১৮ অক্টোবর ২০১৭,   ঢাকা, বাংলাদেশ   শেষ আপডেট ৫ ঘন্টা পূর্বে  
Login   Register        
ADS

ইন্টারনেটের দাম কমছে ৪১ শতাংশ


স্টাফ রিপোর্টার ॥ ইন্টারনেটের দাম কমানো হচ্ছে। সাধারণ মানুষের সামর্থ্যরে মধ্যে ব্যান্ডউইথের দাম রাখার জন্য প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশে ৪১ শতাংশ কমানোর ঘোষণা দিয়েছে বাংলাদেশ সাবমেরিন কেবল কোম্পানি লিমিটেড (বিএসসিসিএল)। নতুন দাম কার্যকর হলে প্রতি এমবিপিএস (মেগাবাইট পার সেকেন্ড) দাম হবে ৬২৫ টাকা। আগে এর দাম ছিল এক হাজার ৬৮ টাকা। অন্যদিকে আগামী ৬ সেপ্টেম্বর থেকে ভারতের কাছে ১০ জিবিপিএস ব্যান্ডউইথ রফতানি শুরু করা হবে। ভারতের কাছে ব্যান্ডউইথ রফতানি করে বছরে ১২ লাখ মার্কিন ডলার আয় করতে পারবে বিএসসিসিএল। এজন্য সব ধরনের প্রস্তুতি শেষ করেছে বিএসসিসিএল।

বিএসসিসিএলের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) মনোয়ার হোসেন জানিয়েছেন, আজ মঙ্গলবার থেকে ইন্টারনেট গেটওয়েগুলো প্রতি এমবিপিএস (মেগাবাইটস পার সেকেন্ড) ব্যান্ডউইডথ পাবে ৬২৫ টাকায়, যার বর্তমান মূল্য ১ হাজার ৬৮ টাকা। গ্রাহক পর্যায়ে আইএসপি ও ওয়্যারলেস ইন্টারনেটের দামও তুলনামূলকভাবে কমে আসবে। তবে নতুন দাম প্রযোজ্য হবে কেবল ১০ জিবিপিএস (গিগাবাইট পার সেকেন্ড) ব্যান্ডউইডথের ক্ষেত্রে। প্রাথমিকভাবে ঢাকা, চট্টগ্রাম ও কক্সবাজারে এই সুবিধা কার্যকর হবে। পর্যায়ক্রমে সারা দেশে ইন্টারনেটের দাম কমানো হবে।

বিএসসিসিএলের এমডি বলেন, আমরা ভারতে ব্যান্ডউইথ রফতানির প্রক্রিয়া শুরু করেছি। সেখানে প্রতি মেগাবাইটের দাম ধরা হয়েছে ১০ মার্কিন ডলার। রফতানির কৃত ব্যান্ডউইথের দাম বাংলাদেশে ব্যবহৃত ব্যান্ডউইথের দামের চেয়ে বেশি। দেশে প্রতি এমবিপিএস ব্যান্ডউইথ ১ হাজার ৬৮ টাকায় বিক্রি করা হয়। গ্রাহকের সাধ্যের মধ্যে রাখতে ইন্টারনেট ব্যান্ডউইথের দাম আরও কমিয়ে আনা হচ্ছে। এতে ইন্টারনেট ব্যবহারে বেশি সংখ্যক গ্রাহক তৈরি হবে। ইন্টারনেট ব্যান্ডউইথের দাম কমিয়ে গ্রাম পর্যায় পর্যন্ত গ্রাহক বৃদ্ধি করা হবে। গ্রাহক পর্যায়ে দাম কমানোর বিষয়টি নির্ভর করবে ইন্টারনেট গেটওয়ে ও ইন্টারনেট সার্ভিস প্রোভাইডরদের ওপর। দেশে ইন্টারনেটের দাম নিয়ে ব্যবহারকারীদের মধ্যে আগে থেকেই অসন্তোষ রয়েছে। সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যমগুলোতেও ইন্টারনেটের দাম কমানোর দাবি উঠেছে বিভিন্ন সময়ে।

তথ্য প্রযুক্তিবিদরা বলেন, ইন্টারনেট ব্যান্ডউইথের দাম কমানোর বিষয়টি শুভঙ্করের ফাঁকি। এর আগেও বহুবার ইন্টারনেটের দাম কমানো হয়েছে। কিন্তু গ্রাহক পর্যায়ে দাম কমেনি। গ্রাহকরা ইন্টারনেটের ব্যান্ডউইথ বেশি দাম দিয়ে কিনলেও গতি পাচ্ছে না। এটা ব্রডব্যান্ড ও ওয়্যারলেস ইন্টারনেটের ক্ষেত্রে একই অবস্থা বিরাজ করছে। প্রধানমন্ত্রী ঘোষণা দেয়ার পর ইন্টারনেটের দাম কমানো হচ্ছে। অথচ দেশে বাড়তি ব্যান্ডউইথ থাকার পরও ইন্টারনেটের গতি বাড়ানো হয় না। উল্টো নানা প্যাকেজের নামে ইন্টারনেটের দাম বেশি নেয়া হচ্ছে। এভাবে চলতে থাকলে সাধারণ মানুষ ইন্টারনেটের ব্যবহার করতে পারবে না।

এদিকে বিএসসিসিএলের এমডি বলেন, বাংলাদেশ আগামী ৬ সেপ্টেম্বর থেকে ভারতের কাছে আনুষ্ঠানিকভাবে ব্যান্ডউইথ রফতানি শুরু করা হবে। প্রাথমিক অবস্থায় ১০ জিবিপিএস ব্যান্ডউইথ লিজ দেয়া হবে ভারতকে। এই পরিমাণ ব্যান্ডউইথ রফতানি করে বাংলাদেশ সাবমেরিন কেবল কোম্পানি লিমিটেড (বিএসসিসিএল) বছরে ১২ লাখ মার্কিন ডলার আয় করতে পারবে। প্রতি মেগাবাইটের দাম ধরা হয়েছে ১০ মার্কিন ডলার। পর্যায়ক্রমে ব্যান্ডউইথের পরিমাণ ৪০ জিবিপিএস পর্যন্ত বাড়ানো হবে। ৪০ জিবিপিএস ব্যান্ডউইথ রফতানি করা গেলে বছরে ৪৮ লাখ মার্কিন ডলার আয় করা সম্ভব হবে। ভারতের বিএসএনএলের সঙ্গে তিন বছরের জন্য একটি

চুক্তি স্বাক্ষর হয়েছে।

বাংলাদেশ সাবমেরিন কেবল কোম্পানি লিমিটেড বিএসসিসিএলের সি-মি-উই-৪ সাবমেরিন কেবল কনসোর্টিয়ামের সদস্য। এই সাবমেরিন কেবল থেকে বিএসসিসিএল ২০০ জিবিপিএস ব্যান্ডউইথ শেয়ার হিসেবে পেয়েছে। গত ৬ জুন বিএসসিসিএল ভারতের বিএসএনএলের সঙ্গে ব্যান্ডউইথ লীজের জন্য একটি চুক্তি স্বাক্ষর করে। চুক্তি মোতাবেক বিএসসিসিএল শুরুতে ১০ জিবিপিএস ইন্টারনেট ব্যান্ডউইথ লীজ দেবে, যা পরবর্তীতে ৪০ জিবিপিএস পর্যন্ত বাড়ানো হবে। ভারতে ব্যান্ডউইথ লীজ দেয়ার যৌক্তিকতা হিসেবে বলা হয়েছে, দেশের অভ্যন্তরে বর্তমানে প্রয়োজন প্রায় ১২৫ জিবিপিএস ইন্টারনেট ব্যান্ডউইথ, যার মধ্যে ৩৩ জিবিপিএস ব্যান্ডউইথ বিএসসিসিএল কর্তৃক সরবরাহ হচ্ছে। বাকি ৯২ জিবিপিএস ইন্টারনেট ব্যান্ডউইথ আইটিসি কোম্পানিগুলো সরবরাহ করছে ভারত থেকে ক্রয় করে। ব্যান্ডউইথের চাহিদার দিকে লক্ষ্য রেখে ও বর্তমানে ব্যান্ডউইথের মূল্য কমানোর পরবর্তী প্রভাবের কথা বিবেচনায় আনলে ২০১৬ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত বাংলাদেশের অভ্যন্তরে বিএসসিসিএলের ব্যবহৃত ব্যান্ডউইথ হবে সর্বোচ্চ ৯০ জিবিপিএস। ২০১৬ সালের ডিসেম্বরে ২০০ জিবিপিএসের মধ্যে সর্বোচ্চ ৯০ জিবিপিএস ব্যবহৃত হবে। অব্যবহৃত ব্যান্ডউইথের পরিমাণ হবে ১১০ জিবিপিএস। অব্যবহৃত ব্যান্ডউইথের অংশবিশেষ লীজ দিয়ে দেশ বড় অঙ্কের টাকা আয় করা যাবে।

সূত্র জানিয়েছে, ভারতের রাষ্ট্রায়ত্ত কোম্পানি ভারত সঞ্চার নিগাম লিমিটেড (বিএসএনএল) ভারতীয় সরকারের মাধ্যমে ২০১৩ সালের ২৫ মার্চ ব্যান্ডউইথ লিজের জন্য বাংলাদেশ সরকারের কাছে প্রথম আগ্রহ প্রকাশ করে। পরে ২০১৪ সালের ২০ ফেব্রুয়ারি বিএসএনএল আবার আগ্রহ প্রকাশ করে বাংলাদেশ সরকারকে (পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়) চিঠি দেয়। এই চিঠির প্রেক্ষিতে ডাক ও টেলিযোগাযোগ মন্ত্রণালয়ের অধীনে বিএসসিসিএল পদক্ষেপ গ্রহণ করে। তৎকালীন ডাক ও টেলিযোগাযোগ বিভাগের মন্ত্রীর সভাপতিত্বে আন্তঃমন্ত্রণালয় সভায় (অর্থ, পররাষ্ট্র, ডাক ও টেলিযোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তি মন্ত্রণালয় ও বিটিআরসি) বিএসসিসিএলের অব্যবহৃত ব্যান্ডউইথ দেশের বাইরে লীজ দেয়ার বিষয়টি অনুমোদন দেয়। বিএসসিসিএলের ৯৪তম বোর্ড সভায় ভারতে ব্যান্ডউইথ লীজ দেয়ার বিষয়টি চূড়ান্ত অনুমোদন পায়। একই সঙ্গে ব্যান্ডউইথ রফতানিমূল্য নির্ধারিত হয় প্রতি মেগাবাইট ৯ দশমিক ৫ থেকে ১০ মার্কিন ডলার। বিএসসিসিএল বিএসএনএলের সঙ্গে মেগাবাইট প্রতি ১০ মার্কিন ডলার মূল্য ধার্য্য করে একটি খসড়া চুক্তি তৈরি করে।

খসড়া চুক্তিটির আইনগত মতামত নিয়ে তা বিএসসিসিএলের ১০৫তম বোর্ড সভায় উপস্থাপিত হলে খসড়া চুক্তিটির অনুমোদন দেয়া হয়। খসড়া চুক্তিটির বিষয়ে সরকারের মতামতের জন্য পাঠানো হলে তা মন্ত্রিসভায় (কেবিনেট সভা) উপস্থাপনের জন্য অর্থ ও আইন মন্ত্রণালয়ে প্রেরণ করা হয়। দুই মন্ত্রণালয় খসড়া চুক্তিটি অনুমোদন করে এবং একই সঙ্গে বাংলাদেশ ব্যাংকের অনাপত্তিপত্র সংগ্রহ করা হয়। চুক্তিটি মন্ত্রিসভায় উপস্থাপিত হলে ডাক ও টেলিযোগাযোগ বিভাগ গত ২১ এপ্রিল চিঠি দিয়ে জানায়, খসড়া চুক্তি স্বাক্ষরের জন্য পদক্ষেপ নিতে। পরে চুক্তি স্বাক্ষরের অগ্রগতি প্রতি মাসের ৪ তারিখের মধ্যে মন্ত্রণালয়কে অবহিত করার নির্দেশও দেয়া হয়। বিএসসিসিএল গত বছর দেশের অভ্যন্তরে ব্যান্ডউইথের মূল্য কমানোর অনুমোদন চাইলে সম্প্রতি তা বাস্তবায়নের অনুমতি দেয়া হয়েছে। এই অনুমোদন পাওয়ার আগে কক্সবাজার থেকে বিএসসিসিএল ১০ জিবিপিএস লেভেলে সর্বোচ্চ ছাড় দিয়ে মেগাবাইট প্রতি ৬১২ টাকায় ব্যান্ডউইথ লীজ দিচ্ছে। ভারতে ব্যান্ডউইথ লীজের জন্য কক্সবাজার-চট্টগ্রাম-কুমিল্লা-বি.বাড়িয়া-আখাউড়া ট্রান্সমিশন লাইন ব্যবহার করতে হচ্ছে। ঢাকা পর্যন্ত ট্রান্সমিশন খরচ যোগ করলে দেখা যায়, দেশের অভ্যন্তরে ব্যান্ডউইথের মূল্য লীজকৃত ব্যান্ডউইথের মূল্য থেকে কম।

অন্যদিকে, আগামী বছর ডিসেম্বরে একটি কনসোর্টিয়ামের আওতায় সি-মি-ইউ-৫ বা দ্বিতীয় সাবমেরিন কেবলে সংযুক্ত হবে বাংলাদেশ। এই কেবলের মাধ্যমে অতিরিক্ত ১ হাজার ৩শ’ জিবিপিএস ব্যান্ডউইথ পাবে বাংলাদেশ।

সর্বাধিক পঠিত:
পাতা থেকে: