১৮ অক্টোবর ২০১৭,   ঢাকা, বাংলাদেশ   শেষ আপডেট এই মাত্র  
Login   Register        
ADS

তারকা ঝলকে আলোকিত বেজিং


সেরাদের অনেকেরই বয়স বেড়ে যাওয়ার কারণে এবার বেজিংয়ে ভিন্ন চিন্তা ছিল সবার। হয়ত নতুন করে আকর্ষণীয় ও জনপ্রিয় ইভেন্টগুলোর সেরা হবেন কেউ। বিশেষ করে এ্যাথলেটিক্সের অন্যতম আকর্ষণ ১০০ মিটার স্প্রিন্টে বিশ্বরেকর্ডধারী সর্বকালের সবচেয়ে গতিধর মানব জ্যামাইকার উসাইন বোল্টের দিকে কেন্দ্রীভূত ছিল সবার দৃষ্টি। পারবেন তো বোল্ট? চরম প্রতিপক্ষ মার্কিন গতিতারকা জাস্টিন গ্যাটলিনের সুবর্ণ সময় যাচ্ছিল। তার কাছেই হয়ত পতন ঘটবে ‘বিদ্যুত’ গতির বোল্টের। কিন্তু সেসব কিছুই হয়নি। আবারও ট্রেবল জিতেছেন বোল্ট। চীনের বেজিংয়ে শেষ হয়েছে ৯ দিনের মহাযজ্ঞ। বিশ্ব এ্যাথলেটিক্স চ্যাম্পিয়নশিপসে এবার শ্রেষ্ঠত্ব নিয়ে শেষ করেছে কেনিয়া। সর্বাধিক ৭ স্বর্ণসহ ১৬ পদক নিয়ে শেষ করেছে তারা। যদিও বেশি পদক জয়ের দিক থেকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রই এগিয়ে। ৬ স্বর্ণ, রৌপ্য ও ব্রোঞ্জ জিতে তাদের সংগ্রহ ১৮ পদক। কিন্তু সেরা দল হিসেবে ঘরে ফিরেছে কেনিয়ার এ্যাথলেটরাই। প্রথমবারের মতো বিশ্ব আসরে সেরা হওয়ার খেতাব জিতেছে তারা। কিন্তু কেনিয়ার নির্দিষ্ট কোন এ্যাথলেটের দিকে বিশ্বের ক্রীড়ামোদীদের তেমন আকর্ষণ ছিল না। সব নজর কেড়ে নিয়েছিলেন আগের আসরগুলোয় উদ্ভাসিত নৈপুণ্য দেখানো কয়েক তারকা। তাদের সাফল্য নিয়েই এবারের লেখাÑ

উসাইন বোল্ট ॥ ৬ সপ্তাহ ট্র্যাক এ্যান্ড ফিল্ডের বাইরে ছিলেন এবং বেজিংয়ে আসার আগ পর্যন্ত মাত্র দু’বার ১০ সেকেন্ডের নিচে টাইমিং। মৌসুমে ব্যক্তিগত সেরা ৯.৮৭ সেকেন্ড টাইমিং নিয়ে র‌্যাঙ্কিংয়ে ৬ নম্বরে অবস্থান। সে কারণে এবার বোল্টের সাম্রাজ্য লুণ্ঠন করবেন মার্কিন স্প্রিন্টার জাস্টিন গ্যাটলিন এমনটাই মনে করেছেন অনেকে। কারণ টানা ২৮ রেস জয় এবং মৌসুম সেরা ৯.৭৪ টাইমিং বলছিল বোল্টের চেয়ে বর্তমান সময়ে এগিয়ে আছেন তিনি। তবে মূল লড়াইয়ে আর পারলেন না গ্যাটলিন। যেমনটা তিনি আগে সাতবারের লড়াইয়ে ছয়বারই পারেননি। এবার অবশ্য ১০০ মিটারে দারুণ লড়াই হয়েছিল দু’জনের মধ্যে। উত্তেজনাটাও তাই সর্বোচ্চ বিন্দু পেরিয়ে গিয়েছিল উপস্থিত দর্শকদের। কিন্তু সেই দম বন্ধ করে রাখা চরম উত্তেজনা মাত্র ৯.৮০ সেকেন্ড স্থায়ী হয়েছে। কারণ ৯.৭৯ সেকেন্ডে আবারও দ্রুততম মানব হয়েছেন বোল্ট এবং ৯.৮০ সেকেন্ড টাইমিং নিয়ে পুরনো দিনের মতোই ‘বিদ্যুত’ বোল্টের পেছনে থেকে গেছেন গ্যাটলিন। এরপর ২০০ মিটার এবং ৪^১০০ মিটার রিলেতেও বোল্টের কাছে নতি স্বীকার করেছেন তিনি। আবারও ট্রেবল জয় করে ফিরেছেন বিশ্বসেরা বোল্ট।

ড্যাফনে শিপার্স ॥ মস্কোয় দুই বছর আগের বিশ্ব আসরে তিনি অংশ নিয়েছিলেন হেপ্টাথলনে। এবার কোচের অনুপ্রেরণায় অনুশীলন নিয়ে বিশ্ব আসরের স্প্রিন্ট ইভেন্টে অংশ নিয়েছেন। যদিও বিশ্বের দ্রুততম মানবী হতে পারেননি অল্পের জন্য, অভিজ্ঞ শেলী এ্যান ফ্রেজার-প্রাইসের কাছে হেরে গেছেন। তবে সেখানেও গড়েছেন জাতীয় রেকর্ড। কিন্তু ২০০ মিটারে নতুন চ্যাম্পিয়নশিপস রেকর্ড গড়েছেন। ৩৬ বছর আগের রেকর্ড ভেঙ্গে দিয়েছেন, হয়েছে নতুন ইউরোপিয়ান রেকর্ডও। তিনি সময় নেন ২১.৬৩ সেকেন্ড। ১৯৭৯ সালে ইউরোপ সেরা টাইমিং গড়েছিলেন মারিটা কচ। সেটা ভেঙ্গে দিয়েছেন। গত বছর ইউরোপিয়ান চ্যাম্পিয়নশিপসে ডাবল জয়ের পর তিনিই ছিলেন ফেবারিট। শিপার্সের টাইমিং তার সাত বছরের কোচ বেনেমাকেও করেছে দারুণ বিস্মিত। তার বিশ্বাস ছিল শিপার্স জিতবেন, কিন্তু রেকর্ড গড়বেন টাইমিংয়ের, সেটা কোনভাবেই বিশ্বাস করতে পারছিলেন না। যদিও আনন্দিত শিপার্স প্রতিক্রিয়ায় বলেন, ‘আমি কঠোর পরিশ্রম করেছি এর জন্য। আমি জানি আমি একেবারেই নিখাদ।

মো ফারাহ ॥ জয়ের পর ব্যতিক্রমী এক ধরনের উদযাপন করেন ফারাহ। সেটা অনেকখানিই রোবটিক। ফারাহর সঙ্গে মিলিয়ে সেই উদযাপনের নাম দেয়া হয়েছে ‘মোবট’। বেজিংয়ের বার্ডস নেস্ট প্রথমবারের মতো অবলোকন করল মোবটের। ক্যারিয়ারের তৃতীয়বার ডাবল জিতেছেন সোমালিয়া বংশোদ্ভূত এই ব্রিটিশ দূরপাল্লার দৌড়বিদ। আগের বিশ্ব আসরে ডাবল জিতেছিলেন। এবারও ডাবল জিতে নতুন ইতিহাস সৃষ্টি করেছেন তিনি। কারণ এর আগে বিশ্ব এ্যাথলেটিক্সের ইতিহাসে আর কোন দৌড়বিদ ৫ ও ১০ হাজার মিটার দৌড়ে টানা দু’বার চ্যাম্পিয়ন হতে পারেননি। ২০১২ অলিম্পিকেও ডাবল জিতেছিলেন তিনি। সব মিলিয়ে ক্যারিয়ারে ট্রিপল ‘ডাবল’ হয়ে গেল ফারাহর। জয়ের পর ফারাহ বলেন, ‘যখন মানুষ প্রশ্ন করে- তুমি কী করছ মো? আমি তাদের উত্তর দিই যে, জীবনটা সংক্ষিপ্ত তাই মজা করে কাটাচ্ছি।’

এ্যারিস মেরিট ॥ কিছুটা আবেগী ও ট্র্যাজিক গল্পই বলা যেতে পারে। পুরুষদের ১১০ মিটার হার্ডেলসে ফেবারিট ছিলেন মার্কিন এই এ্যাথলেট। কিন্তু সেই প্রত্যাশা পূরণ করা নিয়ে ছিল সংশয়। কারণ কিডনি সমস্যা। সেই সমস্যাকে জয় করে শেষ পর্যন্ত ব্রোঞ্জ জিতে বিস্ময় গড়েছেন। কারণ ১১০ মিটার হার্ডেলস শেষ করেই তিনি বেজিং ছেড়েছেন কিডনি প্রতিস্থাপনের জন্য। এ কারণে অলিম্পিক চ্যাম্পিয়ন মেরিট বলেন, ‘এই ব্রোঞ্জ আমার কাছে অলিম্পিক স্বর্ণের চেয়েও অনেক বড় কিছু। ২০১৩ সালে ডাক্তাররা বলেছিলেন আমি আর দৌড়াতে পারব না। কিন্তু সত্যি আমি একটা গর্ব নিয়েই এখন জীবনটা শেষ করতে পারব।’ শেলী এ্যান ফ্রেজার-প্রাইস ॥ গতির সম্রাট যেমন বোল্ট তেমনি পিছিয়ে নেই তার স্বদেশী শেলী। তিনি গতির সম্রাজ্ঞী। এবারও সেই মর্যাদা অটুট রেখেছেন জ্যামাইকান তরুণী। এবার ১০.৭৬ সেকেন্ড সময় নিয়ে স্বর্ণপদক জয় করেন শেলী। হল্যান্ডের ২৩ বছর বয়সী উদীয়মান তারকা শিপার্সকে অনেকেই ফেবারিট ধরে নিয়েছিলেন। কিন্তু শেষ পর্যন্ত হেরেই গেছেন শেলীর কাছে। ১০.৮১ সেকেন্ড নিয়ে এ ডাচ্ তারকা রৌপ্য এবং যুক্তরাষ্ট্রের টোরি বাউয়ি ১০.৮৬ সেকেন্ড সময় নিয়ে ব্রোঞ্জ জেতেন। সেমিফাইনালে মাত্র ১০.৮২ সেকেন্ড টাইমিং গড়ার পরই প্রায় নিশ্চিত হয়ে গিয়েছিল আবারও বিশ্বের দ্রুততম মানবী হিসেবে নিজেকেই ধরে রাখতে যাচ্ছেন শেলী। অবশেষে সেটাই সত্য হলো। এবার নিয়ে মোট তিন বিশ্ব চ্যাম্পিয়নশিপসের স্বর্ণ জিতলেন শেলী। তিনি বোল্টের মতোই ২০০৯ ও ২০১৩ সালেও ১০০ মিটারে স্বর্ণ জিতেছিলেন। এছাড়া দুটি অলিম্পিক স্বর্ণও জিতেছেন শেলী। জেসিকা ইন্নিস হিল ॥ গত বছর ট্র্যাক এ্যান্ড ফিল্ড থেকে ১৮ মাস দূরে ছিলেন বহুমুখী এ্যাথলেটিক্সের এ রানী। সন্তান জন্মদানের জন্য সরে দাঁড়ানোর পর আবারও ফিরেছিলেন। নিজেকে প্রস্তুত করেছেন বিশ্ব আসরের জন্য। সবাইকে অবাক করে দিয়ে ঠিকই শ্রেষ্ঠত্ব পুনরুদ্ধার করেছেন জেসিকা। হেপ্টাথলনে ২০১১ বিশ্ব আসরে শ্রেষ্ঠত্ব হারানো জেসিকা ২০১৩ সালেও ব্যর্থ হয়েছিলেন, কিন্তু আবার স্বর্ণ জিতেছেন তিনি। সব মিলিয়ে মৌসুম সেরা ৬৬৬৯ পয়েন্ট নিয়ে তিনি স্বর্ণ জয় করেন। হেপ্টাথলনের রানী বলা হয় তাকেÑ বিষয়টা এমন নয়। বিশ্বসেরা যেমন হয়েছিলেন, তেমনি গত অলিম্পিকে ২০১২ সালে লন্ডনে এবং ২০১০ সালে বার্সিলোনায় ইউরোপিয়ান চ্যাম্পিয়নশিপসে স্বর্ণ জিতেছেন তিনি। এ্যাশটন ইটন ॥ এবারের বিশ্ব আসরে বিশ্বরেকর্ডের অভাব ছিল। একমাত্র বিশ্বরেকর্ডটাই গড়েছেন ইটন। মার্কিন এ আয়রনম্যান পুরুষদের ডেকাথলনে আগে থেকেই ছিলেন ফেবারিট। সেই তকমাটা ধরে রেখে জিতেছেন স্বর্ণপদক। ধরে রেখেছেন গত আসরের খেতাবটা। সব মিলিয়ে ৯ হাজার ৪৫ পয়েন্ট স্কোর করেন তিনি, যা নতুন বিশ্বরেকর্ড। এর আগের বিশ্বরেকর্ডটাও ছিল তাঁর নিজেরই গড়া। ৬ পয়েন্ট পেছনে ফেলেছেন পুরনো রেকর্ডটাকে। শুধু তাই নয়, ডেকাথলনের ৪০০ মিটারে মাত্র ৪৫ সেকেন্ড এবং ১০০ মিটারে ১০.২৩ সেকেন্ড সময় নিয়ে নতুন চ্যাম্পিয়নশিপস রেকর্ড গড়েছেন। এ বিষয়ে ইটন পরে বলেন, ‘আমার মনে হয় ঘড়িটা এক সেকেন্ডের জন্য বন্ধ ছিল। তাদের এখনই গিয়ে সেটা ঠিক আছে কিনা পরখ করা উচিত।’

এবার সেরা দল হয়েছে কেনিয়া। কেনিয়ার এ্যাথলেটরা সর্বাধিক ১৬ পদক (৭ স্বর্ণ, ৬ রৌপ্য ও ৩ ব্রোঞ্জ) জিতে শ্রেষ্ঠত্ব নিয়ে শেষ করেছে। সমান ৭ স্বর্ণ জিতলেও জ্যামাইকা ২ রৌপ্য ও ৩ ব্রোঞ্জসহ ১২ পদক নিয়ে দ্বিতীয় অবস্থানে থেকে শেষ করেছে। ১৮ পদক নিয়ে যুক্তরাষ্ট্র তৃতীয় এবং মাত্র একটি স্বর্ণ জেতা স্বাগতিক চীন ৭ রৌপ্য ও ১ ব্রোঞ্জসহ ৯টি পদক নিয়ে একাদশ স্থান নিয়ে শেষ করেছে।