১৮ অক্টোবর ২০১৭,   ঢাকা, বাংলাদেশ   শেষ আপডেট এই মাত্র  
Login   Register        
ADS

ঢালিউড কোন্ পথে...


দেশের চলচ্চিত্রে বর্তমানে একই সঙ্গে সুসময় এবং দুঃসময় চলছে। সুসময় এজন্য বলা যেতে পারে প্রতি মাসে নতুন নতুন চলচ্চিত্র মুক্তি পাচ্ছে। বেরিয়ে আসছে নতুন নির্মাতা। কিন্তু নতুন সিনেমা কি আদৌ হচ্ছে? এই প্রশ্নের জবাব সিনেমা হলের দর্শকরাই ভাল বলতে পারবেন। তবে মোটের ওপর বলা যেতে পারে গল্পে কোন নতুনত্ব পাচ্ছে না দর্শক। ঢাকার সিনেমায় এ রকম প্রচ- মেধাশূন্যতা এর আগে কখনও তৈরি হয়নি বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা। নতুন সিনেমার নির্মাতারা বেশিরভাগই ছোট পর্দায় কাজের অভিজ্ঞতা থেকে আসছেন। কিন্তু একটি দর্শকনন্দিত সিনেমা নির্মাণের যে কারিগরি ও নান্দনিক অভিজ্ঞতা থাকা দরকার, তার কোনটাই এসব পরিচালকের নেই। এত কিছুর পরেও সিনেমা মুক্তি পেলে প্রথম দিনেই পরিচালক অথবা প্রযোজনা সংস্থা থেকে দাবি করা হয়, সিনেমা ‘‘সুপারহিট’’ ‘‘বাম্পার ব্যবসাসফল’’ ইত্যাদি। অথচ বক্স অফিসের হিসেবে সিনেমা হলে এক সপ্তাহও চলছে না এসব সিনেমা। কারণ অনুসন্ধানে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন মৌলিক গল্পের প্রচ- অভাব রয়েছে ঢাকার সিনেমার গল্পে। নতুনদের সুযোগ দেয়ার নামে নেয়া হয় যাদের, তাদের অভিনয়ের ন্যূনতম জ্ঞান নেই। দুর্বল গল্প, ততোধিক দুর্বল অভিনয় এবং একঘেয়ে লোকেশনে বিরক্ত দর্শক। শাকিব খান নামক নাম্বার ওয়ান ‘ক্লাউন’ এর ভাঁড়ামিও দর্শকদের আর হলমুখী করতে পারছে না। এক সময়ের কোলাহলমুখর বিএফডিসি এখন সিনেমার শূটিং-এর অভাবে টিভির বিজ্ঞাপনের লোকেশনস্থল হিসেবে ব্যস্ত সময় পার করছে। বিএফডিসি বর্তমান সময়ের সঙ্গে তাল মেলাতে পারছে না। নতুন নির্মাতা তৈরিতে কোন ভূমিকাই রাখতে পারছে না সরকারী এই প্রতিষ্ঠানটি। বর্তমানে তিন ধারার চলচ্চিত্র নির্মিত হচ্ছে আমাদের এখানে। এক ধারায় রয়েছে ইউরোপিয়ান আর্ট ফিল্মের ঘরানায় উদ্বুদ্ধ ‘আর্ট ফিল্ম’। অন্যদিকে এফডিসিকেন্দ্রিক ‘কমার্শিয়াল ফিল্ম’। সর্বশেষ ধারাটি একেবারেই নতুন সংযোজন। এটি হচ্ছে ছোট পর্দার কিছু পরিচালকের বড় পর্দার জন্য নির্মিত সিনেমা। শেষের এই ধারাটি এখনও সংগ্রাম চালিয়ে যাচ্ছে। তবে, মাঝে মাঝেই কিছু পরিচালক ভুলে যাচ্ছেন তারা আসলে কোন মাধ্যমের জন্য কাজটি করছেন। অনেক দর্শকই বলছেন, ‘এটি তো আসলে সিনেমা হয়নি, হয়েছে একটি বড়সড় নাটক।’ অনেক নতুন নাট্য পরিচালকই এখন ‘ফিল্মমেকার’ হবার জন্য উঠেপড়ে লেগেছেন। কারণ ছোট পর্দার নির্মাতার আর আগের সেই কদর নেই, ইজ্জতও নেই। অন্যদিকে, বর্তমানে সিনেমায় সবচেয়ে বেশি ধুঁকছে এফডিসিকেন্দ্রিক ‘কমার্শিয়াল ফিল্ম’। শাকিব খান অথবা বাপ্পী অথবা সাইমন ধারণা থেকে তারা বের হতে পারেনি। বেশিরভাগ পরিচালক ভাবছেন যে, এইসব হিরোকে নিলে সিনেমা দর্শক ‘খাবে’। কিন্তু ব্যাপার হচ্ছে দর্শক আসলে ‘খাচ্ছে’ না। একই লোকের অভিনয় আর কত দেখবে দর্শক? এই ধারা সিনেমার কারিগরি দুর্বলতার কথা না হয় বাদই দিলাম। কিছুদিন আগে পূণদৈর্ঘ্য ‘প্রেমকাহিনী নামক একটি সিনেমা’ এর একটি দৃশ্যে দেখা গেল হিরো শাকিব খান মালয়েশিয়ায় তার ঘর থেকে বের হলো বাইরে যাবার উদ্দেশ্যে কিন্তু পরের দৃশ্যেই তাকে দেখা গেল হাতিরঝিলে। তাহলে কোথায় গেল কন্টিনিউটি? মুশকিলের ব্যাপার হচ্ছে বাণিজ্যিক ঘরানার সিনেমা যারা বানাচ্ছেন তাদের বেশিরভাগেরই সিনেমা নির্মাণের প্রাতিষ্ঠানিক কোন শিক্ষা নেই। কোন পরিচালকের সঙ্গে দুই-তিনটি সিনেমায় সহকারী হিসেবে কাজ করে নেমে পড়ছেন চলচ্চিত্র নির্মাণে। ফলশ্রুতিতে সিনেমা নির্মাণে কোন নতুনত্ব আসছে না। একই জিনিস কপি করতে করতে ক্রমে জরাজীর্ণ হচ্ছে। অন্যদিকে, পাশের দেশ ভারতের কলকাতা বছর দশেক আগেও বাংলাদেশের সিনেমার রিমেক করে বেঁচে ছিল। এখন তাদের সিনেমা দেখে আমরা শুধুই আফসোস করি। কিন্তু তাদের এই প্রযুক্তি এবং নান্দনিকভাবে এগিয়ে যাবার পেছনের সুপরিকল্পিত কর্মকা-ের খোঁজ কি আমরা রেখেছি?

