২৩ অক্টোবর ২০১৭,   ঢাকা, বাংলাদেশ   শেষ আপডেট এই ঘন্টায়  
Login   Register        
ADS

প্যারিস ফ্যাশন শো আর আমাদের স্বপ্ন...


সাম্প্রতিক সময়ে নতুন ফ্যাশন চিত্র দুনিয়াজুড়ে মার্চ করছে পুরনো ফ্যাশন হাউসগুলোকে চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দিয়ে। দুনিয়ার কোণায় কোণায় ‘স্টাইলিং দা নেশান’ করছে ফ্যাশনের তীর্থ শহরগুলোর অনুপ্রেরণায়। গ্লোবাল ল্যাঙ্গুয়েজ মনিটরের ২০১৪ সালের তৈরির তালিকায় উঠে এসেছে ফ্যাশনের স্বর্গ এমন কিছু জায়গার নাম। তাদের জরিপে এ ধরনের বিশটি দেশের মধ্যে শীর্ষ পাঁচটি শহরের নামের তালিকায় শীর্ষে রয়েছে নিউইয়র্ক শহর। এছাড়াও দ্বিতীয় প্যারিস, তৃতীয় লন্ডন, চতুর্থ লস এনজেলস আর পঞ্চম বার্সেলোনা। টোকিও আর মিলান শহরের নাম নিচের দিকে। প্রত্যেক বছর এই রেঙ্কিং অদল বদল হয়। প্রকৃতপক্ষে ফ্যাশন স্বর্গ রাজ্যের ব্যবসা, অর্থনৈতিক মানদ-, বিনোদন ও সংস্কৃতি, বড় মাত্রার ডিজাইন সেন্সের মাতামাতি, প্রসিদ্ধ ডিজাইন স্কুল, ফ্যাশন ম্যাগাজিন, স্থানীয় মার্কেট আর বিশাল ভোক্তাদের ব্যাপকতা নিয়ে এই শীর্ষ পাঁচ বাছাই করা হয়। এই ফ্যাশনের স্বর্গরাজ্যগুলো সাধারণত সংযুক্ত থাকে আভ্যন্তরীণ আর আন্তর্জাতিক হাই প্রোফাইলের ওপর। এই ফ্যাশন বাণিজ্যের শহরগুলো প্রতি ঋতুতে ব্যস্ত থাকে ফ্যাশন উইক নিয়ে। প্রধানত প্যারিস, মিলান, লন্ডন, নিউইয়র্ক দুনিয়ার সামনে মেলে ধরে তাদের নতুন টাটকা পরিধান পণ্য বিভিন্ন ফ্যাশন ইভেন্টের আয়োজন করে। গ্লোবাল ফ্যাশন ইন্ডাস্ট্রিকে নিয়ন্ত্রণ করে এই শহরগুলো।

সৌন্দর্যের নগরী ফ্রান্সের প্যারিসে ফ্যাশনের জমকালো উৎসব হলো প্যারিস ফ্যাশন উইক। ফ্যাশন দুনিয়ায় প্যারিস তার ঠাট-বাটটি ঠিকই বজায় রেখেছে। সে উঠতি ডিজাইনারই হন কিংবা ডাকের জাদরেল ফ্যাশন ডিজাইনার যাই বলুন না কেন! উৎসবের চাকচিক্য বাড়াতে শ্যানেল, ডিওর, ভ্যালেন্তিনো ও সেইন্ট লরার মতো নামী-দামী ব্র্যান্ডের অংশগ্রহণে চোখ ধাঁধানো ফ্যাশন শো অনুষ্ঠিত হয় প্রতিদিন। সত্যি বলতে কি, মন ভরানোর পাশাপাশি গাঁটের কড়িটিও যে এই প্যারিসই মিলিয়ে দেয়। খ্যাতিমান আর সম্ভাবনাময় সব তরুণ ডিজাইনারদের নক্সা করা পরিচ্ছদের সম্ভার আর তাদের জৌলুসে প্যারিস সর্বদা বহু বর্ণিল হয়ে উঠে মডেলদের ক্যাটওয়াকের মোহনীয় ছন্দে। প্রায় দুইযুগ পরে ল্যুভরে মিউজিয়মের নির্ধারিত জায়গাটিতে ফ্যাশন সপ্তাহ অনুষ্ঠিত হয়। ‘সেন’ নদীর কাছাকাছি, ফ্যাশন শোর আয়োজনস্থল হিসেবে খ্যাত প্যারিসের ঐতিহ্যবাহী বড়গম্বুজের গ্র্যাণ্ড প্যালাসে বিশালকায় তাবু বসে, ল্যুভরের পিরামিডাকৃতির জায়গাটির নিচে মস্ত তাবু টাঙিয়ে ৪ ঘরের এই আয়োজন। দিনে আটটি শো হয়।

ডিজাইনারদের নিজস্ব পছন্দের কল্যাণে আর উৎসবের বিভিন্ন আয়োজন সংখ্যায় বেড়ে ইতোমধ্যেই যেজায়গায় পৌঁছেছে তাতে এই আয়োজনটি কেবল ল্যুভরেতেই সীমাবদ্ধ থাকে না, তা ছড়িয়ে যায় প্যারিসময়। কেবল ফ্যাশন নয়, সুন্দরী নারীও শোর অন্যতম আকর্ষণ প্যারিসের ঐতিহ্য অনুযায়ী ফ্যাশন সপ্তাহের প্রথমদিনটি বরাদ্দ রাখা হয় তরুণ ডিজাইনারদের জন্যই। এই ফ্যাশন শোতে দেখতে পাওয়া যায় লন্ডনের এ্যাগনোভিচ আর আন্তনি ভ্যাকারেল্লোর ফ্যাশন শো। তরুণ আন্তনিভ্যাকারেলো ভোগের ঢাউস পেল্লায় সকলের নিকট আইডল হিসেবে পরিচিত। কিন্তু তারপরও ফ্যাশনপ্রেমী সকলের চোখই চেয়ে থাকে গিভাঞ্চি, বালমেন, ব্যালেনসিয়াগার মতো ডাকের সব ফ্যাশন ব্র্যান্ডের দিকেই। প্যারিসের বিভিন্ন জায়গায় রাতভর সব জাকালো পার্টি শুরু হয় এই ফ্যাশন শোর পরপরই। ফ্যাশন ম্যাগাজিন আর সব নামী-দামী ব্র্যান্ডের আয়োজনে রাত ভর চলবে এসব পার্টি। বাতাসে উড়বে প্যাশন, ফ্যাশন আর সৃষ্টিশীলতা।

রেনেসাঁর যুগ থেকে ইউরোপের বিভিন্ন শহর বিশেষ করে ফ্লোরেন্স, মিলান, নেপলস, জেনোয়া আর ভেনিস অর্থাৎ ইতালি ছিল মূল ট্রেন্ড সেটার। তার দেশের সংস্কৃতির দ্রুত আগ্রাসন প্রক্রিয়ায় পুরো দুনিয়ার ফ্যাশন স্বর্গ রাজ্যের মুকুট পরে নেয়। সতেরো শতকে রেনেসাঁর জোশ যখন কমে এলো তখন ফরাসিরা ফ্রেঞ্চ কোর্টের ছত্রছায়ায় লুইস জিভ নামে শুরু করল ইউরোপের প্রধান ফ্যাশান সেন্টার। উনিশ শতকে, ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের মহারানী ভিক্টোরিয়া শাসনামলে লন্ডন আবারও ফ্যাশান তীর্থে পরিচিত হয়ে উঠে। কিন্তু তাদের চোখ আর ইনফ্লুয়েন্স থাকে প্যারিস নগরী। ব্রিটিশ নাগরিক চার্লস ফ্রেডারিক অরথ ১৮৪৬ সালে প্যারিস পাড়ি দিয়ে এক নতুন ক্রাফট চালু করেন। তিনি প্রথম ফ্যাশন শো আর লঞ্চ করেন ফ্যাশন লেবেলের কনসেপ্ট বা ধারণাকে।

এবার আসি বিশ শতকে অর্থাৎ গোল্ডেন বিংশ শতাব্দীতে জার্মানির বার্লিন শহর হয়েছিল ভ্যান গার্ড ফ্যাশন রাজধানী। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর আটলান্টিকের ওইপাড়ে নিউইয়র্কে জ্বলে উঠে ছিল পুরাপুরি সমান্তরাল ডিফারেন্ট ফ্যাশন আবেদন। ১৯৪০ আর ৫০ এ তারা বাজারে স্পোর্টস পরিধান বা পোশাককে ট্রেন্ড হিসেবে নিয়ে বিশ্ব তরুণদের দৃষ্টি আকর্ষণ করল। ১৯৫০ সালে ফ্লরেন্সেÑ হটে কসার বা টপ সেলাইয়ের দক্ষতাকে পুঁজি করে মিলানে ফ্যাশন হাউসগুলো ১৯৭০ সাল পর্যন্ত ফ্যাশন নগরীর নেতৃত্ব দিয়ে যায়। ১৯৮০ সালে বিশ্ব অর্থনীতির সিংহ জাপান ও পিছিয়ে থাকল। তারাও খুলে দিল নতুন ফ্যাশন আইডিয়া আর পোশাকের বাজার। দুনিয়ার চোখ ঘুরে গেল জাপানের দিকে। নতুন জেনারেশানের ইসি মিয়াকে, রেই কাউয়াকুবও, কমেদেস জারকন নামের ডিজাইনাররা পৃথিবীর ফ্যাশান দলবলকে আকর্ষণ করল, নিয়ে এলো নিজের শহর টোকিওতে। টোকিও হলো ফ্যাশান তীর্থ। পুরামাত্রায় টেক্সটাইলের ভিন্নতা জগতের চোখে পড়ল। পোশাকে তাদের ‘কাট আর ড্রেপড’ সব শহর থেকে আলাদা।

ফ্যাশন আইকন লিসে স্কভ বলেছিলেন- পলি সেন্ত্রিক ফ্যাশন ইন্ডাস্ট্রি ২১ শতককে রাজত্ব করবে। স্বপ্ন দেখতে তো দোষ নেই, হয়ত একদিন ঢাকার নামও উঠে আসবে বিশ্ব পাঁচের ফ্যাশন নগরীর তালিকায়! আমরা সেই সুদিনের অপেক্ষায় রইলাম...