১৯ অক্টোবর ২০১৭,   ঢাকা, বাংলাদেশ   শেষ আপডেট পূর্বের ঘন্টায়  
Login   Register        
ADS

মুক্তিযুদ্ধপন্থী জোট ঐক্য ধরে রাখুন


দুঃখের সঙ্গে স্মরণ করি যে, ’৭১-এর ডিসেম্বরে আমরা স্বাধীনতা পেলাম, ১০ জানুয়ারি ’৭২-এ বঙ্গবন্ধু পাকিস্তানের কারাগার থেকে মুক্তি লাভ করে স্বাধীন স্বদেশে ফিরেই নতুন সরকার গঠন করেন। তিনি দ্রুত গতিতে এক কোটি শরণার্থীর পুনর্বাসনসহ ভাঙ্গা দেশ গড়ে তুলছেন, কৃষিখাতকে উন্নত করছেন, এর মধ্যে ’৭৩-এর খরা, ফসলহানি, ’৭৪-এ দুর্ভিক্ষাবস্থা সৃষ্টি করলে তা মোকাবেলা করতে বঙ্গবন্ধু সরকার যখন প্রাণান্ত চেষ্টা চালাচ্ছেন, সে সময় বঙ্গবন্ধুর পাশে বীর মুক্তিযোদ্ধারা এসে দাঁড়াবেন- এটাই ছিল যথোপযুক্ত। যেহেতু সে সময় ছাত্রলীগের এক অংশ জাসদ নামে কর্নেল তাহেরের সঙ্গে এক জোট হয়, অথচ অপরদিকে ’৭১-এর ঘাতক জামায়াত, পাকিস্তান, সিআইএ এবং পাকিস্তানপন্থী সামরিক-বেসামরিক ব্যক্তি, আমলা, রাজনীতিকরা তাদের ’৭১-এর পরাজয়ের প্রতিশোধ নিতে বঙ্গবন্ধু, তাঁর পরিবারের সদস্য এবং তাঁর সরকারের বিরুদ্ধে চরিত্র হননকারী প্রচার-প্রচারণার দ্বারা দ্রুত জনমতকে বঙ্গবন্ধু সরকারবিরোধী করে তুলছিল সেই বাস্তবতার নিরিখে ১৯৭৩-৭৪-এ বঙ্গবন্ধুর সদ্য নতুন রাষ্ট্র গঠনের সময়ে ওই বিভক্তি বাস্তবিকই ছিল দুঃখজনক, অনাকাক্সিক্ষত এবং যুদ্ধাপরাধীদের ষড়যন্ত্র বাস্তবায়নে সহায়ক- এটি জাসদের প্রত্যেক নেতা পরে বুঝেছেন, যখন তাঁরা বয়স ও অভিজ্ঞতার দ্বারা ’৭১-এর ঘাতকদের লক্ষ্য-উদ্দেশ্য উপলব্ধি করেছেন। তখন তাঁরা ওই সময়ের ভূমিকার জন্য দুঃখও প্রকাশ করেছিলেন।

১৯৭৩-৭৪-এর ঘটনাগুলো অবিবেচনাপ্রসূত এবং হঠকারী ছিল তা বলাই বাহুল্য। কিন্তু বর্তমানে এই মুহূর্তে যে ২০১৫ সালটিতে আমরা অবস্থান করছি, আওয়ামী লীগ, জাসদ, ওয়ার্কার্স পার্টি, সাম্যবাদী দল এবং সিপিবিকেও এ সময়ের সম্ভাব্য সবরকম ষড়যন্ত্র সম্পর্কে যে কোন সময়ের চেয়ে সবচেয়ে বেশি সতর্ক ও সজাগ থাকতে হবে। স্মরণ রাখতে হবে, আমরা দীর্ঘ একুশ বছর পর বঙ্গবন্ধু হত্যার বিচার এবং দীর্ঘ চুয়াল্লিশ বছর পর ’৭১-এর ঘাতকদের বিচার করছি। আরও স্মরণ রাখতে হবে, শত্রুরা কখনও এক মুহূর্ত অসতর্ক থাকে না। এক মুহূর্তও তারা ষড়যন্ত্রের কৌশল, পরিকল্পনা করা থেকে বিরত থাকে না।

এই ২০১৫-এ সংঘটিত একের পর এক কতগুলো দেশ ও সমাজ অস্থিতিশীলকারী বর্বরতা কেন, কারা, পরপর সংঘটিত করল- বরং এটিই গভীরভাবে ভাবা দরকার। যারা ঘটনাগুলো ঘটাচ্ছে তাদের অতীত, বর্তমান রাজনৈতিক অবস্থান বিচার করতে হবে।

একই সঙ্গে আমরা আরও কিছু অশনি সঙ্কেত দেখতে পাচ্ছি, যেমন-

১. বিএনপির আগুন-সন্ত্রাসী নেত্রীর লন্ডন যাত্রা, লন্ডনে চিকিৎসা করা, পুত্র ও তাদের পরিবারের সঙ্গে দেখা করা হঠাৎ স্থগিত হলো কেন? আশঙ্কা হয় বিএনপির চিরকালের মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ও আদর্শবিরোধী অবস্থান, সহিংস পন্থায় বঙ্গবন্ধু সরকারকে যেভাবে উৎখাত করা হয়েছিল সেভাবেই বার বার সহিংস হত্যার অপরাজনীতির পরিকল্পক তারেকের সঙ্গে নতুনভাবে শেখ হাসিনার সরকার উৎখাতের পরিকল্পনা ও বাস্তবায়নের কৌশল কি খালেদা উত্থাপিত ‘সমঝোতা’র নামে ভিন্নরূপে দেখা দেবে? এতে বিদেশী রাষ্ট্র, বিশেষত যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপের রাষ্ট্রগুলোর সহায়তা লাভ, দেশীয়, শেখ হাসিনা সরকারবিরোধী ব্যক্তি ও দলগুলোর সহায়তার সদ্ব্যবহার আরও ভিন্নভাবে করা, আইএসআই-এর অর্থ ও বুদ্ধি, নির্দেশ ইত্যাদি খুঁটিনাটি আলোচনা করার উদ্দেশ্যে বাংলাদেশের আজন্ম খলনেত্রী খালেদা জিয়ার লন্ডন যাত্রা স্থগিত করার কারণটি মুক্তিযুদ্ধপন্থী সরকারের জন্য কি নির্দেশ করছে- সে তথ্য ভালভাবে সরকারী জোটকে জানতে হবে। কেননা, ‘আপোসহীন’ খলনেত্রীর কণ্ঠের সুর হঠাৎ ‘সমঝোতা’র মতো নরম হলো কেন?

স্মরণ রাখতে হবে, আমাদের কষ্টে বোনা পাকা ধান বার বার রাক্ষস এসে তছনছ করবে, ঘুঘু এসে খেয়ে যাবে, তা আমরা, মুক্তিযুদ্ধের প্রহরীরা আর হতে দিতে পারি না।

২. লন্ডনে তারেক রহমান অস্থায়ী ভিসায় আছে, সে কোন সমস্যায় রয়েছে কি? লন্ডনে ওদের প্রধানমন্ত্রী ক্যামেরনের অভিযোগ অনুযায়ী ‘লন্ডন হয়ে উঠেছে দুনিয়ার সব দেশের সন্ত্রাসীদের অভয়ারণ্য’। সত্যিই তো আমাদের দেশের ’৭১-এর ঘাতকদের একটি দল লন্ডনের স্থায়ী বাসিন্দা হয়েছে। এদের সঙ্গে তো বটেই, এমন কি ভারতীয় জঙ্গী-সন্ত্রাসী দাউদ ইব্রাহিমের সঙ্গেও তারেকের রয়েছে রমরমা সম্পর্ক। খালেদা, তারেক ও আইএসআই, ’৭১-এর ঘাতক- এরা কিন্তু ‘স্বাভাবিক মিত্র’, যাকে বলে ন্যাচারাল এ্যালাই। সেজন্যই বেশি সতর্কতা দরকার মুক্তিযুদ্ধপন্থী জোটের। সুযোগের সদ্ব্যবহার করতে না পারলে সুযোগ তো বার বার আসবে না। বেড়ালের গলায় শিকেও বার বার ছেঁড়ে না।

আওয়ামী লীগারদের স্মরণ রাখতে হবে, অন্য মুক্তিযুদ্ধপন্থীদের সমর্থন-সহযোগিতা লাভ না করলে কিন্তু ওই অতবড় দানব-দানবী যারা মুহূর্তে দেশকে বিরান করে দিতে পারে, যাদের মনে নেই এই স্বাধীন দেশ, বাঙালী জাতি, বাংলা ভাষা ও ধর্মনিরপেক্ষ বাঙালী সংস্কৃতির প্রতি বিন্দুমাত্র মমতা বা একাত্মতাবোধ- তাদের মোকাবেলায় ঐক্যের কোন বিকল্প নেই। সাবধান হন, তারা যে কোন মুহূর্তে সরকারের জোটে বিন্দুমাত্র দুর্বলতা, বিভক্তি দেখামাত্র হামলা চালাতে কোন সময় নেবে না। সেজন্য বলতে চাই, আসলে আমরা, মুক্তিযুদ্ধের আদর্শপন্থীদের জন্য যতদিন ওই খলনেত্রী, ওর পুত্র খলনেতা বেঁচে থাকবে, ততদিন কোনরকম বিভক্তি তো নয়ই, এমনকি বিতর্কও চলতে দেবেন না, যে বিতর্ক দিনশেষে ওই শত্রুদেরই সুবিধা দেবে।

১৯৭২-৭৩-এ বঙ্গবন্ধু ছিলেন স্বাধীন দেশের স্থপতি, প্রেসিডেন্ট, যে দেশটির স্বাধীনতার বিরোধী শক্তিকে মোকাবেলা করে দেশ পুনর্গঠনে অতি ব্যস্ত একজন নেতা। আমার বিশ্বাস- বাকশালের যথার্থ লক্ষ্য এবং কারণ জাতিকে বুঝিয়ে বলবার দায়িত্ব ছিল আওয়ামী লীগসহ সব মুক্তিযুদ্ধপন্থী দলের তরুণ নেতা, নেত্রীর, বঙ্গবন্ধুর নয়। তাঁরা কেউ এ কাজ করেননি, বরং তাজউদ্দীন সাহেব বাকশালবিরোধী ছিলেন। সংবাদপত্র বন্ধ হওয়ায় সাংবাদিকরাও এর বিরোধী হয়েছিলেন। এ সময়ে বঙ্গবন্ধু প্রকৃত অর্থে নিঃসঙ্গ ছিলেন। এ কথা বলাই যায়, ’৭৫-এর শুরুতে ঘাতক দল, বাংলাদেশবিরোধী চক্র তাদের শেষ আঘাত হানার জন্য জিয়ার সম্মতি পেয়ে সব প্রস্তুতি শেষ করে ফেলেছে। অর্থাৎ, বঙ্গবন্ধুকে হত্যার জন্য আক্রমণ করা হতো। তারপরও একটা কথা বার বার মনে উদিত হয়, সে সময়ের সেনাপ্রধান মেজর জেনারেল শফিউল্লাহ্ কি এ হত্যা পরিকল্পনা জানতেন না? যখন র’ থেকে বঙ্গবন্ধুকে সতর্ক করা হয়েছিল তখন কি সেনাপ্রধানকে এ তথ্য জানানো হয়নি? যদি না জেনে থাকেন তবে ১৫ আগস্ট ভোরে বঙ্গবন্ধুর ফোন পেয়ে যে দুজনের বঙ্গবন্ধুকে রক্ষা করার দায়িত্ব ছিল তারা কি সেনাপ্রধান ও কর্নেল শাফায়েত জামিল নন? তারা প্লাটুন নিয়ে, কামান নিয়ে, বিমান নিয়ে এগিয়ে আসার ব্যবস্থা নিতে পারতেন এবং খুনীরা এমন জোরালো আক্রমণের মধ্যেও যদি বঙ্গবন্ধুকে হত্যা করে ফেলত তবু তো নেতৃত্ব দেয়ার জন্য অন্যেরা বেঁচে যেত, ৩ নবেম্বর আওয়ামী লীগের চার নেতা মুক্তি পেয়ে বঙ্গবন্ধুর অবর্তমানে মুক্তিযুদ্ধের সরকারের ধারাবাহিকতা রক্ষা করতে পারতেন। অবশ্য আজ সে সময় যা ঘটেনি তা ভেবে লাভ নেই।

এখন ২০১৫-এর এই চরম বর্বরতারকালে যখন শিশু হত্যা, বালিকা ধর্ষণ, গণধর্ষণ, ছাত্রী ধর্ষণ, হিন্দু-আদিবাসীদের ভূমি দখল, তরুণ হত্যা, ব্লগার হত্যা অস্বাভাবিকহারে সংঘটিত হচ্ছে- এই সময়টিকে অস্থিতিশীল পরিস্থিতির দিক থেকে বিবেচনা করলে সেই ১৯৭৩-৭৪ ও ’৭৫-এর সঙ্গে মিল কেন যেন খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে। কেন এখন এমন অস্থিতিশীলতা দেখা যাচ্ছে? অথচ খলনেত্রীর গলার সুর নরম কেন? এটি বিবেচনা করতে হবে মুক্তিযুদ্ধের আদর্শে বিশ্বাসী সব দলের নেতাকর্মীকে। বিশেষ করে খেয়াল রাখতে হবে আওয়ামী লীগে যেন কোন ২০০১-২০০৬, ২০১৩, ২০১৪, ২০১৫-তে সংঘটিত মুক্তিযুদ্ধপন্থী তরুণদের হত্যাকারী, মুক্তিযোদ্ধা হত্যাকারী, ধর্ষক, রাজাকার, জামায়াত-শিবিরের সন্ত্রাসী, জঙ্গী-জেহাদি হিসেবে পরিচিত কেউ অনুপ্রবেশ করতে না পারে। যদিও তথ্যসূত্রে খুনীদের আওয়ামী লীগে যোগদানের খবর প্রকাশ হচ্ছে। তারেকের ছাত্রদলের প্রতি দেয়া ১৯৯৭-এর সেই উপদেশ সবসময় স্মরণে রাখবেন- ‘তোমাদের আর ছাত্রদল করতে হবে না, এখন সবাই ছাত্রলীগ হয়ে যাও, তাহলে পরে সময় বুঝে ছাত্রলীগকে ধ্বংস করতে পারবে।’ এর চাইতে শত্রুর বিনাশ সাধনের আর কোন বড় পন্থা হতে পারে কি? আওয়ামী লীগ খুনী ও চাটার দলকে ঝেড়ে ফেলতে পারবে তো? পারতে কিন্তু হবেই।

যাই হোক, শেখ সেলিমসহ আওয়ামী লীগ নেতৃত্বকে অনুরোধ করব, শত্রু“ঘাড়ের কাছে নিঃশ্বাস ফেলছে, কিন্তু ইনু, মেনন ভাই বা জাসদ এককালে ভুল করে এখন তো তারা সে ভুল শুধরে নিয়েছেন। মনে রাখবেন, তারা কিন্তু কখনই আপনাদের, আমাদের শত্রু“নন। ইনু যথার্থই বলেছেন- এখন সময় এসেছে খলনেত্রী ও খলনেতাকে সর্বশেষ কিন্তু কঠিনতম শেষ আঘাত হেনে এই দেশবিরোধী অপরাজনীতির জন্মদাতাদের চির অবসান ঘটানোর। এবং সে সময়টি এখুনি। কোন ভুল করে নিজেদের মধ্যে বিভেদ সৃষ্টি করবেন না, যেটি ওরা কায়মনোবাক্যে কামনা করছে। জানবেন- ইতিহাস কোন জাতিকে বার বার তার শত্রু সংহারের জন্য সুযোগ তৈরি করে দেয় না। সুতরাং, বজ্র কঠিন ঐক্যবদ্ধ থেকে দেশ ও জাতির শত্রুদের সংহার করুন। বিচার শেষ হওয়া যুদ্ধাপরাধীদের দণ্ড কার্যকর করুন, অন্যদের বিচার শেষ করে দণ্ড কার্যকর করুন। কোন দ্বিধা, কোন ভুল, দয়া আর করবেন না এবং শত্রুদের আবারও বলীয়ান হওয়ার হাতিয়ার তুলে দিয়ে ওদের পক্ষে সুযোগ তৈরি করবেন না।

আবার বলছি, প্রধানমন্ত্রী, এই মুহূর্তে শাহজালাল বিশ্ববিদালয়য়ের মুক্তযুদ্ধপন্থী শিক্ষকদের ওপর ছাত্রলীগের একটি দল হামলা করেছে। এ কথা দ্ব্যর্থহীনভাবে বলা যায়- যারা নিজ শিক্ষকদের ওপর হামলা করতে পারে তারা যাই হোক শিক্ষার্থী হতে পারে না, হওয়ার উপযুক্ত নয়। তারা গু-া-সন্ত্রাসী এবং ছাত্রদল-শিবিরের অনুগত। ওদের বহিষ্কার করুন। বিশ্ববিদ্যালয়, কলেজকে এসব আত্মঘাতী গু-াদের হাত থেকে রক্ষা করুন এবং দলকেও রক্ষা করুন। এরা তো তারেকের নির্দেশ মেনেছে। তাই নয় কি?

এ প্রসঙ্গে যুগল হাশমীকে একটি অভিনন্দন জানাতে চাই, কেননা দীর্ঘদিন ধরে আমি অপেক্ষায় ছিলাম শেখ কামাল, ব্যাংক ডাকাতি, ডালিম ও তার স্ত্রী ইত্যাদি নিয়ে যেসব বানোয়াট প্রচারণা সে সময় চলেছিল, কেউ কোন একদিন সেসব প্রচারণার পেছনের প্রকৃত ঘটনা জাতিকে জানাবে। মনে মনে আমি এ সত্য জানবার অপেক্ষায় ছিলাম। এ লেখাটি আমার রাজনৈতিক সচেতনতাকে সমৃদ্ধ করেছে। এই প্রকৃত সত্যের উদ্ঘাটন বড্ড জরুরী ছিল। সে সময়ের চরিত্র হননের এ প্রসঙ্গগুলো নিয়ে আরও লেখালেখির প্রয়োজন রয়েছে ইতিহাসের ছাই থেকে প্রকৃত সত্যকে খুঁজে পাওয়ার জন্য।

লেখক : শিক্ষাবিদ, গবেষক