নতুন নির্মাতা যারাই আসছেন, তারা ভাল কিছু করার স্বপ্ন নিয়েই আসছেন। কিন্তু সেই স্বপ্নকে বাস্তবে রূপ দেয়ার কতটুকু সামর্থ্য তাদের থাকছে? অনেকেরই সিনেমাটোগ্রাফী বা চলচ্চিত্র সম্পাদনার পরিপূর্ণ জ্ঞান না নিয়েই আসছেন। কথায় কথায় আমরা পাশের দেশের উদাহরণ দিয়ে দেই। কিন্তু আমরা স্বাধীনতার এত বছর পরেও কি একটি পূর্ণাঙ্গ চলচ্চিত্র ইনস্টিটিউট তৈরি করে যোগ্য নির্মাতা তৈরি করতে পেরেছি? এখনও পর্যন্ত যা কিছু ভাল অর্জন আমাদের সিনেমার তার সবটাই কৃতিত্ব বাংলাদেশের ‘আর্ট ফিল্ম’-এর। সম্প্রতি নির্মাতা আশরাফ শিশিরের চলচ্চিত্র ‘গাড়িওয়ালা’ ১৮টি দেশের ৪৮টি শহরে প্রদর্শিত হয়েছে। এর মধ্যে আফ্রিকা, লাতিন আমেরিকার বড় কিছু চলচ্চিত্র উৎসবও রয়েছে। আরেক নির্মাতা জাহিদুর রহিম অঞ্জনের চলচ্চিত্র ‘মেঘমল্লার’ কানাডার ‘টরন্টো চলচ্চিত্র উৎসব’ এ মনোনীত হয়েছে। আবু শাহেদ ইমনের ‘জালালের গল্প’ কয়েকটা উৎসব থেকে সম্মান বয়ে এনেছে। এসব আমাদের অনুপ্রাণিত করে। সামনে এগিয়ে যাবার পথ দেখায়। এগিয়ে যাক বাংলা সিনেমা। আবার প্রেক্ষাগৃহ পরিপূর্ণ হয়ে উঠুক দর্শকের কোলাহলে। বাংলার সিনেমা ফিরে পাক তার হারানো গৌরব।