১৮ অক্টোবর ২০১৭,   ঢাকা, বাংলাদেশ   শেষ আপডেট এই মাত্র  
Login   Register        
ADS

এবার অপহরণ আতঙ্কে প্রবাসী বাংলাদেশীরা


মোয়াজ্জেমুল হক ॥ দেশ থেকে মানব পাচারের ঘটনার পাশাপাশি প্রবাসী বাংলাদেশীদের টার্গেট করে অপহরণ করে মোটা অঙ্কের মুক্তিপণ আদায়ের উদ্বেগজনক ঘটনা ঘটছে। এসব ঘটনার সঙ্গে বিদেশী কয়েকটি দেশের গ্যাংস্টারদের সঙ্গে কিছু বাংলাদেশী জড়িত থাকার সুনির্দিষ্ট অভিযোগ উঠেছে। বিশ্বজুড়ে অভিবাসন প্রত্যাশী হতে গিয়ে মানবপাচারকারীদের খপ্পরে পড়ছে অসহায় সাধারণ মানুষ। বঙ্গোপসাগর ও ভূমধ্যসাগরে সাম্প্রতিক মানবপাচারের একের পর এক ঘটনা, অনাহারে-অর্ধাহারে, নির্যাতনে ও সাগরে ডুবে অকাতরে অভিবাসন প্রত্যাশীদের অনাকাক্সিক্ষত মৃত্যুর ঘটনা এখন বিশ্বজুড়ে আলোচিত এবং বড় ধরনের উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। এ জাতীয় ঘটনা নিয়ে বিভিন্ন সূত্রে বিভিন্ন ধরনের তথ্য রয়েছে। কিন্তু সরকারী পর্যায়ে এসব তথ্যের সত্যতা মেলানো কঠিন।

সূত্র জানায়, মানবপাচারের পাশাপাশি বিদেশে অপহরণ করে মুক্তিপণ আদায়ের ঘটনা নতুন করে উৎকণ্ঠার জন্ম দিয়েছে। পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে বাংলাদেশীদের অবস্থান রয়েছে। এদের বেশিরভাগ রয়েছে চাকরিতে। একটি অংশ বিভিন্ন ব্যবসার সঙ্গে জড়িত। অনেকে ধনাঢ্যও বটে। বিদেশী গ্যাংস্টারের লোকজন প্রবাসী বিত্তশালী বাংলাদেশীদের অপহরণের মাধ্যমে মোটা অঙ্কের মুক্তিপণ আদায়ের অপতৎপরতা শুরু করেছে। এ পর্যন্ত প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী মালয়েশিয়া, থাইল্যান্ড, মিয়ানমার, ভারত, সংযুক্ত আরব আমিরাত ও লিবিয়াসহ আরও কয়েকটি দেশে এসব গ্যাংস্টার তৎপর রয়েছে।

ইতোপূর্বে চট্টগ্রাম থেকে কক্সবাজারের সেন্টমার্টিন উপকূল থেকে সাগর পথে মালয়েশিয়ায় অবৈধ অভিবাসী প্রত্যাশী হতে গিয়ে যে লোমহর্ষক ঘটনা বের হয়ে এসেছে এর কোন সমাধান হতে না হতেই লিবিয়া থেকে ভূমধ্যসাগর পাড়ি দিয়ে বিভিন্ন দেশে অভিবাসন প্রত্যাশী হতে গিয়ে বাড়ছে মৃত্যুর মিছিল। এ পথে এ পর্যন্ত ২৪ বাংলাদেশীর মৃত্যুর আশঙ্কা ও ৫৪ জনকে জীবিত উদ্ধারের তথ্য মিলেছে। ধারণা করা হচ্ছে, এ সংখ্যা আরও বৃদ্ধি পাবে।

মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশের পাশাপাশি মালয়েশিয়ায়ও রয়েছে বাংলাদেশীদের বিশাল শ্রমবাজার। এসব দেশে বাংলাদেশী অনেকের বড় পুঁজি বিনিয়োগের ব্যবসায়ও জড়িত। আন্তর্জাতিক গ্যাংস্টার সদস্যরা সম্প্রতি বিত্তশালী বাংলাদেশীদের টার্গেট করেছে। অপহরণের মাধ্যমে আটকে রেখে মুক্তিপণ বাণিজ্যে মেতে উঠেছে বিভিন্ন গ্রুপ। অতিসম্প্রতি মালয়েশিয়ায় প্লাস্টিক ডোরের এক আমদানিকারককে অপহরণ করে আটকে রেখে দেশে স্বজনদের কাছ থেকে মোটা অঙ্কের মুক্তিপণ আদায়ের একটি ঘটনা সংশ্লিষ্ট সকল মহলকে উদ্বিগ্ন করে তুলেছে।

