২২ নভেম্বর ২০১৭,   ঢাকা, বাংলাদেশ   শেষ আপডেট ৩ ঘন্টা পূর্বে  
Login   Register        
ADS

মৌলবাদের রাষ্ট্র গঠন বনাম সেক্যুলার রাষ্ট্র গঠন


মৌলবাদ, বর্তমান মুহূর্তে, বাংলাদেশে ইসলামী রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার স্ট্র্যাটেজি গ্রহণ করেছে। এই অবস্থানের সঙ্গে বাংলাদেশ যে রাষ্ট্র গঠন প্রক্রিয়া থেকে উৎসারিত এবং ধনতান্ত্রিক ঔপনিবেশিক অব-উন্নয়নের ফল, তার সম্পর্ক নেই। বাংলাদেশ ব্রিটিশ আমল থেকে এবং পাকিস্তান আমল থেকে একটি বিশেষ ধরনের সামাজিক ও সাংস্কৃতিক ধারা তৈরি করেছে, এই ধারাটি ব্রিটিশ (এবং ইউরোপিয়ান) কলোনির বিরুদ্ধে লড়াই করেছে এবং একই সঙ্গে একটি জাতির ডি-কলোনাইজিং প্রক্রিয়ার ইতিহাস স্পষ্ট করেছে।

মৌলবাদ এই সবকিছু প্রত্যাখ্যান করে, বাংলাদেশের ইতিহাসকে দক্ষিণ এশিয়ার মুসলমানদের রাষ্ট্র গঠনের লড়াইয়ে যুক্ত করেছে এবং একই সঙ্গে মধ্য এশিয়ার মুসলমানদের জাতীয়তাবাদী লড়াইয়ের অন্তর্গত করেছে। মৌলবাদী রাষ্ট্র গঠন ও সেক্যুলার রাষ্ট্র গঠন পরস্পরবিরোধী অবস্থান নিয়েছে। মৌলবাদ বাংলাদেশের নব্য এলিট ইতিহাসের উৎসারণ, কৃষক আন্দোলনের ইতিহাস, স্থানীয় ইতিহাস, নারীবাদী ইতিহাস এবং নারীবাদী আন্দোলন তাদের ইতিহাস থেকে বাদ দিয়েছে। মৌলবাদ এসব বিভিন্ন উপাদান থেকে একটি উপাদান গ্রহণ করেছে। সেটি ধর্ম, একটি এথনিক জাতিগোষ্ঠীর ক্রিয়াকলাপ : মুসলমান : এভাবেই রাষ্ট্র গঠনের একটি ধর্ম ও একটি জাতিকে বড় করেছে মৌলবাদ। তার লড়াই আধুনিক গণতন্ত্রের বিরুদ্ধে, আধুনিক প্রজাতন্ত্রের বিরুদ্ধে, বিভিন্ন ধর্ম ও জাতির বিরুদ্ধে। এই লড়াইয়ের একদিকে আছে প্রবল জাতীয়তাবাদী মডার্নিটি, অন্যদিকে আছে ইসলামিক সাম্রাজ্যবাদী আন্দোলন। মৌলবাদ সচেষ্ট এই ইসলামী সাম্রাজ্যবাদী আগ্রাসনের ভেতরে সবচেয়ে ভয়ঙ্কর সাম্প্রদায়িক ফর্ম ঢুকিয়ে দিতে, নাগরিকত্বের মধ্যে প্রোথিত সমতার কনসেপ্ট উধাও করে দিতে।

মডার্নিটি ও রাষ্ট্র গঠনের অবস্থান থেকে ইসলামিক ঐতিহ্য ও সেক্টারিয়ানিজমের দূরত্ব বহুদূর। মৌলবাদের ন্যারেটিভ কাঠামো এবং সেক্যুলারিজমের ন্যারেটিভ কাঠামো একেবারে ভিন্ন। তার দরুন মৌলবাদ অন্য সমাজ গ্রুপ, অন্য ধর্মজ গ্রুপকে অনবরত প্রবল সম্পর্কের মাধ্যমে অধস্তন করেছে, যুক্তি-পূর্ব এবং আদিম স্ট্যাটাসকে সামনে ঠেলে দিয়েছে। আমরা যখন কৃষকদের লড়াই, নারীবাদী ইতিহাস কিংবা নন-এলিট সাংস্কৃতিক ফর্মের কথা বলি, তখন মৌলবাদীরা আল্লাহর বয়ান, কিংবা বেহেশতি সওগাত কিংবা মানুষের তৈরি আইনের নিকৃষ্টতা প্রমাণে সচেষ্ট হয়ে ওঠে।

অধস্তনতার ভিত্তি সাম্প্রতিক ইসলামী রাষ্ট্র গঠনের মধ্যে ক্রিয়াশীল থাকার ধারণা। এ ধারণা হচ্ছে অন্য ধর্ম বিশ্বাসী মানুষদের ইসলামিক রাষ্ট্র থেকে উচ্ছেদ করা ও হত্যা করা। সেজন্য মৌলবাদী ইসলামিক রাষ্ট্র গঠনের মধ্যে একটা সশস্ত্রতার এমার্সসন আছে, যে কারণে সশস্ত্রতা চেতনার মধ্যে ছড়িয়ে যায়। যেমন পুরুষের এমার্সসন এবং নারীদের অধস্তনতা। এই অধস্তনতা ডিস্কার্সিভ সম্পর্কের মধ্যে ক্রিয়াশীল। মৌলবাদী ইসলামিক রাষ্ট্র গঠনের মধ্যে নারীবিরোধী টার্ম, মওলানা ও মুসল্লিবিরোধী টার্ম, ধর্মজ এলিট ও অনুসারীবিরোধী টার্ম ক্রিয়াশীল। এভাবে উন্মোচিত ক্ষমতার সাংঘর্ষিক দিক। ক্ষমতা ও ক্ষমতার সাংঘর্ষিক দিক বাদ দিয়ে মৌলবাদী ইসলামিক রাষ্ট্র গঠনের মতাদর্শের কাছে পৌঁছনো যায় না।

বাংলাদেশে মৌলবাদ ইসলামের দূরবর্তী অঞ্চল। এই অঞ্চলটি ধারাবাহিকভাবে ইসলামী ধর্মজ সাম্রাজ্যের অন্তর্গত হয়েছে সাম্রাজ্যের অংশ হিসেবে ও কলোনি হিসেবে। রাষ্ট্র গঠনের প্রক্রিয়ার দিক থেকে বাংলাদেশে উন্মোচিত হয়েছে অভ্যন্তরীণ কলোনিয়ানিজমের ধারা। মৌলবাদ এই ধারার মধ্যে সমাজ গঠন ও রাষ্ট্র গঠনের অভ্যন্তরীণ কলোনিয়ানিজমকে শক্তিশালী করেছে। মৌলবাদী ইসলামিক রাষ্ট্র গঠন, সমাজ গঠন ও রাষ্ট্র গঠনের দিক থেকে বাংলাদেশকে দক্ষিণ এশিয়ার ও মধ্য এশিয়ার রাজনীতির মধ্যে যুক্ত করার চেষ্টা করেছে। এই চেষ্টা থেকে উদ্ভূত হয়েছে হিন্দু ভারতের সঙ্গে মুসলিম বাংলাদেশের সম্পর্ক, বৌদ্ধ মৌলবাদী মিয়ানমারের সঙ্গে মুসলিম বাংলাদেশের সম্পর্ক। মৌলবাদী ইসলামিক রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা এসব সম্পর্কের ক্ষেত্রে ধনতান্ত্রিক কলোনিয়ালিজম ব্যবহার করেছে।

