২১ নভেম্বর ২০১৭,   ঢাকা, বাংলাদেশ   শেষ আপডেট এই মাত্র  
Login   Register        
ADS

বদলে যাচ্ছে গুগল আসছে এ্যালফাবেট


ইন্টারনেটকে আক্ষরিক অর্থে ভেঙ্গে ফেলতে সক্ষম কোন কোম্পানি যদি থেকে থাকে, তবে সেটা হলো সম্ভবত গুগল। সুবিশাল ও সুবিস্তৃত এই কোম্পানিটি সার্চ রেজাল্ট থেকে, শুরু করে ভাইরাল ভিডিও এবং স্মার্টফোন ও ট্যাবলেটের অপারেটিং সফটওয়্যার পর্যন্ত সবকিছু জুগিয়ে থাকে। ১৬ বছরের পুরনো এই কোম্পানি গত ১০ আগস্ট অন্তত আলঙ্কারিক অর্থে ইন্টারনেটকে ভেঙ্গে দিয়েছে। কোম্পানিটি ওইদিন ঘোষণা করেছে, ওরা নিজেকে পুনর্গঠিত করবে এবং নতুন নাম ধারণ করবে। এ হলো সিলিকন ভ্যালির ইতিহাসে সবচেয়ে ব্যতিক্রমধর্মী উদ্যোগগুলোর একটি।

গুগল ডটকম, এ্যানড্রয়েড, ইউটিউব এবং বিজ্ঞাপন ব্যবসাসহ সর্বাধিক পরিচিত উদ্যোগগুলোর সমন্বয়ে গুগল প্রতিষ্ঠানটি গঠিত। এখন এই গুগল এক নতুন ছত্রছায়ায় প্রতিষ্ঠান এ্যালফাবেটের অঙ্গ প্রতিষ্ঠানে পরিণত হবে। এ্যালফাবেট হবে একটা হোল্ডিং কোম্পানি। এর থাকবে বিভিন্ন ইউনিট। গুগল হবে তার একটি। গুগলের মধ্যে থাকবে সার্চ, ইউটিউব ও এ্যানড্রয়েড। অন্য ইউনিটগুলো হলো ক্যালিকো। ২০১৩ সালে জীবনবিজ্ঞানের বিভিন্ন কাজ করার জন্য গুগল এই ইউনিট চালু করেছিল। এর লক্ষ্য হবে মানুষের আয়ু বাড়ানোর উদ্দেশ্যে বিভিন্ন কর্মকা- পরিচালনা। নেস্ট হলো আরেক ইউনিট। এটি আসলে একটি থার্মোস্ট্যাট কোম্পানি, যা গুগল ২০১৪ সালে ৩২০ কোটি ডলারে কিনে নিয়েছিল। এটা হচ্ছে ভবিষ্যতের স্মার্ট গৃহ নিয়ন্ত্রণে কোম্পানির পরিকল্পনার কেন্দ্রবিন্দু। গুগল ভেনচারস আরেক ইউনিটের নাম। গুগলের পণ্যের সঙ্গে প্রতিযোগিতায় লিপ্ত হয় এমন কোম্পানিগুলোতে নিয়মিত বিনিয়োগে করাই এর কাজ। ফাইবার নামক ইউনিটটি আসলে হলো হাইস্পিড ব্রডব্যান্ড।

ইন্টারনেট সার্ভিস, যা এখন আমেরিকার তিনটি নগরীতে পাওয়া যাচ্ছে। আরেক ইউনিট হচ্ছে গুগল ক্যাপিটেল, যা প্রকৃতপক্ষে একটা বিনিয়োগ প্রতিষ্ঠান। এছাড়া আছে গুগল এক্স। এটি একটি গবেষণা প্রতিষ্ঠান, যা চালকহীন গাড়ি ও পরিধেয় সামগ্রী নিয়ে গবেষণা চালিয়ে যাচ্ছে। এছাড়া আছে সাইডওয়াক ল্যাবস্্ নামক প্রতিষ্ঠান, যার দৃষ্টি নগরজীবন উন্নয়নে প্রযুক্তি ব্যবহারের ওপর নিবন্ধ। এভাবে এ্যালফাবেটের ইউনিটগুলো চালকহীন গাড়ি, আয়ু বৃদ্ধির কৌশল, ইন্টারনেট বেলুন, ডেলিভারি ড্রোন, ব্রডব্যান্ড সার্ভিস এবং এ জাতীয় আরও অনেক কিছু উদ্ভাবন ও সরবরাহের কাজে নিয়োজিত থাকবে। গুগলের যুগ্ম প্রতিষ্ঠাতা ও প্রধান নির্বাহী ল্যারি পেজ বলেন, আমরা এমন কিছু করার চেষ্টা করছি, যা অন্য লোকেরা পাগলামী বলে মনে করে।

এ্যালফাবেট দেখা শোনা বা তত্ত্বাবধায়কের দায়িত্বে থাকবেন ল্যারি পেজ, যুগ্ম প্রতিষ্ঠাতা সার্গেই ব্রিন ও চিফ ফাইন্যান্সিয়াল অফিসার রুথ পোরাত। কলেবরে ছোট করে ফেলা গুগল পরিচালনা করবেন উদীয়মান তারকা নতুন সিইও সুন্দর পিচাই। উল্লেখ করা যেতে পারে, গত বছর গুগলের ৬৬০০ কোটি ডলার আয়ের প্রায় পুরোটাই জুগিয়েছিল গুগলের সঙ্কুচিত অংশটি।

গুগলের প্রতিষ্ঠাতারা এমন এক উদ্ভাবনী মডেলের জন্য হাতড়ে বেড়িয়েছিলেন, যা কোম্পানিকে চিরস্থায়ীভাবে টিকিয়ে রাখতে পারবে। ইতিহাসে এমন দৃষ্টান্ত ভূরি ভূরি মিলবে যে, কোম্পানিগুলো একটি নির্দিষ্ট যুগের হাতিয়ারের ওপর চরম উৎকর্ষ অর্জনের মধ্য দিয়ে আকারে বড় ও সম্পদশালী হওয়ার পর শেষ পর্যন্ত একেবারেই অপ্রয়োজনীয় ও বাহুল্য হয়ে পড়েছে। এমন একটা অবস্থার কথা কোম্পানির একেবারে প্রথম দিন থেকেই পেজ ও ব্রিনের চিন্তার স্থান পেয়ে এসেছিল।

কিন্তু সিলিকন ভ্যালিতে কিভাবে দীর্ঘকালব্যাপী টিকে থাকা যায়, সে ব্যাপারটা মোটামুটি একটা রহস্যই বটে। এ্যাপল এক্ষেত্রে যে মডেল অনুসরণ করে আসছে, সেটা হলো নিজেকে অনবরত ভেঙেচুরে ফেলা। বর্তমানে যেটা থেকে নগদ অর্থ যোগ হচ্ছে, তা থেকে অর্জিত মুনাফাকে এমন সব ধ্যান-ধারণার পেছনে বিনিয়োগ করা, যা শেষ পর্যন্ত তাকেই গ্রাস করে ফেলবে। আগে আইবিএম কম্পিউটার ব্যবসার ক্ষেত্রে একই কাজ করেছিল। এখন গুগলের প্রতিষ্ঠাতারা মনে করছেন যে, তারা তাদের নিজস্ব মডেল খুঁজে পেয়েছেন।

গুগলের হেডকোয়ার্টার হলো ক্যালিফোর্নিয়ার মাউন্টেনভিউতে। নাম গুগলপ্লেক্স। সেখানে গেলে মনে হবে আইভি লীগের কোন গবেষণা প্রতিষ্ঠানে বসন্তের প্রথম উষ্ণ দিনটিতে বেড়াতে আসা হয়েছে। সর্বত্রই রয়েছে পিএইডি ডিগ্রীধারীরা। কেউ কেউ কোম্পানির বহুরঙা বাইসাইকেলে ইতস্তত ছুটে চলেছে। কেউ কেউ আবার লনে বসে কৃত্রিম বুদ্ধির সীমাবদ্ধতা নিয়ে বিতর্কে লিপ্ত। কেউ আবার ইনডোরে নতুন কিছু করার জন্য এলগোরিদম শেখাচ্ছে। এভাবে গুগলকে প্রতিভাধর মানুষদের একটা সমাবেশ বলে মনে হবে, যারা বিভিন্ন বৈজ্ঞানিক ক্রিয়াকলাপ নিয়ে সাধনা করে চলেছেন নিরন্তর।