বিভিন্ন সূত্রে জানা গেছে, মালয়েশিয়া, মিয়ানমার, থাইল্যান্ড নিয়ে মানবপাচার ও অপহরণ করে মুক্তিপণ আদায় বাণিজ্যের সঙ্গে বাংলাদেশে অবস্থানরত প্রভাবশালী পাচারকারী সদস্যরা জড়িত। এদের টার্গেট মালয়েশিয়ায় মানবপাচার। এর পাশাপাশি মালয়েশিয়ায় অবস্থানরত বাংলাদেশীদের সুযোগ বুঝে অপহরণ করে আটকে রেখে মুক্তিপণ আদায়। অপরদিকে, মধ্যপ্রাচ্যে সংযুক্ত আরব আমিরাত ভিত্তিক রয়েছে বড় একটি চক্র। এরা অধিক উপার্জনের লোভ ও ফাঁদে ফেলে প্রবাসী বাংলাদেশীদের ইউরোপসহ বিভিন্ন দেশে পাচারের কাজে জড়িত। শুধু তাই নয়, এ প্রক্রিয়ায়ও চলছে অপহরণের মাধ্যমে মুক্তিপণ বাণিজ্য। ভূমধ্যসাগরে নৌকাযোগে যেসব বাংলাদেশীর মৃত্যু ও উদ্ধারের খবর মিলেছে এরা প্রত্যেকেই মানবপাচার-কারীদের অপতৎপরতার শিকার।

সূত্র জানায়, মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে বাংলাদেশীদের মধ্যে চট্টগ্রাম ও আশপাশের জেলাগুলোর লোকজনের আধিক্য বেশি। অপহরণ ও পাচারের শিকার হওয়ার ঘটনা ঘটছে অহরহ। কিন্তু জীবন রক্ষার ভয়ে অধিকাংশ ঘটনা প্রকাশ পায় না। মৃত্যুকে আলিঙ্গন করার পর কিছু ঘটনা প্রকাশ পায়। অন্যথায় নয়। নীরবে দেশ থেকে মুক্তিপণ পরিশোধ করে রক্ষা পাচ্ছে অনেকে। সম্প্রতি সমুদ্র পথে মালয়েশিয়ায় অবৈধ অভিবাসন প্রত্যাশী হতে গিয়ে যেসব ঘটনা ঘটেছে তা অত্যন্ত ন্যক্কারজনক। শুধু তাই নয়, মিয়ানমার, থাইল্যান্ড, সংলগ্ন সীমান্তে এবং মালয়েশিয়ার অভ্যন্তরে বাংলাদেশী অভিবাসনপ্রত্যাশীদের বড় একটি অংশকে বন্দীশালায় আটকে রেখে বা অপহরণ করে রেখে মুক্তিপণের টাকা আদায়ের ঘটনা অসংখ্য। ভারতের মুম্বাইসহ কয়েকটি স্পট দিয়ে বাংলাদেশীদের অনেককে পাচার করে দেয়ার ঘটনা রয়েছে। মধ্যপ্রাচ্যসহ বিভিন্ন দেশে পাচার হচ্ছে বাংলাদেশের হতদরিদ্র কিছু মানুষ। এসব কাজে বিদেশী গ্যাংস্টারের সঙ্গে জড়িয়ে আছে কিছু দেশীয় পাচারকারী দলের প্রভাবশালী সদস্য। টেকনাফে সরকার দলীয় এক এমপি মানবপাচার, মাদক ইয়াবা পাচার ও চোরাচালান কাজে পুলিশী অনুসন্ধান শেষে প্রণীত তালিকার শীর্ষে রয়েছে। কিন্তু দেশের আইন তাকে কখনও স্পর্শ করতে পারে না। এ কাজে জড়িত যেসব চুনোপুঁটি ধরা পড়ছে এদের কারও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির ঘটনা দৃশ্যমান নয়। সাগরের দুর্গম পথে মালয়েশিয়ায় মানব পাচারের ঘটনাটি সম্প্রতি বিশ্বজুড়ে তোলপাড় সৃষ্টি করার পর বিষয়টি সেই তিমিরেই রয়ে গেছে। মালয়েশিয়ায় পাচার রুটে সর্বশেষ আরও গণকবর আবিষ্কৃত হয়েছে, উদ্ধার হয়েছে ২৪ জনের দেহাবশেষ। এছাড়া গত এপ্রিল-মে মাসে ১৩৯ গণকবর আবিষ্কৃত হয় এবং এসব গণকবর থেকে ১০৬ গলিত, কঙ্কাল উদ্ধার করা হয়। পরিত্যক্ত বন্দী শিবির আবিষ্কৃত হয় ৩০। এসব গণকবর ও বন্দী শিবির মালয়েশিয়া থাইসীমান্তের গভীর জঙ্গলাকীর্ণ এলাকায় অবস্থিত। থাই সেনাবাহিনীর পদস্থ কর্মকর্তাসহ পুলিশ এবং মানবপাচারে জড়িত বড় বড় হোতারা এ কাজে জড়িত থাকার তথ্য প্রমাণ বেরিয়েছে সে দেশের তদন্তে। কিন্তু এ অপকর্মে জড়িত বাংলাদেশী কোন রাঘব বোয়ালকে এ পর্যন্ত সরকার আইনের আওতায় আনতে পারেনি। অথচ এরা চিহ্নিত। পুলিশী তদন্তে এদের অনেকের নাম উদঘাটিত হয়েছে। পত্র-পত্রিকায় এদের পরিচয়ও প্রকাশিত হয়েছে। অথচ এরা অধরা।

অনুরূপভাবে ইউরোপ ও মধ্যপ্রাচ্যে বাংলাদেশীদের পাচার ও অপহরণের কিছু বিচ্ছিন্ন ঘটনা চলছে। অপহরণ করে মুক্তিপণ আদায়ের প্রমাণসাপেক্ষ কোন তথ্য প্রকাশ না হলেও সাগর পথে পাচারের ঘটনায় বাংলাদেশীরা যে শিকার হচ্ছে তা এখন প্রমাণিত। এসব ঘটনা নিয়ে সরকারের উচ্চ পর্যায় থেকে শুধুমাত্র সতর্কতামূলক বক্তব্য দেয়া ছাড়া আইনী কোন ব্যবস্থা গৃহীত না হওয়ায় মানবপাচার ও অপহরণ বাণিজ্য এখন বাংলাদেশী প্রবাসীদের মাঝে আতঙ্ক ছড়িয়ে যাচ্ছে। প্রবাসীদের দেশী স্বজনদের প্রতিনিয়ত উদ্বেগ উৎকণ্ঠায় থাকতে হচ্ছে। দেশের আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরগুলোতে প্রতিনিয়ত এমনিতেই বিদেশ থেকে বাংলাদেশীদের মৃতদেহ আসার ঘটনা অহরহ। বিভিন্ন দেশে বিভিন্ন দুর্ঘটনায় প্রাণ হারানো হতভাগ্য বাংলাদেশীদের কারও কারও লাশ এলেও অনেকের লাশও মিলছে না। বর্তমানে বিদেশে অপহরণ বাণিজ্যের বিষয়টি দেশে স্বজনদের সর্বক্ষণিক তাড়িত করে রেখেছে। কখন বিপজ্জনক খবর আসে।

বিভিন্ন সূত্রে জানানো হয়েছে, বিশ্বের বিভিন্ন দেশে বাংলাদেশীদের প্রবাস জীবন রয়েছে। পাশাপাশি সেসব দেশে বাংলাদেশী দূতাবাস, হাইকমিশন, কনসাল অফিসও রয়েছে। এসব অফিস প্রবাসীদের সুযোগ সুবিধা বা বিপদ আপদ নিয়ে তত তৎপর না থাকায় অনেকের ভাগ্যে নেমে আসছে অনাকাক্সিক্ষত দুর্ভাগ্য।

সম্পর্কিত:
পাতা থেকে: