মেঘলা, তাপমাত্রা ৩১.১ °C
 
২১ আগস্ট ২০১৭, ৬ ভাদ্র ১৪২৪, সোমবার, ঢাকা, বাংলাদেশ
সর্বশেষ

মার্কিন পুলিশের ওপর আস্থা কেন কমছে

প্রকাশিত : ২ সেপ্টেম্বর ২০১৫
  • এনামুল হক

নানা কারণে আমেরিকার পুলিশ বাহিনী ইদানীং আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে এসেছে। তার মধ্যে ইতিবাচক নেতিবাচক দুটো দিকই আছে। পুলিশের কিছু কিছু কার্যকলাপ, বিশেষ করে মন্টানার ফার্গুসনে গুলি করে এক নিরপরাধ কৃষ্ণাঙ্গ যুবককে হত্যার মতো ঘটনা নিয়ে তীব্র সমালোচনার ঝড় উঠেছে। পুলিশের ভূমিকা প্রশ্নবিদ্ধ। মানুষ সঙ্গতভাবেই প্রশ্ন তুলেছে যে, খারাপ আচরণের কারণে পুলিশের জবাবদিহির পর্যাপ্ত ব্যবস্থা কি রাখা হয়েছে? আবার অন্যদিকে পুলিশকে নিয়ে কিছু ভ্রান্ত ধারণারও যেমন জন্ম হয়েছে, তেমনি পুলিশের দায়িত্ব উত্তরোত্তর বিপজ্জনকও হয়ে দাঁড়িয়েছে।

গোটা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে পুলিশ অফিসারের সংখ্যা ৬ লাখ ৮০ হাজার। প্রতি ৪৬৯ নাগরিকের জন্য পুলিশ আছে ১ জন। মার্কিন পুলিশদের শিক্ষাদীক্ষার মান যে খুব উঁচ,ু তা বলা যাবে না। এদের ২১ শতাংশের রয়েছে হাইস্কুল ডিপ্লোমা কিম্বা তারও কম কিছু। ৩৬ শতাংশের ব্যাচেলর কি তারও ওপরের ডিগ্রী আছে। ৪৪ শতাংশ কোন না কোন কলেজে পড়া শেষ করেছে। এদের মাঝারি স্তরের বয়স ৪০। পুলিশদের ১২ শতাংশ মহিলা। গোটা পুলিশ বাহিনীর ৮০ শতাংশ সদস্য শ্বেতাঙ্গ, ১৬ শতাংশ কৃষ্ণাঙ্গ, ১৩ শতাংশ হিসপানিক এবং ২ শতাংশ এশীয়।

আমেরিকার এক পুলিশের মাঝারি স্তরের মোট বার্ষিক বেতনের পরিমাণ ৫৯ হাজার ৫৬০ ডলার। সর্বনিম্ন আয় ৩২ হাজার ৭৪০ ডলার এবং সর্বোচ্চ ৮৮ হাজার ৫৩০ ডলার। পুলিশের ওপর এমনিতে জনগণের যথেষ্ট আস্থা আছে। তবে ইদানীং কিছু কিছু ঘটনার কারণে তা হ্রাস পেয়েছে। চলতি বছরের জুন মাসে ৫২ শতাংশ মার্কিন নাগরিক পুলিশের ওপর আস্থা প্রকাশ করেছে। আগের বছর এই সংখ্যা ছিল আরও ৪ শতাংশ বেশি। অর্থাৎ জনগণের আস্থার মাত্রা ১৯৯৩ সালের স্তরে নেমে এসেছে, যা হলো কিনা সর্বনিম্ন। ১৯৯১ সালে লস এ্যাঞ্জেলেসে পুলিশ অফিসারদের হাতে রডনি কিং প্রহৃত হওয়ার পর ১৯৯৩ সালে আস্থার মাত্রাটা ওই পর্যায়ে নেমেছিল। তেমনি ২০১৪ সালে ফার্গুসনের ঘটনার জন্য পুলিশের ওপর আস্থা ওই মাত্রায় নেমে আসে।

চলতি বছর পুলিশ অফিসারদের হাতে যুক্তরাষ্ট্রে ৬০১ জন মারা গেছে। একই সময় পুলিশ অফিসার নিহত হয় ৭২ জন। এভাবে পুলিশের হাতে মৃত্যুর ঘটনা যেমন রয়েছে, তেমনি পুলিশও মারা পড়ছে আগের চেয়ে বেশি। ট্রাফিক দুর্ঘটনায়ও বছরে ৫০ জনের মতো পুলিশ মারা যাচ্ছে। এক পুলিশ অফিসারের অস্ত্র থেকে প্রতিটি গুলিবর্ষণের জন্য গোটা পুলিশ বিভাগের সুনাম প্রশ্নের সম্মুখীন হয়।

ভাল বেতনের জন্য অনেকে পুলিশ বিভাগে যোগ দিতে আকর্ষণ বোধ করে। বিল উলফ (৫৭) নামে এ্যারিজোনার প্রেসকোর্টের এক পুলিশ অফিসারের কথাই ধরা যাক। ওহাইও রাজ্য থেকে রুশ ইতিহাসের ওপর পিএইচডি করা এই ব্যক্তিটি একটা কমিউনিটি কলেজে ইতিহাস পড়াতেন। কিন্তু সপ্তাহে ৫০ থেকে ৬০ ঘণ্টা খেটে তাঁর বার্ষিক আয় দাঁড়াত সর্বোচ্চ ১১ হাজার ৫শ’ ডলার। কাজেই বাড়তি আয়ের জন্য অন্য কাজও করতে হতো, যেমন ড্রাইভিং। তারপর একদিন শুনলেন প্রেসকোর্টে পুলিশ অফিসার নেয়া হবে। এখন তার বয়স ৪৮ বছর। আবেদন করলেন। চাকরিও হলো, শুরুতে বেতন বছরে ৪০ হাজার ডলার। বিরাট ব্যাপার তাঁর জন্য। আমেরিকায় পুলিশ অফিসারদের গড় বার্ষিক আয় ৫৯ হাজার ডলার। বড় বড় শহরে আরও বেশি।। বিশ্ববিদ্যালয়ের ডিগ্রী ছাড়াই এমন মাঝারি আয়ের উপায় কমই আছে। তবে পুলিশ অফিসারের চাকরি উত্তরোত্তর ঝুঁকিপূর্ণ হচ্ছে। ২০১৩ সালে ২৭ পুলিশ অফিসারকে হত্যা করা হয়েছিল। বলাবাহুল্য, ওই সংখ্যাটি ছিল ৫০ বছর কি তারও বেশি সময়ের মধ্যে সর্বনিম্ন। তবে পরবর্তী দুই বছরে এই সংখ্যা বেড়েছে।

আমেরিকার পুলিশ বাহিনীতে মারাত্মক কিছু গলদ ও ঘাটতি যে আছে, তা নিয়ে তেমন কারও সন্দেহ নেই। তার একটি হলো এই পুলিশ বাহিনীতে কিছু মাত্রায় বর্ণবাদ ও অন্যায় ব্যবস্থা রয়ে গেছে। অথচ বেশিরভাগ পুলিশ অফিসারই সজ্জন ব্যক্তি, যারা অন্যের নিরাপত্তা বিধান করতে গিয়ে প্রতিদিন নিজেদের জীবনকে ঝুঁকির মুখে ঠেলে দেয়। তারপরও পুলিশের কার্যকলাপের ওপর মানুষের সন্দেহ অবিশ্বাস ব্যাপক পরিসরে বিদ্যমান। এই স্ববিরোধিতার কি ব্যাখ্যা থাকতে পারে?

শ্বেতাঙ্গ পুলিশের হাতে ধরা পড়ার সময় বা তার পরে কিছু কৃষ্ণাঙ্গ নিহত হওয়ার পর ফার্গুসন, মিসৌরি, নিউইয়র্ক, সাউথ ক্যারোলিনাসহ যুক্তরাষ্ট্রের কতিপয় শহরে পুলিশের কার্যকলাপ নিবিড়ভাবে পর্যালোচনা করে দেখা হচ্ছে। সেগুলো নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। পুলিশের ওপর জনগণের আস্থা হ্রাসে এই ঘটনাগুলোর অবদান থাকতে পারে। তথাপি একথা উল্লেখ করা গুরুত্বপূর্ণ যে, পুলিশের ওপর আমেরিকানদের আস্থার ভিত মৌলিকভাবে কেঁপে ওঠেনি।

সামগ্রিকভাবে ৫২ শতাংশ আমেরিকান পুলিশ নামক প্রতিষ্ঠানটির ওপর আস্থা রাখে। এই প্রতিষ্ঠানের ওপর আস্থা আছে ৬০ শতাংশেরও বেশি শ্বেতাঙ্গ ও ৫৭ শতাংশ হিসপ্যানিক আমেরিকানের। কিন্তু কৃষ্ণাঙ্গদের বেলায় এই সংখ্যাটা নাটকীয়ভাবে কমে এসেছে ৩২ শতাংশে। শহরাঞ্চলে কৃষ্ণাঙ্গরা পুলিশের ব্যাপারে আরও কম স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করে। বড় বড় শহরের মাত্র ২৬ শতাংশ কৃষ্ণাঙ্গ আমেরিকান বলে যে, পুলিশের ওপর তাদের আস্থা আছে। সাম্প্রতিক ফার্গুসন এবং স্ট্যাটেন দ্বীপের মামলায় গ্র্যান্ড জুরির রায়ের পর এই আস্থার অভাবটা আরও বেড়ে গেছে। কারণ রায়ে বলা হয়েছে যে, ওই দুই স্থানে কৃষ্ণাঙ্গদের মৃত্যুর ঘটনায় পুলিশ অফিসারদের অভিযুক্ত করা যাবে না। গ্র্যান্ড জুরির এই রায় নিয়ে জনমত এখনও বর্ণগত লাইনে অতিমাত্রায় বিভক্ত। ৭১ শতাংশ কৃষ্ণাঙ্গ গ্র্যান্ড জুরির এই বয়সের সঙ্গে প্রবলভাবে দ্বিমত পোষণ করে। একই ধরনের মতো হলো মাত্র ১৫ শতাংশ শ্বেতাঙ্গের। অর্থাৎ এক বিশাল বর্ণগত ব্যবধান বিদ্যমান।

পুলিশের ওপর ডেমোক্র্যাটদের আস্থা ২০১২-১৩ সালের তুলনায় গত দুবছরে ১৩ শতাংশ হ্রাস পেয়েছে। অথচ একই সময় রিপাবলিকান ও নির্দলীয়দের আস্থার কোন পরিবর্তন ঘটেনি। পুলিশের প্রতি যারা নেতিবাচক মনোভাবের পরিচয় দিয়েছে তারা পুলিশের নানা ধরনের বাড়াবাড়ি, সামরিক বাহিনীর মতো কৌশল প্রয়োগ এবং রবার বুলেট ও টিয়ার গ্যাসের ব্যবহারের কথা উল্লেখ করে থাকেন। তারা মনে করেন, সাংবাদিকদের তরফ থেকে প্রশ্নের সম্মুখীন হলে তাদের রিএ্যাকটিভ না হয়ে প্রো-এ্যাকটিভ হওয়া উচিত। কেউ কেউ মনে করে পুলিশের যতটা না আক্রমণাত্মক হওয়া উচিত, তার চেয়েও তারা বেশি আক্রমণাত্মক, অথচ তারা তেমন কোন কাজের নয়।

সূত্র: টাইম ও অন্যান্য

প্রকাশিত : ২ সেপ্টেম্বর ২০১৫

০২/০৯/২০১৫ তারিখের খবরের জন্য এখানে ক্লিক করুন


শীর্ষ সংবাদ: