২০ নভেম্বর ২০১৭,   ঢাকা, বাংলাদেশ   শেষ আপডেট ৪ ঘন্টা পূর্বে  
Login   Register        
ADS

মুক্ত বাট-আসিফ, তবে....


প্রবাদে আছে ‘দুষ্ট গুরুর চেয়ে শূন্য গোয়াল ভাল’। মঙ্গলবার পাঁচ বছরের নিষেধাজ্ঞা শেষ হয়েছে সালমান বাট, মোহাম্মদ আসিফ ও মোহাম্মদ আমিরের। তিন জনকে জাতীয় দলে ফেরানো হবে কি না- এ নিয়ে তৈরি হয়েছে বিতর্ক। সাধারণ অনেকের সঙ্গে গ্রেট জাভেদ মিয়াঁদাদ, এমনকি বর্তমান টি২০ অধিনায়ক শহীদ আফ্রিদিও কলঙ্কিত ক্রিকেটারদের দলে দেখতে চান না! কলঙ্কের হোতাদের দলে ফেরালে চরিত্রবান-তরুণ ক্রিকেটারদের মধ্যে বিরূপ প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি হবে বলে মনে করছেন তারা। অবশ্য আমিরের বয়স কম হওয়ায় তার প্রতি কিছুটা সহানুভূতি রয়েছে সবার। ২০১০ সালে ইংল্যান্ড সফরে লর্ডস টেস্টে স্পট ফিক্সিংয়ে জড়িয়ে পড়েন দলটির তৎকালীন অধিনায়ক বাট এবং সতীর্থ পেসার আসিফ ও আমির।

বয়স কম হওয়ায় কিশোর সংশোধন কেন্দ্রে কাটিয়ে আমির আগেই দায়মুক্তি পেয়েছেন, এরই মধ্যে ঘরোয়া ক্রিকেটে খেলারও অনুমতি মিলেছে তার। এক বিজ্ঞপ্তির মধ্য দিয়ে বাট ও আসিফের শাস্তির মেয়াদ শেষ হওয়ার বিষয়টি নিশ্চিত করে ক্রিকেটের নিয়ন্ত্রক সংস্থা আইসিসি জানায়, ‘সেপ্টেম্বর ২০১৫Ñ বাট ও আসিফের দু’জনেরই নিষেধাজ্ঞা এবং পুনর্বাসন প্রক্রিয়ার মেয়াদ শেষ হচ্ছে। ওই দিন থেকে আমিরের সঙ্গে তারা দু’জনও ঘরোয়া এবং আন্তর্জাতিক পর্যায়ে ক্রিকেট খেলতে পারবেন’ বিজ্ঞপ্তিতে উল্লেখ করে আইসিসি। সংস্থাটির দুর্নীতি দমন বিধিতে সংশোধনী আনার পর চলতি বছর জানুয়ারিতে মোহাম্মদ আমিরের পাঁচ বছরের নিষেধাজ্ঞা শিথিল করা হয়। ফলে ছয় মাস আগেই তিনি ঘরোয়া ক্রিকেটে খেলার অনুমতি পান। বয়স কম হওয়ায় আমিরের প্রতি সহানুভূতি থাকলেও বাট-আসিফের জাতীয় দলে প্রত্যাবর্তন নিয়ে পাকিস্তানজুড়ে বিতর্কের তৈরি হয়েছে।

পাকিস্তান বোর্ডকে (পিসিবি) অনুরোধ জানিয়ে আফ্রিদি বলেন, ‘যেন একটু ভাবনা চিন্তা করেই সিদ্ধান্তটা নেয়া হয়। তাড়াহুড়ো করলে সেটি পাকিস্তান ক্রিকেটের জন্য খারাপ হবে। এতে ভবিষ্যতের ক্রিকেটারদের স্বার্থ জড়িত।’ আফ্রিদির মতে, এই তিন ক্রিকেটারের কেলেঙ্কারির জন্য পাকিস্তানকে অনেক ঝামেলা পোহাতে হয়েছে। এই ধাক্কা কাটিয়ে ফিরে আসতেও অনেক সময়ও লেগেছে। যেহেতু এই দুর্নীতির স্বরূপ উন্মোচনে আফ্রিদিরও ভূমিকা ছিল, তাই এই তিন ক্রিকেটারের ফিরে আসাটা খুব একটা পছন্দ হচ্ছে না তাঁর। এমনকি পাকিস্তানের বর্তমান দলের অধিকাংশ ক্রিকেটারই নাকি বাট, আসিফ ও আমিরের ফিরে আসাটা ভাল চোখে দেখছেন না। এই ত্রয়ীর সঙ্গে সাজঘর ভাগাভাগির বিষয়টিতেই মূলত অরুচি তাদের।

আর সাবেক অধিনায়ক ও কোচ জাভেদ মিয়াঁদাদ বলেন, ‘তারা বড় ধরনের অপরাধের সঙ্গে জড়িত ছিল। ক্রিকেটের যে কোন পর্যায়ে তাদের ফিরতে দেয়া ভুল হবে।’ ২০০৯ থেকে ২০১৪ পর্যন্ত পিসিবির ডিরেক্টর জেনারেল ছিলেন মিয়াঁদাদ। তিনি বলেছেন, ম্যাচ গড়াপেটা একটি বড় অপরাধ। আর দেশকে ছোট করার মতো এমন জঘন্য কাজ করার পর ওই তিন জনকে ফিরতে দেয়া ঠিক হবে না। উদাহরণ টেনে তিনি আরও যোগ করেন, ‘দেশের সঙ্গে প্রতারণা করার দায়ে অনেক ফুটবলার ও অন্য ক্রীড়াবিদরা বিশ্ব চিত্র থেকে উধাও হয়ে গেছে। তাদের পদক ও পুরস্কার পর্যন্ত কেড়ে নেয়া হয়েছে। আজকের দিনে তাদের কেউ চেনেও না।’ বাটদের আর কখনও দেশের প্রতিনিধিত্ব করার সুযোগ দেয়া ঠিক হবে না। মিয়াঁদাদের ভাষায়, ‘তারা হয়া শাস্তি খেটেছে। টাকা নিয়ে ম্যাচ পাতানোয় জড়িত হওয়ার জন্য তারা দ্বিতীয় সুযোগ পাওয়ার যোগ্য না। আমি যদি পিসিবির প্রধান হতাম তাহলে সোজা জানিয়ে দিতাম, এই তিন জনের আর কখনোই দলে ফেরার সুযোগ মিলবে না।’

নিষেধাজ্ঞার মেয়াদ শেষ হলেও তাই তিন ক্রিকেটারের প্রতি সদয় হতে পারছে না পিসিবি। এমনটাই জানিয়েছেন এক কর্তা। অক্টোবরে ইংল্যান্ডের বিপক্ষে পাকিস্তানের সিরিজ। ভারতের সঙ্গেও সিরিজ খেলার কথা হচ্ছে। সবই হবে সংযুক্ত আরব আমিরাতে। আর এসব সিরিজে ওই তিন খেলোয়াড়ের ভবিষ্যত দেখছেন না পাকিস্তনের ক্রিকেটের প্রধান নির্বাচক হারুন রশিদ। তিনি বলেছেন, ‘যে কোন পর্যায়ে তাদের ফেরার ব্যাপারে এই মুহূর্তে নির্বাচক কমিটি কোন সময় বেঁধে দিতে পারে না। আগে প্রয়োজন পাকিস্তান ক্রিকেট বোর্ডের বেঁধে দেয়া পলিসি।’ কিন্তু প্রধান নির্বাচক রশিদ বলেছেন, তারা সময় নিতে পারেন। ৫ বছরের জন্য নিষিদ্ধ ছিল তারা। তাই ফিরেই তারা কয়েকটি ম্যাচে ভাল করলে সেই অনুযায়ী তাদের বিচার করা ঠিক হবে না। রশিদ যোগ করেন, ‘পিসিবি এর মধ্যে এ সংক্রান্ত একটি বিবৃতি প্রকাশ করেছে। তারা অপেক্ষা করছে বাট ও আসিফের ব্যাপারে আইসিসির কাছ থেকে ব্যাখ্যা পেতে। একটা নীতি নির্ধারণ করা হবে।’

তবে দু’জনই ফিরতে মরিয়া। বাটের বর্তমান বয়স ৩০। তিন জনকেই নিজ নিজ সময়ে পাকিস্তানের অন্যতম প্রতিভাবান ক্রিকেটার বলে মনে করা হতো। ওপেনিংয়ে ব্যাটিং করা বাটের নেতৃত্বে অস্ট্রেলিয়া ও ইংল্যান্ডের বিপক্ষে টেস্ট জয়ের স্বাদ পেয়েছিল দেশটি। ‘মাঠে গিয়ে ব্যাটিং করতে আমার আর তর সইছে না। ভুলের জন্য দেশের মানুষের কাছে ক্ষমা চেয়েছি, তবে ক্রিকেট মাঠে ফেরাটাই হবে সত্যিকারের মুক্তি। নিজেকে আবারও প্রমাণ করতে চাই।’ স্থানীয় সংবাদ মাধ্যমকে বলেন আবেগাপ্লুত বাট। অন্যদিকে এ বছরই ৩৩Ñএ পা দেবেন আসিফ, যিনি এক সময় বল হাতে বিশ্ব কাঁপিয়েছেন। দুরন্ত সুইংয়ে নাকাল করেছেন প্রতিপক্ষ ব্যাটসম্যানদের। সেই আসিফ বলেন, ‘এটা আমার জন্য ছিল কঠিন এক অপেক্ষা। নেটে বোলিং শুরু করেছি। মূল ধারার ক্রিকেটে ফিরতে এখন সামনের দিকে তাকিয়ে আছি।’

সহানুভূতি পাওয়া ২৩ বছর বয়সী আমির অবশ্য অস্থির নন। ঘরোয়া ক্রিকেটের মাধ্যমে ফর্ম ও ফিটনেসের প্রমাণ দিয়ে তবেই জাতীয় দলে ফিরতে চান প্রতিভাবান এই বাঁহাতি পেসার। ২০১০-এর আগস্টে লর্ডস টেস্টে বাজির হোতা মাজহার মাজেদের সঙ্গে ফিক্সিংয়ের সূত্র ধরে ইচ্ছাকৃত ‘নো বল’ করে গোটা বিশ্বকে নাড়িয়ে দিয়েছিলেন আসিফ ও আমির। নেপথ্যে সঞ্চালকের ভূমিকায় ছিলেন অধিনায়ক বাট। খবরটি ফাস করেছিল ব্রিটিশ ট্যাবলয়েড ‘নিউজ অব দ্য ওয়ার্ল্ড’। তদন্তে অভিযোগ প্রমাণিত হওয়ায় ২ সেপ্টেম্বর ’১০ আইসিসি প্রাথমিকভাবে বাটকে ১০, আসিফকে ৭ ও আমিরকে ৫ বছরের জন্য নিষিদ্ধ করে। আপীলের পর তিনজনের শাস্তি কমিয়ে ৫ বছর করা হয়।