১৬ ডিসেম্বর ২০১৭,   ঢাকা, বাংলাদেশ   শেষ আপডেট এই মাত্র  
Login   Register        
ADS

কবি আহমেদ মুজিব ভিন্ন পথের যাত্রী


১৯৮৬ সালের গোড়ার দিকে আমি ঢাকায় নবাগত, কবিযশোপ্রার্থী তরুণ। থাকতাম মিরপুরের গাবতলীতে। সে সময় আজিমপুরে (গোরস্তান মেইন গেটের কাছাকাছি) আমাদের একটা আড্ডা ছিল। মুজিবের বাসাও ছিল আজিমপুরে। সম্ভবত রিফাত চৌধুরীর মাধ্যমে পরিচয় হয়। মুজিব ছিলেন স্বল্পভাষী কিন্তু আন্তরিক। ফলে সেই পরিচয় বছর খানেকের মধ্যেই ঘনিষ্ঠ সম্পর্কে রূপ নেয়। ১৯৮৭ থেকে ১৯৯০/৯১-এর দিনগুলোয় আহমেদ মুজিব আবিদ আজাদ সম্পাদিত ‘শিল্পতরু’ পত্রিকায় কাজ করেছেন। আমি তখন ঘোড়াশালের শিল্পাঞ্চল কলেজে পড়াচ্ছি। প্রতি সপ্তাহেই ঢাকা আসতাম। প্রায় প্রতি সপ্তাহেই দেখা হতো মুজিবের সঙ্গে। এবং কাজল শাহনেওয়াজ, অমিতাভ পাল প্রমুখের সঙ্গেও।

প্রচুর আড্ডা হতো। পানি-তামাক হতো। সাহিত্যালাপও হতো। কিন্তু মুজিব কবিতা নিয়ে খুব যে কথা বলতেন, তা নয়। বরং এ ব্যাপারে তিনি অপ্রতিভই ছিলেন। তবে তার কবিতা পড়লে বোঝা যেত ভেতরে ভেতরে কতটা সিরিয়াস ছিলেন। কাব্যের নতুন প্রকাশরীতি এবং নতুন বিষয়বস্তুর কথা ভাবতেন। সে সবের প্রভাবও পড়ত তার কবিতায়। ফলে কম্পোজিটর, পোকা, সিলিংফ্যান, কালো কালি, করল্লা ক্ষেতের পাখি, মতিঝিল প্রভৃতি বিচিত্র থিম নিয়ে লিখেছেন তিনি। ‘মতিঝিল’ কবিতাটা তো এককথায় অসাধারণ। ছাপা হয়েছিল পাক্ষিক ‘শৈলী’ পত্রিকায়। পুরো পৃষ্ঠাজুড়ে। মনে আছে, ইকবাল আজিজ (শৈলীর কবিতা সম্পাদক) কবিতাটির অকুণ্ঠ প্রশংসা করেছিলেন, বলেছিলেন কবি হিসেবে মুজিবের উজ্জ্বল সম্ভাবনার কথাও।

তো মুজিবের আরও অনেক কবিতা পড়ে আমরা সত্যিই খুশি হয়েছিলাম; পাঠক হিসেবে, বন্ধু হিসেবে। ১৯৯২/৯৩-এর দিকে স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছিলাম, আহমেদ মুজিবের কবিতা ক্রমশ নিজত্ব চিহ্নিত হয়ে উঠছে। একাধিক সাহিত্য সম্পাদকের সুনজরে পড়ে গেছেন তিনি। লিটল ম্যাগাজিনের পাশাপাশি সুপ্রতিষ্ঠিত ৩/৪টি দৈনিকেও তার কবিতা নিয়মিত বেরোতে আরম্ভ করেছে। একটু একটু করে তার কবি পরিচিতি বৃদ্ধি পাচ্ছে। আমার ভাল লাগত। তার আনন্দটা শেয়ার করতাম আমি।

গোড়া থেকেই স্বাতন্ত্র্যসন্ধানী ছিলেন মুজিব। সাধ্যমতো ক্ষমতার প্রয়োগও করে গেছেন। বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে, স্বভাবতই তার ভাবনা-কল্পনা পরিচ্ছন্ন হয়েছে। শব্দ ব্যবহারের ক্ষেত্রে অধিকতর সতর্ক হয়েছেন। সাবধান ছিলেন কবিতা বিষয়ক মন্তব্যের বেলায়ও। ‘প্রেসের কবিতা’ পরবর্তী ৫/৭ বছরের কবিতাগুলো একত্রিত করা সম্ভব হলে দেখা যেত, সেই বইয়েরও আলাদা একটা মেজাজ আছে। কবিকল্পনার বিশিষ্ট ভুবন আছে। কিন্তু ‘শিল্পতরু’ প্রেসে কাজ করার সময়ই মুজিবের মাথায় খুলে গিয়েছিল কবিতার এক নতুন দিগন্ত। আমরাও তো কতবার প্রেসে গিয়েছি। কিন্তু ছাপার মেশিন, কম্পোজিটর, কালি, প্রুফ, নিউজপ্রিন্ট এগুলো নিয়েও যে কবিতা লেখা যায়, আর তা সফল কবিতা হয়ে উঠতে পারে তা আমাদের মাথায় আসেনি। প্রেসে কাজ করতে করতে মুজিব ভেবেছেন সেসব। তলে তলে লিখেও ফেলেছেন ব্যতিক্রমী একগুচ্ছ কবিতা যা পরে ‘প্রেসের কবিতা’ নামে বই হয়ে বেরোয়। বাংলা ভাষায় প্রেসকে উপজীব্য করে হয়ত কবিতা রচিত হয়েছে। কিন্তু এ বিষয়ে পুরো একটা বই লেখা মানে রীতিমতো একটা ভাব পরিম-ল সৃষ্টি করার ব্যাপারটা আমি যদ্দূর জানি, এই প্রথম। পরন্তু দু’ফর্মার চটি গ্রন্থটিতে আছে ছাব্বিশটা কবিতা যার অনেকগুলোই সার্থক রচনা বলে মনে করি।

একটি কবিতায় মুজিব লিখেছেন ‘মরা ডাল থেকে শাদা বাল্ব-ফুল আলো ছুড়ে দেয়।’ লক্ষ করুন ‘বাল্ব-ফুল’ শব্দটি। ‘দ্বন্দ্ব’ শিরোনামের কবিতাটি শুরু হয়েছে এভাবে, ‘প্রজাপতি তুমি উড়ন্ত ইজেল’। এখান থেকেই মুজিবের কবি কল্পনার নিজস্ব ধরনটি বুঝে নেয়া যেতে পারে। আরও কয়েকটি দৃষ্টান্ত হাজির করছি ক. আহা কি সুন্দর হাওয়া/ টেবিলের মধ্যখান দিয়ে যায়/আর আমার চুল ছোঁয়/আর আমার কান্না ছোঁয়।/কয়েকটি কান্না যায় গড়িয়ে, ঐ কোথায়?

খ. তুমি ব্যথা পেয়েছো ভোর মেশিনের চাপে,/এজন্য তুমি আজ বাঁকা, অন্ধ।/তোমার হাত মেঘের ব্যান্ডেজে শক্ত করে বাঁধা,/চুঁইয়ে পড়ছে রক্তের মন, তাই একটু লাল।

গ. ঢালো রঙ প্রকৃতমনে পাটাতনে/কালো রঙ রাত্রির খোপে;/শাদা হলো দিন/আর লাল আমারই রক্ত/সূচ দিয়ে গাঁথা বই।

সৃষ্টিশীল কবি কল্পনার পাশাপাশি আরও যেটা আমাকে আকর্ষণ করেছে তা হচ্ছে আহমেদ মুজিবের কাব্যভাষা। শাদামাটা আটপৌড়ে গদ্যকে একজন কবি কতটা সক্ষমতার সঙ্গে ব্যবহার করতে পারেন তার উজ্জ্বল উদাহরণ মুজিবের কবিতা। এই গদ্য নমনীয়, প্রচল অর্থে অকবিতাসুলভ ও হৃদয়গ্রাহী। হ্যাঁ, এসব লেখা, বিশেষত প্রেসের কবিতাসমূহ, একান্ত ব্যক্তিক অনুভূতির এলাকা থেকে উৎসারিত। কবিতার কালোত্তীর্ণ হওয়ার অন্যতম প্রধান শর্ত হচ্ছে ব্যক্তিগত ভাবনাকে নৈর্ব্যক্তিক স্তরে পৌঁছে দেয়া। তার কবিতা আরও বেশি স্বাতন্ত্র্যদীপ্ত এবং আরেকটু যোগাযোগসক্ষম হয়ে ওঠার আগে আহমেদ মুজিব চলে গেলেন আমাদের ছেড়ে।

আশির প্রজন্মে এসেছে এক ঝাঁক বৈচিত্র্যসন্ধ কবি। বিচ্ছিন্নভাবে ভালো কবিতা লিখেছেন অনেকেই। কিন্তু কবিতাভাষায় অনন্যতা অর্জন করেছেন কিংবা তীব্রভাবে সেই পথে এগিয়ে যাচ্ছিলেন এরকম গুটিকয় শক্তিমন্ত কবির একজন অবশ্যই আহমেদ মুজিব। বাংলাদেশের আশির প্রজন্মের সহজ গভীর কবিতার পরিম-লে উল্লেখযোগ্য বৈচিত্র্যের জোগান দিয়েছে তার কবিতা। তার অকাল তিরোধান আমাদের স্তম্ভিত করে দিয়েছে। এই কষ্ট এবং সাহিত্যের অপূরণীয় ক্ষতির বিষয়টি আমাদের তাড়িত করবে আমৃত্যু।