রাষ্ট্র দখলের ষড়যন্ত্রের ইতিহাস প্রণয়ন করে চলেছে জামায়াত, হেফাজত, বিএনপি; এই প্রণয়নের বিরুদ্ধে তৈরি হয়েছে অন্য ধারা: থম্পসন ও হবসবয়ের তৃণমূল থেকে ইতিহাস তৈরির ধারা : একপক্ষে হিস্ট্রি ওয়ার্কসপের জার্নাল এবং অন্যপক্ষে ফরাসীদের প্রাত্যহিক ও স্থানিক ইতিহাস তৈরির ধারা। এভাবে মৌলবাদের বিরুদ্ধে একাডেমিক ও ইনটেলেকচুয়াল লড়াই চলছে। বাংলাদেশে এসব লড়াই প্রবলভাবে করে চলেছেন মুনতাসীর মামুন, শাহরিয়ার কবির ও স্বদেশ রায়। মৌলবাদীদের রাষ্ট্র দখলের ষড়যন্ত্রের ইতিহাসের বিরুদ্ধে বিভিন্ন কাজ নির্মিত হচ্ছে। এসব ইতিহাস হচ্ছে নারী মুক্তির ইতিহাস, শ্রমিক মুক্তির ইতিহাস, আদিবাসীদের ইতিহাস। এসব ইতিহাস মৌলবাদীদের ষড়যন্ত্রের ইতিহাস নির্মাণ পরাভূত করছে এবং একই সঙ্গে বিভিন্ন মুক্তির ইতিহাস শক্তিশালী করছে। আমাদের যাত্রা মানবমুক্তির দিকে।

তালেবানী আগ্রাসনের দরুন মাদ্রাসার ঐতিহ্য থেকে মানবিকতা বহিষ্কৃত হচ্ছে। তালেবানী আগ্রাসন মানবাধিকার ধারণাকে মাদ্রাসা ও মসজিদ থেকে উচ্ছেদে উদ্যত হয়েছে। জ্ঞানের আধুনিক সিস্টেমে যাকে বলা হয় মানবিকতা, তার উদ্ভব পঞ্চদশ ও ষষ্ঠদশ শতাব্দীর ইতালিতে নয়, যদিও জেকব বুর্গহাডট তাই করেছেন। ইসলামিক ঐতিহ্য থেকে উত্থিত মানবিকতা খ্রিস্টান ঐতিহ্যে যুক্ত হয়েছে, এই যুক্ততা থেকে তৈরি হয়েছে জ্ঞানের আধুনিকতা। এভাবেই লিগ্যাল থিওলজিক্যাল এবং সেক্যুলার জ্ঞানচর্চার ঐতিহ্য ও কারিকুলাম গঠিত হয়েছে। ইসলামিক ঐতিহ্য গঙ্গা-যমুনার মতো খ্রিস্টান ঐতিহ্যে মিলেছে এবং তৈরি হয়েছে মানবিকতার বোধ। এখান থেকে উৎসারিত হয়েছে জ্ঞানচর্চার ধারণা, উৎসারিত হয়েছে জ্ঞানচর্চার আবহাওয়া, যেখানে বিবাদ, মতভেদ ও বিতর্ক মিলে তৈরি হয়েছে জ্ঞানচর্চার পশ্চাৎপট। মানবিকতা সেজন্য পশ্চিমের একান্ত কনসেপ্ট নয়, এই কনসেপ্ট একই সঙ্গে আরবীয়, ভারতীয় এবং চৈনিক।

ইসলামের সঙ্গে সাম্রাজ্যবাদের সম্পর্ক নেই কিংবা ডিকটেটরশিপের সম্পর্ক নেই। অথচ মৌলবাদ ইসলামের সঙ্গে সাম্রাজ্যবাদী নির্যাতন তৈরি করেছে। মৌলবাদী বিশ্বাসের বাইরে কিংবা পরপারে অন্য কোন বিশ্বাস নেই, যদি অন্য কোন বিশ্বাস থাকে (এক ধর্মপ্রসূত অন্য বিশ্বাস কিংবা অন্য কোন ধর্ম বিশ্বাস) তার বিরুদ্ধে জিহাদ ঘোষণা করে লড়াই করে যেতে হবে। এর ফলে একদিকে অন্য বিশ্বাস উচ্ছেদ করার প্রবণতা তৈরি হয়েছে এবং অন্য বিশ্বাস থেকে তৈরি হয়েছে বিশ্বাসের ডিকটেটরশিপ। এখান থেকে উদ্ভূত হয় অন্ধত্ব : পিস্তল বন্দুকের খেলা। প্রতিপক্ষকে হত্যা করে উচ্ছেদ করতে হবে, প্রতিপক্ষের কোন জায়গা নেই, প্রতিপক্ষ একই ধর্মবিশ্বাসী মুসলমান হতে পারে কিংবা ভিন্ন ধর্মবিশ্বাসী হতে পারে। প্রতিপক্ষ হচ্ছে সর্বতোভাবে নারীরা, তালেবানী বিশ্বাসের বাইরে তাদের কোন জায়গা নেই, তারা পুরুষের অধস্তন। তালেবানী সাম্রাজ্যে সকল কর্তৃত্ব পুরুষের। তালেবানী টিরেনির ভিত্তি হচ্ছে জবরদস্তি, জবরদস্তি হচ্ছে সকল রাজনৈতিক সাংস্কৃতিক সমস্যার সমাধান আর রাজনৈতিক সংস্কৃতি হচ্ছে কর্তৃত্বের ম্যানুয়াল। কৃর্তত্ব হচ্ছে ধর্মজ কর্তৃত্ব, জবরদস্তি, স্তরবিন্যস্ত ধর্মজ শিক্ষাব্যবস্থা কর্তৃত্বের ভিত্তি শক্তিশালী করে রাখে। গণতান্ত্রিক সমাজ ব্যবস্থা ধর্মজ কর্তৃত্ববিরোধী বলে গণতান্ত্রিক সরকার ব্যবস্থার বিরুদ্ধে লড়াই করা জায়েজ। অন্যদিকে আধুনিকতার কিছু অংশ তালেবানী ব্যবস্থা আত্মসাত করছে, কিন্তু আধুনিকতা নয়। সেজন্য তালেবানী ব্যবস্থা সামগ্রিকভাবে আধুনিক ধ্যান-ধারণার বিরোধী। পশ্চাৎপদতা থেকে আধুনিকতা তৈরি করা সম্ভব হয় না।

বাংলাদেশের সমস্যা : পশ্চাৎপদতা থেকে আধুনিকতা তৈরি করা সম্ভব হয়নি বহু ক্ষেত্রে। বাংলাদেশে তালেবানী বিশ্বাসপ্রসূত বেশ সংখ্যক রাজনৈতিক দল আছে : জামায়াতে ইসলামী, হেফাজতে ইসলাম, বিএনপি। এসব রাজনৈতিক দল গণতান্ত্রিক সরকার ব্যবস্থার বিরুদ্ধে আন্দোলন করছে। এসব আন্দোলনের প্রথম বলি শিক্ষার্থীরা। শিক্ষা ব্যবস্থায় বারবার আঘাত করা হচ্ছে। চলছে পরীক্ষা বন্ধ করার অপচেষ্টা। সাধারণ মানুষ ও সাধারণ মানুষের সন্তান-সন্ততি লেখাপড়ার দিকে দু’হাত বাড়িয়ে রেখেছে, অন্যদিকে বিএনপি-জামায়াত-হেফাজত আধুনিক শিক্ষা ব্যবস্থা নষ্ট করে পরীক্ষা বন্ধকরণের, আন্দোলনের মধ্য দিয়ে সার্বিক পরিবেশ নষ্ট করে চলেছে। পরীক্ষার সময় হরতাল দিয়ে স্কুল পুড়িয়ে মেয়েদের পড়ার বিরোধিতা করে, যোগাযোগ ব্যবস্থা উচ্ছেদ করবার চেষ্টা করছে।

সেই সুদূর আমলে, গত শতাব্দীর পঞ্চম দশকে যে আন্দোলন কৃষকের সন্তান-সন্ততি শুরু করেছিল, সেই আন্দোলন হচ্ছে বর্তমানের একুশের আন্দোলন, আধুনিক লেখাপড়ার আন্দোলন, ভাষাচর্চার আন্দোলন। এই অর্থে ভাষার বিরুদ্ধে আধুনিক লেখাপড়ার বিরুদ্ধে আন্দোলন করে চলেছে বিএনপি, জামায়াত, হেফাজত। আধুনিকতার বিরুদ্ধে আধুনিক শিক্ষার আন্দোলন রুদ্ধ করে মানুষকে পশ্চাদমুখী ও অনগ্রসর করে রাখাই ইসলামী রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার স্ট্র্যাটেজি।

আমরা এই স্ট্র্যাটেজির বিরুদ্ধে আধুনিকতা রুদ্ধ করার বিরুদ্ধে, পশ্চাদমুখিতার বিরুদ্ধে। মানুষ হত্যা করে ইসলামী রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করা যায় না।