মেঘলা, তাপমাত্রা ৩১.১ °C
 
২২ আগস্ট ২০১৭, ৭ ভাদ্র ১৪২৪, মঙ্গলবার, ঢাকা, বাংলাদেশ
সর্বশেষ

নান্দীমুখ রঙ্গমেলায় তবুও মানুষ

প্রকাশিত : ৩ সেপ্টেম্বর ২০১৫
  • অপূর্ব কুমার কুণ্ডু

আহমদ ছফা তাঁর লিখিত বইয়ে বলে গেছেন সেই এক দূর দেশের বৃক্ষ বিজ্ঞানীর কথা, যার ব্যাকূলতা দেখার মত। একটি কাঁটাযুক্ত রসালো ফল বৃক্ষের কাছে বিজ্ঞানীর আর্তি, তোমার ফলের সুরক্ষা আমি দেব কিন্তু তুমি ফলকে কাঁটা ছাড়াই ফলতে দিতে শুরু করো। অপরদিকে কারোরই ব্যাকূলতায় কোন কাজই যে হয় না, তার প্রমাণ ঝুড়ি ভর্তি কাঁকড়া দেখলে। হাওড়-বিল-ক্ষেত-খামারের দেশী হোক কিংবা চাঁষের কাঁকড়া হোক পিছন থেকে স্বগোত্রের পা টেনে সে ধরবেই। অনেকটা সে ভাবেই মানবসৃষ্ট বৈষম্যের বিপরীতে লড়াইরত বিপ্লবীর ত্যাগ এবং অভ্যন্তরীণ টানাপোড়েনের মধ্যে দিয়ে প্রকৃত মানব মুক্তির পথ অন্বেষার নাটক ‘তবুও মানুষ’। পথ চলার ২৫ বছরকে ঘিরে বছরব্যাপী অনুষ্ঠানমালার ৩য় আয়োজন উপলক্ষে ২৮ ও ২৯ আগস্ট উদযাপিত দুদিনব্যাপী নান্দীমুখ রঙ্গমেলা উৎসবের দ্বিতীয় দিনে বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমির এক্সপেরিমেন্টাল থিয়েটার হলে মঞ্চস্থ হলো নাট্যকার- অভিনেতা-নির্দেশক অভিজিৎ সেনগুপ্ত রচিত, অভিনীত ও নির্দেশিত, নান্দীমুখ প্রযোজিত নাটক ‘তবুও মানুষ’।

মান আর হুঁশ নিয়ে যে মানুষ সেই মানুষের পক্ষে অপর ক্ষমতাবান মানুষের দাস হয়ে দিনের পর দিন বঞ্চনা-নিষ্পেষণ- বৈষম্য মেনে নেয়া সতিই কঠিন। ফলে দাস বিজয়দেব অপরাপর দাসদের সংগঠিত করে দাস প্রভুদের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করে আজ কারাঘরের অন্ধকার প্রকোষ্ঠে বন্দী। অপরদিকে অপর বন্দী যৌবনের পূজারী চন্দ্রকেতু রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত অত্যাচারী শাসককে উৎখাত করতে গিয়ে নিজেই আজ একই প্রকোষ্ঠে কারাবন্দী। বিজয়েদেব অর্থমূল্য দিয়ে বিষাক্ত বিষ সংগ্রহ করে মরে বাঁচার আগ্রহ রাখলেও পাছে সত্যিই যদি কারামুক্তি ঘটে এই আশায় কারাগারে পার করেছে আঠারটি শীত বসন্ত। অপরদিকে ধূমকেতুর মতো চমকে দেয়া কিন্তু মুহুর্তেই বিলীন হওয়া চন্দ্রকেতু মাত্র দুই বছরের কারাবাস মেনে নিতে না পেরে কৃতকর্মকে অপরাধ বলে স্বীকার করে রাষ্ট্রের রাজার কাছে ক্ষমা চেয়ে মুক্তির আশা করছে আজকের এই শেষ রাত্রে। কারণ নবপ্রভাতে রাজা তার জন্মদিনে অনেক কারাবন্দীর মতো হয়ত তাকেও মুক্তি দেবে। কিন্তু মুক্তির ঘোষণা আসে বিজয়দেবের। হতবিহ্বল ধূমকেতু ঘোষণা আর মুক্তির মধ্যবর্তী সময়ে দাঁড়িয়ে একের অবর্তমানে অপরের সুযোগের কোটার স্বার্থে বিজয়দেবকে বিষ দিয়ে মেরে নিজের মুক্তি ত্বরান্বিত করে। বিজয়দেব যে কৌশলের কারণে মরেনি বরং স্বেচ্ছায় মৃত্যুকে ত্বরান্বিত করেছে যাতে করে বার্ধক্যের বিপরীতে তারুণ্যের চন্দ্রকেতু কারামুক্তি হয়ে ঝাঁপিয়ে পড়তে পারে শোষিতের লড়াইয়ের পক্ষে সেই দর্শন জয়দেবের বয়ান এবং চন্দ্রকেতুর শ্রবণের মধ্যে দিয়ে শেষ হয় নাটক তবুও মানুষ।

তবুও মানুষ নাটকটি শেষ পর্যন্ত সস্তা নাটক হয়ে যাবার সম্ভাবনা থাকতো যদি নাট্যকার একমাত্র ক্ষমতাসীনদের বিরুদ্ধে লড়াইয়ের ডাক দিয়ে শেষ করতেন। বরং তিনি করলেন ক্ষমতাহীনদের তৈরি করার আহ্বান। এখানেই নাটকটি স্বার্থক। প্রতিপক্ষ অপরে না বরং প্রতিপক্ষ নিজেই নিজের নাট্যকারের এই ভাবনা সার্বজনীন। উপরন্তু বিজয়দেবের অবিচল সত্তা এবং চন্দ্রকেতুর দোদুল্যমানতায় স্পষ্ট নাট্যকার অভিজিৎ সেনগুপ্ত মানুষ চেনেন। তবে নাটক করতে গিয়ে নাটকের শুরুতেই নাট্যকথন অতিকথন দোষে দুষ্ট। যে উপলব্ধি হবে অভিজ্ঞতায়, তা যদি বলেই দিতে হল তবে তার মূল্য কোথায়!

মূল্যের দিক দিয়ে চট্টগ্রামের নাট্যপ্রযোজনা এখনও পর্যন্ত অভিনয় নির্ভর। নির্দেশক অভিজিৎ সেনগুপ্ত অত্যন্ত চৌকস দক্ষতায় স্বল্প পরিসরে ক্ষুদ্র আয়োজনে প্রাণবন্ত অভিনয় দিয়ে প্রযোজনা সফল করতে সক্ষম হয়েছেন। অসীম দাশের সেট একদিকে মানব যাত্রার আবহমানতা (ঝুলন্ত পর্দার কাজ প্রসঙ্গ) যেমন বোঝায় তেমনি অন্ধ প্রকোষ্ঠের মাঝে ন্যূনতম আলোই যে বন্ধীদের প্রাণের স্পন্দন তাও বোঝায়। পরিমল মজুমদার আবহ ও সঙ্গীত পরিকল্পনায় উপস্থিত বটে তবুও তার করণীয় যেন আরও বাকি। নির্দেশক-নাট্যকার-অভিনেতা অভিজিৎ সেনগুপ্তের বড় চমক, মূলত দুজন চরিত্র তথা অভিনেতার (বিজয়দেব চরিত্রে অভিনেতা সুজিত দাশের কায়িক পরিশ্রম এবং চরিত্রের প্রতি বিশ্বস্ততা বিশেষ বিবেচ্য প্রসঙ্গ এবং দলীয় সকল কর্মকা-ের অস্থিরতার মধ্যে দাঁড়িয়েও বিপ্লবী হয়ে ওঠার স্থিরতার ক্ষেত্রে চন্দ্রকেতু চরিত্রে অভিজিৎ সেনগুপ্তের অভিনয়ের মনোবল বিবেচ্য) ওপর নির্ভর করে আবহমান কাল-সমকাল এবং ভাবী কালের অসংখ্য ঘটনার ঘনঘটা ঘটালেন সাবলীলভাবে এবং কার্যকারণের সঙ্গে সম্পৃক্ততা রেখে। নিদর্শকের ঘাটতি দুটি ক্ষেত্রে। প্রথমত কোরাসের চল এখন বেমানান। মিটিং মিছিলে লোক সরবরাহ যেখানে পেশদারিত্বের জায়গায় পৌঁছেছে সেখানে দশজন একই সুরে একই সময় কথা বলবে এটা অভাবনীয়। যদিও মূল লেখা আর লেখার শিরোনামের ফ্রন্ট ভিন্ন হবে তার অর্থ এই না যে চিৎকার করে কথা বললেই দর্শকদের হৃদয়ে তা দাগ কাটবে। বরং অভিনীত অভিনেতা কিংবা অভিনেত্রী যত সূক্ষ্মভাবে সংলাপটিকে নিজেদের হৃদয়ের মর্মমূলে জায়গা দেবে ততটাই দর্শকরা তাদের সঙ্গে সহযাত্রী ও সহমর্মী হবে। দ্বিতীয়ত বিষপাত্রের পাশে জলপাত্র না থাকার ঘাটতি। জীবন এবং মৃত্যুর মধ্যবর্তী জায়গাতেইতো মুমূর্ষের পরিণতির টানাপড়েন। যে টানাপড়েন চন্দ্রকেতুর সমাপ্তি লগ্নে। কারামুক্তি- দৈহিক মুক্তি-চিন্তার মুক্তি সেসবইতো বিজয় দেবের মৃত্যুর মুহূর্ত ক্ষণে। বিজয়দেবের মৃত্যু, কারাঘারের ভঙ্গুরতা কিংবা চন্দ্রকেতুর আত্ম উপলব্ধি কোন একটিকে বাদ দিয়ে কি তবুও মানুষকে বোঝা যায়! বোঝা যায়, তবুও মানুষ নাট্য প্রযোজনা শেষ পর্যন্ত মানুষকে মানবিক হয়ে মনুষত্বের জয়গানে অংশ নেবার আহ্বান জানায়।

প্রকাশিত : ৩ সেপ্টেম্বর ২০১৫

০৩/০৯/২০১৫ তারিখের খবরের জন্য এখানে ক্লিক করুন


শীর্ষ সংবাদ: