো সুন্দরভাবে শেষ না করেই অপর প্রান্তে রিসিভার নামিয়ে রাখল লোকটি।

‘কার সঙ্গে কথা বলতেছিলা মা।’ দ্রৌপদী কোনও উত্তর না দিয়ে রান্নাঘরে চলে যান।

আবার টেলিফোন বেজে উঠল। ক্রিং ক্রিং ক্রিং চারবার। বীরা ফোন ধরল, ‘হ্যালো? হ্যালো!

‘হ্যাঁ, হ্যালো! আমি সুভাষ। বীরা কেমন আছ? কী করতেছ?

খুশির চোটে চিৎকার করে ওঠার কথা ছিল। কিন্তু বীরা শুধু বলল, ‘না বেশি ভাল না।’

‘কেন? সুভাষের জিজ্ঞাসা টেলিফোনের অপর প্রান্ত থেকে।

ফোনে সুভাষের সঙ্গে কথা বলার সময় গলা শুকিয়ে যায় কিংবা আবেগতাড়িত কণ্ঠ রুদ্ধ হয়ে পড়ে। অথচ বীরার বুকের ভেতর খুশির বন্যা। বীরা ধীরকণ্ঠে অভিমান করে বলল, ‘ভাল না থাকার অনেক অনেক কারণ।’ সত্যি সত্যি আমার কথা মনে হলে নিশ্চয়ই ডেইলি ফোন করতে!’

এবার কণ্ঠ স্পষ্ট হয় বীরার, ‘সত্যি আমায় ভুল নাই? ঢাকায় তো কত কিছু আছে, আছে না? মন ফুরফুরা করণের মানুষ নাকি ঢাকা শহরেই অনেক বেশি!’

এমন কথায় অপাশের কণ্ঠে উচ্চকিত হাসি শোনা যায়। এ হাসি যেন সহজে ফুরোয় না।

সুভাষ অপাশ থেকে আরও জানায়, সে দুদিনের মধ্যে বাড়ি ফিরবে। কলেজে সমস্যা হয়েছে আগ্নেয়াস্ত্রসহ ধরা পড়েছে এক রুমমেট। হোস্টেলে গ-গোল। গোলাগুলির শব্দে হোস্টেলের ছাত্রদের ঘুম ভাঙ্গে। টাকা পাঠাতে হবে না। এ খবরটা যেন বীরা জানিয়ে দেয় ওর জ্যাঠিমাকে।

প্রতিদিনের মাতা গঙ্গানারায়ণ আজও ভোর বেলা ঘুম থেকে উঠেছেন। জানালা খুলে সকালের সূর্য ওঠা দেখছিলেন। গঙ্গানারায়ণ দেখলেন ছয় তরুণ কথা বলতে বলতে বাড়ির আঙ্গিনায় এসে দাঁড়িয়েছে। এ বাড়ির কাউকে খুঁজছে তারা। অনুমান করে তিনি দরজা খোলেন । ঘরের বাইরে বের হয়ে উঠোনে দাঁড়ান। কাছাকাছি হতেই পাঁচ-ছ’জনের ভেতর থেকে দাঁড়িওয়ালা এক তরুণ সামনে দাঁড়ালো। জিন্সপ্যান্ট আর স্যান্ডো গেঞ্জি পরা যে তরুণটি গঙ্গানারায়ণের নাভিম-লে পিস্তল ঠেকালÑ সে আর কেউ না লালু ডাকাত। ছিনতাই আর ডাকাতি ওর পেশা। এ অঞ্চলে লালুর বাপ-দাদার বসবাস ছিল না।

পঁয়ত্রিশ মামলার আসামি। পত্রিকায় তার ছবি বহুবার ছাপা হয়েছে। গঙ্গানারায়ণ বিস্ময় ও ভয়ে কাতর হলেও লালুকে চিনতে পেরে বললেন, ‘জেল থেকে ছাড়া পাইছস তাহলে।’

‘নিজ চক্ষে দেখতেছেন না! নাকি বিশ্বাস হইতেছে না। কথাগুলো উচ্চারণের পর হাসে বিশ্রী ভঙ্গিতে হাসলো সে।

লালুর এক সঙ্গী উত্তর দেয়, ‘এইডা ত পুরানা খবর। লালু ভাই এমপি সাবের গাড়িতে ঘুরে, বাড়িতে ভাত খায়।’

লালু বলে, ‘আপনের আয় উন্নতিতো মাশাল্লাহ্ ভালই শুনতেছি। তয় আপনের এইবারের চান্দার হিসাবটা দিতে আসলাম। বেশি না মুডে দুই লাখ। দুই লক্ষ টাকা!’ কথাগুলো তীক্ষ্ম তীরের মতো বিঁধে গেল গঙ্গানারায়ণের বুকে। তিনি অনুমান করেন লালু ডাকাত প্রকাশ্য হওয়ার সুযোগ পেয়েছে যার খুঁটির জোরে তিনি আর কেউ নন, প্রতিমন্ত্রী সিরাজী।

‘এবার চাঁদাবাজি শুরু করলা?’

‘চান্দা একমাত্র ভরসা। উকিল, কোর্ট-কাছারি চালাইতে খরচপাতি আছে না?’ ভুরু কুঁচকে লালু আরও বলল, ‘আপনে আমারে পছন্দ করেন না জানি। কিন্তু এইটা তো জানেন কার পক্ষে ইলেকশনের কাম করছি। সেই লোকটার হাত এখন কতডা লম্বা!’

লালুর সঙ্গীরা কেউ কেউ সিগারেট ফুঁকে লম্বা করে ধোঁয়া ছাড়ে, কেউ চুয়িঙ্গাম চিবোয়।

ঘৃণায়, ক্ষোভে, মুখ ফিরিয়ে নেন গঙ্গানারায়ণ। তার কঠিন উত্তর, ‘চাঁদা আমি দেব না।’

‘থানা পুলিশ কোর্ট কাছারি করতে হইতেছে, টাকা পয়সা খরচপাতি অনেক বাড়ছে। উকিল সাহেবের খাতায় পঞ্চাশ হাজার টাকা বাকি পড়েছে। আপনে গো জ্ঞাতিগোষ্ঠী আমার নামে তো মামলা কম দেয় নাই।’ ক্রুদ্ধ লালু গরগর করে বলে ফেলল কথাগুলো।

‘অপরাধ করছো মামলা হয়েছে। মানুষতো আইনের আশ্রয় নেবেই। তুমি এখন যাইতে পার।’

জিন্সপ্যান্ট আর ফতুয়া পরা লালুর সঙ্গীদের একজন কর্কশ কণ্ঠে হুমকি দেয়, ‘ব্যাটা অতো ফটফট করে ক্যান? আখেরি মেশিন গান দ্যাখবা বড় বাপের পুত!’

রেগে যান গঙ্গানারায়ণ, ‘তুমি এত বড় বেয়াদব কেন?’

উত্তর দিল, ‘আমার নাম তালুকাটা মতি। হের লাইগাই আমি দেয়াদব।’

তালুকাটা মতি পরনের ফতোয়াখানি কোমরে থেকে সরিয়ে কুচকুচে কালো একখানি রিভলবারের অর্ধেক দেখিয়েই ঢেকে বলল, ‘মেইড ইন জার্মান!’

সঙ্গীদের থামিয়ে নিয়ে লালু গম্ভীর ভঙ্গীতে বলে ওঠে, ‘এ্যাই থাম। দেনা-পাওনা হইব আমার লগে। শ্বশুর বানামু পরতাপের দাদারে। হেরপর জামাই-শ্বশুরের হিসাব কিতাব।’

মস্ত সাহসী দৃঢ়চেতা পুরুষ গঙ্গানারায়ণ চিৎকার করে প্রতিবাদ করতে চান। কিন্তু তিনি আজ বড় অসহায়।

লালু গু-া তার দলবল নিয়ে বাড়ি ত্যাগ করে। যাওয়ার মুহূর্তে শেষ বারের মত হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করে, ‘টাকা মোডে দুই লাখ। সমুয় তিনদিন আইজ-কাইল-পরশু।’

গৃহের খাদ্যভাণ্ডার, ব্যাংকের সঞ্চয়, গোয়ালের গরু, স্ত্রীর গহনা সব কিছুর বিনিময়ে কি দুই লাখ টাকা যোগাড় করা সম্ভব! হিসাব কষতে কষতে রাতে ক্লান্ত-পরিশ্রান্ত গঙ্গনারায়ণের মস্তিষ্ক অলস হয়ে পড়ে। অনেকটা নির্জীব দেহ বিছানায় সমর্পণ করেন তিনি। জমাট-বাঁধা অন্ধকার রাতে তার ঘুম ভাঙে, আলো জ্বালান, জানালার পাশে দাঁড়ান, পানির প্লাসে চুমুক দেন। সকল বাধা, প্রতিকূলতা, লজ্জা, সীমাবদ্ধতা ছাড়িয়ে স্ত্রী দ্রৌপদীর সামনে এক অন্যরকম মানুষ হয়ে ওঠেন। গঙ্গানারায়ণ চরম অসহায়তায় স্ত্রীর কাছে যখন বর্ণনা করেন লালু গ-াদের দাবিনামা তখন তার কিংবা তাদের কণ্ঠস্বর অনেক নিচু।

পৃথক বিছানায় ঘুমিয়ে আছে আদরের কন্যা বীরাবতী। ঘুমে কাতর বীরার চোখ। সকল প্রশান্তি আর নির্ভরতার আবরণ ওর নিষ্পাপ মুখম-লে। দ্রৌপদী আলমারী খুলে গঙ্গানারায়ণের সামনে মেলে ধরেন তার স্বর্ণালঙ্কার, বাক্স খুলে বালা, কানপাশা, সূতিহার...।

এতে সুরাহা হওয়ায় নয়, স্বামীর চোখ পড়ে বুঝে নেন দ্রৌপদী। গঙ্গানারায়ণ স্ত্রীকে বুকে জড়িয়ে উষ্ণতায় ভরে তোলার ব্যর্থ চেষ্টা চালান।

খাওয়া দাওয়ার পর অল্প হাসিমুখে ঘর থেকে বেরোলো সুভাষ। রাতটা পূর্ণিমার। দুধে ভেসে যাচ্ছিল গ্রাম। কালো রঙের কুকুরটা শুয়ে থেকেই মুখ উঁচু করে অতিথি সুভাষকে যেন বিদায় জানাল।

বাজার রোড ধরে স্কুলে যাচ্ছিল বীরা ও তার স্কুলের তিন বান্ধবী। ঠিক তখনই মোটর সাইকেলযোগে তিন যুবক তাদের পথরোধ করে দাঁড়াল। মাঝখানের ছেলেটি বীরার দিকে চোখ রেখে উচ্চারণ করল, ‘গুড সাইজ।’ আরেকটি অশ্লীল উক্তি কী যেন করল। এরপর বলল, ‘তালুকাটা মতির নাম শুনেছ?’

বীরার বান্ধবীরা ভয়ে কাঁপছিল।

উত্তর দিল বীরা নিজেই, ‘শুনি নাই দেখিও নাই।’

‘আজকে দেইখ্যা রাখ। তোমার বাপেরে আইজকা চান্দার দুই লাখ টাকার ফাইনাল তাগিদটা দিতে যাইতেছি।’

তালুকাটা মতির এক সঙ্গী বলল, ‘এইডা পরতাপের ভাতিজি না? পয়লা অপারেশনটা চালাইতে হইব ওর ওপরই।’ মোটরসাইকেল স্টার্ট দিয়ে চলে গেল তালুকাটা মতির দল।

স্কুলে আজ পড়াশোনায় মোটেই মন বসল না বীরাবতীর। ফেরার সময় তিন বান্ধবী সকালের ঘটনাটা একেক জন একেক ভঙ্গিতে বলাবলি করছিল। আতঙ্কটা তাদের চেহারায় স্পষ্ট হয়ে আছে।

হঠাৎ একটা রিক্সা দাঁড়াল বীরাদের সামনে। বোরকা পরা এক মহিলা যেন দুইলাফে বীরার সম্মুখে এসে দাঁড়াল। বীরা দেখল, যিনি বোরকা পরেছেন তিনিই তার কাকু প্রতাপ নারায়ণ। ইশারায় একা ডেকে নিলেন তাকে রাস্তার পাশে। কপালে চুমু খেয়ে বললেন, ‘ভাল আছিস মামণি।’

হঠাৎ কী যেন হলো বীরাবতীর চোখ জলে ভরে উঠল। সে শুধু বলল, ‘কাকু তালুকাটা মতিরে চিন নাকি?’

‘হ্যাঁ চিনি। সে আর কি!’ ফুঁৎকারে উড়িয়ে দেয়ার মতো মন্তব্য করল প্রতাপ।

এরপরও বীরা বলতে চেয়েছিল তালুকাটা মতি জঘন্য একটি মানুষ। তুমি বাড়ি আসছ না কেন কাকু। ইত্যাদি ইত্যাদি। অথচ চুপ থাকল।

বীরার চোখ পড়ে নিয়ে সবিকিছুই যেন বুঝে ফেলে প্রতাপ নারায়ণ। বীরাকে পিঠে আদর করে চাপড় দিয়ে দু’নিমিটের মধ্যে রিক্সায় উঠে উধাও হয়ে গেল প্রতাপ।

পরদিন সকাল।

সেই ভোর থেকেই গাঁয়ের বড়খুড়ী বলে বেড়াচ্ছে, ‘লাশ পড়েছে গো লাশ। কার লাশ? কার লাশ? ভালা মাইনষের লাশ নয় গো! খারাপ জাত, খারাপের লাশ। সঙ্গে নিকি পিস্তল ছিল। পিস্তলঅলার লাশ। দেখে আইলেম, শকুন নাকি গরু-কে মরিছে কে জানে গো?’

বাজার রোডের ঢালে পড়ে থাকা লাশ দেখতে তখনও থানাওয়ালারা আসেনি। তবে র‌্যাব খরব পেয়ে লাশের ছবি তুলেছে, সুরতহাল করে গেছে।

গাঁয়ে আবার অস্ত্রের ঝন্ঝনানি শুরু হলো এই আশঙ্কা অনেকের। গঙ্গা নারায়ণ লাশটি দেখে প্রথমে বিস্মিত পরে আতঙ্কিত হয়ে পড়লেন। এ যে সেই তালুকাটা মতির লাশ! ছ’টি গুলি বুকটাকে ছিন্নভিন্ন করে দিয়েছে। জিন্সের প্যান্টের ভিতর পাওয়া গেছে বিদেশি পিস্তল। শত্রু নিধনে খুশি না হয়ে অন্যরকম আশঙ্কা তাকে তাড়িয়ে মারছে। স্ত্রী দ্রৌপদীকে ঘটনাটা খুলে বলবার সাহস পাচ্ছেন না।

কুসুম কুমারী উচ্চ বালিকা বিদ্যালয়ের ছাত্রীরা স্কুলে যাবার পথে লাশ দেখে যাচ্ছে এক নজর। সকাল সাড়ে নয়টা পর্যন্ত পুলিশের লোক না আসায় অতি সাহসী গ্রামবাসী কেউ কেউ লাশ ওলটপালট করে দেখছিল। আর তখনই বীরা ও তার বান্ধবীরা দেখে নিল সড়কের ঢালুতে পড়ে থাকা বেওয়ারিশ লাশ। কিন্তু বীরা খুব ভাল করে চিনতে পারল, এ হচ্ছে সেই তালুটাকা মতি।

দুপুর বারোটায় পুলিশ এল গাঁয়ে। গঙ্গানারায়ণের উঠোনে এসে থানার ওসি জানতে চাইলেন, ‘লাশ দেখেছেন আপনি!’

গঙ্গানারায়ণ হ্যাঁ ভঙ্গিতে মাথা নেড়ে বললেন, ‘দেখেছি।’

‘প্রতাপ নারায়ণ গতরাতে বাড়ি এসেছিল। তথ্য সঠিক?’

‘ইনফরমেশন সঠিক নয়।’

চোখ রাঙিয়ে ওসি বললেন, ‘জানেন কার লোক মার্ডার হয়েছে।’

নিশ্চুপ গঙ্গানারায়ণের জবাব।

ওসি সাহেবের মোবাইল ফোন বেজে উঠল। কয়েক সেকেন্ড ইতস্তত করে ফোন রিসিভ করলেন ওসি। আরো কয়েক সেকেন্ড পর তার বিস্ময়সূচক উত্তর, ‘বলেন কী স্যার।’

খুবই মনোযোগ দিয়ে ওসি শুনছেন কথাগুলো। এরপর আবার বিস্ময়কর জিজ্ঞাসা, ‘দুটি লাশ পড়ে আছে! মেয়েটির নাম বীরাবতী, ছেলেটি কে? স্যার-স্যার-স্যার, আমি পিওতে এখনই যাচ্ছি।’

গঙ্গানারায়ণের দিকে তাকালেন ওসি, অন্যভাবে।