মেঘলা, তাপমাত্রা ৩১.১ °C
 
১৭ আগস্ট ২০১৭, ২ ভাদ্র ১৪২৪, বৃহস্পতিবার, ঢাকা, বাংলাদেশ
সর্বশেষ

ডায়াবেটিস নিউরোপ্যাথি ॥ ডায়াবেটিসজনিত স্থায়ুতন্ত্রের জটিলতা

প্রকাশিত : ১ সেপ্টেম্বর ২০১৫

ডায়াবেটিস আমাদের একটি অতি পরিচিত রোগ। সমাজের অনেক লোক এই রোগে ভুগছে। শরীরের প্রায় সব অঙ্গের কার্যক্রমের ওপর ডায়াবেটিসের প্রতিক্রিয়া যেমন দেখা যায় তেমনি নার্ভ বা স্থায়ুতন্ত্রের ওপর অনিয়ন্ত্রিত ডায়াবেটিসের মারাত্মক প্রতিক্রিয়া লক্ষণীয়।

ডায়াবেটিস নিউরোপ্যাথি বলতে আমরা স্থায়ুতন্ত্রের ওপর ডায়াবেটিসের প্রতিক্রিয়াজনিত প্রভাবকে বুঝি।

অনিয়ন্ত্রিত ডায়াবেটিসের কারণে দীর্ঘদিনে ধীরে ধীরে ডায়াবেটিস নিউরোপ্যাথি দেখা দেয়।

অনেক সময় অনিয়ন্ত্রিত এমনকি অনিয়মিতভাবে নিয়ন্ত্রিত ডায়াবেটিসের কারণে ১০-১৫ বছর সময়ের মধ্যে ডায়াবেটিস নিউরোপ্যাথিক দেখা দিতে পারে। আবার কোন কোন ক্ষেত্রে ৫ বছরের মধ্যেই ডায়াবেটিস নিউরোপ্যাথি দেখা দেয় ।

কারণ : ডায়াবেটিস নিউরোপ্যাথির প্রকৃত কারণ খুব ভালোভাবে জানা যায়নি। তবে ধারণা করা হয় রক্তে গ্লুকোজের আধিক্যই এর কারণ। যে সমস্ত রোগীদের ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণে থাকে না তারাই মূলত নিউরোপ্যাথির শিকার হয়। প্রায় ৬০-৭০ শতাংশ ডায়াবেটিস রোগী নিউরোপ্যাথিতে আক্রান্ত হয়।

হাত ও পায়ের ব্যথা, ঝিম ঝিম করা, অবশ লাগা ইত্যাদি ডায়াবেটিস নিউরোপ্যাথির লক্ষণ।

ডায়াবেটিস নিউরোপ্যাথি কয়েক রকমের হতে পারে। যেমন-

১। পেরিপেরাল নিউরোপ্যাথি (হাত ও পায়ের ¯œায়ু আক্রান্ত হয়)

২। প্রক্সিমাল নিউরোপ্যাথি (হাত ও পায়ের উপরের দিকে মাংসপেশীর ¯œায়ু আক্রান্ত হয়)

৩। অটোনমিক নিউরোপ্যাথি (হৃদান্ত্র, রক্তনালী, পরিপাকতন্ত্র, মূত্র ও যৌনাঙ্গ, শরীরের রেচন প্রক্রিয়া ইত্যাদি আক্রান্ত হয়)

৪। ফোকাল নিউরোপ্যাথি (কোন একটি নির্দিষ্ট ¯œায়ু আক্রান্ত হয়)

পেরিপেরাল নিউরোপ্যাথি : ডায়াবেটিস নিউরোপ্যাথির মধ্যে সবচেয়ে বেশি দেখা যায় পেরিপেরাল নিউরোপ্যাথি। এতে হাত ও পায়ের নিচের দিকের অংশ অর্থাৎ কুনই-এর নিচে এবং হাঁটুর নিচের দিকের অংশে ব্যথা করা, জ্বালা-পোড়া করা, ঝিনঝিন করা ও অবশ লাগাভাব হয়। হাত ও পায়ের এই অংশ ঠা-া থাকে, লোম পড়ে যায়, হাত ও পায়ের অনুভূতি নষ্ট হয়ে যায়। আঘাত লাগলে বা পুড়ে গেলে ব্যথা পাওয়া যায় না। সে কারণে পায়ে প্রায় ঘা হয়, পচন ধরে যে কারণে অনেক সময় পা কেটেও ফেলতে হয়। ডায়াবেটিসে রক্তনালী সরু হয়ে যায় বলে রক্ত চলাচল কম থাকায় ঘা সহজে শুকায় না।

প্রক্সিমাল নিউরোপ্যাথি : এতে হাত ও পায়ের উপরের দিকের অর্থাৎ উরু বস্তিদেশ ও বাহুর মাংসপেশীর দুর্বলতা দেখা যায় এবং মাংসপেশী শুকিয়ে যায়। এটা সাধারণত বয়স্ক মানুষদের হয় এবং চিকিৎসায় আরোগ্য হয়।

অটোনমিক নিউরোপ্যাথি : আমরা প্রায়ই আমাদের শরীরের ভেতর অনেক কর্মকা-ের ব্যাপারে ওয়াকিবহাল থাকি না। যেমন- হৃৎপি-ের পাম্পিং, শ্বাস নেয়া, খাদ্যের পরিপাক প্রক্রিয়া, খাদ্য গ্রহণের পর পরিপাক ও রেচন প্রক্রিয়া, শরীরের অভ্যন্তরীণ পরিবেশ বজায় রাখা। এসব হচ্ছে অটোনমিক নার্ভের কাজ। অটোনমিক নিউরোপ্যাথি হলে হৃৎপি-ের গতির অস্বাভাবিকতা দেখা দেয় রক্তচাপ কমে যায়। পেটের খাদ্য ঠিকমতো হজম হয়না, পেট ফুলে থাকে, মস্তিষ্কে রক্ত চলাচলে বিঘœ সৃষ্টি হয়। পায়খানা ও প্রস্রাবের নিয়ন্ত্রণে সমস্যা দেখা দেয়। যৌন প্রক্রিয়ার বিঘœ হয়।

ফোকাল নিউরোপ্যাথি : যখন কোন একটি নির্দিষ্ট নার্ভে সমস্যা দেখা দেয় তখন তাকে ফোকাল নিউরোপ্যাথি বলে। যেমন শুধু হাত বা পায়ে সমস্যা হতে পারে।

উপসর্গ : যখন কোন ডায়াবেটিস রোগী পায়ে বা হাতে ব্যথা, অবশ লাগা, ঝিন ঝিন করা, শক্তি কমে যাওয়া, পায়ে ঠা-া/গরম বুঝতে অসুবিধা হওয়ার কথা বলে, পা ঠা-া হয়ে যায়, পায়ের লোম উঠে যায় তখন বুঝতে হবে তার নিউরোপ্যাথির সমস্যা তৈরি হয়েছে। এ ধরনের বেশিরভাগ রোগীর পায়ে ঘা হয় এবং সহজে ঘা শুকায় না কিন্তু কোন ব্যথা থাকে না। অটোনমিক নিউরোপ্যাথির ক্ষেত্রে মাথা ঝিম ঝিম করে, বসা থেকে উঠলে মাথা ঘুরে ওঠে, বুক ধড়ফড় করে। পেট ফেঁপে থাকে, পাতলা পায়খানা হয়, বমি বমি ভাব হয়, চোখে ঝাপসা লাগে, প্রস্র্রাবের নিয়ন্ত্রণে সমস্যা হয় এবং যৌন ক্রিয়ার সমস্যা হয়।

ডায়াবেটিস রোগীদের প্রস্রাবে সংক্রমণ বেশি হয়।

চিকিৎসা : ডায়াবেটিসের চিকিৎসা হচ্ছে মূলত ৩ -উ। ক) উরবঃ খ) উরপরঢ়ষরহব, গ) উৎঁম।

প্রতিরোধই হচ্ছে মূলত ডায়াবেটিস নিউরোপ্যাথির চিকিৎসা। একবার নিউরোপ্যাথি হয়ে গেলে তা আর নিরাময় করা সম্ভব হয় না। তবে কঠোরভাবে ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণ করা গেলে, নিউরোপ্যাথি আরো খারাপ অবস্থায় যাওয়া বন্ধ করা যায়।

