মেঘলা, তাপমাত্রা ৩১.১ °C
 
২০ সেপ্টেম্বর ২০১৭, ৫ আশ্বিন ১৪২৪, বুধবার, ঢাকা, বাংলাদেশ
সর্বশেষ

এবার ইতিবাচক রাজনীতির কৌশল খালেদার

প্রকাশিত : ৪ সেপ্টেম্বর ২০১৫

শরীফুল ইসলাম ॥ নেতিবাচক টানা আন্দোলনের বদনাম ঘোচাতে ইতিবাচক রাজনীতির কথা বলাসহ বিভিন্নভাবে জনদৃষ্টি আকর্ষণ করার কৌশল নিয়েছেন বিএনপি চেয়ারপার্সন খালেদা জিয়া। এ জন্যই তিনি আগের মতো সরকারকে আন্দোলনের হুমকি না দিয়ে ইতিবাচক আবেদনের মাধ্যমে পরবর্তী নির্বাচনের সুষ্ঠু পরিবেশ নিশ্চিত করার পথে অগ্রসর হচ্ছেন। উল্লেখ্য, টানা আন্দোলন কর্মসূচী ব্যর্থ হওয়ার পর থেকেই খালেদা জিয়াসহ বিএনপির সিনিয়র নেতারা ভিন্ন সুরে কথা বলতে শুরু করেন। আন্দোলন করে বর্তমান সরকারের পতন ঘটানো সম্ভব নয় বুঝতে পেরেই রাজনীতিতে কিছুটা অবস্থান পরিবর্তন করার চেষ্টা শুরু করেন তারা। অবশ্য বিএনপির দেশী-বিদেশী বন্ধুরাও এ কৌশল নেয়ার পক্ষে মত দিয়েছেন। এ জন্যই ১ সেপ্টেম্বর বিএনপির প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর আলোচনা সভায় সভাপতির বক্তব্যে দলের চেয়ারপার্সন খালেদা জিয়া প্রধানমন্ত্রীকে উদ্দেশ করে বলেছেন, আমরা কাউকে গালাগাল, হানাহানিতে বিশ্বাস করি না। আমরা ক্ষমতায় যাওয়ার জন্য রাজনীতি করি না। তাই আসুন সকল ভেদাভেদ ভুলে জাতীয় ঐক্য গড়ে তুলি। আসুন জাতীয় ঐক্যের মাধ্যমে উন্নয়নের রাজনীতি করি। যে কোন নামেই হোক নিরপেক্ষ সরকারের অধীনে নির্বাচনের ব্যবস্থা করুন। আমরা ক্ষমতায় গেলেও প্রতিহিংসা ও প্রতিশোধের রাজনীতি করব না।

এদিকে বিএনপি চেয়ারপার্সন খালেদা জিয়ার এ বক্তব্যকে ইতিবাচক হিসেবে নিয়েছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকরাও। এ বিষয়ে মন্তব্য করতে গিয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক ভিসি অধ্যাপক এমাজউদ্দিন আহমেদ বলেছেন, দেশের মানুষ আর হানাহানি দেখতে চায় না। তাই বিএনপি চেয়ারপার্সন খালেদা জিয়া জাতীয় ঐক্যের রাজনীতির জন্য প্রধানমন্ত্রীর কাছে যে আবেদন রেখেছেন, তা ইতিবাচক। প্রধানমন্ত্রীসহ বিভিন্ন দলের শীর্ষ পর্যায়ের নেতারা যদি এ আহ্বানে সাড়া দেন তাহলে দেশের জন্য মঙ্গল বয়ে আনবে।

গ্যাস-বিদ্যুতের মূল্যবৃদ্ধির প্রতিবাদে ২ সেপ্টেম্বর বিকেলে বিএনপি জোটের পক্ষ থেকে ৫ সেপ্টেম্বর সারাদেশে বিক্ষোভ কর্মসূচী পালনের ঘোষণা দেয়া হয়। কিন্তু ওই দিন জন্মাষ্টমী হওয়ায় বিএনপির কর্মসূচী নিয়ে সমালোচনা ওঠায় রাতেই বিএনপি চেয়ারপার্সন খালেদা জিয়া কর্মসূচী একদিন পিছিয়ে ৬ সেপ্টেম্বর করার সিদ্ধান্ত নেন। এটি একটি ইতিবাচক সিদ্ধান্ত বলে অনেকেই মনে করছেন।

বড় কোন ইস্যু সৃষ্টি না হলে সরকারবিরোধী আন্দোলনে যাবে না বিএনপি। তবে যদি এমন কোন ইস্যু সামনে এসে যায় যে ইস্যুতে কোন কর্মসূচী না দিলে দলের অস্তিত্ব হুমকির মুখে পড়বে তখন মৃদু আন্দোলন কর্মসূচী পালনের পাশাপাশি শান্তিপূর্ণভাবে দলীয় বিভিন্ন কর্মসূচী পালন করবে। আর এ কর্মসূচী পালনে বাইরে থেকে দলের থিংকট্যাংক হিসেবে বুদ্ধিজীবীরাও সহযোগিতা করবেন।

সূত্রমতে, ইতিবাচক কর্মসূচীর অংশ হিসেবে সম্প্রতি ঘূর্ণিঝড়ের প্রভাবে বন্যাকবলিত এলাকায় ত্রাণসামগ্রী বিতরণ করেছে বিএনপি। কেন্দ্রীয়ভাবে ঢাকা থেকে দলের একটি টিম পাঠানোর পাশাপাশি খালেদা জিয়ার নির্দেশে বন্যাকবলিত এলাকার স্থানীয় বিএনপি নেতাকর্মীরাও এই ত্রাণ তৎপরতায় অংশ নিয়েছেন। এই কার্যক্রমের মাধ্যমে কিছুটা হলেও মানুষের প্রশংসা কুড়াতে সক্ষম হয় দলটি।

এর আগে ৩১ জুলাই ভারতের সঙ্গে ছিটমহল বিনিময়ের পর যারা দেশের নতুন নাগরিক হন তাদের স্বাগত জানিয়ে আরেকটি ইতিবাচক কাজ করেছে বিএনপি। নতুন নাগরিকদের স্বাগত জানানোর পাশাপাশি ভারত সরকারের প্রতিও কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেছে দলটি। এ বিষয়টিকেও অনেকেই ইতিবাচক হিসেবে দেখেছেন। এ ছাড়া শীঘ্রই বিএনপি চেয়ারপার্সন খালেদা জিয়ার লন্ডন সফরে যাওয়ার কথা রয়েছে। মূলত লন্ডনপ্রবাসী ছেলে তারেক রহমান ও তার স্ত্রী-কন্যার সঙ্গে সাক্ষাত করতে এক সপ্তাহের জন্য তিনি লন্ডন যাচ্ছেন। তাদের সঙ্গে একান্তে সময় কাটানোর পাশাপাশি বিএনপির ভবিষ্যত কর্মসূচী নিয়ে ছেলে তারেকের সঙ্গে বিস্তারিত আলোচনা করবেন। এ ছাড়া সে দেশের সরকারী ও বেসরকারী দলের নেতাদের সঙ্গে সাক্ষাত করে দেশের পরবর্তী নির্বাচন যাতে নিরপেক্ষভাবে হয় সে জন্য সহায়তা চাইবেন। লন্ডন সফরের পর তিনি আরও কয়েকটি দেশ সফর করবেন।

বিএনপি যে ইতিবাচক কর্মকা-ের মাধ্যমে জনদৃষ্টি আকর্ষণ করতে চায় তা দলটির মুখপাত্র ড. আসাদুজ্জামান রিপনসহ সিনিয়র নেতাদের সরকারী দলের কঠোর সমালোচনা না করে কোমল সুরে কথা বলা থেকেই বোঝা যাচ্ছে। গণতান্ত্রিক রাজনীতিতে এটা নিঃসন্দেহে ইতিবাচক। এতে একদিকে যেমন সরকারী দলের সঙ্গে কোন কোন বিষয়ে সমঝোতার চেষ্টা করা সম্ভব হবে, অপরদিকে জনগণ বিষয়টিকে ভালভাবে নেবে। এতে পরবর্তী নির্বাচনের আগে দুই দলের মধ্যে পারষ্পরিক সম্পর্ক উন্নয়নেরও সুযোগ সৃষ্টি হবে। আর যদি সরকারী দল আওয়ামী লীগ বিএনপির সংলাপের আহ্বানে সাড়া দেয় তাহলে অবশ্যই রাজনীতিতে ইতিবাচক ফল বয়ে আনবে বলে অভিজ্ঞমহল মনে করছেন।

তত্ত্বাবধায়ক সরকার ছাড়া নির্বাচনে যাব নাÑ এক সময় এমন দাবিতে বিএনপি অনড় থাকলেও এখন খালেদা জিয়াসহ দলের নেতারা বলছেনÑ যে কোন পদ্ধতির সরকারের অধীনে নিরপেক্ষ নির্বাচনের আশ্বাস পেলেই তারা নির্বাচনে যাবে। দলের এ অবস্থান পরিবর্তনকে দেশের মানুষ এবং বিদেশীরা ইতিবাচক হিসেবে দেখছেন। বিএনপির এ অবস্থান অব্যাহত থাকলে নির্বাচন কমিশনকে সংস্কার করে সব দলের অংশগ্রহণে একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন করা সম্ভব। এতে একদিকে নির্বাচন সবার কাছে গ্রহণযোগ্য হবে এবং অপরদিকে রাজনৈতিক পরিবেশ স্বাভাবিক থাকবে। ফলে দেশে গণতন্ত্র সুসংহত হওয়ার পাশাপাশি অর্থনৈতিক অগ্রগতি সাধিত হবে বলে দেশী-বিদেশী বিশ্লেষকরা বলছেন।

এক সময় মামলা নিয়ে বিএনপি কঠোর ভাষায় সরকারের সমালোচনা করত। কিন্তু এখন বিএনপি চেয়ারপার্সন খালেদা জিয়াসহ দলের সর্বস্তরের নেতারা আইনী প্রক্রিয়ায় তাদের বিরুদ্ধে দায়ের হওয়া মামলা মোকাবেলা করছেন। বিষয়টি নিঃসন্দেহে ইতিবাচক। বিএনপি চেয়ারপার্সন খালেদা জিয়া মামলা মোকাবেলায় নিয়মিত আদালতে যেতেন না। কিন্তু ইদানীং আইনী প্রক্রিয়ায় মামলা মোকাবেলা করতে খালেদা জিয়াসহ দলের নেতারা নিয়মিত আদালতে যাচ্ছেন। বিএনপি নেতাদের মধ্যে কেউ কেউ কারাগারে গেলেও সরকারের বিরুদ্ধে বিরূপ মন্তব্য থেকে বিরত থাকছেন।

দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচন বর্জনের পর বিএনপি রাজনৈতিকভাবে চরম বেকায়দায় পড়ে। বিশেষ করে ৬ জানুয়ারি থেকে টানা ৯২ দিন অবরোধ ও দফায় দফায় হরতাল কর্মসূচী সফল না হওয়ায় দলের সর্বস্তরে হতাশা নেমে আসে। আর এ আন্দোলন চলাকালে পেট্রোলবোমাসহ বিভিন্ন নাশকতামূলক কর্মকা- চালিয়ে বিএনপি দেশের গ-ি পেরিয়ে বিদেশেও বদনামের ভাগি হয়েছে। যেসব দেশ বিএনপির প্রতি এক সময় সহানুভূতিশীল ছিল সেসব দেশও বিএনপির দিক থেকে মুখ ফিরিয়ে নেয়। এ আন্দোলন চলাকালে প্রায় দেড় শ’ মানুষের প্রাণহানিসহ বিভিন্ন স্থাপনা ধ্বংসের বিষয়টিকে চরম নেতিবাচক আন্দোলন বলে মনে করছে তারা। এ কারণেই বিএনপি এখন বিদেশেও বন্ধুহীন হয়ে পড়েছে। আর এ অবস্থার অবসান ঘটাতেই খালেদা জিয়া রাজনীতিতে নতুন কৌশল নিয়েছেন।

এ ব্যাপারে জানতে চাওয়া হলে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য লে. জেনারেল (অব) মাহবুবুর রহমান বলেন, আমরা ইতিবাচক রাজনীতির মাধ্যমে জনগণের সমর্থন আদায় করতে চাই। এ জন্যই দল গোছানোর পাশাপাশি বিভিন্ন ইতিবাচক কর্মসূচী হাতে নেয়া হয়েছে। আর বিএনপি চেয়ারপার্সন খালেদা জিয়া যেভাবে জাতীয় ঐক্যের রাজনীতির কথা বলেছেন তাতে আওয়ামী লীগ সাড়া দিলে দেশের জন্য ইতিবাচক ফল বয়ে আনবে।

বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান আবদুল্লাহ আল নোমান বলেন, দেশের মানুষের সমর্থন আদায় করতে হলে ইতিবাচক রাজনীতির কোন বিকল্প নেই। আশা করছি শুধু বিএনপি নয়, দেশের স্বার্থে সব দলই ইতিবাচক রাজনীতি করবে।

প্রকাশিত : ৪ সেপ্টেম্বর ২০১৫

০৪/০৯/২০১৫ তারিখের খবরের জন্য এখানে ক্লিক করুন

প্রথম পাতা



শীর্ষ সংবাদ: