২১ অক্টোবর ২০১৭,   ঢাকা, বাংলাদেশ   শেষ আপডেট এই মাত্র  
Login   Register        
ADS

প্রযুক্তির অপব্যবহার নয়


ফেসবুক ভাল কী মন্দ এই প্রশ্ন উঠে এসেছে আজ। প্রশ্ন উঠেছে কম্পিউটারের নেগেটিভ ব্যবহার নিয়ে। নিঃসন্দেহে বলা যেত কম্পিউটার বা ফেসবুক একটি সত্যিকারের দরকারি মনোরঞ্জন প্রতিষ্ঠান আমাদের জীবনে। অনেক কাজ এই মাধ্যমে সহজে করে ওঠা সম্ভব। কিন্তু বর্তমান অবস্থায় ফেসবুক ব্যবহারকারীদের যথেচ্ছা ব্যবহারের কারণে এ কথাটি আর বলা সম্ভব হচ্ছে না। গত কয়েক দিন ধরে একটি খবর ভাইরাল হয়ে আমাদের নৈতিকতার শিকড়ে টান দিয়েছে। ভাই এবং বোনের পবিত্র সম্পর্ককে কালিমা দিতে এক মুহূর্ত দ্বিধা করেনি কোন কোন অসভ্য মানুষ। এরা কি আদৌ কোন পিতামাতার সন্তান? এরা কোন শ্রেণীর মনুষ্য প্রাণী, যারা ভাইয়ের সঙ্গে বোনের ছবি দেখে ইতর প্রাণীর মতো লোলুপ হয়ে নির্লজ্জ কমেন্ট করে? যেখানে এটি জানা যে, ফেসবুকের কোন কর্মকা-ই লুকানো থাকে না।

যেমন মোবাইলের সূত্র ধরে আধুনিক অপরাধ বিজ্ঞানীরা অপরাধীকে খুঁজে বের করে আনে, তেমনি ফেসবুক এ্যাকাউন্ট বন্ধ করে দিলে বা কমেন্ট মুছে ফেললে প্রযুক্তির সাহায্যে এ্যাকাউন্টহোল্ডারকে বা কমেন্টরকে অনায়াসে খুঁজে বের করা সম্ভব। কয়েক বছর আগে জনৈক উঠতি নায়িকা অভিনেত্রীর একটি ভিডিও নিয়ে সারাদেশে হৈচৈ পড়ে গিয়েছিল। যত দোষ নায়িকার! কেউ কিন্তু প্রশ্ন করেনি সে কি একাই ওই ভিডিওর পাত্র-পাত্রী? নারীরা তাদের জীবনে যদি কাউকে বিশ্বাস করে সে তার স্বামী। তার প্রেমিক। সেই স্বামী বা প্রেমিককে তো কোন নারীর অদেয় কিছু থাকে না। কোন কারণে সম্পর্ক ভেঙ্গে গেলে কি স্বামী বা প্রেমিকের কাছে সেই নারী পণ্য হয়ে যায়? অভিনেত্রীর সেই সময়ের প্রেমিক হবু স্বামী কিন্তু আদিম রাগে পশুর চেয়েও বর্বর আচরণ করেছে। পুরুষকুলের একটি কলঙ্ক এই অবিশ্বাসী কাপুরুষ। বর্তমানে দেশের নারীরা এই বিশ্বাসঘাতক পুরুষের কারণে তাদের স্বামী বা প্রেমিককে সম্পূর্ণ বিশ্বাস করতে ভয় পায়। কী জানি, স্বামীর সঙ্গের একান্ত অন্তরঙ্গ মুহূর্তে তুলে রাখা কোন দুর্বলতম ভালবাসার সোনালী স্মৃতিচিহ্নের ছবি বা ভিডিও যদি স্বামী বিক্রি করে দেয়?

ঠিক যতখানি দোষ দেয়া হচ্ছে অভিনেত্রীকে, প্রেমিক তার চেয়ে হাজারগুণ বেশি দোষী। কেননা সে স্বামী-স্ত্রী, প্রেমিক-প্রেমিকার চিরকালের বিশ্বাসের চুক্তি ভঙ্গ করেছে। বিশ্বাসঘাতকতা একটি অপরাধ। সমাজের মূল্যবোধের অবমূল্যায়ন করেছে। তার এই মানসিকতার সঙ্গে মিল রয়েছে পয়লা বৈশাখে নারীর ওপর নির্যাতনকারীদের, মিল রয়েছে গার্মেন্টস ফেরত রাহিমা, সেফালি, আফরোজা, স্কুলছাত্রী শম্পা, টুসি, অফিসযাত্রী রোকেয়া বেগম, শাহেলা আসিফ আর ক্রিকেটার নাসিরের বোনের ছবিতে কমেন্টকারীদের সঙ্গে। এরা মানুষ নয়, মানুষের মতো দেখতে যৌনকাতর পশু ছাড়া আর কিছু নয়। কিন্তু কেন এরা মনুষ্য দেহে এরকম পশু প্রবৃত্তিপরায়ণ? ভ- প্রেমিকেরও ছিল প্রত্যাখ্যানের রাগ। প্রেমিকাকে ছোট করতে গিয়ে নিজের পশু চেহারা উন্মোচিত করতে এক মুহূর্তে নিজের পরিবার, বাবা-মা, ভাই-বোন, আত্মীয়-পরিজন ও বন্ধুদের কথা একবারও ভাবেনি। ক্রিকেটার নাসিরকে আঘাতকারীদের ব্যাপারেও ঠিক তাই। একজন ক্রিকেটারের সবচেয়ে কাছের মানুষ হচ্ছে তার ভক্ত বা ফ্যান। কতটা দুঃখ পেয়ে একজন ক্রিকেটার বলতে পারেনÑ আপনাদের মতো ভক্তের আমার প্রয়োজন নেই। নৈতিকতার চরম অবক্ষয় ঘটলেই কেবল এ রকম হতে পারে। এদের ঘরেও মা-বোন আছে, এদেরও বান্ধবী-প্রেমিকা রয়েছে। কিন্তু যেহেতু নারীকে সম্মান দেয়ার শিক্ষা এই অমানুষ পশুরা পায়নি, তাই এরা এমন লোভেই কুকুরের মতো আচরণ করতে পারছে। এই মুহূর্তে সরকারের পদক্ষেপ নেয়া একান্ত প্রয়োজন। বাঙালী ভদ্রভাবে কোনকিছু শিক্ষা নেয় না। সেক্ষেত্রে এই পশুদের দ্বারা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে সমাজ। আর সমাজের অসহায়তা পরিবারের ওপর বিরূপ প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করছে। একটি রাষ্ট্রে নারীর নিরাপত্তা দেয়ার দায়িত্ব রাষ্ট্রের কর্তব্য। এখুনি যদি ফেসবুক ব্যবহারকারীদের যোগ্যতা, ব্যবহারের সীমানা নির্ধারণ করে না দেয়া হয় এবং এদের যথোপযুক্ত শাস্তি দেয়া না হয়, তবে বিশ্বাসঘাতক স্বামী-প্রেমিকদের হাত থেকে কোন স্ত্রী-প্রেমিকা রক্ষা বা সম্মান পাবে না।

সংযম শিখতে হবে। ব্যর্থতা বা প্রত্যাখ্যানকে মেনে নেয়ার শিক্ষা অর্জন করতে হবে। মানতে হবে, নারীরও অধিকার আছে কাউকে বা যে কোন কিছুকে প্রত্যাখ্যান করার। নারীও মানুষ। আর নিজের দেশকে যদি মায়ের মতো কেউ ভালবাসতে পারে, সেই পুরুষ বা নারী কখনই তার মূল্যবোধকে বিসর্জন দিয়ে এতটা নিচে নামতে পারে না। যেখানে ফেসবুকে সবার পরিচয় উন্মোচিত থাকে, সেখানে কোন্ শ্রেণীর ইতর হলে তারা এ রকম আচরণ করতে পারে? বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে আইনের মাধ্যমে সুষ্ঠু আচরণ শেখাতে বাধ্য করতে হবে। স্কুল-কলেজে মূল্যবোধের ওপর জোর দিতে হবে। আর আইন থাকতে হবে কঠিন, কঠোর। বিশ্বাস ভঙ্গের জন্য শাস্তির ব্যবস্থা থাকলে ভ- প্রেমিকের মতো কাপুরুষ ক্ষতিকর উগ্র স্বভাবের একজন প্রেমিক বা স্বামী কখনও সাহস পেত না তার নিজের এবং প্রেমিকার একান্ত ভিডিও জনসমক্ষে প্রকাশ করতে। নাসিরের ভক্তরা কখনই সাহস পেত না এমন অশ্লীল কমেন্ট করতে। আর পয়লা বৈশাখের কুলাঙ্গাররা কিছুতেই পার পেয়ে জেলের বাইরে ঘুরে বেড়াতে পারত না। পারিবারিকভাবে এদের নৈতিকতার শিক্ষা এবং মূল্যবোধের ঘাটতি আছে বলেই এদের পরিবার এখনও এদের আশ্রয় দিয়ে রেখেছে।

বাংলাদেশে মেয়ের কি অভাব! ভ- প্রেমিকের মতো ঘৃণ্য পুরুষের বিয়ের জন্য মেয়ে পেতে অসুবিধা হবে না। তবে এদের ছেলেমেয়েরাও প্রতারকের মূল্যবোধ নিয়েই বড় হবে। বাবাকে প্রশ্ন করবে না, কেন সে এত নিচে নেমে গেল! কিংবা ঘৃণা করবে এই বাবাকে, যে কোন সময় নিজের স্বার্থের জন্য যে কোন কাজ করতে পারে। পারিবারিকভাবে যদি এদের বয়কট করা হতো, পয়লা বৈশাখের পশুদের বাবা-মা’রা যদি নিজেরাই আইনের হাতে সন্তানকে তুলে দিত, নাসিরের ভক্তদের যদি পরিবারশুদ্ধ লজ্জা দেয়া যেত, তবে সমাজে এই কুলাঙ্গারের সংখ্যা কমে আসত।

অপরাধ করে পরিবার, বাবা-মা, ভাই-বোনের কাছে প্রশ্রয় পেলে অপরাধ কখনই কমে যায় না। সরকারের কাছে অনুরোধ, ফেসবুকসংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়কে নিয়ে বসে এমন আইন করা, যাতে এসব কুলাঙ্গারদের যথাযথ শাস্তি হয়। এদের শাস্তি দেখে পরবর্তীতে যেন আর কেউ সাহস না পায় এই ধরনের আচরণ করতে।

বাংলাদেশের নারীরা অগ্রগামী হচ্ছে। তাদের এই অগ্রগামী মিছিলকে কিছুতেই যেন থামিয়ে দেয়া না হয়। পরিবারে নারীর ভূমিকাও কম নয়। মা-বোন-ভাবি-চাচি-মামিদেরও পারিবারিক মূল্যবোধ সম্পর্কে ছোটকাল থেকে শিশুকে শিক্ষা দিতে হবে। সেই মা কখনই সন্তানের জন্য ভাল মা নয়, যে অপরাধী সন্তানকে আশ্রয় দেয় ভবিষ্যতে আরও একটি অপরাধ সংঘটিত করার জন্য। তাই নারীদেরও বুঝতে হবে পরিবার, সমাজ, রাষ্ট্রে সম্মানের সঙ্গে বাঁচতে হলে পরিবারেই গড়ে তুলতে হবে মূল্যবোধ ও নৈতিকতার শিক্ষালয়। আর আইন প্রয়োগের মাধ্যমে সরকারকে থাকতে হবে অতন্দ্র প্রহরীর মতো নিরপেক্ষ ও বিশ্বস্ত। আশা করি, সরকার ইতিমধ্যে ব্যাপারটি নিয়ে চিন্তা-ভাবনা শুরু করেছে।