১৮ নভেম্বর ২০১৭,   ঢাকা, বাংলাদেশ   শেষ আপডেট ৭ ঘন্টা পূর্বে  
Login   Register        
ADS

ক্যারিয়ারের বিরুদ্ধে যখন স্বামী


আমার কিছু টাকা লাগবে-

না, এখন টাকা নেই। তুমি আবার টাকা দিয়ে কি করবে?

আমার প্রয়োজন আছে।

না, টাকা ইনকাম করতে কষ্ট আছে। চাইলেই টাকা দিতে পারব না। ঘরে বসে বসে খাও তো, টাকা রোজগার করা কত কষ্ট তা বুঝবে কি করে।

এক মাস পর বাসা ভাড়া, বিদ্যুৎ বিল, গ্যাস বিল বাবদ টাকা তুলে দেয় স্ত্রীর হাতে।

এগুলো তো সব বিল। আমাকে এক হাজার টাকা দাও।

-না পারব না। প্রতি মাসে সংসারের পেছনে অনেক খরচ, তোমাকে আবার কিসের টাকা। বিল দিতে আমি বাধ্য। তোমাকে ১ হাজার টাকা দিতে বাধ্য নই।

বিল বাবদ ৩০-৩২ হাজার টাকা দিতে কষ্ট হয় না, আর আমাকে ১ হাজার টাকা দিতেই তোমার যত কথা!

টাকা কোথা থেকে আসে বোঝ

ওকে আমি চাকরি করব। যেটুকু যোগ্যতা আছে। অল্প বেতনের চাকরি তো পাব আশা করি।

চাকরি করবে। এখানে থেকে পারবে না। চাকরি করতে চাও বাপের বাড়ি যাও।

ওপরের কথাগুলো একটি পরিবারের। এমন কথা বা ঘটনা দেশের অনেক পরিবারেই হয়। হয়ত কোথাও একটু কম, কোথাও একটু বেশি। সৃষ্টির সেরা জীব হলো মানুষ। বোধ ও বুদ্ধি সবকিছুই আছে মানুষের। প্রতিটি কাজে নারী-পুরুষের অংশগ্রহণ থাকলেও নারীরা অনেক ক্ষেত্রে বিভিন্ন ধরনের নির্যাতনের শিকার। একজন নারীর ক্যারিয়ারে স্বামীর বাধা, এটাও এক ধরনের নির্যাতন।

ভাষা আন্দোলন, স্বাধীনতা আন্দোলনসহ সব ধরনের আন্দোলনে নারীর অংশগ্রহণ ছিল উল্লেখযোগ্য। আর সর্বশেষ ২০১৫ সালের এইচএসসি ও এসএসসি পরীক্ষায় ছেলেদের চেয়ে মেয়েদের পাসের হার বেশি হওয়ার ফলে আরও একবার প্রমাণ হলো, মেয়েরা কোন দিক দিয়ে পিছিয়ে নেই। বরং এগিয়েই আছে। তবুও কেন এমন হচ্ছে। অনেক ক্ষেত্রেই দেখা যায়, স্ত্রীর ক্যারিয়ার গঠনে ও চাকরি করাতে স্বামীরা আপত্তি জানায়। এক সময় স্বামীর অবর্তমানে বাধ্য হয়ে স্ত্রীকে জীবিকার জন্য কাজে নামতে হয়। এমন কয়েক জনের সঙ্গে কথা হয়।

সালেহা বেগম, ৮ম শ্রেণীতে থাকা অবস্থায় বিয়ে হয়। এরপরও ৩ বছর থাকে বাবার বাড়িতে। তখনই এসএসসি পাস করে। স্বামী আকবর থানা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে চাকরি করে। ঘরে ৫ সন্তান। একার রোজগারে সংসার চালানো কষ্টকর। সালেহা বেগম চাকরি করতে চায়। একটা চাকরির সুযোগও পায়। কিন্তু সে সময়ে বাধা হয়ে দাঁড়ায় স্বামী আকবর। অনেক বুঝিয়েও কিছু হলো না। একই কথা, ঘরের বউ, চাকরি করা যাবে না। না খেয়ে থাকবে, তবুও ঘরে থাকবে। ছোট সন্তানের বয়স যখন মাত্র ১০ মাস, তখন আকবর সাহেব মারা যান। সহায় সম্পত্তিও নেই তেমন। একজন গৃহবধূর মাথার ওপরে ৫ সন্তানের সব দায়িত্ব ও কর্তব্য। চোখে-মুখে অন্ধকার সালেহার। সালেহাসহ ৬ জন মানুষের দায়িত্ব কে নেবে? ঠিক ওই মুহূর্তে থানা স্বাস্থ্যের একটা ট্রেনিং শুরু হয়। সালেহার বাবা সেই ট্রেনিংয়ে দিয়ে দেয় সালেহাকে। ১০ মাসের সন্তানসহ বাকি ৪ জনকে বাবার বাড়িতে রেখে সালেহা চলে যায় ট্রেনিংয়ে। ১৮ মাস ট্রেনিং শেষে চাকরিতে যোগ দেয়। বাবার বাড়ির সহযোগিতা আর নিজের চাকরি। সালেহার সব সন্তান আজ প্রতিষ্ঠিত। সবাইকে বিয়ে দিয়েছে।

আয়েশা আক্তার ছোটবেলা থেকেও গ্রামেই বেড়ে উঠেছে। বিয়ের পর স্বামীর সঙ্গে আসে শহরে। আয়েশার স্বামী ইলিয়াস সাহেব একটা সরকারী চাকরি করতেন (রেলওয়ের)। একটা ছোট কোয়ার্টারও পান। গ্রামের আয়েশা শহরের তেমন কিছু চেনে না। আয়েশাও বাল্যবিয়ের শিকার। শহরে এসে পড়তে চায়। বাধা দেয় স্বামী। এরপর ইলিয়াস রাজি হয় আরবি শিক্ষা নিতে দেবে আয়েশাকে। সেভাবে আরবি শিক্ষা নেয় আয়েশা। ২ সন্তানের জন্ম হয়। তৃতীয় সন্তানকে গর্ভে রেখে মারা যান ইলিয়াস সাহেব। স্বামী মারা যাওয়ার পর হিসাব অনুযায়ী আরও ১ বছর থাকতে পারে সেই কোয়ার্টারে। চাকরি থেকে কিছু টাকাও পায়। মোট ৪ জনের পরিবারের জন্য যা ছিল সামান্য। সেই টাকা জমা রাখে ব্যাংকে। ব্যাংকের লভ্যাংশ দিয়ে চলে না সংসার। তার ওপর সন্তানদের লেখাপড়া। আয়েশা কি করবে? লেখাপড়া তো তার করা হয়নি। সেই আরবি শিক্ষাকে সম্বল করে বেরিয়ে পড়ে আয়েশা। বাড়ি বাড়ি গিয়ে মুসলিম বাচ্চাদের কোরআন শিক্ষা দিচ্ছে। যে আয়েশা শহরের তেমন কিছু চিনত না। এখন তাকে অনেক কিছু চিনতে হচ্ছে। জানতে হচ্ছে, যেতে হচ্ছে। আয়েশার চোখে হাজার স্বপ্ন সন্তানদের নিয়ে। জীবনযুদ্ধে হেরে যাওয়া নারী আয়েশা নয়। সন্তানরা এখনও লেখাপড়ার মাঝে। নিজের চোখের স্বপ্নগুলো সন্তানদের চোখে দেখার খুব সাধ আয়েশার।

বস্তিতে বাস করে দিলারা। বয়স কত হবে নিজে জানে না। কত বছরে বিয়ে হয়েছে তাও জানে না। বিয়ের পর জানতে পারে, স্বামীর আগের একটা বউ আছে। গরিব অসহায় ঘরের মেয়ে দিলারা। জন্মনিয়ন্ত্রণ বলে কাকে তা জানলেও সেসব কখনও নেয়নি। দিলারার ঘরেই একে একে ৫ সন্তান। স্বামী ২ দিন রিকশা চালায় তো ৫ দিন বসে থাকে। দিলারা বাসা বাড়িতে কাজ নেবে তাও দেবে না। এদিকে ছোট ছোট বাচ্চা, সন্তানের মায়া ছাড়তে পারে না দিলারা। এমন স্বামীর ভাত খাবে না বলে ঘর থেকে বের হয়। সন্তানরা মায়ের সঙ্গে চলে আসে। বাধ্য হয়ে বড় দুই সন্তানের কাছে ছোট ৩ সন্তানকে রেখে বাসাবাড়িতে কাজে নামে। ৩ বছরের মাথায় বড় সন্তানকে কারখানায় কাজ দেয়।

বাকি ৪ সন্তান গ্রামে পাঠিয়ে দেয় শাশুড়ির কাছে। শহরে দিলারা ও তার বড় সন্তান কাজ করে। যা রোজগার করে নিজেরা বস্তিতে থাকে, বাকি টাকা গ্রামে পাঠায়। লড়াকু দিলারার অবস্থা দেখে স্বামী আবার ফিরে আসে। দিলারার কথা, যে স্বামী খাবার দেয় না, কাজ করতে দেয় না, সে স্বামীর কোন দরকার নেই। সালেহা, আয়েশা, দিলারা সমাজের ভিন্ন স্তরের নারী। সমস্যা তাদের এক। খুব আক্ষেপ করেই বলে- স্বামীরা চাকরি করতে দিলে নিজের ক্যারিয়ার গড়তে পারতাম আরও সুন্দর করে। তবে এখনও স্বামীরা ভাবে স্ত্রীরা চাকরি করলে, নিজের ক্যারিয়ার গড়লে, স্বামীদের মূল্যায়ন করবে না। আসলে এমন ধারণাটাই ভুল। মনে রাখা দরকার, সন্তান যেমন দুজনের সংসারও দুজনের। একজনের ভাল ক্যারিয়ার অন্যজনেরও বটে।