সেই গুগলের প্রতিষ্ঠাতারা এখন গুগলকে ঢেলে সাজাচ্ছেন। সৃষ্টি করতে যাচ্ছেন এ্যালফাবেট, যার উদ্দেশ্য তাদের মতে মানুষের উদ্ভাবনী শক্তিকে আরও বিকশিত করে তোলা। প্রতিটি অঙ্গ প্রতিষ্ঠানের নিজস্ব প্রধান থাকবে। প্রায়ই সেই ব্যক্তিটি হবেন অসাধারণ প্রতিভাদীপ্ত কেউ। যেমন স্মার্ট গৃহসরঞ্জাম প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠান নেস্টের প্রধান হবেন টনি ফাডেল, যিনি আইপডের গডফাদার হিসাবে পরিচিত। গবেষণা ও উন্নয়ন প্রতিষ্ঠান গুগল এক্সের প্রধান হবেন কম্পিউটার বিজ্ঞানী ও উপন্যাসিক এসট্রো টেলার। মানুষের আয়ু বৃদ্ধির কাজে নিয়োজিত ক্যালিকোর দায়িত্বে থাকবেন বামোটেক ফার্মের পথিকৃৎ প্রতিষ্ঠান জেনেনটেকের সাবেক প্রধান আর্থার লেভিনসন। কাজেই পেজ যখন বলেন যে, এ্যালফাবেট হলো বলিষ্ঠ নেতৃত্ব ও স্বাধীন কর্মোদ্যোগের মধ্য দিয়ে বিকাশমান এক ব্যবসা, তখন তাতে আশ্চর্য হওয়ার কিছু থাকে না।

এই আলোকে দেখলে এ্যালফাবেট বিশ্বের সবচেয়ে উচ্চাভিলাষী কোম্পানিগুলোর একটা কনফেডারেশনের রূপ ধারণ করতে চলেছে। পুনর্বিন্যাসের এই উদ্যোগ সম্পর্কে বলতে গিয়ে পেজ বলেন, আমাদের কোম্পানি ভালই চলছে। তবে আমরা মনে করি একে আরও স্বচ্ছ, আরও দায়বদ্ধ করে তোলা প্রয়োজন। এটা কি পেজের স্রেফ শব্দের কারুকাজ মাত্র, নাকি তার চাইতে বেশি কিছু সেটা বহুলাংশে নির্ভর করছে এ্যালফাবেট এরপর কি করে তার ওপর। একপর্যায়ে এই ছত্রছায়া সংগঠনের প্রসার ঘটতে পারে। এতে যোগ হতে পারে নতুন কোম্পানি। যেমন, ইলেকট্রিক কার তৈরিকারক। কোম্পানি তেলসাযেটিকে গুগল সেই ২০১৩ প্রায় পুরোপুরি সংগ্রহ করে নিয়েছে। এই তেলসাকে এখন সহসাই এ্যালফাবেটের একটি যৌক্তিক কোম্পানির মতো মনে হচ্ছে। একই কথা টুইটারের বেলায়ও প্রযোজ্য। আবার এর উল্টোটিও হতে পারে। অধিকতর কেন্দ্রীভূত নগদ অর্থ বয়ে আনা গুগল যদি হোঁচট খেতে শুরু করে, তাহলে এ্যালফাবেট গঠনকে খুবই বাজে ধরনের ভ্রান্তি বলে গণ্য করা হতে পারে। আর যাই হোক, গুগলের সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনা ও পুনর্গঠনের দীর্ঘ ইতিহাস আছে। এ্যালফাবেট গঠনের সিদ্ধান্ত ঘোষিত হওয়ার পর গুগলের বাজার মূলধন পরদিন ২ হাজার কোটি ডলার বেড়ে যায়। তার ফলে গুগল কোম্পানির মূল্য দাঁড়ায় ৪৬ হাজার কোটি ডলার।

(সূত্র : টাইম)