মেঘলা, তাপমাত্রা ৩১.১ °C
 
২০ সেপ্টেম্বর ২০১৭, ৫ আশ্বিন ১৪২৪, বুধবার, ঢাকা, বাংলাদেশ
সর্বশেষ

ব্ল্যাক মানডে অতঃপর...

প্রকাশিত : ৩০ আগস্ট ২০১৫
  • আরিফুর সবুজ

বিশ্ববাসী শঙ্কিত। চীনের শেয়ার বাজারের ভয়াবহ ধসের কারণেই এই শঙ্কা। বিশ্বের দ্বিতীয় অর্থনৈতিক দেশটির সঙ্গে প্রায় সারা বিশ্বেরই অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিদ্যমান। আর এ কারণেই শঙ্কা। গত সোমবার দেশটির শেয়ারবাজারে আট বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ দরপতন ঘটে। সাংহাই কম্পোজিট সূচক ৮ দশমিক ৪৯ শতাংশ কমে দাঁড়িয়েছিল প্রায় ৩ হাজার ২০৯ পয়েন্ট। ২০০৭ সালের পর এটিই ছিল চীনের পুঁজিবাজারের সর্বোচ্চ দরপতন। এ পতন একদিকে এশিয়াসহ বিশ্বের সব বিনিয়োগকারীকে স্তম্ভিত করেছে, অন্যদিকে এ ঘটনায় বিশ্বের দ্বিতীয় সর্ববৃহৎ অর্থনীতি নিয়ে শঙ্কা আরও জোরালো হয়েছে। এই বিপুল দরপতনে বিশ্বের বাঘা বাঘা বিলিয়নর যেমন তাদের অনেক সম্পত্তি হারিয়েছে, তেমনি চীনা লাখ লাখ ক্ষুদ্র বিনিয়োগকারী হয়েছে নিঃস্ব। ১৯৮৭ সালের ১৯ অক্টোবর বিশ্ব পুঁজিবাজারে অনেক বড় ধস নেমেছিল। দিনটি ছিল সোমবার এবং তা ব্ল্যাক মানডে হিসেবে ইতিহাসে আখ্যায়িত। চীনের এই বড় ধসটিও কাকতালীয়ভাবে সোমবার হওয়ায় ইতোমধ্যে তা ব্ল্যাক মানডে হিসেবেই অভিহিত হয়েছে।

হুট করেই যে চীনের শেয়ারবাজারে ধস নেমেছে, তা কিন্তু নয়। বিগত কয়েক মাস ধরেই চীনের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ছিল মন্দা। রফতানি বাণিজ্য, শিল্প উৎপাদনসহ বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই ছিল শ্লথ গতি। শেয়ারবাজারেও সেই প্রভাব পড়তে থাকে। বিগত দু’মাস ধরে কম্পোজিট সূচক প্রায় ৩০ শতাংশ কমে যাওয়ায় দেশটির সরকার শেয়ারবাজারের দরপতন ঠেকানোর জন্য প্রাণপণ চেষ্টা করতে থাকে। কিন্তু তাদের চেষ্টা যে ব্যর্থতায় পর্যবসিত হয়েছে, এই ধসই তার প্রমাণ। সম্প্রতি দেশটি যখন ইউয়ানের অবমূল্যায়ন করে, তখনই উদ্বিগ্ন সৃষ্টি হয়েছিল বিনিয়োগকারীদের মাঝে। সেই উদ্বেগই সত্য পরিণত হয়েছে ব্ল্যাক মানডেতে। চীনের ব্ল্যাক মানডেতে বিশ্বের চার শ’ ধনী ব্যক্তি প্রায় ৭৬ বিলিয়ন ডলার খুইয়ে ফেলে। আর পুরো সপ্তাহে হারান ১৮২ বিলিয়ন ডলার। সবচেয়ে বেশি সম্পদ হারিয়েছেন চীনের ধনকুবের ওয়াং জিয়ালিন। তিনি ঐ দিনে ২২০ কোটি ব্রিটিশ পাউন্ড তথা ২৭ হাজার ৫২২ কোটি টাকার সম্পদ হারিয়েছেন। ব্লুমবার্গ বিলিয়নিয়ার ইনডেক্সের সতেরোতম এই ধনী ব্যক্তিটি শেয়ারবাজার ধসে তার নিট সম্পত্তির দশ শতাংশই খুইয়ে ফেলেছেন। এছাড়া, ওয়ারেন বাফেট, মার্ক জুকারবার্গ, বিল গেটসসহ ইনডেক্সের প্রায় সব শীর্ষ ধনীই বিপুল পরিমাণ সম্পদ হারিয়েছেন এই শেয়ার ধসে। তবে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে ক্ষুদ্র বিনিয়োগকারীরা। অনেককেই বসে যেতে হয়েছে পথে।

এই ধসের প্রভাব চীন ছাড়িয়ে ইউরোপ, আমেরিকাসহ এশিয়ার বিভিন্ন দেশের শেয়ার মার্কেটেও পড়েছে। দেশটির শেয়ারবাজার ধসের প্রভাব বিশ্ব অর্থনীতিতে ভালভাবেই পড়া শুরু হয়েছে। পুরো বিশ্বের অর্থনীতির জন্য এটি একটি ধাক্কা। আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে চীনের সঙ্গে বাণিজ্য ও বিনিয়োগ সম্পর্কিত দেশগুলোতে। চীনের শেয়ারবাজারে ধস, মুদ্রার মান কমা, শ্লথ অর্থনীতি, প্রবৃদ্ধি সঙ্কোচনের ঝুঁকি প্রভৃতি কারণে উন্নয়নশীল দেশগুলোর আর্থিক বাজার থেকে বিনিয়োগকারীরা অর্থ তুলে নেয়া শুরু করেছেন। রাশিয়া, দক্ষিণ আফ্রিকা, ব্রাজিলসহ ভোগ্যপণ্য রফতানিকারক অন্যান্য দেশের মুদ্রার মান ডলারের বিপরীতে বড় হারে কমেছে। এসব দেশের শেয়ারবাজারের সূচকেরও বড় পতন হয়েছে। মুদ্রার মানের বড় পতনে এসব দেশের অর্থনীতিতে উভয় সঙ্কট তৈরি হয়েছে। চীনের ওপর নির্ভরশীল দেশগুলোর অর্থনীতি কতটা ভঙ্গুর তার অন্যতম প্রমাণ রাশিয়া। চীনের দুর্বলতা যেমন রাশিয়ার রফতানি পণ্যের দাম কমিয়েছে, তেমনি দেশটির প্রধান বৈদেশিক মুদ্রা আয়ের উৎস ক্রুড অয়েলেরও দাম কমিয়েছে। ফলে মান কমেছে রুবলের। দেশটির মূল্যস্ফীতি ১৫ শতাংশের ওপরে দাঁড়িয়েছে। চীনে কয়লা, খনিজ পদার্থ ও পাম অয়েলের অন্যতম রফতানিকারক ইন্দোনেশিয়ার শেয়ারবাজারে দরপতন হয়েছে ২০ শতাংশেরও বেশি। দক্ষিণ আফ্রিকার স্বর্ণ, প্লাটিনাম ও লোহা খনির বাণিজ্যিক অংশীদার চীন। এ ধসের কারণে দক্ষিণ আফ্রিকার এই খাতেও ধস নেমেছে। আরও ক্ষতির হাত থেকে বাঁচতে শুরু হয়েছে কর্মী ছাঁটাই। এ রকমভাবে বিশ্বের অনেকে দেশেই অল্প বিস্তর হলেও প্রভাব পড়ছে। চীনের এ সঙ্কট সাময়িক নাকি দীর্ঘমেয়াদী, এখনও তা নিশ্চিত নয়। প্রতিদিনই পরিস্থিতি পরিবর্তন হচ্ছে। তবে শীঘ্রই এটি কাটিয়ে ওঠা সম্ভব না হলে সারা বিশ্বের মতো বাংলাদেশের অর্থনীতিতেও তা প্রভাব ফেলবে। কেননা চীন বাংলাদেশের অনেক বড় আমদানি-রফতানির বাজার। এই কারণেই চীনের মন্দা ও শেয়ারবাজার ধস প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে বাংলাদেশের অর্থনীতিকে এখনও না করলেও, ভবিষ্যতে প্রভাবিত করতে পারে। তবে আশার কথা, চীনা সরকার এই ধস ও মন্দা মোকাবেলায় কিছু পদক্ষেপ নিয়েছে। চীনের কেন্দ্রীয় ব্যাংক সুদের হার শূন্য দশমিক ২৫ শতাংশীয় পয়েন্ট কমানোয় তা ৪ দশমিক ৬ শতাংশে দাঁড়িয়েছে। গত নবেম্বরের পর এ নিয়ে পঞ্চমবারের মতো সুদের হার কমিয়েছে দেশটির কেন্দ্রীয় ব্যাংক। এছাড়া পেনশন ফান্ডের টাকা শেয়ারবাজারে বিনিয়োগ, মার্জিন ঋণের শর্ত শিথিল, বড় বিনিয়োগকারীদের শেয়ার বিক্রি বন্ধ, প্রাথমিক শেয়ার অনুমোদন বন্ধ করা এবং সরকারী প্রতিষ্ঠানগুলোকে শেয়ার কিনতে উদ্বুদ্ধ করা হয়েছে। এসব পদক্ষেপের কারণে ঘুরে দাঁড়াতে শুরু করেছে দেশটির শেয়ারবাজার। টানা কয়েকদিন ধসের পর বৃহস্পতিবার থেকে শেয়ারবাজারে আশার আলো দেখা দিয়েছে। তবে অনেক বিশেষজ্ঞ এসব উদ্যোগকে বিবেচনা করছেন লাইফসাপোর্ট হিসেবে।

প্রকাশিত : ৩০ আগস্ট ২০১৫

৩০/০৮/২০১৫ তারিখের খবরের জন্য এখানে ক্লিক করুন


শীর্ষ সংবাদ: