মেঘলা, তাপমাত্রা ৩১.১ °C
 
২২ আগস্ট ২০১৭, ৭ ভাদ্র ১৪২৪, মঙ্গলবার, ঢাকা, বাংলাদেশ
সর্বশেষ

‘অনুপ্রেরণা শিকারি দাদার বন্দুক!’ ॥ শুটার অবন্তী বললেন

প্রকাশিত : ২ সেপ্টেম্বর ২০১৫
  • রুমেল খান

‘দাদার একটা বন্দুক ছিল। তিনি খুব ভাল শিকারি ছিলেন। তার মুখেই শিকার করার অনেক রোমাঞ্চকর গল্প শুনেছি। সেগুলো শুনে অনেক ভাল লাগত। সেই বন্দুক উত্তরাধিকার সূত্রে বাবা পান। তিনিও ওই বন্দুক দিয়ে শিকার করেছেন। আমাদের পিরোজপুর হচ্ছে দক্ষিণ অঞ্চলে। এখানে অনেক বন-জঙ্গল আছে। কাজেই শিকার করার জন্য অনেক প্রাণী আছে। দাদা মোবারক আলী দুই বছর আগে মারা গেছেন। কিন্তু তার ওই বন্দুকটি আছে এখনও। বলতে পারেন ওই বন্দুকটিই আমাকে শূটার হতে অনুপ্রেরণা জুগিয়েছে।’

কথাগুলো যার, তার নাম ফাতেমা মেহনাজ খান অবন্তী। ষোড়শী সুর্দশনা নবীনা এক শূটার। নিবাস পিরোজপুর। বাবা এ্যাডভোকেট খান মোহাম্মদ আলাউদ্দিন। মা পিরোজপুর উপজেলার মহিলা ভাইস চেয়ারম্যান আনিসা খান। তাদের দুই কন্যা। কনিষ্ঠজনই অবন্তী। এখন সে পড়ছে বাংলাদেশ ক্রীড়া শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে (বিকেএসপি) উচ্চ মাধ্যমিকে, মানবিক বিষয় নিয়ে।

ঢাকার গুলশানে অবস্থিত জাতীয় শূটিং কমপ্লেক্সে কদিন আগেই অনুষ্ঠিত হয় ‘জাতীয় যুব প্রতিযোগিতা।’ তিন দিনব্যাপী এই প্রতিযোগিতা শুরুর আগের দিন শূটিং কমপ্লেক্সে কথা হয় অবন্তীর সঙ্গে। আলাপনে সে জানায় আরও একটি ঘটনা আছে তার জীবনে, যেটিও তাকে শূটার হতে উৎসাহ জুগিয়েছে।

কী সেই ঘটনা? ‘ছোটবেলা থেকেই দেখতাম বাসার ছাদে বাবা প্রচুর কবুতর পালতেন। এটা ছিল তার শখ। আমি তখন ক্লাস সেভেনে পড়ি। একদিন দেখা গেল, কবুতরের সংখ্যা কমে আসছে। খোঁজ নিয়ে জানা গেল এক দুষ্ট বিড়াল কবুতরগুলো সাবাড় করছে। একদিনের ঘটনা। বাবা একজোড়া দামী কবুতর কিনে এনেছেন। ছাদে সেগুলোকে নিয়ে গেলেন। তখন কবুতরখেকো বিড়ালটা নিমিষেই একটা কবুতর খেয়ে ফেলল চোখের সামনেই! এবার বাবা ভীষণ রেগে গেলেন। তিনি পিরোজপুর রাইফেলস ক্লাবের আজীবন সদস্য। তিনি করলেন কিÑ ক্লাব থেকে একটা রাইফেল নিয়ে এলেন গুলি ভরে। তারপর বিড়ালটাকে গুলি করে মারলেন! ওই ঘটনাটি দেখে আমার শূটার হওয়ার অনুপ্রেরণা আরও বেড়ে যায়।’ পরের বছর অষ্টম শ্রেণীতে ওঠে বিকেএসপিতে ভর্তি হয় অবন্তী। প্রথম সুযোগেই বেছে নিল প্রিয় খেলাটিÑ শূটিং। যদিও শুরুর দিকে এই খেলাটি সম্পর্কে তেমন কোন সুস্পষ্ট ধারণা ছিল না তার। ধারণাটা তাহলে প্রথম কিভাবে হলো? ‘সেটা আরেক কাহিনী।’ অবন্তীর ভাষ্য। ‘পিরোজপুরের চারমারি নামে একটা জায়গা আছে, ওখানে প্রতিবছর একটা উন্মুক্ত শূটিং প্রতিযোগিতা অনুষ্ঠিত হতো। ২০১১ সালে একবার বাবা আমাকে সেখানে নিয়ে যান। ওখানে গিয়েছিলাম স্রেফ দর্শক হিসেবে। বাবা বললেন, শূটিং খেলব কি না, একবার চেষ্টা করে দেখতে বললেন। আমি চেষ্টা করলাম এবং ছেলেমেয়ে মিলে সবার মধ্যই প্রথম স্থান অধিকার করে ফেললাম! ওটা ছিল ১০ মিটার এয়ারগান ইভেন্ট। এছাড়া ৫০ মিটার রাইফেলে হলাম চতুর্থ।’

২০১২ সাল থেকে বিকেএসপির কোচ আসবাব আলী ফয়েজের অধীনে প্রশিক্ষণ নেয়া অবন্তী কৃতজ্ঞচিত্তে স্মরণ করে তার প্রতিষ্ঠান বিকেএসপির অবদান, ‘বিকেএসপি আমাকে অনেক কিছু দিয়েছে, দিচ্ছে। বিকেএসপির কারণেই আমি বিদেশে যেতে পেরেছি। এমন সাহায্য-সহযোগিতা মনে হয় না ভবিষ্যতে অন্য কোন প্রতিষ্ঠান থেকে পাব।’ ২০১২ সালে বিকেএসপির সঙ্গে গাঁটছড়া বাঁধার পর ৩ জুন জন্ম নেয়া অবন্তীর এ পর্যন্ত শূটিং কর্মকা-গুলো হচ্ছে এ রকমÑ ২০১২ সালে জাতীয় এয়ারগান চ্যাম্পিয়নশিপে (জুনিয়র) ১০ মিটার এয়ার পিস্তলে চতুর্থ, ওই বছর বাংলাদেশ গেমসে ১০ মিটার এয়ার পিস্তলে একাদশ, ২০১৪ সালে কুয়েতে সাত দিনের জন্য শূটিংয়ে উচ্চতর প্রশিক্ষণ গ্রহণ (ওটাই অবন্তীর প্রথম বিদেশ সফর), ওই বছরই জাতীয় এয়ারগান চ্যাম্পিয়নশিপে ১০ মিটার এয়ারগান ইভেন্টে জুনিয়র বিভাগে স্বর্ণপদক লাভ (ক্যারিয়ারের প্রথম সাফল্য)। এছাড়া ২০১৫ সালের মেতে চীনে ২০ দিনের জন্য উচ্চতর প্রশিক্ষণ নিতে যাওয়া (বিওএর মাধ্যমে)। এরপর সর্বশেষ ভারতের দিল্লীতে অনুষ্ঠিতব্য একটি শূটিং প্রতিযোগিতার জন্য ট্রায়াল কম্পিটিশনে দ্বিতীয় হওয়া। অবন্তীর আদর্শ শূটার বিকেএসপির পিস্তর কোচ ফারহানা কাওসার রনি। অবন্তীর প্রত্যাশাÑ অনেক শিরোপা জিতে বিকেএসপির সুনাম আরও বৃদ্ধি করা। ভবিষ্যত লক্ষ্য কী? ‘শুটিংয়ে ভাল কিছু করা। সেজন্য এগুতে চাই ধাপে ধাপে। এক লাফে আমি কখনই মগডালে পৌঁছতে চাই না। পর্যায়ক্রমে অংশ নিয়ে সাফল্য পেতে চাই এশিয়ান গেমস, কমনওয়েলথ গেমস এবং সবশেষে অলিম্পিক শূটিংয়ে। জীবনে সফল হতে হলে অবশ্যই স্বপ্নের পরিধি থাকতে হবে অনেক বড়। আমার মা-বাবা আমাকে এ বিষয়ে অনেক সমর্থন-উৎসাহ দেন।’ বিদায় নেয়ার আগে মিষ্টি হেসে জানিয়ে গেল অবন্তী। অদূর ভবিষ্যতে অবন্তীর সফল শূটার হওয়ার এই সুনীল স্বপ্ন কতটা সত্যি হয়, সেটা বলে দেবে সময়ই।

প্রকাশিত : ২ সেপ্টেম্বর ২০১৫

০২/০৯/২০১৫ তারিখের খবরের জন্য এখানে ক্লিক করুন


শীর্ষ সংবাদ: