২৪ অক্টোবর ২০১৭,   ঢাকা, বাংলাদেশ   শেষ আপডেট পূর্বের ঘন্টায়  
Login   Register        
ADS

পরিকল্পনা কমিশনের মূল্যায়ন ॥ স্বস্তিতে সব সূচক


হামিদ-উজ-জামান মামুন ॥ দেশের অর্থনীতি সুসময় পার করছে। অধিকাংশ সূচকই ভাল অবস্থানে। তাছাড়া সামাজিক ক্ষেত্রেও অর্জন অনেক। গত জুন মাস পর্যন্ত দেশের আর্থ-সামাজিক অগ্রগতি মূল্যায়ন করে এমনই তথ্য দিয়েছে পরিকল্পনা কমিশনের সাধারণ অর্থনীতি বিভাগ (জিইডি)। প্রতিবেদনে সংস্থাটি বলেছে বিগত ছয় অর্থবছরে মোট দেশজ উৎপাদন, রফতানি আয়, কর্মসংস্থান, রেমিটেন্স বৃদ্ধি ও মূল্যস্ফীতি হ্রাস এবং সামাজিক খাতের দারিদ্র্য নিরসন, খাদ্যে স্বয়ংসম্পন্নতা অর্জন, শিক্ষা, স্বাস্থ্যসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে যে সাফল্য এসেছে তা অভূতপূর্ব। সঙ্কটের জাল ছিন্ন করে বাংলাদেশ এখন বিশ্বের নিম্ন-মধ্য আয়ের দেশের তালিকায় স্থান করে নিয়েছে।

এ বিষয়ে জিইডির সদস্য (সিনিয়র সচিব) ড. শামসুল আলম জনকণ্ঠকে বলেন, সরকার দায়িত্ব গ্রহণের পর থেকে ধারাবাহিকভাবে উন্নয়ন বাজেটে সরকারী বিনিয়োগ বৃদ্ধি করছে। ২০০৫-০৬ অর্থবছরে উন্নয়ন বাজেট ছিল ২৪ হাজার ৫০০ কোটি টাকা, ২০১৫-১৬ অর্থবছরে এসে বৃদ্ধি পেয়ে দাঁড়িয়েছে ৯৭ হাজার কোটি টাকা। এটি টাকার অংকে এযাবতকালের সর্ববৃহৎ সরকারী বিনিয়োগ পরিকল্পনা। তাছাড়া সরকার দায়িত্ব গ্রহণের পর থেকেই ষষ্ঠ পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করছে, বর্তমানে সপ্তম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনা চূড়ান্ত পর্যায়ে রয়েছে। তাছাড়া বিভিন্ন ক্ষেত্রে ব্যাপকভিত্তিক পরিকল্পনা নেয়া হয়েছে এবং সেগুলো বাস্তবায়ন করা হচ্ছে। ফলে এসবের প্রভাব অর্থনীতিতে পড়েছে।

‘সাধারণ অর্থনীতি বিভাগের আর্থ-সামাজিক উন্নয়ন ॥ নিম্ন-মধ্য আয়ের দেশে উত্তরণের অনবদ্য সাফল্যগাথা’ শীর্ষক এ প্রতিবেদনে বলা হয়েছে দেশজ আয় ও প্রবৃদ্ধি অর্জনে অতীতের সব রেকর্ড ভঙ্গ হয়েছে। ২০০৫-০৬ অর্থবছরে মোট দেশজ উৎপাদন (জিডিপি) ছিল ৭১ দশমিক আট বিলিয়ন ডলার এবং ২০০৮-০৯ অর্থবছরে সেটি হয় ১০২ দশমিক পাঁচ বিলিয়ন ডলার, যা ২০১৪-১৫ অর্থবছরে বৃদ্ধি পেয়ে হয়েছে ১৯৪ দশমিক ৯৮ (প্রাক্কলিত) বিলিয়ন মার্কিন ডলার। বর্তমান সরকার দায়িত্ব গ্রহণের সময় প্রবৃদ্ধি ছিল পাঁচ দশমিক এক শতাংশ, যা ২০১৪-১৫ অর্থবছরে হয়েছে ছয় দশমিক ৫১ শতাংশ। গত ছয় অর্থবছরে প্রতিটিতেই বাংলাদেশ ছয় শতাংশের উপরে প্রবৃদ্ধি বজায় রেখেছে। গত অর্থবছরের গড় প্রবৃদ্ধি ছিল ছয় দশমিক ১৮ শতাংশ। দেশের ইতিহাসে এ ধরনের ঘটনা বিরল।

