১৮ নভেম্বর ২০১৭,   ঢাকা, বাংলাদেশ   শেষ আপডেট এই মাত্র  
Login   Register        
ADS

মুক্তবুদ্ধি চর্চার পথিকৃৎ


নিম্ন প্রাইমারী স্কুলে পড়ার ঘটনা। ক্লাসে যোগ-বিয়োগ ও গুণনের পদ্ধতি শেখান শিক্ষক। এই শিখে নিজে নিজেই পরে ভাগের নিয়ম আবিষ্কার করেন তিনি। পরের দিন শিক্ষককে তা দেখিয়ে রীতিমতো অবাক করে দেন কাজী পরিবারের দুরন্ত বালক কাজী মোতাহার হোসেন। পদ্মাপারের প্রকৃতির সাহচর্যে বেড়ে ওঠা এই অশান্ত বালকের তাক লাগানোর ঘটনার এখানেই শেষ নয়। যৌবনে এসে সেই মোতাহারই এক সপ্তাহের অনুশীলন হিসেবে দেয়া বিজ্ঞানাচার্য সত্যেন্দ্রনাথ বসুর সাত-আটটা প্রশ্নের সমাধান করে ফেলেছিলেন মাত্র কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই। কাজী মোতাহার হোসেন নামের এই আশ্চর্য বালক পরবর্তী জীবনে খ্যাতি লাভ করেন বাংলাদেশের প্রথম পরিসংখ্যানবিদ, বিজ্ঞানী, শিক্ষাবিদ, দাবাড়ু এবং বিশিষ্ট সাহিত্যিক হিসেবে। ডক্টর মুহম্মদ শহীদুল্লাহ্র ভাষায় তিনি ‘আপনভোলা নিরহঙ্কার মানুষ, বিদ্বান ও গুণী।’ আর গুণমুগ্ধ ভক্তদের কাছে তিনি শ্রদ্ধেয় ‘কাজী সাহেব।’ বিজ্ঞান গবেষণার পাশাপাশি সাহিত্য-সংস্কৃতি-সঙ্গীত-খেলাধুলা ইত্যাদি ক্ষেত্রে অনন্য-সাধারণ প্রতিভার সমন্বয়ে যুক্তিবাদী, ধর্মপ্রাণ ও স্পষ্টবাদী কাজী মোতাহার হোসেন ছিলেন একজন পরিপূর্ণ মানুষ।

তৎকালীন নদীয়া জেলার ভালুকা (বর্তমান কুষ্টিয়া জেলার কুমারখালী) থানার অন্তর্গত লক্ষ্মীপুর গ্রামে ১৮৯৭ খিস্টাব্দের ৩০ জুলাই (বাংলা ১৩০৪ বঙ্গাব্দের ১৪ শ্রাবণ) শুক্রবার ভোরবেলা নানার বাড়িতে জন্মগ্রহণ করেন কাজী মোতাহার। তাঁর বাবা কাজী গওহরউদ্দীন আহমদ এবং মা তসিরুন্নেসা। বাবা-মায়ের চার ছেলে ও চার মেয়ের মধ্যে কাজী মোতাহার হোসেন ছিলেন দ্বিতীয় সন্তান। গওহরউদ্দীন আহমদের আদিনিবাস ছিল ফরিদপুর জেলার পাংশা উপজেলার অধীন বাগমারা গ্রামে। তাঁদের পূর্বপুরুষ মুঘল সম্রাট জাহাঙ্গীরের শাসনামলে দিল্লী-দরবারে নিযুক্ত ছিলেন ধর্মীয় উপদেষ্টা ও কাজী (বিচারক) পদে। বংশগত ‘কাজী’ পদবি তাঁরা পেয়েছেন ওই সূত্রেই। গওহরউদ্দীন এন্ট্রান্স পাস করেননি। পেশায় তিনি ছিলেন প্রথমে সেটেলমেন্টের আমিন, পরে হেড আমিন এবং আরও পরে আমিনদের ইন্সপেক্টর। পেশাগত জরিপ কাজের সূত্রে বছরের ছয় মাস বিভিন্ন অঞ্চলে যেতে হতো তাঁকে। বাকি ছয় মাস বাড়িতে থাকার অবসরে তিনি বাড়ির পাঠশালায় শিক্ষকতা ও গ্রামের মসজিদে ইমামতি করতেন। দিল্লীর বাদশাহর দেয়া অল্প কিছু জমিজমা থাকলেও সৎ ও ধর্মপ্রাণ কাজী গওহরউদ্দীনের সংসারে যথেষ্ট সচ্ছলতা কখনই ছিল না। তবে বাগমারার মধ্যবিত্ত এ পরিবারটি শিক্ষা-সংস্কৃতি ও বংশ-গৌরবে ছিল বিশিষ্ট।

ফরিদপুরের বাগমারা গ্রামে বাবার বাড়িতে শৈশবের দিনগুলোতে ঝড়ের সময় আম-জাম কুড়ানো, খেজুরগাছে উঠে খেজুর বা খেজুর রস আহরণ, পদ্মায় ঝাঁপাঝাঁপি, বাঁশ বা কাঠের হাতার ব্যাট ও ন্যাকড়ার বল দিয়ে ব্যাট-বল আর কাঁচা জাম্বুরা দিয়ে ফুটবল খেলা, ঘুড়ি ওড়ানো, কুস্তি ইত্যাদি ছিল মোতাহারের বাল্যকালের নিত্যদিনের খেলা। আট বছর বয়স পর্যন্ত স্কুলে না গিয়ে এসব স্বতঃস্ফূর্ত আনন্দলীলার মধ্য দিয়েই স্বাভাবিক বুদ্ধির বিকাশ ঘটেছিল দুরন্ত মোতাহারের।

শিক্ষায় অনন্য কৃতিত্ব

বাবার কাছে এবং পারিবারিক মক্তবে প্রাথমিক শিক্ষার হাতেখড়ি হয় কাজী মোতাহার হোসেনের। নানাবাড়ি লক্ষ্মীপুরের কাছে যদুবয়রা নিম্ন প্রাইমারী স্কুলে ১৯০৬ সাল পর্যন্ত পড়াশোনা করেন তিনি। পরে ১৯০৭ সালে বাগমারা নিম্ন প্রাইমারী স্কুল পাস করেন এবং রাজবাড়ী কেন্দ্রে মৌখিক বৃত্তি পরীক্ষায় পুরো নম্বর পেয়ে বৃত্তিলাভ করেন মাসিক দুই টাকা হারে। ১৯০৯ সালে তিনি কুষ্টিয়া মহকুমার অন্তর্গত উকিল রাইচরণ দাস প্রতিষ্ঠিত সেনগ্রাম মাইনর স্কুল থেকে উচ্চ প্রাইমারি (ষষ্ঠ শ্রেণী) পাস করেন। ১৯১১ সালে তিনি কুষ্টিয়া উচ্চ ইংরেজী (এইচই) স্কুলে ফোর্থ ক্লাসে (বর্তমান সপ্তম শ্রেণী) ভর্তি হন। সেখানে উচ্চ প্রাইমারী ক্লাসের বৃত্তি পরীক্ষা দিয়ে প্রথম হয়ে মাসিক তিন টাকার এবং চুয়াডাঙ্গা থেকে বৃত্তি পরীক্ষা দিয়ে মাসিক চার টাকার বৃত্তিলাভ করেন তিনি। ১৯১৫ সালে তিনি এইচই স্কুল থেকে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে অনুষ্ঠিত প্রবেশিকা (ম্যাট্রিকুলেশন) পরীক্ষায় পূর্ববঙ্গ ও অসমের ভেতরে প্রথম বিভাগে প্রথম স্থান অধিকার করেন এবং মাসিক পনেরো টাকা হারে প্রাদেশিক বৃত্তি পান। এ প্রসঙ্গে একটি তথ্য দেয়া যেতে পারে, ইংরেজী শিক্ষার ক্ষেত্রে কাজী মোতাহার হোসেনই ছিলেন কাজী পরিবারের প্রথম কোন ব্যক্তি।

প্রবেশিকার পর কলকাতার প্রেসিডেন্সি কলেজে আইএসসি শ্রেণীতে ভর্তি হন কাজী মোতাহার। সে সময় তিনি বেশ কয়েকজন গুণী শিক্ষকের সান্নিধ্য লাভ করেন। কলেজে দ্বিতীয় বর্ষে পড়ার সময় ঘটে একটি অপ্রীতিকর ঘটনা। এর ফলে সকল শিক্ষার্থীর দশ টাকা করে জরিমানা ধরা হয়। জরিমানা মওকুফের সুযোগ না পেয়ে সেখান থেকে চলে এসে তিনি ভর্তি হন রাজশাহী কলেজে। ১৯১৭ সালে ওই কলেজের বিজ্ঞান শাখা থেকে তিনি প্রথম বিভাগে চতুর্দশ স্থান অধিকার করে আইএসসি পাস করেন এবং লাভ করেন মাসিক কুড়ি টাকা বৃত্তি। ১৯১৯ সালে কাজী মোতাহার কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে ঢাকা কলেজ থেকে পদার্থবিজ্ঞানে অনার্স পরীক্ষায় দ্বিতীয় শ্রেণীতে প্রথম স্থান অধিকার করেন এবং ওই পরীক্ষায়ও পূর্ববঙ্গ ও আসামের শিক্ষার্থীদের মধ্যে প্রথম হয়ে মাসিক ত্রিশ টাকা বৃত্তিলাভ করেন। ১৯২১ সালে তিনি ঢাকা কলেজ থেকে পদার্থবিজ্ঞানে দ্বিতীয় শ্রেণীতে প্রথম স্থান অর্জন করে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের এমএ ডিগ্রী অর্জন করেন। উল্লেখ্য, সে বছর কেউ প্রথম শ্রেণী পাননি।

দারিদ্র্যের সাহচর্য

বাবার আর্থিক অসচ্ছলতার কারণে ছাত্রাবস্থায় দুঃসহ দারিদ্র্য ছিল কাজী মোতাহারের নিত্যসঙ্গী। তৃতীয় শ্রেণীতে থাকতে গোসলের পরে একটিমাত্র কাপড় (ধুতি) ভেজা থাকায় স্কুলে যেতে তাঁর দেরি হয়েছে কোন কোন দিন। কুষ্টিয়া হাই স্কুলে পড়ার সময়ও তাঁকে প্রায় সময়ই দিন কাটাতে হয়েছে এক কাপড়ে। ঢাকা কলেজে এমএ-তে পড়ার সময়ে ত্রিশ টাকা বৃত্তির সবটাই তিনি পাঠিয়ে দিতেন অসুস্থ বাবার কাছে। আর ছাত্র পড়িয়ে পাওয়া ২০-২৫ টাকা দিয়েই তিনি চালাতেন নিজের খরচ। কলেজে গ্রীষ্মের ও পুজোর ছুটিতে কোন না কোন স্কুলে শিক্ষকতা করে বাড়িতে টাকা পাঠাতেন। এ রকম ছুটিতেই ১৯১৯ সালে তিনি দৌলতপুরের মহসীন স্কুলে শিক্ষকতা করেন অল্প কিছু দিন।

উচ্চতর শিক্ষা ও কর্মজীবন

১৯২১ সালে স্থাপিত হয় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়। তার প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই পদার্থবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যক্ষ ড. জেনকিন্সের সুপারিশে ওই বিভাগে ডেমোনেস্ট্রেটরের পদে নিযুক্ত হন এমএ শেষ পর্বের ছাত্র মোতাহার হোসেন। একই বছরে এমএ পরীক্ষার ফল প্রকাশিত হলে তিনি ওই বিভাগে সহকারী প্রভাষক নিযুক্ত হন। সেসময় বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রখ্যাত বিজ্ঞানসাধক ও কোয়ান্টাম পরিসংখ্যানের জনক বিজ্ঞানাচার্য সত্যেন্দ্রনাথ বসু এবং অনেক নৈতিক জ্ঞানসম্পন্ন শিক্ষকের স্নেহ-ভালবাসা লাভ করেন তিনি। মোতাহারের মধ্যে গণিতের অসামান্য প্রতিভা লক্ষ্য করে তাঁকে পরিসংখ্যান পড়তে পরামর্শ দেন সত্যেন্দ্রনাথ। ১৯৩৮ সালের দিকে এক ছুটিতে সত্যেন্দ্রনাথ ছাত্র কাজী মোতাহারকে নিয়ে যান কলকাতার ‘ওহফরধহ ঝঃধঃরংঃরপধষ ওহংঃরঃঁঃব’-এর অধ্যাপক ড. প্রশান্তচন্দ্র মহলানবীশের কাছে। উপমহাদেশের সংখ্যাতত্ত্ব (ঝঃধঃরংঃরপং) বিষয়ে পঠন-পাঠনের জনক এই মনীষীর কাছে সংখ্যাতত্ত্বের পাঠ গ্রহণ করে ১৯৩৮ সালে ডিপ্লোমা অর্জন করেন মোতাহার হোসেন। পরের বছর কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে গণিতে এমএ ডিগ্রী লাভ করেন তিনি। কলকাতা থেকে ফিরে এসে তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে গণিত বিভাগের অন্তর্ভুক্ত পরিসংখ্যান বিষয় পড়ানো শুরু করেন। একই সঙ্গে পদার্থবিদ্যার ফলিত অংশ ছেড়ে দিয়ে অনার্স ক্লাসে পড়াতে শুরু করেন তাত্ত্বিক পদার্থবিদ্যা। ১৯৩৯ সালে তিনি ডিপার্টমেন্ট অব এ্যাগ্রিকালচার-এ স্ট্যাটিসটিক্স বিষয়ে পাঠদান করেন। ১৯৪৯ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গণিত বিভাগটি গণিত ও পরিসংখ্যান বিভাগে রূপান্তরিত হলে এ বিভাগের প্রভাষক হিসেবে যোগ দেন তিনি। ১৯৫০ সালে তিনি উবংরমহ ড়ভ ঊীঢ়বৎরসবহঃং বিষয়ে ইধষধহপবফ ওহপড়সঢ়ষবঃব ইষড়পশ উবংরমহ শিরোনামের গবেষণা-অভিসন্দর্ভ রচনা করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে সংখ্যাতত্ত্ব তথা তথ্যগণিতে পিএইচডি ডিগ্রী অর্জন করেন। বিশ্ববিদ্যালয়ে সে সময় সংখ্যাতত্ত্ব বিষয়ে গবেষণা পরিচালনার কোন যোগ্য ব্যক্তি না থাকায় তত্ত্বাবধায়কের সাহায্য ছাড়াই অভিসন্দর্ভ রচনা করেন কাজী মোতাহার। তাঁর পিএইচডি অভিসন্দর্ভের পরীক্ষক ছিলেন প্রখ্যাত সংখ্যাতত্ত্ববিদ অধ্যাপক স্যার রোনাল্ড ফিশার, অধ্যাপক রাজচন্দ্র বোস এবং ড. মোহাম্মদ জিয়াউদ্দীন। গবেষণাপত্রটি মূল্যায়ন করতে গিয়ে উচ্চ প্রশংসামূলক মন্তব্য করেন অধ্যাপক ফিশার। কাজী মোতাহার হোসেন উদ্ভাবিত এই পদ্ধতি সংখ্যাতত্ত্বে পরবর্তীকালে ‘হোসেন শৃঙ্খল’ বা ‘ঐঁংধরহ’ং ঈযধরহ জঁষব’ নামে অভিহিত হয়। শিক্ষকতার পাশাপাশি মোতাহার হোসেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সহকারী প্রক্টর হিসেবে এবং ফজলুল হক মুসলিম হলসহ আরও কয়েকটি হলে প্রাধ্যক্ষের দায়িত্ব পালন করেন অত্যন্ত দক্ষতার সঙ্গে। ১৯৫০ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পৃথক পরিসংখ্যান বিভাগ সৃষ্টি হলে মোতাহার হোসেন ওই বিভাগের বিভাগীয় প্রধান নিযুক্ত হন। পরের বছর তিনি উন্নীত হন এ বিভাগের রিডার পদে। এরপর ১৯৫৪ সালে তিনি পরিসংখ্যান বিভাগের অধ্যাপক পদে নিযুক্ত হন এবং ১৯৬১ সালে নিয়মিত অধ্যাপকের পদ থেকে অবসর গ্রহণ করেন। ১৯৫৩ সালে গ্রীষ্মের ছুটিতে ইন্ডিয়ান স্ট্যাটিস্টিক্যাল ইনস্টিটিউটে তিনি পালন করেন ভিজিটিং প্রফেসরের দায়িত্ব। এ ছাড়া ১৯৫৫ থেকে ১৯৫৮ সাল পর্যন্ত তিনি বিশ্ববিদ্যালয়ের বিজ্ঞান অনুষদের ডিনের দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৬১ থেকে ১৯৬৪ সাল পর্যন্ত তিনি নিযুক্ত ছিলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিসংখ্যান বিভাগের সংখ্যাতিরিক্ত অধ্যাপক (সুপারনিউমারারি প্রফেসর) হিসেবে। ১৯৬৩ সালে তিনি কলেজ অব মিউজিক-এ বাংলা ও এ্যাকুস্টিক্সের অবৈতনিক শিক্ষক নিযুক্ত হন। ১৯৬৪ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পরিসংখ্যান গবেষণা প্রতিষ্ঠান (ওঝজঞ)-এর প্রতিষ্ঠাতা পরিচালক নিয়োগ করা হয় তাঁকে। ১৯৬৯ সালে তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ‘প্রফেসর ইমেরিটাস’ পদে নিযুক্ত হন।

সাহিত্য-জীবন ও লেখালেখি

স্কুলজীবনে অবসর সময়ে বাবার সংগ্রহের বই পাঠ করার মধ্য দিয়ে সাহিত্যের প্রতি আগ্রহ জন্মে কাজী মোতাহার হোসেনের। বাল্যকালে একই গ্রামের কাজী আবদুল ওদুদের ঘনিষ্ঠ সাহচর্যে এসে তিনি রবীন্দ্রনাথ, প্রমথ চৌধুরী ও সত্যেন দত্তের লেখা এবং ‘সবুজপত্র’, ‘প্রবাসী’ ও ‘পরিচয়’ পত্রিকাসমূহ পাঠ করার সুযোগ পান। কুষ্টিয়া হাই স্কুলে পড়ার সময়ই শিক্ষক জ্যোতিন্দ্রমোহন রায়ের উৎসাহ ও প্রেরণায় মোতাহার হোসেনের লেখালেখির হাতেখড়ি হয়। ‘সওগাত’ পত্রিকায় প্রকাশিত হয় তাঁর প্রথম রচনা ‘গ্যালিলিও’। ১৯২৬ সালের ১৯ জানুয়ারি কাজী আবদুল ওদুদ, আবুল হুসেন এবং কাজী মোতাহার হোসেন ঢাকায় প্রতিষ্ঠা করেন ‘মুসলিম সাহিত্য সমাজ’ নামে একটি প্রগতিশীল সাহিত্য-সংগঠন। এই সংগঠনের বার্ষিক মুখপত্র ‘শিখা’র দ্বিতীয় ও তৃতীয় বর্ষ-সংখ্যা সম্পাদনা করেন মোতাহার হোসেন। যদিও পত্রিকাটি অল্পকালব্যাপী প্রকাশিত হয়েছে, তার পরেও এটি মুসলিম সমাজে মুক্তচিন্তার প্রসার ঘটাতে সক্রিয় ভূমিকা পালন করেছিল। কাজী মোতাহার হোসেন ছিলেন বাংলা একাডেমি প্রতিষ্ঠার স্বপ্নদ্রষ্টাদের মধ্যে একজন। তিনি ছিলেন বাংলা বানান ও লিপি সংস্কার কমিটিরও অন্যতম সদস্য। শক্তিশালী লেখনীর মাধ্যমে তিনি ভাষা আন্দোলন এবং মুক্তিযুদ্ধে প্রেরণা জুগিয়েছিলেন। পরবর্তীকালে নিজস্ব রীতিতে মননশীল, প্রাঞ্জল ও বলিষ্ঠ প্রকাশভঙ্গির একজন দায়িত্বশীল প্রাবন্ধিক ও সাহিত্যিক হিসেবে পরিচিতি লাভ করেন তিনি।

কাজী মোতাহার হোসেন লেখক হিসেবে বিচিত্র বিষয়ের চর্চায় ছিলেন নিবেদিত। মূলত সমাজভাবুক মননশীল প্রাবন্ধিক হিসেবে তিনি পরিচিত হলেও বিজ্ঞান-দর্শন-ধর্ম এসব বিষয়ে তাঁর চিন্তার পরিচয় মেলে নানা রচনায়। প্লেটো কিংবা হিন্দী কবিতার অনুবাদেও তাঁর নৈপুণ্যের স্বাক্ষর আছে। ১৯৩৭ সালে প্রকাশিত তাঁর প্রথম মৌলিক প্রবন্ধ-সংকলন ‘সঞ্চরণ’ প্রসঙ্গে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর এক পত্রে (২রা ভাদ্র ১৩৪৪ বঙ্গাব্দে প্রেরিত) কাজী মোতাহার হোসেনকে সাধুবাদ জানিয়ে লিখেছিলেন, ‘... বিচিত্র ভাবকে এবং আলোচনার বিষয়কে স্বচ্ছ প্রাঞ্জল ভাষায় রূপ দিয়ে যে প্রবন্ধগুলো আপনার ‘সঞ্চরণ’ গ্রন্থে প্রকাশ করেছেন তা পড়ে পরিতৃপ্ত হয়েছি। আপনার বলবার সাহস এবং চিন্তার স্বকীয়তা সাধুবাদের যোগ্য।’ এ ছাড়া প্রমথ চৌধুরী, উপেন্দ্রনাথ গঙ্গোপাধ্যায় প্রমুখেরও বিশেষ প্রশংসা লাভ করে ‘সঞ্চরণ’।

বুদ্ধির মুক্তি আন্দোলন ও

কাজী মোতাহার হোসেন

গত বিশ শতকের তৃতীয় চতুর্থ দশকে (১৯ জানুয়ারি ১৯২৬) সূচিত ‘ঢাকা মুসলিম সাহিত্য সমাজ’ পরিচালিত বুদ্ধির মুক্তি আন্দোলনের অন্যতম পুরোধা ব্যক্তিত্ব বিচিত্র প্রতিভাদীপ্ত ড. কাজী মোতাহার হোসেন। মূলত এ আন্দোলন ছিল মুসলিম সমাজকে প্রগতিমুখী করার জন্য একটি সাহিত্যিক-সাংস্কৃতিক আন্দোলন। আধুনিক জ্ঞান-বিজ্ঞান-দর্শন-রাজনীতি-অর্থনীতি ইত্যাদি নানা বিদ্যার দিগন্তে বিচরণ উৎসাহী এবং যুক্তিবাদ ও মানবতাবাদ উদ্দীপ্ত সদ্য প্রতিষ্ঠিত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক আবুল হুসেন (অর্থনীতি ও বাণিজ্য), অধ্যাপক কাজী মোতাহার হোসেন (পদার্থবিদ্যা), বিএ ক্লাসের ছাত্র আবুল ফজল, ঢাকা ইন্টারমিডিয়েট কলেজের অধ্যাপক কাজী আবদুল ওদুদ (বাংলা) প্রমুখ ‘মুসলিম সাহিত্য সমাজ’ প্রতিষ্ঠায় অগ্রণী ভূমিকা পালন করেন। কাজী আবদুল ওদুদকে বলা হতো এ প্রতিষ্ঠানের মস্তক, আবুল হুসেনকে হস্ত এবং কাজী মোতাহার হোসেনকে হৃৎপি-। স্বগ্রামবাসী আবদুল ওদুদ ছিলেন কাজী মোতাহার হোসেনের ভাবগুরু। এঁদের সঙ্গে যুক্ত থেকে আরও কিছু ছাত্র এবং বিশিষ্ট কয়েক ব্যক্তি কাজ করেছিলেন। এঁরা হলেন কাজী আনোয়ারুল কাদের, মোতাহের হোসেন চৌধুরী, আবদুল কাদির প্রমুখ। ‘মুসলিম সাহিত্য সমাজ’র এ সপ্তরথীর প্রত্যেকেই সাবলীলভাবে লেখনী চালিয়েছেন।

গতানুগতিক চিন্তাধারায় অভ্যস্ত প্রগতিবিমুখ মানসিকতার বিরুদ্ধে তাঁদের মতাদর্শ প্রকাশের জন্য ‘শিখা’ শীর্ষক একটি বার্ষিক সাহিত্যপত্র বের করেছিলেন তাঁরা। ১৩৩৩-১৩৩৮ সময়সীমার মধ্যে মোট পাঁচটি সংখ্যা বের হয়েছিল। দ্বিতীয় ও তৃতীয় সংখ্যা সম্পাদনা করেছিলেন কাজী মোতাহার হোসেন। শিখার মূলমন্ত্র ছিল : ‘জ্ঞান যেখানে সীমাবদ্ধ, বুদ্ধি সেখানে আড়ষ্ট, মুক্তি সেখানে অসম্ভব।’ এর প্রেক্ষিতে রক্ষণশীলতা, কুসংস্কার, গোঁড়ামি ইত্যাদি দূর করার জন্য তাঁরা নির্ভীকভাবে বিভিন্ন বিষয়ে লিখে বার্ষিক সম্মেলনে পাঠ করতেন এবং বার্ষিক প্রতিবেদনসহ ‘শিখা’য় প্রকাশ করতেন। তাঁদের এ নির্ভীক লেখায় কায়েমি স্বার্থবাদীর দল ক্ষুব্ধ হয়েছিল। কিন্তু পরিবর্তন প্রত্যাশী, সমাজ উন্নয়নকামী সচেতনজন তাঁদের স্বাগত জানিয়েছিল।

বিচিত্র গ্রন্থাবলীর প্রণেতা

কাজী মোতাহার হোসেনের প্রকাশিত মৌলিক গ্রন্থগুলোর মধ্যে রয়েছে নজরুল কাব্য পরিচিতি, সেই পথ লক্ষ্য করে, নির্বাচিত প্রবন্ধ (প্রথম খ-)। প্লেটোর ‘সিম্পোজিয়াম’, ম্যাক্সিম গোর্কির ‘ঝড়ো বাজের গান কবিতা’ এবং কাজী আশরাফ মাহমুদের বেশ কয়েকটি হিন্দী কাব্যগ্রন্থ বাংলায় অনুবাদ করেন তিনি। স্কুল, কলেজ এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্য তাঁর রচিত পাঠ্যপুস্তকের মধ্যে রয়েছে ওহঃবৎসবফরধঃব এবড়সবঃৎু, ইবমরহহবৎ’ং ঞৎধহংষধঃরড়হ, আধুনিক ভূগোল, সাহিত্যবিকাশ (প্রথম ভাগ), জ্যামিতি প্রবেশ, প্রবেশিকা বাংলা ব্যাকরণ, ইসলামের ইতিহাস, পাকিস্তান ও পৃথিবী, ঊষবসবহঃং ড়ভ ঝঃধঃরংঃরপং, সাহিত্যিকা (প্রথম ভাগ), তথ্যগণিত, গণিতশাস্ত্রের ইতিহাস, আলোকবিজ্ঞান (প্রথম খ- )। ‘নবাব স্যার সলিমুল্লাহ’ তাঁর রচিত একটি জীবনী পুস্তিকা। তাঁর উল্লেখযোগ্য প্রবন্ধের মধ্যে রয়েছে অসীমের সন্ধানে, কবি ও বৈজ্ঞানিক, বৈজ্ঞানিকের জ্ঞানসাধনা, মানুষ মোহাম্মদ, ধর্ম ও সমাজ, নাস্তিকের ধর্ম, আনন্দ ও মুসলমান গৃহ, সঙ্গীতচর্চা ও মুসলমান, সঙ্গীতে রবীন্দ্রনাথ, আমার বন্ধু নজরুল : তাঁর গান ইত্যাদি। পাঠ্যপুস্তক ছাড়াও কাজী মোতাহার হোসেনের অন্তত বারোটি গবেষণা-নিবন্ধ প্রকাশিত হয় বিভিন্ন জার্নালে। বাংলা পরিভাষা সৃষ্টির ক্ষেত্রেও তিনি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। স্ট্যাটিসটিক্সের বাংলা পরিভাষা হিসেবে তিনি ব্যবহার করেছিলেন ‘তথ্যগণিত’, যদিও অধ্যাপক মহলানবীশের ‘পরিসংখ্যান’ বেশি জনপ্রিয়তা অর্জন করেছে। কাজী সাহেবের যে পরিভাষাগুলো এখন নির্দ্বিধায় ব্যবহৃত হয় সেগুলো ংপধঃঃবৎ Ñবিস্তার, ফরংঢ়বৎংরড়হ Ñবিক্ষেপ, ংঃধহফধৎফ ফবারধঃরড়হ Ñপরিমিতি বিস্তার, াধৎরধহপব Ñবিস্তৃতি, সবধহ ফবারধঃরড়হ Ñগড় বিস্তৃতি, ৎধহমব Ñপরিক্ষেপ, ংবসর-রহঃবৎয়ঁধৎঃরষব ৎধহমব Ñআন্তঃচতুর্থক অর্ধপরিক্ষেপ, ঃবংঃ ড়ভ ংরমহরভরপধহপবÑ পার্থক্যের যথার্থতা, াধষঁব Ñমান, াধৎরধঃব Ñবিভিন্নক, পড়হংঃধহঃ Ñঅভিন্নক ইত্যাদি।

খেলাধুলায় অসাধারণ নৈপুণ্য

বিজ্ঞান গবেষণা ও সাহিত্য চর্চার পাশাপাশি খেলাধুলায়ও কাজী মোতাহার হোসেন বজায় রেখেছেন নিজের শ্রেষ্ঠত্ব। ছাত্রজীবনেই তিনি ফুটবল, টেনিস, ব্যাডমিন্টন, দাবা ও সাঁতারে বিশেষ পারদর্শিতা অর্জন করেন। পরবর্তীকালে নিজেকে উপমহাদেশের অন্যতম শ্রেষ্ঠ দাবাড়ু হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেন তিনি। ১৯২৫ সালে তিনি ‘অল ইন্ডিয়া চেস্ ব্রিলিয়্যান্সি’ প্রতিযোগিতায় মোট ১০৩ নম্বরের মধ্যে ১০১ নম্বর পেয়ে প্রথম স্থান অধিকার করেন। ১৯২৯ থেকে ১৯৬০ সাল পর্যন্ত তিনি একটানা প্রায় ৩০ বছর অবিভক্ত বাংলা এবং পূর্ব পাকিস্তানে দাবা চ্যাম্পিয়ন ছিলেন। ‘অল ইন্ডিয়া অ্যান্ড সাউথ আফ্রিকা করেসপন্ডেন্স চেস্ কম্পিটিশন’-এ চ্যাম্পিয়ন হয়েছেন তিনি। মোতাহার ছিলেন ‘বাংলাদেশ দাবা ফেডারেশন’-এর প্রতিষ্ঠাতা এবং আজীবন সভাপতি। বাংলাদেশের দাবার জগতে সম্মানিত ‘দাবাগুরু’ হিসেবে স্বীকৃতি লাভ করেন তিনি। দাবার জগতে তাঁর অবদানের স্মারকস্বরূপ ১৯৮০ সালের ২৫ এপ্রিল ঢাকায় ‘কাজী মোতাহার হোসেন ইন্টারন্যাশনাল রেটিং চেস্ টুর্নামেন্ট’ শুরু করা হয়। একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধের সময় করাচীতে দাবা খেলার জন্য নিমন্ত্রিত হয়ে গিয়ে পুরো নয় মাস আটকা পড়েছিলেন সেখানে। তাঁর দাবা খেলার সঙ্গীদের মধ্যে ছিলেন কথাশিল্পী শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়, কবি কাজী নজরুল ইসলাম, সতীশচন্দ্র আঢ্য, কিষাণলাল প্রমুখ। দাবা খেলা ছাড়াও তিনি ১৯৫১ সালে ঢাকায় অনুষ্ঠিত লন্ টেনিস প্রতিযোগিতায় চ্যাম্পিয়ন হন।

কাজী নজরুলের সঙ্গে বন্ধুত্ব

কবি কাজী নজরুল ইসলামের সঙ্গে কাজী মোতাহারের ছিল ঘনিষ্ঠ বন্ধুত্ব। এ প্রসঙ্গে ভাষাবিজ্ঞানী ও নজরুল গবেষক ড. রফিকুল ইসলাম জানান, ‘১৯২৫ সালে নিখিল ভারত দাবা প্রতিযোগিতার ব্যাপারে নিবিড় হয় নজরুল ও মোতাহারের সম্পর্ক। কাজী নজরুল তাঁর ‘মোতাহার’ নামটিকে আদর করে ‘মোতিহার’ বলে ডাকতেন। তাঁদের সম্পর্ক ও বন্ধুতা আরও ঘনিষ্ঠ হয় ১৯২৭ সালে। সে বছর গোড়ার দিকে ‘মুসলিম সাহিত্য সমাজ’-এর বার্ষিক সভায় বিশেষ অতিথি হিসেবে যোগদানের জন্য ঢাকায় আসেন নজরুল।’

এ ছাড়া নজরুল সম্পর্কে অনেক প্রবন্ধ ও একটি গ্রন্থ রচনা করেন মোতাহার হোসেন।

রবীন্দ্রসঙ্গীতে অনুরাগ

১৯৫৩ সালে একুশে ফেব্রুয়ারি উপলক্ষে শান্তিনিকেতনে অনুষ্ঠিত সাহিত্যমেলায় আমন্ত্রিত হয়ে ভাষণ প্রদান করেন কাজী মোতাহার। অনুষ্ঠান শেষে রাত্রিবেলায় বাড়ির ছাদে কফি পার্টির আয়োজন করা হয়। জ্যোৎস্নালোকিত পূর্ণিমার সেই রাতে উপস্থিত সবাইকে চমকে দিয়ে একটি রবীন্দ্রসঙ্গীত গেয়ে শোনান মোতাহার হোসেন। নীরস পদার্থবিজ্ঞানের অধ্যাপকের কণ্ঠে অপ্রত্যাশিত রবীন্দ্রসঙ্গীত শুনে অবাক হয়ে গিয়েছিলেন সবাই। অধ্যাপক আনিসুজ্জামানের সঙ্গে কথা বলে জানা যায় রবীন্দ্রসঙ্গীতের প্রতি কাজী মোতাহার কতখানি অনুরাগী ছিলেন। তিনি বলেন, ‘মূলত সঙ্গীতের প্রতি মোতাহার হোসেনের বিশেষ অনুরাগ ছিল কৈশোরকাল থেকেই। ১৯১৭-১৮ সালে তিনি বিশিষ্ট সঙ্গীতজ্ঞ ওস্তাদ হেকিম মোহাম্মদ হোসেন সাহেবের কাছে দুই বছর রাগসঙ্গীত তথা টপ্পা, ঠুমরি ও খেয়াল শেখেন এবং বছর তিনেক সেতারের তালিম গ্রহণ করেন। তরুণ বয়সে নানাবিধ পুরনো বাংলা গান, রবীন্দ্র, নজরুল, দ্বিজেন্দ্রলাল ও রজনীকান্তের গানের চর্চা করেন তিনি।’

পুরস্কার ও সম্মাননা

১৯৬১ সালে কাজী মোতাহার হোসেন লাভ করেন পাকিস্তান সরকারের ‘সিতারা-ই-ইমতিয়াজ’ পদক। ১৯৬৭ সালে প্রবন্ধ-সাহিত্যের জন্য তিনি লাভ করেন বাংলা একাডেমি সাহিত্য পুরস্কার। ১৯৭৪ সালের ৯ ডিসেম্বর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের এক বিশেষ সমাবর্তন উৎসবে তাঁকে সম্মানসূচক ‘ডক্টর অব সায়েন্স’ (ডিএসসি) ডিগ্রী প্রদান করা হয়। ১৯৭৫ সালের মার্চ মাসে তাঁকে বাংলাদেশের জাতীয় অধ্যাপকের মর্যাদা প্রদান করে বঙ্গবন্ধু সরকার। বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিবিদ্যায় বিশেষ অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ বাংলাদেশ সরকার তাঁকে ১৯৭৯ সালে স্বাধীনতা পুরস্কার প্রদান করে। এ ছাড়াও তিনি বাংলা একাডেমির সম্মানসূচক ফেলোশিপ, মুক্তধারা সাহিত্য পুরস্কার, সওগাত সাহিত্য পরিষদের নাসিরুদ্দীন স্বর্ণপদক, ভাসানী পুরস্কার এবং শেরে বাংলা জাতীয় স্মৃতিসংসদ-এর শেরে বাংলা জাতীয় পুরস্কার অর্জন করেন। তিনি বঙ্গীয় মুসলমান সাহিত্য সম্মেলনের ষষ্ঠ অধিবেশনে কলকাতা মুসলিম ইনস্টিটিউট হলের সভাপতি, দু’বার পাকিস্তান সায়েন্স কনফারেন্সের সভাপতি এবং ইন্ডিয়ান স্ট্যাটিস্টিক্যাল ইনস্টিটিউটের বাংলাদেশী সদস্য নির্বাচিত হন। নজরুল একাডেমি এবং ঢাকা ইউনিভার্সিটি অ্যালামনাই অ্যাসোসিয়েশনের সম্মানসূচক আজীবন সদস্য ছিলেন তিনি। এ ছাড়া কুমিল্লার একটি সংগঠন তাঁকে ‘বিদ্যাসাগর’ উপাধি এবং সিরাজগঞ্জের যমুনা সাহিত্যগোষ্ঠী ‘বিদ্যার্ণব’ উপাধি দিয়ে সম্মানিত করে। ১৯৮১ সালে ফরিদপুর জেলা সমিতি সংবর্ধনা দেয় তাঁকে। ১৯৮৫ সালে তিনি মরনোত্তর শেরে বাংলা জাতীয় স্মৃতিসংসদ স্বর্ণপদক এবং ১৯৯৭ সালে বাংলাদেশের জাতীয় ক্রীড়া স্বর্ণপদক লাভ করেন। তাঁর স্মৃতির প্রতি শ্রদ্ধাজ্ঞাপন করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সায়েন্স অ্যানেক্স ভবনটির নামকরণ করা হয় ‘কাজী মোতাহার হোসেন ভবন।’ ব্যক্তিগত জীবন ও সংসার

১৯২০ সালের ১০ অক্টোবর এমএ ক্লাসের ছাত্র অবস্থাতেই কাজী মোতাহার হোসেন বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন কলকাতার মোহাম্মদ ফয়েজুর রহমান ও মুসলিমা খাতুনের কন্যা সাজেদা খাতুনের সঙ্গে। শিল্প-সাহিত্যের বিশেষ অনুরাগী সাজেদা খাতুন ছিলেন কাজী মোতাহারের যোগ্য জীবনসঙ্গী। বৈষয়িক সকল দায়িত্ব একা হাতে সামলে তিনি নির্বিঘেœ জ্ঞানসাধনা করার সুযোগ করে দিয়েছিলেন জগত-সংসারের প্রতি উদাসীন কাজী সাহেবকে। সংস্কৃতিমনা এই দম্পতির চার পুত্র ও সাত কন্যা। সন্তানদের প্রায় সকলেই জীবনের বিভিন্ন ক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠিত হয়েছেন এবং লালন করেছেন শিক্ষা-শিল্প-সাহিত্য-সঙ্গীত-ক্রীড়ার পারিবারিক ঐতিহ্যকে। প্রয়াত কন্যা যোবায়দা মির্যা অবসর গ্রহণের প্রাক্কালে ছিলেন সরকারি ঢাকা কলেজের অধ্যক্ষ, প্রয়াত ওবায়দা সা’দ ময়মনসিংহের মেয়েদের মডেল স্কুলের ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ ছিলেন, তৃতীয় কন্যা খোরশেদা খাতুন প্রয়াত হন বিএ অনার্স পাঠকালে। প্রয়াত তিন পুত্র কাজী মকবুল হোসেন, কাজী ইকবাল হোসেন এবং কাজী নূরুদ্দিন মাহবুব হোসেনের মধ্যে শেষোক্ত জন প্রতিশ্রুতিশীল দাবা ও টেবিল টেনিস খেলোয়াড় এবং সেই সঙ্গে ছিলেন অনুবাদ সাহিত্যে সুপ্রতিষ্ঠিত। অপর পুত্র কাজী আনোয়ার হোসেন জনপ্রিয় গোয়েন্দা কাহিনী ‘মাসুদ রানা’ ও ‘কুয়াশা’ সিরিজের রচয়িতা ও সঙ্গীতশিল্পী। কন্যাদের মধ্যে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের অবসরপ্রাপ্ত অধ্যাপক ড. সন্জিদা খাতুন, ময়মনসিংহ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের অবসরপ্রাপ্ত অধ্যাপক ফাহমিদা খাতুন এবং চিত্রশিল্পী মাহমুদা খাতুন রবীন্দ্রসঙ্গীতের তিন খ্যাতিমান শিল্পী। পড়াশোনা ছাড়াও খেলাধুলা, গান-বাজনা ইত্যাদিতে কাজী মোতাহার হোসেনই ছিলেন সন্তানদের প্রথম ও প্রধান সহায়। ধর্মপ্রাণ মুসলমান হিসেবে কাজী মোতাহার সস্ত্রীক হজ পালন করেন ১৯৬৬ সালে। ১৯৭৫ সালের ৭ জুন ৬৮ বছর বয়সে ঢাকার তৎকালীন পিজি হাসপাতালে (বর্তমান বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয় হাসপাতাল) স্ত্রী সাজেদা খাতুনের মৃত্যুর পর মোতাহার হোসেনের বাকি জীবন কেটেছে অনেকটা নিঃসঙ্গতা ও অসহায়ত্বের মধ্যে।

সন্তানের চোখে কাজী মোতাহার

কাজী মোতাহার হোসেনের কন্যা, সঙ্গীতশিল্পী ফাহমিদা খাতুন বলেন, আমার চারপাশে দেখা সব বাবার থেকে একেবারে আলাদা রকমের ছিলেন আমাদের আব্বু। তাঁর জগৎই ছিল সম্পূর্ণ অন্য ধাঁচের। খাওয়া-দাওয়া, জামা-জুতা কখন কোনটা পরবেন, সবই তদারক করতেন আম্মু। আব্বুর কথা মনে পড়লেই যে ছবিটা ফুটে ওঠে তা হচ্ছে, একজন সৌম্যদর্শন, রাশভারী ভদ্রলোক বৈঠকখানায় বসে নিবিষ্ট মনে দাবা খেলছেন বা বই পড়ছেন। আমরা কেউ গিয়ে যখন বলতাম, খাবার খেতে যেতে বলেছেন আম্মু, তখন মাঝেমধ্যে বলতেন, ‘ওহ্, আমি খাইনি বুঝি? তাই তো কেমন খিদে লাগছিল।’

সংসারের যাবতীয় ভার ছিল আম্মুর ওপর। চড়-চাপড় যা খেয়েছি, তা তাঁরই হাতে। আব্বু যেন এক অতি আদরের মেহমান। যথেষ্ট ভয় পেতাম তাঁকে দেখে, কিন্তু তার পরও লোভ হতো কাছে গিয়ে এটা-ওটা বলে দৃষ্টি আকর্ষণ করে একটু আদর কাড়ার। সেই আশাতেই মাঝেমধ্যে কাছে গিয়ে দাঁড়িয়ে নালিশ করতাম ভাইবোনদের নামেÑ কেউ মেরেছে বা কটু কথা বলেছে, এই আর কি। তাতে যে কেউ কোন শাস্তি পেত তা নয়, তবে আমার উপরি পাওনা হতো। ‘সুম্মা’ (সোনা মা) বলে কাছে টেনে নিয়ে কপালে একটা চুমু খেয়ে বলতেন, ‘কে রে, ওকে মেরেছিস, এদিকে আয় দেখি?’ ব্যস, আর কিছু প্রয়োজন হতো না। মনে হতো জীবনে আর কিছু চাওয়ার নেই যেন।’

তিনি আরও বলেন, ‘রবীন্দ্রনাথের গান, কবিতা ভীষণ পছন্দ করতেন আব্বু। শেষ বয়সে গীতবিতান-এর পাতা উল্টিয়ে আপন মনে মগ্ন হয়ে সুর করে গাইতেন। যে গান জানা নেই, তা-ও গাইতেন নিজেই সুর দিয়ে। একদিন ওভাবে গাইছিলেন নিজের সুরেÑ আমাকে দেখে জানতে চাইলেন, গানটার সুর জানি কি না। গেয়ে শোনানোর পরে বললেন, ‘হ্যাঁ, এই সুরটাও বেশ ভালো।’ নজরুলের ব্যাপারে কিছু বলতে গিয়ে তাঁর চেহারাই যেন পাল্টে যেত। এই প্রিয় বন্ধুর ব্যাপারে তাঁর দুর্বলতাটাও ছিল অনেক বেশি। তিনি নজরুলের গলায় তাঁর গান শুনেছেন, সেই অভিজ্ঞতা তো খুবই ভিন্ন। কারণ, সে গান যখন তাঁর সমস্ত মন-প্রাণ এবং দেহ দিয়ে গাইতেন, সে তো তুলনাহীন হবেই। যখন তিনি চাকরি থেকে অবসর নিলেন, তখন তাঁর বিদায় অনুষ্ঠানে, স্ট্যাটিসটিকস ডিপার্টমেন্টে আমাকে ডাকা হয়েছিল গান গাওয়ার জন্য। সেই দিন ফেরার পথে, রিকশায় বললেন, ‘তোর গানগুলো বড় ভালো লাগল রে।’ তারপর একটু থেমে বিষণœ গলায় বললেন, ‘তোরা কেউ নজরুলের গান শিখলি না, আমার মাঝে মধ্যে এটা নিয়ে খুব আফসোস হয়। নজরুলের নিজের গলায় যে গানগুলো শুনেছি, সেসব বুঝি হারিয়ে গেল। কারও গলায় তো আর তেমন লাগে না।’ শুনে মনটা খারাপ হয়ে গেল। বললাম, ‘আমরা তো সে গান শুনেছি, শেখার সুযোগ পাইনি।’

বাবা সম্পর্কে আরেক কন্যা, সঙ্গীত শিল্পী সন্্জিদা খাতুন বলেন, ‘যে কোন বিষয়ে নিজের মতামত প্রকাশের স্বাধীনতায় বিশ্বাসী ছিলেন আব্বু। তাই সব সময় চাইতেন, আমরা যেন নিজের বিচার-বুদ্ধি দিয়ে ভাল-মন্দ বিচার করতে শিখি। বিভিন্ন জায়গায় আমাকে গান গাইতে যাওয়ার জন্য যখন কেউ এসে আব্বুকে অনুরোধ করতেন অনুমতি দেয়ার জন্য, তিনি তখন আমাকে ডেকে আমার মতটা আগে জানতে চাইতেন। যে জিনিসটা বেশির ভাগ মা-বাবাই করেন না বলে আমার ধারণা।’

প্রতিষ্ঠিত লেখক কাজী আনোয়ার হোসেন তাঁর বাবা সম্পর্কে স্মৃতিচারণ করে বলেন, ‘আব্বুর সব কাজ খুব শৃঙ্খলায়, সময়মতো করার অভ্যাস ছিল। কখনও কোথাও যেতে দু-এক মিনিট দেরি হতেও দেখিনি কোন দিন; বরং কখনও সখনো কোন নেমন্তন্নে একদিন আগেই গিয়ে উপস্থিত হয়ে খুব বিরক্তির সঙ্গে ফিরে এসে বলতেন, ‘ইয়েটিয়ে করে সব ফাঁকিফুঁকি।’ কোন কাজ ফেলে রাখা তাঁর স্বভাবেই ছিল না। কোন মিটিংয়ে যেতে অনেক আগেই তৈরি হয়ে অপেক্ষা করতেন, উদ্যোক্তাদের কেউ এসে নিয়ে যাবেন বলে এবং তাঁরা দেরি করে এলে ভীষণ বিরক্ত হতেন।’

তিনি বলেন, ‘আব্বুর শেখানোর পদ্ধতিটাই ছিল অন্য রকম। টেক্সট বুক বোর্ডের পাঠ্যবই নির্বাচনের জন্য যে বইগুলো পাঠানো হতো তাঁর কাছে, সেগুলো থেকে কতগুলো বই পড়তে দিয়ে পরে আবার জানতে চাইতেনÑ কেমন লাগল, ভাল কি মন্দ এবং কেন ভাল বা মন্দ ইত্যাদি। বানান ভুল বের করতে বলতেন। অনেক শব্দের মানে জানতে চাইতেন, না পারলে ডিকশনারি দেখে নিতে বলতেন। একটা শব্দ দেখতে গিয়ে আরও কতগুলো নতুন শব্দও শেখা হয়ে যেত। এভাবে ডিকশনারি নিয়ে নাড়াচাড়া করাটাও নেশায় দাঁড়িয়ে গেল। এভাবে চাঁদ আর সূর্যের কত নাম রয়েছে, তার একটা তালিকা করে আব্বুকে দেখিয়ে বাহবা পেয়ে ঝোঁকটা আরও বেড়ে গেল। কখন নিজের অজান্তে আব্বু আমার মনের মধ্যে এ ধারণাটা গেঁথে দিয়েছেন, আমি ইচ্ছে করলেই অনেক শক্ত কাজ করতে পারি।’

সংগ্রামী জীবন ও রাজনৈতিক চেতনা

সংস্কৃতিসচেতন একজন আদর্শ বাঙালি ছিলেন কাজী মোতাহার হোসেন। তাঁর জীবন পরিধি বাঙালি সমাজের এক গুরুত্বপূর্ণ সময়কে স্পর্শ করেছে। রাজনৈতিক আন্দোলন ও উত্থান-পতন, সাংস্কৃতিক দ্বন্দ্ব ও বিবর্তন এবং সামাজিক রূপান্তরের তিনি এক অন্তরঙ্গ সাক্ষী। ছিলেন বুদ্ধির মুক্তি-আন্দোলনের অন্যতম পথিকৃৎ। ঢাকার ‘মুসলিম সাহিত্য সমাজ’-এর মুক্তদৃষ্টি ও কল্যাণবুদ্ধির প্রভাব ও প্রেরণা ছিল তাঁর সারাজীবনের পাথেয়। বাংলা ভাষা ও হরফ সম্পর্কে ষড়যন্ত্র কিংবা সাংস্কৃতিক আগ্রাসন, রবীন্দ্র-বর্জন ও বিদূষণ, সরকারের সংবাদপত্র-সংকোচন নীতি এসব অপতৎপরতার বিরুদ্ধে তাঁর প্রতিবাদী ভূমিকার কথা শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করতে হয়। ফ্যাসিবাদ কিংবা সাম্প্রদায়িক দাঙ্গার বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়িয়ে সচেতন ও বিবেকী বুদ্ধিজীবীর কর্তব্য পালন করেছেন তিনি। বাঙালির পর্যায়ক্রমিক মুক্তির আন্দোলনেও তাঁর চেতনাগত অংশগ্রহণ ও নৈতিক সমর্থন ছিল।

বাংলা ভাষাকে পাকিস্তান সরকার অন্যতম রাষ্ট্রভাষার মর্যাদা না দেয়াতে ১৯৪৭ সালের ১৫ সেপ্টেম্বর প্রকাশিত ‘রাষ্ট্রভাষা ও পূর্বপাকিস্তানের ভাষাসমস্যা’ প্রবন্ধে তিনি লিখেছিলেন ‘...ধূমায়িত অসন্তোষ বেশি দিন চাপা থাকতে পারে না। শীঘ্রই তাহলে পূর্ব-পশ্চিমের সম্বন্ধের অবসান হবার আশঙ্কা আছে।’ ড. রফিকুল ইসলাম এ প্রসঙ্গে বেশ কিছু তথ্য দেন। তিনি বলেন, ‘১৯৬১ সালে প্রতিকূল পরিবেশের মধ্যেও কাজী মোতাহার হোসেন রবীন্দ্র-জন্মশতবার্ষিকী পালনে অগ্রণী ভূমিকা পালন করেন। ১৯৬৭ সালে বেতার ও টেলিভিশনে রবীন্দ্রসঙ্গীত প্রচার নিষিদ্ধ করার সরকারী সিদ্ধান্তের তীব্র প্রতিবাদ জানিয়েছিলেন তিনি। পাকিস্তান সাহিত্য সংসদের সভাপতি হিসেবে তিনিই প্রথম বাংলা নববর্ষ উপলক্ষে পহেলা বৈশাখকে সরকারী ছুটির দিন ঘোষণার দাবি জানিয়ে ১৯৫৪ সালের এপ্রিল মাসে সংবাদপত্রে বিবৃতি প্রদান করেন। এই সংগঠনের উদ্যোগে এবং মোতাহার হোসেনের সভাপতিত্বে ঢাকায় প্রথমবারের মতো ম্যাক্সিম গোর্কির মৃত্যুবার্ষিকী উদ্্যাপিত হয়।’

আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পাওয়া যায় ড. মাহবুবুল হকের কাছ থেকে। তিনি জানান, ‘একদিন কলকাতায় শরৎচন্দ্রের সঙ্গে দাবাখেলার এক ফাঁকে তিনি মন্তব্য করেছিলেন ‘শরৎ সাহিত্যে মুসলিম সমাজচিত্র একেবারেই অনুপস্থিত, যদিও মুসলমানরা এ দেশের বিরাট একটা অংশ জুড়ে হিন্দুদের পাশাপাশি অবস্থান করে আসছে।’ এরপর শরৎচন্দ্র লিখলেন তাঁর একমাত্র মুসলিম সমাজচিত্র, বিখ্যাত ছোটগল্প ‘মহেশ’। এছাড়া সাহিত্যকে হিন্দুকরণ বা ইসলামীকরণের বিরুদ্ধে হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করে কাজী মোতাহার বলেছিলেন, ‘...জলকে পানি বলে উল্লেখ করলে সাহিত্যের জাত যাবে নাÑ জাত যাবে যদি জলচৌকিকে পানিচৌকি, পানিপথকে জলপথ, জলযোগকে পানিযোগ, জলপানিকে পানিপানি বা পাণিপ্রার্থীকে যদি জলপ্রার্থী করা হয়।’

ভাষা আন্দোলন ও কাজী মোতাহার

অসাম্প্রদায়িক ধ্যান-ধারণায় বিশ্বাসী এবং সেই আলোকে দেশের শিক্ষা, সাহিত্য ও সংস্কৃতির সুদৃঢ় ভিত গড়ে তোলার জন্য তিনি লেখনী পরিচালনা করেন। বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা করার পক্ষে বিভিন্ন কর্মকা-ের মাধ্যমে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন তিনি। শিক্ষার সর্বস্তরে বাংলা ভাষা চালুর দাবিতে পঞ্চাশ ও ষাটের দশকে পূর্ববাংলায় যে আন্দোলন গড়ে উঠেছিল, তিনি ছিলেন এর একজন দৃঢ় পৃষ্ঠপোষক। বক্তৃতা, বিবৃতি ও প্রবন্ধাদি প্রকাশ করে এসব আন্দোলনে গতিদান করেন। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বাধীন আওয়ামী লীগের ৬ দফাকে কেন্দ্র করে ষাটের দশকে পূর্ববাংলায় বাঙালি জাতিসত্তা বিকাশের যে আন্দোলন সংঘটিত হয় তারও একজন বলিষ্ঠ সমর্থক ছিলেন কাজী মোতাহার।

সুদীর্ঘ বর্ণাঢ্য কর্মময় জীবনে কাজী মোতাহার হোসেন নিজের মধ্যে একজন দেশপ্রাণ বাঙালি, উদারমনা মুসলমান এবং সৎ ও আদর্শবান ব্যক্তিত্বকে লালন করেছেন। মৃত্যুর কিছুদিন আগে কাজী সাহেব বলেছিলেন, ‘জন্মদিন যেমন আনন্দের দিন মৃত্যুদিনও তেমনই আনন্দের দিন। সুতরাং শোক করা উচিত নয়।’ অবশেষে ৮৪ বছর বয়সে মস্তিষ্কে রক্তক্ষরণ হয়ে ১৯৮১ সালের ৯ অক্টোবর শুক্রবার পবিত্র ঈদ-উল-আযহার সকালে ইন্তেকাল করেন সর্বজনশ্রদ্ধেয় মনীষী কাজী মোতাহার হোসেন। অন্তিম ইচ্ছানুযায়ী তাঁকে সমাহিত করা হয় ঢাকার বনানী গোরস্তানে তাঁর স্ত্রীর কবরের পাশে।