২৪ নভেম্বর ২০১৭,   ঢাকা, বাংলাদেশ   শেষ আপডেট ৬ ঘন্টা পূর্বে  
Login   Register        
ADS

সে রাতে পূর্ণিমা থাকত


অমলকান্তি সরকার

বাংলাদেশের মানুষের প্রাণের খেলা ছিল ফুটবল। অতীত দিনের সেই কথা নতুন প্রজন্মের কাছে বিশ্বাসযোগ্য না হওয়ারই কথা। আমার ছেলে ধ্রুব যখন আর্জেন্টিনা আর বার্সার মেসির খেলা দেখার জন্য নির্ঘুম রাত জাগে তখন আমার ছেলেবেলার ফুটবল খেলার গল্প শোনালে ও হেসে উঠে বলে- ‘গ্রামের মানুষ ফুটবল খেলতে পারে!’ বর্তমান সিরাজগঞ্জ জেলার মহেশপুর গ্রামে আমার জন্ম। বর্ষা মৌসুমে গ্রামের মানুষের অবসর থাকে। ঘরে ঘরে আউস ধানের মৌ মৌ গন্ধ। আমরা স্কুল থেকে ফিরেই বল নিয়ে মাঠে। অন্যরা অধিকাংশই কৃষক। আষাঢ়ী পূর্ণিমার দিন হতো অন্যরকম ফুটবল খেলা। কী উৎসাহ, উদ্যম, আর উদ্দীপনায় ভরপুর ছিল সেই ফুটবল লড়াই। বাবা ছেলের বিপক্ষে, ভাই ভাইয়ের বিপক্ষে, দাদা নাতির বিপক্ষে মাঠে নামত লুঙ্গি কাছা দিয়ে। হার-জিতের এ লড়াইয়ে জিততেই হবে। মূলত সেদিন গ্রামের মহিলা ও পুরুষরা দুই ভাগে বিভক্ত হতো।

বিবাহিত বনাম অবিবাহিতÑ দুই টিমে খেলা হতো। ফাইনাল খেলার আগে হাটে হাটে ঢোল পিটিয়ে জানিয়ে দেয়া হতো। খেলার দিন দর্শকে ভরে যেত মাঠ। আমরা পাঁচ ভাই। তিনজন বিবাহিত দলে, দু’জন অবিবাহিত দলে খেলতাম। আমি স্ট্রাইকারে খেলতাম। দাদারা আমাকে উৎকোচ হিসেবে মালাই আইসক্রিম আর গুড়ের তিলেমটকা খাইয়ে বলতÑ ‘গোল দিলে কপালে দুঃখ আছে।’ কিন্তু কে শোনে কার কথা। এ কথা শুনে ধ্রুব হো হো করে হেসে বলেÑ ‘বাবা তুমি খেলতে স্ট্রাইকারে!’ ওর হাসি আর থামতে চায় না। সত্যি তো শহরে জন্ম নেয়া ছেলের বিশ্বাস না হওয়ারই কথা। খেলা শুরু হলে অবিবাহিতরা একের পর এক গোল দিত। বিবাহিত দল তা হজম করত। বিবাহিত দল যখন নিশ্চিত হেরে যাচ্ছে তখন বৃদ্ধ বায়েজ আলী চাচা মাঠে নেমে বল হাতে অবিবাহিতদের গোলকিপারকে সরিয়ে দিয়ে মনের আনন্দে ডজনখানের গোল দিয়ে রেফারিকে বলত বাঁশি বাজিয়ে গোল ঘোষণা করতে। রেফারি গোপাল কাকু তা করতে না চাইলে অনেক বৃদ্ধ মাঠে এসে বাঁশি কেড়ে নিয়ে রেফারিকে চ্যাংদোলা করে মাঠের বাইরে নিয়ে যেত। আয়েজ আলী নানা বাঁশি বাজিয়ে গোলের ঘোষণা দিতেন। মাঠে উপস্থিত বিবাহিত দর্শক করতালি দিয়ে অভিনন্দন জানাতো। আর আমরা অবিবাহিত দল অসহায়ভাবে তা মেনে নিতাম। কারণ বড়দের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করার সাহস আমাদের ছিল না। দুই দলকে যৌথভাবে চ্যাম্পিয়ন ঘোষণার মধ্য দিয়ে শেষ হতো খেলা। সেই খেলার মধ্যে আনন্দ, বিনোদন আর হাসি থাকত রাশি রাশি। পুরস্কার হিসেবে দেয়া হতো আয়না, চিরুনি, সাবানের কেস আর হৃদয় আকৃতির কালো কাঠের মধ্যে রূপালী কাজ করা শিল্ড। আনন্দের এখানেই শেষ নয়, পূর্ণিমার আলোয় মাঠের মধ্যে খাসির মাংস আর আউসের লালচে চালের ভাত রান্না হতো। কলাপাতায় করে গ্রামের জাতি, ধর্ম, বর্ণ নির্বিশেষে সবাই পেটপুরে খেতাম। গ্রামের মানুষ এক পরিবার হয়ে যেত সে রাতে। আহা! এমন দিন কি আর ফিরে পাব?

আশির দশকে ঢাকায় এসে কতদিন যে স্টেডিয়ামে খেলা দেখতে গিয়ে টিকেট না পেয়ে ফিরে এসেছি। গ্যালারি থাকত দর্শকে পরিপূর্ণ। সে কী উত্তেজনা প্রিয় দলের সমর্থকের মধ্যে! পরের ইতিহাস সবারই জানা। মাঠবিমুখ দর্শক। সম্প্রতি সাফ গেমে অনুর্ধ-১৬ ফুটবলে চ্যাম্পিয়ন হয়েছে বাংলাদেশ। নতুন করে আশার আলো দেখা দিয়েছে আমাদের মনে। বাফুফে নানা উদ্যোগ নিয়েছে ফুটবলকে জনপ্রিয় করার। মাঠের সঙ্কট দূর করতে কর্তৃপক্ষকে এগিয়ে আসতে হবে। ফিরে আসুক ফুটবলের সেই সোনালী দিন।

মগবাজার, ঢাকা থেকে