রফতানি আয়ের ক্ষেত্রে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে ২০০৫-০৬ অর্থবছরে রফতানি আয় ছিল ১০ দশমিক ৫ বিলিয়ন মার্কিন ডলার। সরকার দায়িত্ব নেয়ার পর ২০০৮-০৯ অর্থবছরে আয় হয় ১৫ দশমিক ৬ বিলিয়ন ডলার। সর্বশেষ গত অর্থবছরে অর্থাৎ চলতি বছরের জুন মাস পর্যন্ত রফতানি আয় তিনগুণ বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৩১ দশমিক ২ বিলিয়ন মার্কিন ডলারে। এটি একটি অন্যতম অর্জন।

রেমিটেন্স আয়ের ক্ষেত্রে বলা হয়েছে, ২০০৫-০৬ অর্থবছরে রেমিটেন্স আয় ছিল চার দশমিক আট বিলিয়ন মার্কিন ডলার, সেটি ২০০৯-১০ অর্থবছরে দশ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের মাইলস্টোন অতিক্রম করেছে। সেই ধারাবাহিকতা অব্যাহত রয়েছে। চলতি ২০১৫-১৬ অর্থবছরে রেমিটেন্স আয়ের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে ১৫ দশমিক ৩ বিলিয়ন মার্কিন ডলার।

মূল্যস্ফীতির ক্ষেত্রে দেখা গেছে, আয়ত্তে রয়েছে মূল্যস্ফীতি। ফলে স্বস্তিতে সাধারণ মানুষ। গত এক বছরে অর্থাৎ ২০১৪ সালের জুন মাস থেকে ২০১৫ সালের জুন মাস পর্যন্ত দেশে গড় মূল্যস্ফীতির হার দাঁড়িয়েছে ৬ দশমিক ৪১ শতাংশ। তার আগের বছর গড় মূল্যস্ফীতি ছিল ৭ দশমিক ৩৫ শতাংশ। তবে পয়েন্ট টু পয়েন্টে ভিত্তিতে গত মে মাসের তুলনায় জুন মাসে সামান্য বেড়েছে মূল্যস্ফীতির হার। গত অর্থবছরে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে থাকার কারণ হিসেবে জানা গেছে আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেল, শিল্পের কাঁচামাল, মূলধনী যন্ত্রপাতি, পেট্রোলিয়াম জাতীয় পদার্থসহ সকল পণ্যের দাম কমে গেছে। এ জন্য দেশেও মূল্যস্ফীতি কমেছে। আন্তর্জাতিক বাজারে পণ্যমূল্য কমার পাশাপাশি আমাদের দেশে টাকার মান স্থিতিশীল রয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের মুদ্রানীতি মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে যথেষ্ট গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর হিসাব মতে, গত জুন মাসে সার্বিক মূল্যস্ফীতি দাঁড়িয়েছে পয়েন্ট টু পয়েন্টে ছয় দশমিক ২৫ শতাংশে, যা তার আগের মাসে ছিল ছয় দশমিক ১৯ শতাংশ। খাদ্যপণ্যের মূল্যেস্ফীতি হয়েছে ছয় দশমিক ৩২ শতাংশে, যা তার আগের মাসে ছিল ছয় দশমিক ২৩ শতাংশ। খাদ্যবহির্ভূত পণ্যের মূল্যস্ফীতি হয়েছে ছয় দশমিক ১৫ শতাংশে, যা তার আগের মাসে ছিল ছয় দশমিক ১৪ শতাংশ।

কর্মসংস্থানের ক্ষেত্রে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বিশ্ব মন্দা এবং বাংলাদেশের অন্যতম শ্রমবাজার মধ্যপ্রাচ্য ও উত্তর আফ্রিকার রাজনৈতিক অস্থিরতা সত্ত্বেও সরকারের ঐকান্তিক প্রয়াসের ফলে অর্থবছর ২০১১ থেকে অর্থবছর ২০১৫ সময়ের মধ্যে ২০ লাখ ৮৮ হাজারেরও বেশি শ্রমিক বিদেশে যেতে পেরেছে। প্রতি এক শতাংশ জিডিপি প্রবৃদ্ধি হলে আড়াই লাখ দেশীয় কর্মসংস্থান বৃদ্ধি হয়, এ হিসাবের ওপর ভিত্তি করে অর্থবছর ১১ থেকে অর্থবছর ১৫ এর মধ্যে দেশে ও বিদেশে মিলে প্রায় ১ কোটির বেশি কর্মসংস্থান হয়েছে। এত কর্মসংস্থান অতীতের আর কোন সময়ে হয়নি।

সামজিক সূচকের মধ্যে অন্যতম দারিদ্র্য নিরসনের ক্ষেত্রে বলা হয়েছে দারিদ্র্য নিরসন সরকারের একটি অন্যতম সাফল্য ভিজিডি, ভিজিএফ, জিআর, ওএমএস কর্মসূচী, টেস্ট রিলিফ, কাবিখা, ফেয়ার প্রাইস কার্ড ইত্যাদি কর্মসূচীর কারণে দেশের দারিদ্র্য কমেছে। ২০০৫ সালে দারিদ্রের হার ছিল ৪০ শতাংশ, যা ২০১৫ সালে কমে দাঁড়িয়েছে ২৪ দশমিক ৮ শতাংশে (প্রাক্কলিত)।

খাদ্যে স্বয়ংসম্পন্ন অর্জনের ক্ষেত্রে বলা হয়েছে, ২০০৫-০৬ অর্থবছরে দেশে চালের উৎপাদন হয় ২৬ দশমিক ৫ মিলিয়ন টন। ২০১৪-১৫ অর্থবছরে উৎপাদন হয়েছে ৩৪ দশমিক ৪ লাখ মেট্রিক টন, যা বাংলাদেশের ইতিহাসে সর্বোচ্চ। কৃষিক্ষেত্রে এ সাফল্য এসেছে কৃষি উপকরণে বিপুল ভর্তুকি ও নানা ধরনের প্রণোদনা ব্যবস্থা করা, প্রায় এক কোটি ৪৪ লাখ কৃষি উপকরণ সহায়তা কার্ড বিতরণ, গবেষণায় ব্যয় বৃদ্ধি ইত্যাদি নানা কারণে। বর্তমানে শ্রীলঙ্কায় বাংলাদেশ ২৫ হাজার টন চাল রফতানি করেছে। খাদ্য ঘাটতির দেশ থেকে খাদ্য রফতানির দেশে পরিণত হয়েছে। খাদ্য মজুদের ক্ষমতা ১৪ দশমিক ছয় লাখ টন থেকে বেড়ে ২০ লাখ টনে উন্নীত করা হয়েছে।

মানবসম্পদ উন্নয়ন ও শিক্ষা খাতে তাৎপর্যপূর্ণ অগ্রগতি অর্জিত হয়েছে। এবারই প্রথম কেবল নতুন শিক্ষানীতি প্রণয়নই নয়, তার বাস্তবায়নও করা হচ্ছে। প্রাথমিক স্কুলের শতভাগ ভর্তির লক্ষ্যমাত্রা প্রায় অর্জিত হয়েছে। শিক্ষার গুণগত উৎকর্ষ সাধনে প্রাথমিক ও নিম্ন মাধ্যমিক স্তরে পাবলিক পরীক্ষা পদ্ধতি চালু করা হয়েছে। গত পাঁচ বছর ধরে স্কুল ও মাদ্রাসা শিক্ষার্থীদের প্রতিবছর ৩১ কোটির অধিক পাঠ্যবই সময়মতো দেয়া হয়েছে। শিক্ষাক্ষেত্রে এটি অবিস্মরণীয় সাফল্য।

ডিজিটাল বাংলাদেশ গড়ে তোলার লক্ষ্যও কার্যত অর্জিত হয়েছে বলে প্রতিবেদন উল্লেখ করা হয়েছে। দেশে বর্তমানে ১২ কোট ৬৮ লাখের বেশি মানুষ মোবাইল ফোন ব্যবহার করছে। ইন্টারনেট গ্রাহক সংখ্যাও চার কোটি ৮০ লাখ ছাড়িয়েছে। ইউনিয়ন পরিষদ, সিটি কর্পোরেশন ও পৌরসভার ওয়ার্ডসমূহে বর্তমানে মোট পাঁচ হাজার ২৭৫টি ডিজিটাল সেন্টার কাজ করছে, যা থেকে গড়ে ৪০ লাখ মানুষ সেবা গ্রহণ করছে। সর্বস্তরের মানুষের কাছে তথ্য পৌঁছে দিতে ২৫ হাজার অফিসের পোর্টাল নিয়ে প্রস্তুতকৃত বাংলাদেশের জাতীয় তথ্য বাতায়ন বিশ্বের সর্ববৃহৎ তথ্য পোর্টাল হিসেবে স্বীকৃতি পেয়েছে। তথ্য অধিকার আইন ও তথ্য কমিশনও গঠন করা হয়েছে।

সহস্রাব্দ উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা (এমডিজি) অর্জনের ক্ষেত্রে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, আর্থ-সামাজিক উন্নয়নে এমডিজির লক্ষ্য অর্জনে বাংলাদেশের অগ্রগতি বিশ্ব পরিম-লে ব্যাপকভাবে আলোচিত হয়েছে। প্রাথমিক শিক্ষায় প্রকৃত ভর্তির হার, প্রাথমিক ও মাধ্যমিক শিক্ষায় জেন্ডার সমতা, চরম দারিদ্র্য ও ক্ষুধা নির্মূল এর লক্ষ্য অর্জিত হয়েছে। পাঁচ বছরের কম বয়সী শিশু মৃত্যুর হার কমানো ও মাতৃস্বাস্থ্যের উন্নয়নে বাংলাদেশের অর্জন বিশ্বব্যাপী স্বীকৃত। ইতোমধ্যেই অনেক ক্ষেত্রে পুরস্কারও লাভ করেছে বাংলাদেশ।

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সরকারের গৃহীত সহায়ক নীতি ও উদ্যোগের ফলে নারীর ক্ষমতায়ন বেড়েছে। লিঙ্গ বৈষম্য হ্রাসে দক্ষিণ এশিয়াতে বাংলাদেশ বর্তমানে শীর্ষ অবস্থানে রয়েছে। বিশ্ব অর্থনীতি ফোরামের দি গ্লোবাল জেন্ডার গ্যাপ রিপোর্ট ২০১৪ এ দেখা গেছে বিশ্বের ১৪২টি দেশের মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান ৬৮তম, যেখানে ২০০৬ সালে ১১৫টি দেশের মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান ছিল ৯১তম। লিঙ্গ বৈষম্য সূচকে দক্ষিণ এশিয়ার দেশ শ্রীলঙ্কা, ভারত ও পাকিস্তানের অবস্থান বাংলাদেশের অনেক পেছনে (যথাক্রমে- ৭৯, ১১৪ ও ১৪১)।