তাই ডায়াবেটিস নিউরোপ্যাথির চিকিৎসা হলো :

১। কঠোরভাবে যথাযথ ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণ

২। নিয়মিত ডায়াবেটিস পরীক্ষা করা।

৩। নিউরোপ্যাথির উপসর্গতারও চিকিৎসা। যেমন-ব্যথার ওষুধ, নিউরো ভিটামিন ইত্যাদি। নিউরোপ্যাথিজনিত ব্যথার জন্য সাধারণ ওষুধ ছাড়াও কয়েকটি বিশেষ ওষুধ যেমন (চৎবমধনধষরহ, ফঁষড়ীবঃরহ) ব্যবহার করা যেতে পারে।

৪। রক্তের চর্বি নিয়ন্ত্রণে রাখা

৫। অটোনমিক নিউরোপ্যাথির রোগীদের নিয়মিত হৃদরোগ বিশেজ্ঞর পরামর্শ নেয়া জরুরী।

ডায়াবেটিস রোগীর পায়ের যতœ : ডায়াবেটিস রোগীর পায়ের যতœ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। পায়ে অনুভূতির কোন সমস্যা দেখা দিলে পায়ে যাতে অতিরিক্ত গরম বা ঠা-া কিছু না লাগে, পায়ে যাতে কোন আঘাত না পওয়া যায় এ ব্যাপারে খুব সতর্ক থাতে হবে। পায়ের জুতা নির্বাচনে সব ধরনের সাবধানতা থাকতে হবে যাতে জুতা দ্বারা কোন ক্ষত সৃষ্টি না হয়।

রোগীদের ধূমপান করা কোন ভাবেই চলবে না।

কারণ ধূমপান পায়ের রক্তচলাচল কমিয়ে দেয় এতে করে পায়ে ক্ষত সৃষ্টি হওয়া এবং পচন ধরার সম্ভাবনা আরও বেড়ে যায়। পায়ে একবার পচন ধরলে অনেক সময় পা কেটেও ফেলতে হয়।

শিক্ষা : ডায়াবেটিস রোগীদের ডায়াবেটিস রোগ সম্পর্কে প্রয়োজনীয় শিক্ষা দেয়া খুবই জরুরী। ডায়াবেটিস রোগীদের খাদ্য সম্পর্কে সচেতন হতে হবে। কোন খাবার খাওয়া যাবে না, কোন খাবার কি পরিমাণে খাওয়া যাবে তা বিশদভাবে জানা দরকার। খাদ্য গ্রহণের সময় সম্পর্কেও পরিষ্কার ধারণা থাকা জরুরী। ডায়াবেটিস রোগীদের লাইফ স্টাইল ও শৃঙ্খলাবোধ অত্যন্ত প্রয়োজনীয়। ডায়াবেটিসের জটিলতা সম্পর্কে ধারণা দিতে হবে। বিশেষ করে নিউরোপ্যাথির উপসর্গ এবং এর গুরুত্ব বিশেষভাবে বুঝাতে হবে। ডায়াবেটিস রোগীর পায়ের যতœ সম্পর্কে সম্যক ধারণা থাকতে হবে। দেশের বিভিন্ন ডায়াবেটিক হাসপাতালসমূহ এ ধরনের প্রশিক্ষণ ডায়াবেটিস রোগীদের দিয়ে থাকে।

ডাঃ মোঃ জাহেদ হোসেন

নিউরোসার্জন ও স্পাইনসার্জন

সহযোগী অধ্যাপক, ক্লিনিক্যাল নিউরোর্সাজারি বিভাগ

ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব নিউরোসাইন্সেস ও হাসপাতাল

প্রকাশিত : ১ সেপ্টেম্বর ২০১৫

০১/০৯/২০১৫ তারিখের খবরের জন্য এখানে ক্লিক করুন


শীর্ষ সংবাদ: