১৮ নভেম্বর ২০১৭,   ঢাকা, বাংলাদেশ   শেষ আপডেট এই মাত্র  
Login   Register        
ADS

রফতানির নয়া দিগন্ত


রফতানির নয়া দিগন্ত

এমদাদুল হক তুহিন ॥ এগিয়ে চলছে বাংলাদেশ, অর্থনৈতিক বহু সূচকে দেশের অবস্থান এখন ঈর্ষণীয়। এমনকি কয়েক বছরের ব্যবধানে তথ্যপ্রযুক্তি খাতে বাংলাদেশ দেখিয়েছে আকাশচুম্বী সফল্য। সামগ্রিক খাতের এগিয়ে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে বিস্তৃত হয়েছে দেশের সফটওয়্যার শিল্পও। প্রযুক্তি সেবা ও সফটওয়্যার রফতানি করে গত অর্থবছরে বাংলাদেশের আয় হয়েছে ৩০০ মিলিয়ন ডলার। আর ’১৮ সালের মধ্যে এক বিলিয়ন ডলার ও ’২১ সালের মধ্যে ৫ বিলিয়ন ডলার আয়ের লক্ষ্য নির্ধারিত রয়েছে। দেশে বর্তমানে ১ হাজরেরও বেশি সফটওয়্যার রফতানিকারক ছোট-বড় প্রতিষ্ঠান রয়েছে। শুধু সফটওয়্যার রফতানি করে বছরপ্রতি ১০ কোটি ডলারেরও বেশি আয় করছে বাংলাদেশ। রফতানি উন্নয়ন ব্যুরোর তথ্য মতে, মাত্র ১০ বছরে ব্যবধানে সফটওয়্যার শিল্পে রফতানি আয় বৃদ্ধি পেয়েছে ১০ কোটি ৪৭ লাখ ডলার। প্রতিদিনই এ খাতে বাড়ছে রফতানি আয়, তবে স্বপ্ন আরও বিশাল। আকাশচুম্বী! সে স্বপ্নকে বাস্তবতায় রূপ দিতে তৈরি হচ্ছে তরুণ ও উদ্যোমী পোগ্রামার ও ফ্রিল্যান্সার। শিল্পে আগমন ঘটছে নতুন প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানের। কর অবমুক্ত ও জ্যামিতিক হারে আয় বৃদ্ধি পাওয়ায় প্রতিবন্ধকতাকে তোয়াক্কা না করে টার্গেটের চূড়ায় পৌঁছানো সম্ভব বলে মনে করেন আইসিটি খাতের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট একাধিক ব্যক্তিবর্গ।

জানা গেছে, সরকারী-বেসরকারী সমন্বিত প্রয়াসে সফটওয়্যার শিল্পের ব্র্যান্ডিং করে আয় বাড়াতে চলছে একাধিক কার্যক্রম। বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের অধিনস্থ রফতানি উন্নয়ন ব্যুরো (ইপিবি), তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি মন্ত্রণালয় ও বাংলাদেশ এ্যাসোসিয়েশন অব সফটওয়্যার এ্যান্ড ইনফরমমেশন এ্যাসোসিয়েশন সার্ভিসেস (বেসিস) সমন্বিতভাবে লক্ষ্য পূরণে প্রতিনিয়ত নানাভাবে রফতানিকারদের সহায়তা করছে। কয়েক দশক ধরে এক বিলিয়ন ডলার রফতানি আয়ের স্বপ্ন নিয়ে কাজ করে তাদের অধিকাংশই মনে করেন, আইসিটি খাতের সামগ্রিক পরিস্থিতি এখন ইতিবাচক।

এ প্রসঙ্গে বিশিষ্ট প্রযুক্তিবিদ মোস্তফা জব্বার জনকণ্ঠকে বলেন, বিগত কয়েক বছরে সরকার নানা ইতিবাচক পদক্ষেপ নিলেও সফটওয়্যার রফতানি আয় ১ বিলিয়ন ডলার অর্জনের পথে এখনও অনেক কমতি রয়েছে। তবে বর্তমান সরকারের মেয়াদে রফতানি আয় বৃদ্ধিতে সব উপাদানই ইতিবাচক বলে মনে করেন এ প্রযুক্তিবিদ। আর প্রতিবন্ধকতা থাকলেও পিছিয়ে নেই বাংলাদেশ। প্রতিদ্বন্দ্বী দেশের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বাড়িয়ে চলছে রফতানি আয়। চলেছে বাংলাদেশ ব্র্যান্ডিং ও কান্ট্রি ব্র্যান্ডিংয়ের কাজ।

রফতানি উন্নয়ন ব্যুরো (ইপিবি)-এর তথ্যমতে, ২০০৪-০৫ অর্থবছর থেকে ২০০১৫-১৬ অর্থবছরে ১০ বছরের ব্যবধানে সফটওয়্যার শিল্পে রফতানি আয় বৃদ্ধি পেয়েছে ১০ কোটি ৪৭ লাখ ডলার। ২০০৪-০৫ অর্থবছরে সফটওয়্যার রফতানি আয় ছিল ১ কোটি ২৬ লাখ ডলার। ৪৭ লাখ ডলার বৃদ্ধি পেয়ে পরের অর্থবছর ২০০৫-০৬ সালে তা ২ কোটি ৭১ লাখ ডলারে উন্নিত হয়। তবে ২০০৬-০৭ ও ২০০৭-০৮ পরপর দু’বছরই রফতানি আয় হ্রাস পায়। আর ২০০৭-০৮ অর্থবছরে রফতানি আয় হ্রাস পেয়ে ২ কোটি ৪৮ লাখ ডলারে এসে ঠেকে। তবে পরের অর্থবছরই আয় এক লাফে ৩ কোটি ছাড়িয়ে যায়, ২০০৮-০৯ অর্থবছরে রফতানি তা বৃদ্ধি পেয়ে দাঁড়ায় ৩ কোটি ২৯ লাখ ডলারে। আর এভাবেই কিছুটা হ্রাস-বৃদ্ধির মাধ্যমে বাড়তে থাকা রফতানি আয়ের অঙ্ক। ২০১০-১১ অর্থবছরে ৪ কোটি ৫৩ লাখ ডলার, ২০১২-১৩ অর্থবছরে ১০ কোটি ১৬ লাখ ডলারে পেঁৗঁছায়। আর সর্বশেষ ২০১৪-১৫ অর্থবছরের ১১ মাসে সফটওয়্যার রফতানি করে বাংলাদেশ আয় করে ১২ কোটি ডলার। রফতানি আয়ের চিত্র ঘেঁটে দেখা যায়, এ শিল্পে মাত্র ১০ বছরে রফতানি আয় বৃদ্ধি পেয়েছে ১০ কোটি ৪৭ লাখ ডলার। চলতি অর্থবছর শুরু হয়েছে সবেমাত্র। এ অর্থবছরেও শিল্পটিতে রফতানি আয় পূর্বের যে কোন বছরের তুলনায় কয়েকগুণ বৃদ্ধি পাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।

মানবসম্পদ উন্নয়নের সঙ্গে সঙ্গে দেশে তথ্যপ্রযুক্তি সম্পর্কিত জ্ঞানও বাড়ছে। অনেকের মতে ৩ বছরে নির্ধারিত লক্ষ্যমাত্রা ১ বিলিয়ন ডলার স্পর্শ করা না গেলেও রফতানি বৃদ্ধিতে বাংলাদেশের জ্যামিতিক হার অব্যাহত থাকবে।

দাবি করা হয়, তথ্যপ্রযুক্তি খাতে অপার সম্ভাবনা থকলেও যথেষ্ট সুফল পাচ্ছে না বাংলাদেশ। ব্যক্তিগত উদ্যোগ থাকলেও বড় কোন কোম্পানি গড়ে ওঠায় যথেষ্ট সুবিধার অভাবে পেশাদার সফটওয়্যার বিশেষজ্ঞরা বিদেশে চলে যাচ্ছেন বলে একদলের অভিমত। ধারণা করা হয়ে থাকে পার্শ্ববর্তী দেশ ভারত এ খাত থেকে আয় করছে প্রায় ১০০ বিলিয়ন ডলার। ভারতের তুলনায় লক্ষ্যমাত্রা নগণ্য হলেও সে লক্ষ্য পূরণে অনেক পিছিয়ে বাংলাদেশ।

সফটওয়্যার শিল্পের বিকাশ ও রফতানি আয় বৃদ্ধি প্রসঙ্গে বিশিষ্ট প্রযুক্তিবিদ মোস্তফা জব্বার জনকণ্ঠকে বলেন, বিগত কয়েক বছরে সরকার নানা ইতিবাচক পদক্ষেপ নিলেও দেশে হাজার চারেক গ্রাজুয়েট তৈরি হয়েছে মাত্র। আমরা এখনও লক্ষ্য অর্জনের স্থানে পৌঁছাতে পারিনি। গুণগত দিক দিয়ে শিক্ষার মান বৃদ্ধি ও ডিজিটাল শিক্ষা ব্যবস্থা প্রবর্তন সম্ভব না হলে ১ বিলিয়ন ডলারের গোল অর্জন সম্ভব নয়।

মোস্তফা জব্বারের মতে সফটওয়্যার শিল্পের বিকাশ ও রফতানি আয় বৃদ্ধির পথে মানবসম্পদ উন্নয়নই প্রধান দুর্বলতা। তিনি জনকণ্ঠকে আরও বলেন, সাধারণ শিক্ষার মান যদি ভাল না হয়, জেনারেল এডুকেশন থেকে তেমন আউটপুট পাওয়া যাবে না। যে গতিতে এগিয়ে যাওয়ার কথা ছিল, আমরা সেভাবে এগুতে পারছি না। আইসিটি এডুকেশন ও সম্পৃক্ত শিক্ষায় তেমন গতি লক্ষ্য করা যাচ্ছে না। রফতানি বৃদ্ধিতে বেসিস ও রফতানি উন্নয়ন ব্যুরোও তেমন কোন কার্যকারী ভূমিকা রাখতে পারছে না বলে অভিমত বিজ্ঞ এ প্রযুক্তিবিদের। তিনি বলেন, মেলায় যেখানে যাওয়ার দরকার বেসিস সেখানে যাচ্ছে না। এখনও দেশের সফটওয়্যারের ব্র্যান্ডিং হয়নি। অনেক দেশ জানেই না-আমরা সফটওয়্যার রফতানি করছি। তবে অন্য যে কোন সময়ের চেয়ে বাংলাদেশের অবস্থান অনেক ভাল, রফতানি আয় বৃদ্ধি পাওয়াকে একটি ইতিবাচক দিক হিসেবেই মনে করেন প্রযুক্তিবিদ জব্বার। তথ্যপ্রযুক্তি মন্ত্রণালয় ও সরকারের ভূমিকা প্রসঙ্গে বলতে গিয়ে তিনি আরও বলেন, প্রথমদিকে আইসিটি মন্ত্রণালয়ের গতি খুবই ধীর ছিল। বর্তমানে তারা অনেক ইতিবাচক পদক্ষেপ গ্রহণ করছে। সরকার তার সাধ্যানুযায়ী করছে। তবে কাজ করতে হবে সম্মিলিতভাবে। বেসরকারী প্রতিষ্ঠানকে এগিয়ে আসতে হবে। এ মুহূর্তে সরকারী উদ্যোগের কোন কমতি দেখছি না।

রফতানির চেয়ে আমদানি বেশি কিনা এমন এক প্রশ্নের উত্তরে মোস্তফা জব্বার আরও বলেন, হ্যাঁ। রফতানির চেয়ে আমদানি বেশি হয়। আমাদের দেশের ব্যাংকগুলো নানা কারণে বিদেশী সফটওয়্যার ব্যবহার করে। অভিযোগ রয়েছে নানা কারণে ব্যাংকগুলো দেশীয় সফটওয়্যার ব্যবহারে তেমন আগ্রহী নয়।

জানা গেছে, দেশ থেকে সফটওয়্যার রফতানি করার জন্যে জামিলুর রেজা চৌধুরীর নেতৃত্বে ১৯৯৫ সালে একটি কমিটি গঠিত হয়। ওই কমিটির পক্ষ থেকে সরকারের কাছে ৪৫টি সুপারিশ করা হয়। যার মধ্যে অন্যতম ও প্রধান সুপারিশ ছিল কম্পিউটার আমদানির ক্ষেত্রে ভ্যাট প্রত্যাহার। সে সময় সরকার সুপারিশটি গ্রহণ করলেও ২০০১ সালে সরকার পরিবর্তনের সঙ্গে সাথে মনোযোগ হারায় দেশের আইসিটি খাত। ২০০৮ সালে আবারও পটপরিবর্তনের পর সামগ্রিক এ খাতে পরিবর্তনের হাওয়া লাগে। বয়ে যেতে থাকে উন্নয়নের হাওয়া। ২০০৯ সালে তৈরি হয় আইসিটি নীতিমালা, স্টেক হোল্ডারদের নিয়ে আইসিটি পলিসি হয়। আর এরও আগে ১৯৯৮ সালে সফটওয়্যার রফতানিকারক প্রতিষ্ঠান নিয়ে গঠিত হয় বাংলাদেশ এ্যাসোসিয়েশন অব সফটওয়্যার এ্যান্ড ইনফরমমেশন এ্যাসোসিয়েশন সার্ভিসেস (বেসিস)। বিগত ৮-৯ বছরে সরকারী ও বেসরকারী নানা উদ্যোগে ক্রমান্বয়ে বাড়ে সফটওয়্যার রফতানিতে দেশের আয়।

বাংলাদেশ এ্যাসোসিয়েশন অব সফটওয়্যার এ্যান্ড ইনফরমমেশন এ্যাসোসিয়েশন সার্ভিসেস (বেসিস) সূত্রে জানা গেছে, বাংলাদেশ ব্যাংকের মাধ্যমে গত অর্থবছরে ১২ কোটি টাকা রফতানি আয় হলেও প্রকৃত আয় ৩০ কোটি ডলার। ২০১৪-১৫ অর্থবছরে এ খাতে প্রায় ৩০০ মিলিয়ন ডলার আয় হয়েছে বলে দাবি বেসিসের এক উর্ধতন কর্মকর্তার। ফ্রিল্যান্সিংয়ের মাধ্যমে আয়কৃত অর্থ সরাসরি ব্যাংকের মাধ্যমে আনার কোন পন্থা না থাকায় ওই আয়ের কোন রেকর্ড নেই বলেও জানান তিনি। আয়কৃত অর্থ পেপ্যলের মাধ্যমে আসে, বাংলাদেশে এখনও যুক্ত হয়নি সে মাধ্যম। জানা গেছে, প্যাপল ব্যবসাকে কেন্দ্র করে দেশের অভ্যন্তরে গড়ে উঠেছে সিন্ডিকেট ব্যবসাও। ফলে একদিকে ফ্রিল্যান্সাররা হচ্ছেন ভোগান্তির স্বীকার, অন্যদিকে সরকার হারাচ্ছে মোটা অঙ্কের রাজস্ব।

বেসিস সূত্রে আরও জানা যায়, বর্তমানে প্রতিষ্ঠানটির অন্তর্ভুক্ত সফটওয়্যার রফতানিকারক ও কম্পিউটার সেবাপ্রদানকারী প্রতিষ্ঠান সংখ্যা ৯২৭। এর বাইরেও রয়েছে ছোট-বড় প্রতিষ্ঠান।

সামগ্রিক প্রসঙ্গে কথা বলতে গিয়ে বেসিসের নির্বাহী পরিচালক সামী আহমেদ জনকণ্ঠকে বলেন, এ খাতে রফতানি আয় বৃদ্ধিতে দেশে সর্বদিক দিয়ে ইতিবাচক আবহ রয়েছে। বেসিস, রফতানি উন্নয়ন ব্যুরো ও আইসিটি বিভাগ সম্মিলিতভাবে কাজ করছে।

সফটওয়্যার শিল্পে রফতানি আয়ে বাংলাদেশের সাফল্য প্রসঙ্গে বলতে গিয়ে আইসিটি প্রতিমন্ত্রী জুনাইদ আহমেদ পলক জনকণ্ঠকে বলেন, বর্তমান সরকার এ খাতকে কর অবমুক্ত ঘোষণা করেছে। ফলে প্রতিবেশী যে কোন দেশের তুলনায় আমরা অধিক সুবিধা পাচ্ছি। বহির্বিশ্বে ক্রমাগত আমাদের প্রাপ্ত সুবিধা বৃদ্ধি পেতে থাকবে। ’১৮ সালের মধ্যে এক বিলিয়ন ডলার, ’২১ সালের মধ্যে ৫ বিলিয়ন ডলার রফতানি আয় আমাদের প্রধান লক্ষ্য। আইসিটি খাতে বর্তমানে আয় ৩০০ মিলিয়ন ডলার, শতাংশিক হিসেবে প্রবৃদ্ধির হার ২০০ শতাংশ। ইতোমধ্যে সাড়ে ৩ হাজার এ্যাপস তৈরি করেছি। কয়েক বছরের মধ্যে এ খাতে আরও দেড় লাখ প্রোগ্রামার ও ফ্রিল্যান্সার তৈরি হবে। তখন এ আয় আরও বৃদ্ধি পাবে।

দেশের সফটওয়্যার ও আইসিটি সেবা প্রতিষ্ঠানগুলো সম্পর্কে বলতে গিয়ে পলক বলেন, আগামী ৫ বছরে এককভাবে বেশ কয়েকটি কোম্পানি বিলিয়ন ডলার আয় করতে পারবে। বর্তমানে প্রথম সারির কোম্পানিগুলো ৩০ এর অধিক দেশে আইসিটি পণ্য ও সেবা রফতানি করছে। এক প্রশ্নের জবাবে প্রতিমন্ত্রী বলেন, পেপ্যল নিয়ে আমরা কাজ করছি। আশা করি দ্রুত সময়ের মধ্যে পেপ্যল সেবাদানকারী প্রতিষ্ঠানগুলোকে এ দেশে নিয়ে আসতে পারবো। সর্বোপরি বর্তমানে রফতানি আয় বৃদ্ধিতে আইসিটি খাতের সামগ্রিক পরিস্থিতি অনুকূল ও ইতিবাচক।

সর্বাধিক পঠিত:
পাতা থেকে: